জ্বলদর্চি

ফুটবলকে দিয়ে তৈরি করেন কবিতা, জাদুকর লিয়োনেল মেসি/অর্হণ জানা

ফুটবলকে দিয়ে তৈরি করেন কবিতা, জাদুকর লিয়োনেল মেসি

অর্হণ জানা

'আমি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম যে, সে যতদিন ইচ্ছা ততদিন খেলতে চেয়েছিল। আশা করি সে তার সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত। আমার বিশ্বাস, সে অবশ্যই গর্বিত। আর মানুষও যেন তার অর্জন নিয়ে গর্ব করে। কারণ, ফুটবল মাঠে পা রাখা সর্বকালের সেরা ফুটবলার সে। এই বিশ্বকাপে সে যা করেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।'--- লিয়োনেল স্কালোনি 

আরও একটা বিশ্বকাপ। শেষ হল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা। যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার অবসর নেন, কোচিংয়ে চলে যান কিংবা মাঠের বাইরে নতুন জীবনে অভ্যস্ত হন, সেই বয়সেই তিনি দেশের অধিনায়ক হিসেবে দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন। এ যেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। মানব ঈশ্বর।
১৬ নভেম্বর ২০০৩, হোসে মরিনহো তখন পর্তুগালের ক্লাব এফসি পোর্তোর কোচের দায়িত্বরত। তাঁর দলের বিপক্ষে বার্সেলোনা তখন খেলছে এক প্রীতি ম্যাচ। ২-০ গোলে পিছিয়ে অতিথি দল বার্সেলোনা। পরিবর্তনে এলেন ১৪ নম্বর জার্সি পরা খর্বকায় ১৬ বছরের এক ছোকরা। তার পর কী হল?
তার পর থেকে ইতিহাস ওলোটপালোট হয়ে গেল। বিশ্ব ফুটবল নড়েচড়ে বসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে চেয়ে উপভোগ করতে থাকল সেই ক্ষুদে ফুটবলারের অপার্থিব ফুটবলীয় কারুকর্য। এ যেন বাংলার নকশি কাঁথার থেকেও সুন্দর শৈলী। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো আবেদন জাগানিয়া। ছেলেটি একের পর এক বিশ্ব রেকর্ড গড়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন ভিনগ্রহের ফুটবলারের ট্যাগ। ভিনগ্রহের সেই ফুটবলের জাদুকর আর কেউ নন, লিয়োনেল মেসি।
🍂
সবাই কবি নয়--- কেউ কেউ কবি। মেসি তেমনই এক কবি। দশবার লা লিগা শিরোপার ট্রফিটি ছুঁয়ে বালক থেকে যুবক বয়সের শেষের দিকে আসা অবধি মেসির ক্লাব ক্যারিয়ারের গোলের সংখ্যা ৬৮৭। স্পেনের ঘরোয়া লিগ জিতেছেন বেশ কয়েকবার করেই, তাঁর সঙ্গে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব চ্যাম্পিয়ন্স লিগও জিতেছেন পাঁচবার। লিয়োনেল মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের আক্ষেপ হয়ে থাকত একটি আন্তর্জাতিক ট্রফি। সেটাও মিটেছে। তাও পর পর দু'টো। কোপা এবং ফিনালিজমা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বমুকুট পরিয়ে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছেন। যা পেতে গিয়ে ২০১৪-তে খুব কাছ থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল। 
মেসির খেলা দেখার অভিজ্ঞতা আর দশটা খেলোয়াড়ের খেলা দেখার মতো নয়। বল যখন তাঁর পায়ে থাকে, তখন যেন পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মগুলোও থমকে দাঁড়ায়। চোখের পলকে গতি পরিবর্তন, ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের একের পর এক রক্ষণভাগ চুরমার করে দেওয়া, কিংবা সুনির্দিষ্ট নিখুঁত পাসে গোল করানো--- সব কিছুর মধ্যেই যেন রয়েছে এক অপরূপ নান্দনিকতা। তিনি মাঠে যখন দৌড়ান, বল যেন তাঁর পায়ের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে। কবি যেমন কলমের আলতো ছোঁয়ায় হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেন, মেসিও তেমনি বলের আলতো স্পর্শে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় স্পন্দিত করেন। 
মেসি শুধুই আর্জেন্টিনা বা কোনও নির্দিষ্ট ক্লাবের নন, তিনি গোটা ফুটবল বিশ্বের সম্পদ। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ বা আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম। ব্রাজিল, ভারতের কলকাতা কিংবা বাংলাদেশের দূরবর্তী কোনও গ্রাম--- বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে নীল-সাদা ১০ নম্বর জার্সি পরা মানুষের সংখ্যাই বলে দেয় ফুটবলে তাঁর প্রভাব কতখানি। তাঁর খেলা দেখতে মাঝরাতে জেগে থাকা ভক্তদের কাছে মেসি এক স্বপ্নের নাম। 
কথিত আছে, এগারো বছর বয়সি মেসির কুশলতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ। হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে মেসির বাবার সঙ্গে চুক্তি করেন ন্যাপকিন পেপারে। এর পরে, বাকিটুকু ইতিহাসের খাতায় উল্লিখিত।
এক একটা বছর অতিক্রান্ত হয় আর পকেট ভরে যায় এক একটা ব্যালন ডি অর-এ! কখনও এক মরসুমে ৯১ গোলের রেকর্ড। অজস্র সব অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। কখনও হয়ে উঠেছেন ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত। কিংবা নিজের নামে চালু করেছেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন, রোগাক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার স্বার্থে। আক্ষরিক অর্থে তিনি একজন রোল মডেল।
সময় বয়ে যাবে, নতুন নতুন খেলোয়াড় আসবে, নতুন নতুন রেকর্ড গড়বে আর ভাঙবে। কিন্তু ফুটবল মাঠে লিয়োনেল মেসি যে নান্দনিকতার জন্ম দিয়েছেন, তা চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। ফুটবল নামক খেলাটিতে গতি আর শক্তির পাশাপাশি যে গভীর প্রেম, সাহিত্য এবং শিল্প লুকিয়ে থাকতে পারে--- তা বিশ্ববাসীকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন ৩৯ বছরের এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। তিনি প্রকৃতই এক জীবন্ত মহাকাব্য। তিনি ফুটবলকে বিদায় জানালেও ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নাম রয়ে যাবে। আজীবন। 

