অমিত কুমার রায়
কেন লিখব এই ভাবনা প্রথমে আমার মধ্যে ছিল না, লিখতে পারি কিনা সেটাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। শখ করে লিখব নাকি সময় কাটানোর জন্য লিখব, সমাজের জন্য কিছু বার্তা দেবো, আমার অস্তিত্বকে হারিয়ে না যেতে দেয়ার জন্য লিখবো কিংবা প্রতিবাদের জন্য লিখব এ ভাবনা প্রথম দিকে কিছুই ঠিক করিনি। পরে বুঝি, শখ করে লেখা, সময় কাটানোর জন্য লেখা বেশিদিন টেকসই হয় না। মনের ভেতর থেকে একটা মানুষকে বের করতে হয় যে সব সময় মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারে, আনন্দে দুঃখে সুখে শোকে সবেতেই। যে তার লেখার লক্ষে স্থির থাকে সে লেখায় ফুটে ওঠে অনুভব বিবেকের বাঙ্ময় প্রতিফলন।
ছোটবেলায় লেখার অভ্যাসটা শুরু হয়েছিল মাসিমাদের চিঠি লিখতে শুরু করে। মাকে দেখেছি মাসিমাদের চিঠি লিখতে, তখন বড়দের চিঠি ছোটদের পড়তে বারণ থাকতো। মাসিমাদের চিঠিও ডাকযোগে আসতো। খোলা চিঠি পিয়ন সেলিমদা আমার হাতে দিয়ে গেলে মায়ের হাতে তুলে দিতাম, মা চিঠি উচ্চারণ করে পড়লে মাসিমাদের বাড়ির ব্যক্তিদের কাল্পনিক মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতো। মায়ের যখন শরীর খারাপ থাকতো ছোড়দি মায়ের কথা মত সব লিখেদিত তা পাশে থেকে দেখেছি। মা মাসিমাদের হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মত গোটা গোটা হরফে। আমি তখন প্রাথমিকে, বায়না ধরলাম সেজো মাসীমাকে চিঠি লিখব। আমাকে পোস্টকার্ড আর ঝরণা কলম দিয়ে লিখতে দিলে গোটা পোস্টকার্ড কালিতে চিত্রলিপি হয়ে গেল! ভয়ে জড়োসড়ো। মা হেসে বলল আরো পোস্টকার্ড আছে, এবার ন’দা এসে পোস্টকার্ড আর উডপেন্সিল দিল, এবার কি লিখব চিঠিতে? মা কি লিখবো বলে বলে দিতে থাকলো কিন্তু কুড়িটা শব্দে পোস্টকার্ডের দু পিঠ ভরে গেল! মা হয়তো আমার মধ্যে নিজস্ব চিন্তাভাবনা অনুভূতি ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলছিল। এরপর থেকে মাসিমাদের মা কম চিঠি লিখতো বাকি সময় আমাকে লেখার অনুপ্রেরণা দিতো। পরবর্তী দিনে আমার বড় দাদা কল্যাণ রায় আমার ছোটখাটো লেখার মধ্যে হয়তো সৃজনশীলতার অঙ্কুরোদ্গম লক্ষ্য করেছিল, লেখার জন্য উৎসাহ যোগাতো। উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে যখন পা রাখলাম তখন থেকে মায়ের জন্য পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই আনবার দায়িত্ব পেলাম। আনতাম বিভিন্ন সাহিত্যিকদের উপন্যাস গল্পের বই মায়ের যেগুলো অতি প্রিয় ছিল।
মনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল যে চিন্তা ভাবনা তাহল নানান রকম গল্প উপন্যাস পাঠ করা। কবিতার বই আমার বড় প্রিয়, আজও পড়াশোনা করি বিভিন্ন ধরনের বই। লিখতে ভালো লাগে এই কারণে বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয় লেখার মাধ্যমেই হোক আর কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেই হোক। বিপুলা পৃথিবীর কিছুটা জানা কিছুটা চেনা। কিছু মনের কথা আদান প্রদান, মতামত, বিশ্লেষণ সকলের মাঝে প্রকাশ করে এক আনন্দের ধারা মনে প্রবাহিত হয়। আর সেই ফল্গুধারার সৃষ্টি খাতায় শব্দ প্রতিমাদের বন্দি করে রাখি।
“ভগিনী নিবেদিতা” বইটি পড়ে কিশোর বেলায় একটি ছোট কবিতার প্রতিমা গড়েছিলাম। কবিতার নাম দিয়েছিলাম “ভগিনী নিবেদিতার প্রতি”। সেই লেখাটি আমাদের পাড়ায় একটি হাতে লেখা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। শতগুন লেখার আগ্রহকে শব্দ- অনলে রূপ দিয়েছিল আমার মন কলম। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে আমার সারস্বত- কবিতা লেখার তপস্যা। এই তপস্যকে সার্থক করার জন্য লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করে আনতাম রবীন্দ্রনাথ নজরুল জীবনানন্দ বিভূতিভূষণ তারাশঙ্কর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টির অমৃত জ্ঞান-ফল। আরো লেখকদের নাম বললে শব্দের কলেবর বেড়ে যাবে তবু যাদের সাহিত্য ছাড়া নিজের জ্ঞান-চর্চাকে বাড়ানো সম্ভব নয় তাদেরও দু-একটা নাম উল্লেখ না করে পারছিনা। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র মাইকেল মধুসূদন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকদের লেখা মনে শক্তি প্রেরণা যুগিয়েছে। আধুনিক কল্লোল যুগের কবি সাহিত্যিকরাও খুবই প্রিয়। আমি মনে করি রামায়ণ মহাভারত গীতা উপনিষদ চর্যাপদ এই সমস্তর চর্চা যদি না করতাম তবে কলম ধরতে হাত কাঁপত।
🍂
যে কোনো লেখা লিখতে হলে প্রথম প্রথম ঘরের থেকে লেখার সমর্থন অনুপ্ররেণার ঠেল ঠেক দুটোই লাগে। মায়ের বাবার দাদা দিদিদের সাহচর্য লাগে । আমি লেখার প্রেরণা মা এবং বড়দার থেকে কিছুটা পেয়েছিলাম প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। পড়াশোনা করতে করতে লেখালেখি করা অনেকেই ভাল চোখে দেখেনা। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও বাংলা আমার বড়ই প্রিয়। লিখে পাঠকের মন জয় করাই লেখার সার্থকতা। মোটা মোটা অভিধান খুলে বমবাস্টিং শব্দ চয়ন করে প্রথমে লিখতাম, পরে নিজের লেখা পড়ে পাঠোদ্ধার করতে না পেরে আবার অভিধানের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। সেই থেকে যতটা পারি মনের ভেতর থেকে যে শব্দ বের হয়ে কবিতা গল্প চিঠি প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখায় তাই লিখি।
কুসংস্কারের আস্তাকুড় বলা যায় আগের এবং বতর্মান সমাজকেও। এখনো বেড়াল ডিঙানোর জন্য গাড়ি থেমে যায়, ঋতুমতী রমণীরা পুজোয় বিরত থাকে,
