জ্বলদর্চি

নিখিল কুমার সামন্ত (গীতিকার, সুরকার, শিক্ষক, দীঘা) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১৮
নিখিল কুমার সামন্ত (গীতিকার, সুরকার, শিক্ষক, দীঘা) 

ভাস্করব্রত পতি

'লা লিকি চল রে বায়া মন্দারমণি খালে  
ও বায়া চল রে, ও বায়া চল।'
ওড়িশা সীমান্তবর্তী পূর্ব মেদিনীপুর জেলার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা এই গান আজও শোনা যায় অনেকের মুখে। এরকম আরও অসংখ্য গানের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন দীঘার শিক্ষক নিখিল কুমার সামন্ত। আকাশবাণীর স্বীকৃত এবং প্রোথিতযশা এই শিল্পীর নাম আর কাজের কথা আমরা তেমন জানিই না। কিন্তু নীরবে নিভৃতে সংস্কৃতির বেড়াজাল রচনা করেছেন এই মানুষ রতনটি। 

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৪৮ এর ১৯ শে এপ্রিল রামনগরের মৈতনা গ্রামে নিখিল কুমার সামন্ত জন্মগ্রহণ করেন রমানাথ সামন্ত ও সিন্ধুবালা দেবীর পরিবারে। কিন্তু খুব কম বয়সেই বাবাকে হারান। ফলে দারিদ্রতা আরও চেপে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। মৈতনার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে বাল্যবন্ধু প্রণবকান্তি ভট্টাচার্য্যের সহযোগিতায় রামনগর রাও হাইস্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে আই.এ পাশ করেন। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে সঙ্গীত প্রেম, তাঁকে জড়িয়ে রাখতো সবসময়। ফলে ছোট থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেমে পড়তেন। 

কিন্তু একটা বিষয় মনে রেখেছিলেন, পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনা না করলে জীবনের কিছুই প্রাপ্তি জুটবে না। সামাজিক পরিচিতি এবং উন্নয়ন করতে হলে পড়াশোনা চালাতেই হবে। তাই শত দারিদ্রতার মধ্যেও লেখাপড়ার কাজে কখনও ফাঁকি দেননি। 

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ থেকে স্নাতক হন। এরপর উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন এবং কাঁথির প্রভাত কুমার কলেজ থেকে বি.এড ডিগ্রি লাভ করেন। দীঘা বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষক ছিলেন হেমন্তকুমার দত্ত। পরবর্তীতে তিনি রামনগরের বিধায়ক (১৯৭২-১৯৭৭) হয়েছিলেন। এই হেমন্তকুমার দত্তের সহযোগিতায় নিখিল কুমার সামন্ত রামনগর রাও হাইস্কুলের শিক্ষক পদে যোগ দেন। দীর্ঘদিন এখানে শিক্ষকতা করার পর একসময় সহকারী প্রধানশিক্ষক (২০০৩) পদেও আসীন হয়েছিলেন। অবসরের পর ফের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন পদিমা গিরি ব্রাদার্স জুনিয়র হাইস্কুলে।

সঙ্গীতপ্রেমী এই মানুষটি একসময় সঙ্গীতকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সাহচর্যে আসেন। ধীরে ধীরে সঙ্গীত জগতের আবহে নিজেকে আরও পরিশীলিত করতে থাকেন। চূড়ান্ত অধ্যবসায় এবং সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহের ফল হিসেবে ১৯৮৬ তে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের লোকশিল্পীর স্বীকৃতি লাভ করেন।

যদিও একসময় রামনগর এলাকার সভা, আড্ডা, মঞ্চে তিনি গান করেছিলেন প্রাণ খুলে।পরবর্তীতে তিনি লোকসঙ্গীত সহ রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, স্বদেশগীতি, রাজনৈতিক গানের জগতে ঢুকে পড়েন প্রাঞ্জলভাবে। ছোটবেলা থেকেই মার্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন সুশীল কুমার মান্না, চতুর্ভুজ দাস, ভূপাল রায়, কলকাতার কমলেশ ভট্টাচার্যের কাছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা নিয়েছেন দীঘার রমেশচন্দ্র মাইতি এবং কলকাতার সুপ্রকাশ চাকীর কাছে। দেশাত্মবোধক সঙ্গীত এবং লোকসঙ্গীত শেখার জন্য তালিম নিয়েছেন কলকাতার সবিতাব্রত দত্ত, দীনেন চৌধুরী, আর্য চৌধুরী এবং নির্মলেন্দু চৌধুরীর কাছে।

সঙ্গীতপ্রেমী এই মানুষটির কলমের আঁচড়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গান, গীতি আলেখ্য, শ্রুতিনাটক, ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ইত্যাদি। সমাজচেতনা, শিক্ষাচেতনা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। সামাজিক সংগঠনের মধ্যে খুঁজে পেতেন কাজের আনন্দ। এখানকার  বহু সংগঠন অঙ্কুর গোষ্ঠী, রামনগর সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ (সংস্থা), দীঘা শিশু কল্যাণ সংসদ, দীঘা নিউটাউনশিপ ক্লাব, নিউ দীঘা প্লট হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন, এস.টি.ই.এ, স্যাগেশিয়াস টিচার্স ও এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সাথে তাঁর নাম জড়িয়ে ছিল। ২০১৫ এর ১৯ শে নভেম্বর এই মানুষটির মৃত্যু হয়।

🍂

Post a Comment

1 Comments

  1. ভালো লাগলো। মেদিনীপুরের গুণী মানুষদের এভাবে আলোকিত করা দরকার।

    ReplyDelete