বিদায়, জাদুকর... তাঁর প্রতি এই চিরকালীন আর্জেন্টাইন সমর্থকের অন্তরের অনুরাগ ও শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কবিতাটি নিবেদন করলাম।

তিনি যখন বল পায়ে ছোটেন
মহাকর্ষের নিয়মগুলো থমকে দাঁড়ায় এক পলক
গণিতবিদেরা হিসেব মেলাতে পারেন না
বিজ্ঞানের সব সূত্র হার মেনে নেয় ওই বাঁ পায়ের জাদুতে।
তাঁর জন্য একটা গোটা রাত নির্ঘুম কেটে যায় কোটি মানুষের
শীতের রাতেও ঘাম ঝরে উত্তেজনায়।
অফিসের কড়া বস আর সাধারণ কেরানি
একই সঙ্গে লাফিয়ে ওঠে একই গোলের আনন্দে।
পরাজয়ের গ্লানি ভুলে, চরম শত্রুও সেদিন
নীল-সাদা রঙের জার্সি গায়ে জড়িয়ে কোলাকুলি করে।
তিনি যখন মাঠে নামেন
আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস এক হয়ে যায় কলকাতার গলির মোড়ে,
তাঁর খেলা দেখে 
রোনাল্ডোর ভক্তও মনে মনে বলে ওঠে— "আহা, কী খেলল!"
যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর কোনও এক কোণে
বুলেটের শব্দ ছাপিয়ে শোনা যায় তাঁর নাম।
বিধাতাও তখন স্বর্গের সিংহাসন ছেড়ে
টেলিভিশনের পর্দার সামনে এসে বসেন,
বলেন— "মানুষ বানানোর সার্থকতা আমি ওই মাঠেই দেখতে পাই।"
মন্দিরের ঘণ্টা বা মসজিদের আজানে নয়
রোজারিয়ো থেকে আসা ওই আটত্রিশ বছরের ছেলেটার পায়েই
বেঁচে থাকে পৃথিবীর সমস্ত নিষ্পাপ আনন্দ।
তিনি আর কেউ নন
তিনি ফুটবলের ঈশ্বর— লিয়োনেল মেসি।

Post a Comment

0 Comments