জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প—ব্যবসা করো ভালোমানুষের সাথে/সুইডেন (ইউরোপ)/ চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প—

ব্যবসা করো ভালোমানুষের সাথে

সুইডেন (ইউরোপ) 

চিন্ময় দাশ


একদিন এক চাষী হাটে চলেছে তার শুকরছানাটাকে নিয়ে। বিক্রি করে, কিছু আটা কিনে আনবে। পথে একজন লোকের সাথে দেখা। চাষী জনতে চাইল—কোথায় গেলে, শুকরছানাটাকে বিক্রী করা যায়, বলো তো?

লোকটা বলল—এই বনটা পেরিয়ে, একটা দৈত্যের বাড়ি পাবে। সেখানে যাও। নিশ্চয় বিক্রি হয়ে যাবে।

বনের রাস্তা পার হয়ে, দৈত্যের বাড়ি পেয়েও গেল চাষি। ফটক পার হতেই দেখল, একটা লোক কাঠ কাটছে। চাষি বলল—হ্যাঁগো, ভালোমানুষের পো! এখানে আমার এই শুকরছানাটা কেউ কিনবে কি না, বলতে পারো?

--আমার তো ঠিক জানা নাই। তবে, ভেতরে গিয়ে জেনে আসছি। তুমি ততক্ষণ আমার হয়ে কাঠগুলি কেটে দাও। এই বলে, হাতের কুঠারটা চাষিকে ধরিয়ে দিয়ে, চলে গেল লোকটা। 

কাঠ কেটেই চলেছে চাষি। বিকেল হতে চলল। লোকটার আর দেখা নাই। এদিকে কুঠারটাও এমন, হাত থেকে নামিয়ে রাখা যায় না। 

🍂

বিকেল ফুরিয়ে এসেছে, এমন সময় একজন লোকের দেখা পাওয়া গেল। চাষি তার হাতে কুঠার ধরিয়ে দিয়ে, নিজে ভেতরে ঢুকল খদ্দের পাওয়া যায় কি না দেখতে।

শুকরছানা বিক্রি হবে শুনে, মেলার মতো ভীড় জমে গেল চাষিকে ঘিরে। সবাই জিনিষটা কিনতে চায়। চাষি তো ভারি মজা পেয়ে গেল। ভাবল, ভালোই হোল। যে বেশি দাম দেবে, তাকেই বেচব। 

হট্টগোল বেধে গেল তাতে। একজন দু’টাকা বলে, তো পরের জন চার টাকা হেঁকে দেয়। তার পরের জন আট টাকা। নিলাম তো থামতেই চায় না। এমন সময় ভদ্দর মতো একজন লোক এসে হাজির। চাষির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল—সব খোয়াতে চাও না কি? এগুলো সব ফেরেব্বাজের দল। গোলমাল বাধানো ছাড়া, আর কিচ্ছুটি জানে না। শেষে তোমার ঐ শুকরছানাটা বাগিয়ে নিয়ে কেটে পড়বে। রেহাই পেতে চাও তো, এসো আমার সাথে। ন্যায্য দামই পাবে তুমি। 

লোকটির বাড়ি গিয়েছে চাষি। শুকরছানার বদলে, একটা মোরগ দিল লোকটি। বলল—তুমি যখনই বলবে, এই মোরগ তোমাকে রূপোর ক্রোনা (সুইডেনের টাকা) পাড়বে ডিমের মতো।

খুশি হয়ে, মোরগ নিয়ে বাড়ির পথ ধরল চাষি। রাত হয়ে এল দেখে, একটা সরাইখানায় ঢুকেছে। সরাইখানাটার মালকিন এক বুড়ি। মনের আনন্দে সারা দিনের সব ঘটনা গল্প করে গেল বুড়ির সামনে। 

শুনে তো মুখ হাঁ হয়ে গেছে বুড়ির। চোখ গোলগোল। খুব খাতির যত্ন করতে আগল চাষির। একেবারে সেরা ভোজের ব্যবস্থা হোল। সেরা ঘর, সেরা বিছানা। গভীর ঘুমে রাত কেটে গেল চাষির। 