পরিবেশ নিয়ে আমরা সচেতন কতটুকু? কথায় যা বলা হয় কাজে কতটা ফল ফলে? আমরা দূষণ দূষণ বলে চিৎকার করছি আর তাকেই আমরা নিত্য দিনের ভূষণ করে ফেলেছি। ফলে মাছে লঙ্কায় অবৈধ সংরক্ষণের বিষ মেশাচ্ছে বলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ধাক্কা লাগছে? কেন এর কোনো প্রতিবাদ প্রতিকার নেই? প্লাস্টিক আমাকে আপনাকে বর্জন করতে বলা হচ্ছে, কেন কেন কেন? এই প্রতিবাদের জন্য আমি লিখি “ চুক্তি ভূত” লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে, আর আমরা বোকা স্তাবক জনার্দন জুলজুল চোখে দেখেই চলেছি। এই প্রতিবাদের কথা মানবতার কথা বেতার তরঙ্গে লিখি, প্রচার হয়, এরনাম ভারতবর্ষ, আমার মৃত্যুর পরেও এর সমাধান সুদূর প্রসারী একথা জেনেও লিখি। ভেতরে থেকে কে যেন খুঁচিয়ে খ্যাঁকশিয়ালটাকে জাগায়, হুয়া হুয়া ডেকে গুহার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে অবিবেক।
তারুণ্যের চৌকাঠে সবে পা রাখছি, তখন আমি একাদশ, মনে মনে হিংসে হলো ওরা ( আমার সহপাঠীরা দু জন) প্রতি বছর বাণী বন্দনার কার্ডে লিখছে, যদিও চিঠির শেষে লেখা হয় “ ছাত্রছাত্রী বৃন্দ” তবু নতুন কাক লেখায় কলম ঘষাঘষি করছি, মাথার মধ্যে লেখা ভূত ঢুকলো। কেন লিখব? জেদের জন্য লিখব, আমিও পারি। সন্ধে হতে জ্বালা বাড়ল কি লিখি, কিভাবে লিখব,তাহলে পড়তে হবে। কি পড়লে লেখা যায়, ছন্দের কালচার খুব একটা করিনি। বাংলা পাঠ্যবই খুলে মধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির “ প্রার্থনা “ কবিতাটি বারংবার পড়ছি। “ তাতল সৈকত বারি বিন্দু সম/ সুত-মিত- রমণী সমাজে….” বাঃ এছন্দ মনে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে! খাতা পেন নিয়ে বসে পড়লাম নির্জন তখনকার মাটির বারান্দায়। অনেক কাটাকুটি করে লিখলাম
“আজি শুভ্র- বসনা জ্ঞানের সাধনা
স্বরগ- মহিমা আনি
বিছায়ে দিয়েছে নিখিল- ভুবনে
সুরের সুরভি দানি।
এসো স্নেহের মুরতি করিতে আরতি
ভারতী দেউল মাঝে,
সবে মিলি সুধী দাওগো পরশ
মোদের নিয়ত কাজে।“/ বিনীত ছাত্রছাত্রী বৃন্দ।
সারারাত ছটফট করে ভোর হতেই ছুটলাম বাংলার স্যার বীরেন্দ্রনাথ চট্টপাধ্যায়ের পড়ানোর সদরে। আমাকে দেখে বললেন কি ব্যাপার সাহিত্যিক ( বিদ্রুপ করে নয়, সস্নেহে ডাকতেন)? আমি আমতা আমতা করে বললাম স্যার, আজতো বাণী বন্দনার কার্ডের জন্য লেখা নেবার শেষ দিন…….কথা শেষ হবার আগেই বললেন লিখবি যদি আগে লিখতে হয়, একটা লেখা মোটামুটি ঠিক হয়েছে। আমি পাংশুবর্ণ মুখে বললাম একটু লেখাটা পড়ে দেখবেন? কাঁপা হাতে লেখা এগিয়ে দিতে বললেন এটা তুই লিখেছিস? আমি মাথা উঁচু করে বললাম হ্যাঁ স্যার। খুঁত ধরতে বীরেনবাবুর জুড়ি মেলা ভার! চশমাটা ঝুলিয়ে পরে বললেন “ নিখিল – ভুবন “ একই মানে, আমি সবিনয়ে বললাম স্যার মাইকেল মধুসূদন দত্ত “ অশ্রু- জল লিখেছেন স্যার। বীরেনবাবু বললেন, দ্যাখ, যাচাই করার সময় নেই, কোনো কবির কবিতা ঝাড়িকল করছিস নাতো? আমি বললাম বড়দার মায়ের দোহাই লেখার আগে বহুবার কবি বিদ্যাপতির “ প্রার্থনা” কবিতা পড়েছিলাম।