জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/ পর্ব ২১/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ২১

প্রীতম সেনগুপ্ত 

স্বনামধন্য পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত একটি নিবন্ধে লিখেছেন ---‘আমি দুটি প্রাসঙ্গিক বিষয় বা প্রশ্ন উত্থাপন করব --- ঈশ্বর সাকার অথবা নিরাকার এবং তিনি ব্যক্তি-ঈশ্বর না নৈর্ব্যক্তিক চৈতন্যস্বরূপ। এই প্রশ্ন আলোচনা করার আগে আমাদের মনে একটা ধারণা পরিষ্কার হওয়া দরকার ---- তা হল, নিরাকার ঈশ্বরও কিন্তু ব্যক্তি-ঈশ্বররূপে পরিগণিত হতে পারেন। ব্রাহ্মধর্মমতে ঈশ্বর নিরাকার, কিন্তু তিনি ব্যক্তি। মুসলমান ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও নিরাকার ব্যক্তি ঈশ্বরের উপাসনা করেন। হিন্দু আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারাতেও দেখি দেবতারা ব্যক্তি-ঈশ্বররূপেই উপস্থাপিত। ঋগ্বেদে উল্লিখিত দেবদেবীদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলি নানা স্তোত্রে বর্ণিত। তাঁরা প্রার্থনা শোনেন এবং সেই প্রার্থনা পূরণ করতেও সক্ষম। ঋগ্বেদের যুগে কোনও দেবায়তন বা দেবমূর্তির অস্তিত্ব ছিল না। তবে এযুগের দেবদেবীদের মূর্তির বর্ণনা মন্ত্রে পাওয়া যায়। সুতরাং ঋগ্বৈদিক যুগে ঈশ্বরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না নৈর্ব্যক্তিক, সাকার না নিরাকার ---- এ-প্রশ্ন ওঠে না।

🍂

বৈদিক যুগের শেষে উপনিষদের যুগে সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরের ধারণার উদ্ভব হল; এবং তখনই তাঁর প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয়ের প্রশ্ন উঠল। এই সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ‘ব্রহ্ম’ আখ্যায় পরিচিত হলেন। উপনিষদে তিনি মানববোধের অতীত। এই ধারণা থেকেই নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা উদ্ভব। এই পরমেশ্বর সম্পর্কে কেনোপনিষদ বলেন, “নয়ন যেখানে গমন করে না, বাক্য গমন করে না, মনও গমন করে না (১/৩)।” এই পরমশক্তিমান চৈতন্যকে কোনও বিশেষ ব্যক্তি রূপে আমরা গণ্য করতে পারি না। অদ্বৈতবাদী উপনিষদ গ্রন্থসমূহে ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারণার কোনও স্থান নেই। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে ছান্দোগ্যর মহাবাক্য ‘তত্ত্বমসি’ --- কোনও ব্যক্তি- ঈশ্বর ভাবনায় আভাস দেয় না। এমনকী অদ্বৈত দর্শনে প্রার্থনারও স্থান নেই।  কিন্তু কোনও কোনও উপনিষদে ঈশ্বর এক ব্যক্তিরূপে উপস্থাপিত যাঁকে দর্শনও করা যায়। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে সাকার ঈশ্বরের কথা বলতে গিয়ে ঋষি বলেছেন: সপ্রকাশ ও অজ্ঞানাতীত এই সর্বব্যাপী পুরুষকে আমি জানি। তাঁকে জানলেই মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে; কারণ পরমার্থলাভের আর কোনও উপায় নেই ( ৩/৮ )। দেখা যাচ্ছে এই উপনিষদটি দ্বৈতবাদী দর্শন --ভিত্তিক। সমগ্র ঔপনিষদিক সাহিত্যকে যদি ‘বেদান্ত'  বলে চিহ্নিত করা যায় তবে বলতে হয় যে বেদান্ত ব্যক্তি-ঈশ্বর ও নৈর্ব্যক্তিক ঈশ্বর উভয়কেই স্বীকার করে এবং যুগপৎ অদ্বৈতবাদ ও দ্বৈতবাদকে সমর্থন করে।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, বেদান্তের সার বলে পরিগণিত ‘বাদরায়ণ সূত্র’ বা ‘বেদান্তসূত্র’ বা ব্রহ্মসূত্র কোন মতবাদের প্রবক্তা? আমি মনে করি, এটি দ্বৈতবাদ প্রচার করে। রাধাকৃষ্ণন ও সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তও আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।

...শংকরাচার্যের মতে ব্রহ্ম নৈর্ব্যক্তিক, নির্গুণ, নিরাকার। তথাপি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সীমা যাঁরা অতিক্রম করতে অক্ষম, তাঁদের জন্য শংকর ‘ঈশ্বর’ আখ্যায়িত এক ব্যক্তি-দেবতার ধারণা উপস্থাপিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করেছেন এবং দেবদেবীর উদ্দেশে স্তব রচনা করেছেন।

এইভাবে ঋগ্বেদ থেকে ঔপনিষদিক যুগ হয়ে শংকরের যুগ পর্যন্ত আধ্যাত্মিক ইতিহাসের ধারা পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাই নিরাকার ও সাকার, ব্যক্তি ও নৈর্ব্যক্তিকরূপে ঈশ্বর উপস্থাপিত ।’ ( শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্ম: ঈশ্বরের স্বরূপ, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, নিবোধত, ২৮ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুলাই -আগস্ট, ২০১৪ ) 

ব্রহ্মসূত্রের প্রথম অধ্যায়ে প্রথম পাদে, অধিকরণ ১ ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা  --- এর প্রাথমিক প্রয়োজন। অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা।।১।১।১।। --- যজ্ঞাদি ক্রিয়ার ফলে ক্ষণস্থায়ী জানার পর আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজনীয় গুণগুলি অর্জন করে সবরকমের সংশয়-মুক্ত ব্রহ্মজ্ঞান লাভের আলোচনার প্রয়োজন। পরবর্তী পর্বে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

                                                                                          (  ক্রমশ )


Post a Comment

0 Comments