এদিকে মাঝরাতে বুড়ি যে নিজের মোরগের সাথে চাষির মোরগ বদল করে নিয়েছে, চাষি টেরটিও পায়নি। সকাল হলে, বুড়িকে টাকা মেটাতে হবে। মোরগকে যতই বলে—ডিম পাড়। মোরগের সাড়া নাই। 

বুড়ি বলল—কী আর করবে, বাছা। লোকটা ভালো মানুষ সেজে, ঠকিয়েছে তোমাকে। পরের বার এদিকে এলে, এখানেই উঠো। আজকের টাকাটা তখন দিয়ে যেও। 

রাগ উঠে গেছে চাষির মাথায়। রইল পড়ে ঘরে ফেরা। সোজা দৈত্যের বাড়ি গিয়ে হাজির। খুব হম্বি-তম্বি করতে লাগল সেই লোকটাকে। গাঁয়ের লোক পেয়ে, তাকে ঠকিয়েছে বলে। 

লোকটা কিন্তু সত্যিই ভদ্রলোক। সব শুনল, রাতে কোথায় ছিল। গল্পগাছা কী করেছে। বুঝতে কিছু বাকি রইল না তার। তবে, খুলে কিছু বলল না। বলল—তাহলে, আমারই হয়তো ভুল হয়ে গেছে। এক কাজ করো, তুমি এই যাঁতাটা নিয়ে যাও। যখনই চাইবে,এ তোমাকে থলে ভর্তি করে, গম পেষাই করা আটা দেবে।  

খুশি মনে যাঁতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল চাষি। সন্ধ্যে হয়ে এলে, সেই সরাইখানায় এসে হাজির। বুড়িকে বলল—এবার দারুণ একটা জিনিষ পেয়েছি। তোমার পাওনা মিটিয়ে দেব। 

সেদিনও গল্পটল্প করে খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ল। বুড়ি তো মওকা পেয়ে গেছে। রাতের বেলা চাষির যাঁতার সাথে নিজের যাঁতা বদলে নিয়েছে। সকাল হতে সেই একই বিপত্তি। যতই হুকুম করে, যাঁতা নড়েও না। চড়েও না। 

বুড়ি গোমড়া মুখ করে বলল—কী আর করবে, বাছা। ভালো মানুষ পেয়ে, বদমাসটা আবার ঠকিয়েছে তোমাকে। এখন যাও। পরে এদিকে এলে, আমার পাওনা মিটিয়ে যেও। 

চাষি আবার দৈত্যের ডেরায় ফিরে গিয়েছে। আবার হম্ব-তম্বি করে অভিযোগ করতে লাগল-- যত ইচ্ছে আটা তো দুরের কথা, এক পাক ঘোরেওনি যাঁতাটা। আবারও আমাকে ঠকিয়েছ তুমি।  

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শুনল লোকটা। বলল-- ঠিক আছে, এবার আর ভুল হবে না। ঠকতে হবে না তোমাকে। নিশিন্তে নিয়ে যাও। যা পাওনি, সব ফেরত পেয়ে যাবে। একটার বদলে তিনটে জিনিষের মালিক হয়ে যাবে তুমি।

করেছে কী, এবার একটা ভীম্রুলের চাক ধরিয়ে দিয়েছে চাষির হাতে। বলেছে—হাজার হাজার সৈন্য আছে এই দুর্গটার ভিতরে। তুমি বলা মাত্র কাতারে কাতারে বেরিয়ে পড়বে। ঝাঁপিয়ে পড়বে তোমার শত্রুর ওপর।

--এবার আবার ঠকে যাব না তো? 

