জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র ---- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি /পর্ব ২০/প্রীতম সেনগুপ্ত

 
ব্রহ্মসূত্র : শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ২০

প্রীতম সেনগুপ্ত

সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই ত্রিশক্তিই বিশ্বব্যাপারধাত্রী হয়ে আছেন। এই শক্তিত্রয় বা গুণত্রয় যখন ব্রহ্মের সাম্যাবস্থা য় বিলীন থাকেন, তখন সেই ত্রিগুণসাম্যময়ী-মূলশক্তি বা আদ্যাশক্তিই “প্রকৃতি“ পদবাচ্য হন। এই প্রকৃতি থেকে গুণত্রয়যোগে সর্বজগতের সৃষ্টি -স্থিতি-লয়। ব্রহ্ম স্ব-ইচ্ছায় সগুণ হয়ে, প্রকৃতির গুণত্রয়যোগেই রজোগুণে ব্রহ্মা, সত্ত্বগুণে বিষ্ণু ও তমোগুণে শিব হয়েছেন এবং সংসারের সৃষ্টি -স্থিতি-সংহারে রত আছেন। ব্রহ্মকে আমরা নির্গুণ অব্যক্ত তত্ত্বে জানতে পারি না সত্য, কিন্তু এই ত্রিগুণাবতার ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বররূপে জগতের সৃষ্টি -স্থিতি-সংহার কার্যে তাঁকে সগুণ ব্যক্ত তত্ত্বে উপলব্ধি করতে পারি। ব্রহ্মের বিশ্ব-মূল-কারণত্ব এই ত্রিগুণাশ্রিত সগুণ ভাবেই জ্ঞাতব্য।

ব্রহ্মের বিশ্বকারণত্ব যে কেবল দার্শনিক যুক্তি-তর্ক- বিচারেরই বোধ্য, তখন নয়; স্মরণাতীত কাল থেকে --- মানবসৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই মানবমনে তার স্পষ্টভাবে মুদ্রিত। বিশ্বকারণত্ব-রূপে ঈশ্বর-তত্ত্ব- বিশ্বাস মানব-হৃদয়ের স্বাভাবিক সম্পত্তি।

🍂

ভৃগুবারুণী পিতৃসকাশে ব্রহ্মতত্ত্ব বুঝতে চাইলে, পিতা বরুণ বললেন, “যতোবা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে, যেন জাতানি জীবন্তি, যৎপ্রযস্ত্যভিসংবিশন্তি, তদ্ব্রহ্ম ত্বং সিদ্ধি।” অর্থাৎ ---

                                             এই ভূতগ্রাম যাঁহাতে জনিত,

                                             জন্মিয়া রহিতে যাঁহাতে জীবিত,

                                              লয়ে হয় পুনঃ যাঁহাতে নিহিত ,

                                              তিনি ব্রহ্ম, তুমি হও হে বিদিত। ( তৈত্তরীয় উপনিষদ ৩/১ ) 

আনন্দস্বরূপ থেকে ভূতগ্রামহম্ভূত, আনন্দস্বরূপেই নিহিত হয়।

প্রাচীন ভারতের ঋষি-মুখ-নির্গত ভগবৎপ্রত্যাদিষ্ট সিদ্ধবাণীসমূহের সমষ্টিই সনাতন সত্যপূত বেদশাস্ত্র। তার ব্রহ্মের প্রতিপাদক। কেবল আমাদের শাস্ত্রই যে ব্রহ্ম প্রতিপাদন করে, এমন নয়, সর্বদা তির সর্ববিধ শাস্ত্রই স্বখধিকারানুরূপে ব্রহ্ম প্রতিপাদন করে থাকে।

ব্রহ্মই বিশ্বকারী, ব্রহ্মই বিশ্বধারী, ব্রহ্মই বিশ্বহারী। এটাই সর্ববেদসম্মতসার সিদ্ধান্ত। যেখানেই ব্রহ্মতত্ত্ব বর্ণনা, জগৎ-কারণ-আলোচনা, সেখানে ওই অর্থ মূর্তিমান। সকল শাস্ত্রে বিভিন্ন বিষয় উক্ত ও ব্যক্ত থাকলেও, সকলের সমন্বয় ব্রহ্মেই, সন্দেহ নেই। শাস্ত্রমাত্রেরই সমন্বয় সেই পরব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

ব্রহ্মের স্বরূপ বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ কী বলছেন? শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত গ্রন্থে এইরকম উল্লেখ আছে ---

একজন ব্রাহ্মভক্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, ঈশ্বর সাকার না নিরাকার?

শ্রীরামকৃষ্ণ --- তাঁর ইতি করা যায় না। তিনি নিরাকার আবার সাকার। ভক্তের জন্য তিনি সাকার। যারা জ্ঞানী অর্থাৎ জগৎকে যাদের স্বপ্নবৎ মনে হয়েছে, তাদের পক্ষে তিনি নিরাকার। ভক্ত জানে আমি একটি জিনিস, জগৎ একটি জিনিস। তাই ভক্তের কাছে ঈশ্বর ‘ব্যক্তি’ (Personal God ) হয়ে দেখা দেন। জ্ঞানী --- যেমন বেদান্তবাদী --- কেবল নেতি নেতি বিচার করে। বিচার করে জ্ঞানীর বোধে বোধ হয় যে, “ আমি মিথ্যা, জগৎ মিথ্যা --- স্বপ্নবৎ।” জ্ঞানী ব্রহ্মকে বোধে বোধ করে। তিনি যে কি, মুখে বলতে পারে না।                                                                                   ( ক্রমশ )   

      

Post a Comment

0 Comments