তাপ গম্বুজের প্রভাবে হিমসিম ইউরোপ মহাদেশ

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়


দুনিয়া জুড়েই এখন তাপের দাপাদাপি চলছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের বাস্তবতাকে কেউই আর অস্বীকার করতে পারছি না, বরং বদলে যাওয়া বাতাবরণের প্রভাব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ক্রান্তীয় মণ্ডলের এলাকার আবাসিক হ‌ওয়ায় গরমের সঙ্গে আমাদের জন্ম ইস্তক সহবাস। সুতরাং এইসব নিয়ে আমাদের মতো আম আদমির তেমন কোনো বিচলন নেই। ইউরোপের কথা অবশ্য বিলকুল আলাদা। সাহেব সুবোধের বাসভূমি,তাই বিধাতা পুরুষের বদান্যতায় গোটা মহাদেশটাই নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের আরামপ্রদ ঘেরাটোপে বন্দি ছিল এতোকাল। এই আরামে থাকার সুবিধার ওপর ভর করেই গোটা দুনিয়ার ওপর তাদের দাদাগিরি সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে গোটা দুনিয়া। লেকিন জমানা বদল গয়া। গরমের দাপট ইউরোপ ও আমাদের একাসনে বসিয়ে দিয়েছে। সাহেব মেমরা এখন গরমে তেতে উঠে হাঁসফাঁস করছে। ১০৮

কেন এমন হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর? এককথায় বলতে পারা যায় যে পৃথিবীর স্থলভাগ ও তাদের ঘিরে থাকা জলভাগের তাপীয় ভারসাম্যের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে, অথচ এই তাপ সমতার ওপর ভর করেই এতোদিন ধরে একধরনের সুস্থিত পরিবেশ বজায় ছিল। বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করে যাওয়া সংস্থাগুলো বিগত জুন মাসকে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর পক্ষে সবথেকে উষ্ণ মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ব্যাপারটা খাতায় কলমে জুন মাসেই শেষ হয়ে গেছে এমনটাও নয়, তাপদাহের প্রভাব এই ভরা বর্ষার জুলাই মাসেও সমানতালে সক্রিয় রয়েছে।এর প্রভাবে ফ্রান্স সহ আইবেরীয় উপদ্বীপের দুই অন্যতম দেশ স্পেন ও পর্তুগাল ভয়ঙ্কর দাবানলের শিকার হয়েছে। গত ৮ জুলাই,২০২৬ , বিখ্যাত বার্সেলোনা শহরে থার্মোমিটার যন্ত্রের পারদ ৪০.৫ ডিগ্রির রেকর্ড মান স্পর্শ করেছিল যা বিগত ১০০ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। ভাবা যায়!

🍂

গরম তো কখনও একা আসেনা। বায়ুর উষ্ণতা বাড়লেই তার জলধারনের ক্ষমতা বেড়ে যায় মানে আর্দ্রতা বেড়ে যায় , বাড়তে থাকে মানুষের শারীরিক অস্বস্তি। আবার তাপ বৃদ্ধির জন্য কমে যায় বায়ুচাপের পরিমাণ যার ফলে সৃষ্টি হয় নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণাবর্ত। এই সবই ইউরোপীয় মানুষজনের পক্ষে একদম নতুন ঘটনা, এসবের সঙ্গে যুঝবার মতো মানসিক ও শারীরিক সামর্থ্য কোনোটাই সেভাবে নেই। এরফলে এই বছরের গ্রীষ্ম ইউরোপ বাসীদের কাছে চরম বিভীষিকার অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। চাই বা না চাই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিস্তির্ণ অংশ। খরার ভ্রুকুটি আরও গভীরতর সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে নিয়ে এসেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো শেষ বারের মতো এমন প্রবল তাপপ্রবাহের দাপট দেখেছিল সেই ১৯৭৬ সালে,মানে আজ থেকে ৫০ বছর আগে। আবহবিদরা জানিয়েছেন যে এমনিতেই ইউরোপের তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। এ সবের ফলে ইউরোপ এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল তাপমাত্রার মহাদেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে গোটা দুনিয়ায়। এ বড়ো সুখের সময় যে নয় তা বুঝতে পারছে ইউরোপবাসী।**

মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে টানা তাপপ্রবাহের দাপট চলছে ইউরোপে। তাপের দাপটে ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক দেশের পুরনো সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক দেশ বলে আমায় দেখ তো অন্য দেশ বলে আমায়। অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি,ইটালি, দ্যা নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড , রোমানিয়া,চেজিয়া, স্লোভাকিয়া,স্পেন , পর্তুগাল – বাদ নেই কেউই। একেবারে মেরু বৃত্তের লাগোয়া স্ক্যান্ডিনেভিয়া উপদ্বীপের দেশ ডেনমার্ক থেকে শুরু করে দ্বীপ রাষ্ট্র ইউনাইটেড কিংডম সকলের‌ই গরমে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। তাপমানের পরিসংখ্যান দেখে চোখ ছানাবড়া ইউরোপবাসী সহ তাবৎ দুনিয়ার। এমন লাগাতার লাগামছাড়া তাপপ্রবাহের কারণ খুঁজে পেতে রীতিমতো নাজেহাল অবস্থা তাবড় তাবড় আবহবিজ্ঞানীদের। পুরনো কোনো মডেলের সাহায্যেই এমন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

জুলাই মাসের আধাআধি সময় পার হয়ে গেল অথচ দক্ষিণ পশ্চিম ইউরোপের ওপর দাপিয়ে চলা তাপমাত্রায় কোনো তারতম্য নজরে পড়ছে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ইউরোপীয় বায়ুমন্ডলের ওপর এক সুবিশাল তাপ গম্বুজের সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে পরিবেশ ঠান্ডা হবার সুযোগ পাচ্ছেনা।

হিট ডোম বা তাপ গম্বুজ বিষয়টি আমাদের খুব পরিচিত এমন নয়। তথ্যাভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের মতে ইউরোপ ও আমেরিকার সাম্প্রতিক তাপ-বিপর্যয়ের পেছনে এই তাপ গম্বুজই মুখ্যত দায়ী। আবহবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তেই তাপপ্রবাহজনিত বিপর্যয় ঘটুক না কেন, তার পেছনে এই তাপ গম্বুজ সৃষ্টির বিষয়টির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রশ্ন হল এই তাপ গম্বুজ আসলে কী? কীভাবেই বা তার সৃষ্টি হয়? প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যে তাপ গম্বুজ একান্তভাবেই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, এর সঙ্গে মানুষের বা মানুষী কার্যকলাপের কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। আসলে তাপ গম্বুজ হল এক বিশেষ ধরনের উচ্চ বায়ুচাপের অবস্থা যা অনেকটা বড় এলাকা জুড়ে অবস্থান করে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের অংশ থেকে ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠতে বা ওপরে উঠতে ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে এই গরম বাতাস নিচে নেমে এসে অসহনীয় তাপপ্রবাহের সৃষ্টি করে। বিষয়টা একটু সহজ করে বলার চেষ্টা করা যাক।