লোকটি বলল—য বলছি, মন দিয়ে শোন। আজও আবার সেই বুড়ির সরাইখানায় গিয়ে ওঠো। ঐ বুড়িই তোমাকে দু’বার ঠকিয়েছে। বুড়ির সামনে বসিয়ে, হাঁক পাড়বে—বেরোও তো আমার বাহিনী। আর কিছু করতে হবে না। বসে বসে দেখবে শুধু। যতক্ষণ না তুমি বাহিনীকে ভেতরে যেতে বলবে, খেলা চলতেই থাকবে। 

একটা কাপড়ের থলের মধ্যে চাকটাকে ভরে, চাষিকে রওণা করিয়ে দিল লোকটি। চাষিরও এবার মনে বিশ্বাস হয়েছে, বুড়িই তাকে ঠকাচ্ছে। অন্য কেউ নয়। 

রাগে গর-গর করতে করতে, সরাইখানায় এসে হাজির। বুড়ি হাসি মুখে এগিয়ে এসেছে—এসো, এসো। খাও, দাও। বিশ্রাম করো। এমন ভালো সরাই তুমি এ তল্লাটে আর কোত্থাও পাবে না। 

চাষি মনে মনে বলল—তুমিও বুঝতে পারবে, আমার মতো খদ্দেরও আর জীবনে পাবে না। 

সাদামাটা মুখ করে বলল—সে কি আমি জানি না ভেবেছো? জানি বলেই তো আবার এলাম। 

--এবার আবার কী দিয়েছে তোমাকে? কেন যে তুমি যাও বারবার ঠকতে? 

--নাগো। এবার আর ঠকব না। নিজের চোখে তুমিও দেখে নাও, কী দারুণ জিনিষ পেয়েছি এবার। একেবারে হাতে নাতে ফল পেয়ে যাব। নিজের সেনাবাহিনী পেয়েছি এবার?

--সেবাবাহিনী? তাও আবার থলের মধ্যে? বলছোটা কী তুমি?

--নিজেই পরখ কর দেখে নাও, কেমন বাহিনী? বলেই, থলের ভেতর থেকে ভীমরুলের চাক বের করেছে চাষি। হাঁক পেড়ে বলল—বাহিনী, বেরিয়ে আয়।

আর যায় কোথায়! ভন-ভন করতে করতে হাজার হাজার পোকা বেরিয়ে পড়েছে। বুড়ি ছিল সামনেই। একেবারে ছেঁকে ধরেছে তাকে। বিষাক্ত হুল ভীমরুলের। বুড়িকে জড়িয়ে ধরেছে একেবারে। যন্ত্রণায় পরিত্রাহী চিৎকার করতে লেগেছে বুড়িটা।

চাষি বলল—এবার বুঝতে পেরেছ তো, ঠকেছি কি না? এটাও বুঝেছ তো, এবার তুমিও আর ঠকাতে পারলে না আমাকে। 

জবাব দেবে কী, বুড়ির তখন প্রাণটাই চলে যাওয়ার অবস্থা। মরণ যন্ত্রণা বেচারির। কোনও রকমে ককিয়ে বলল—মরে যাব। বাঁচাও আমাকে। তোমার সব জিনিষ ফিরিয়ে দেব। ভগবানের দোহাই। দয়া কর আমাকে। 

বুড়ির একেবারে নাজেহাল দশা। চাষি ভাবল, আমার জিনিষ, আমার হাতে ফিরে এলে, কাজ খতম। বুড়িকে কষ্ট দিয়ে লাভ কিসের? 

হাঁক পেড়ে বলল—বাহিনী, ভেতরে ঢোক। 

সাথেসাথেই একেবারে ভোজবাজির মতো ব্যাপার। সাথেসাথেই ভনভনানি থেমে গেল। পোকাগুলো গলগল করে ঢুকে গেল বাসার ভিতর।

ঘরে ফিরে গেল চাষি। এখন মোরগ রূপোর টাকা পাড়ছে। পেষা ময়দা পাওয়া যাচ্ছে যাঁতা থেকে। দু’দিন না যেতেই, বড়লোক হয়ে গেল চাষি। সুন্দরী দেখে বিয়ে করল গাঁয়েরই একটি মেয়েকে। ছেলেপুলে নিয়ে, বেশ সুখেই দিন কাটতে লাগল তার।

কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে, একটা কথাই বলে—ভালোমানুষের সাথেই ব্যবসা কোর। ঠগের ধারেকাছে যেও না কক্ষনো।

Post a Comment

0 Comments