---- স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত হবার পরে টিচার্স রুমে আসবি সব হয়ে যাবে। প্রথম সোনালী হরফে আমার ছড়া ছন্দে চিঠি দেখে যতনা আনন্দ পেয়েছি শত আনন্দ পেয়েছিল আমার মা,বড়দাদা বড়বৌদিদি। বড়বৌদিদি তখন আমতা গার্লস হাইস্কুল এর সহ শিক্ষিকা ( তৎকালীন দিনে ট্রিপল এমএ), তিনি আমার হাত থেকে কার্ডএ র চিঠি পড়েই টিচার্স রুমে নিয়ে গিয়ে লেখাটি পড়ে শুনিয়ে বললেন, এটিতে ছাত্রছাত্রী বৃন্দ লেখা থাকলেও এইচিঠি আমার দেবরের লেখা। প্রধান শিক্ষিকা বললেন এই আমতা এক দুই মিলিয়ে এতদিন এমন ছন্দে লেখা নূতনত্ব চিঠি আগে দেখিনা। আমাকে আশীর্বাদ করলেন, আমি প্রণাম করে বললাম অনেক অনুপ্ররেণা পেলাম।
আমার জেদই সেদিন লিখতে সাহায্য করেছিল।
আমি ইলেক্ট্রনিক্স টেকনিশিয়ান, আর টিভি মেকানিক্স হতে গিয়ে বেশ কয়েক বছর লেখা থেকে বিরত থাকলেও অবসরে বইপড়া বন্ধ করিনি এবং রেডিওর বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান না শুনলে পেটের ভাত হজম আর ঘুম হতোনা। বিশেষ করে আটের দশক থেকে প্রাত্যহিকী না শুনলে মনটা আলোনো মনে হতো। সেই নেশা লেখার পথে টলমল পায়ে চলতে শিখিয়েছে। বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক লেখা চিন্তা এবং কল্পনা শক্তিকে মনের অরণ্যে বৃষ্টি নামিয়ে ফুল ফল ফসল ফলাতে সাহায্য করেছে এবং আজও ঊষর জমিতে শব্দ চাষে রত আছি। আমি গরীব শব্দচাষি, কাটমানি খাওয়া তোলাবাজির কোনো বড়সড় জমি দখল করে শব্দ চাষ করিনা। ভাগে চাষও করিনা। আমার ছোট খাট জমিতে যা ফসল হয় তাই দিয়েই মনের কুটির গড়ে তুলি।
আমাকে অনেক লোকে জিগ্যেস করে কেন লেখ? ইনকাম হয় কিছু? আমি তাদের মিষ্টি করেই বলি না ইনকাম হয় না বরং সেই লেখা কিনে নিতে হয়।তবে ঘরে খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছ কেন? বলতে পারেন নেশা, নিজেকে চেনার ব্যাকুলতা সকলের মাঝে চলে যাবার কিছুদিন পরেও মনে রাখানোর প্রচেষ্টা সমাজকে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে পারা এই আর কি। কেন শুনছি ভালো গল্প লিখলে কাগজ থেকে সাম্মানিক দেয় বই করে বিক্রি করো
আমি দিতে চাই নিতে চাইনা
বৌদি রাগ করবেনা
জানিনা বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। একটা সুন্দর ফুলের বাগান শত ফুল বিকশিত করে আর একটা ভাল কবিতা সারা পৃথিবীর মন জয় করে সৌরভে ভরিয়ে দিতে পারে।
সবাই আমার কবিতা পড়বে এমন হতে পারে না, বাগানের সব ফুলে হাত বাড়ায় না। সবাই না পড়ুক কেউ কেউ পড়ে। অন্ততপক্ষে লেখার প্রেমে কেউ যদি না পড়ে, ছিঃ বলুক জানবো অন্যের কাছ থেকে কিছু শুনেছে।
0 Comments