আমরা লক্ষ করেছি, যেসব দিনে আকাশ মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে সেই সব দিনে রাতের দিকে একটা অস্বস্তিকর গুমোট আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। এখানে আবহমণ্ডলীর তাপ সঞ্চালনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলা সৌরকিরণ ক্ষুদ্র তাপতরঙ্গের আকারে পৃথিবীপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে এবং ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে। বেলা দুটোর আশেপাশের সময় পর্যন্ত এই তাপ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তারপর শুরু হয় ভূপৃষ্ঠ থেকে তাপ বিকিরণের পালা। দীর্ঘ তাপতরঙ্গের আকারে, অবলোহিত রশ্মিরূপে, তাপ মহাশূন্যে পুনরায় বিলীন হয়ে যায়। এই তাপীয় গমনাগমনের দ্বারাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতার ভারসাম্য বজায় থাকে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কখনওই অতিরিক্ত পরিমাণে গরম বা ঠান্ডা হতে পারে না। এই অবধি ঠিকঠাকই আছে। সমস্যা বাড়ে তখনই যখন আকাশে থাকা মেঘ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপতরঙ্গকে পরিপূর্ণভাবে মহাশূন্যে ফিরে যেতে না দিয়ে তাকে প্রতিহত করে পুনরায় ভূপৃষ্ঠে ফিরিয়ে দিয়ে এক উষ্ণ অবস্থার সৃষ্টি করে। তবে মাথায় রাখতে হবে তাপ গম্বুজ সৃষ্টির পেছনে মেঘপুঞ্জের উপস্থিতির কোনও সম্পর্ক নেই। 

বিষয়টিকে বোঝাবার জন্যই এমন অবস্থার কথা বলা হল। তাপ গম্বুজের সৃষ্টির বিষয়টি একদম স্বতন্ত্র এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বায়ুমণ্ডলের একটি বিশেষ অবস্থা যা ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে ছুটতে থাকা গরম বাতাসকে আটকে দেয়। বাধ্য হয়ে এই বায়ু সঙ্কুচিত হয়ে উত্তপ্ত হয়ে যায় এবং একটি গম্বুজাকৃতির আবরণীর সৃষ্টি করে। এই গম্বুজ বিপজ্জনক তাপতরঙ্গের সৃষ্টি করে মানুষের ও অন্যান্য প্রাণীদের তীব্র অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়— ঠিক যেমন হয়েছে এই সময়ের ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে।

দীর্ঘ সময়ের জন্য এক অসহনীয় তাপীয় অবস্থার মধ্যে থাকতে বাধ্য হ‌ওয়ায় মহাদেশের একাধিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আবহবিদরা জানিয়েছেন যে খুব শিগগিরই এই অবস্থা বদলে যাবে এমনটা কখনোই নয়। আসলে আমরা মানে পৃথিবীর আবাসিকরা নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করতে গিয়ে পৃথিবীকে ইতোমধ্যেই অনেকটাই গরম করে ফেলেছি, ইউরোপের তাপপ্রবাহ সেই আগুনে পরিস্থিতিতে ঘৃতাহুতির সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপকে ঘিরে এখন বাড়ছে মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা। 

আসলে এই সময়ের ইউরোপের আবহিক পরিস্থিতি সমস্ত বিশ্বের কাছেই এক বিশেষ সতর্কবার্তা বয়ে নিয়ে আসছে। আগামীদিনে এই অবস্থার শিকার হতে পারে গোটা দুনিয়া। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমারেখার ওপর প্রকৃতির এমন আগ্রাসন কখনোই নির্ভর করে না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এক আশ্চর্য তন্ত্রের অধীন। আমরা সবাই মিলে সেই শৃঙ্খলা নষ্ট করে ফেলেছি। সেই শূন্যতার পথ বেয়েই এখন প্রকৃতির এমন আগ্রাসন শুরু হয়ে গেছে। ইউরোপের তাপপ্রবাহ যত দীর্ঘায়িত হবে,তত বাড়বে মানুষের ও প্রাণিকুলের হাহাকার। ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাপদাহের কারণে। বিধ্বংসী অরণ্যাগ্নির প্রকোপে বিপন্ন বিপুল সংখ্যক মানুষ ও বন্যপ্রাণি , নদীর জল শুকিয়ে গিয়ে গতিহীন হয়েছে মাঝপথে, বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে গিয়েছে ক্ষেতের ফসল। এক অভাবিত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। বিশেষজ্ঞরা আরও গভীর বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন দুরুদুরু বক্ষে। আমরাই বা নিশ্চিন্তে থাকি কি করে?