ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১০সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে
চিত্রগ্রাহক : রাকেশ সিংহ দেব
সম্পাদকীয়
প্রিয় বন্ধুরা,
আশা করি সবাই নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো। পত্রিকা তোমাদের কেমন লাগছে? ভালো লাগছে নাকি মোটামুটি লাগছে? কারো কারো কি একদম ই ভালো লাগছে না ? আচ্ছা একটা কাজ করা যাক, কার কেমন লাগছে সেটা আমাকে লিখে জানাও। আমি তোমাদের চিঠিপত্র নিয়ে বরং আর একটা নতুন বিভাগ শুরু করি । কি গো সবাই লিখবে তো ? অবশ্যই লিখে জানাবে কিন্তু। সেই সঙ্গে তোমাদের পরামর্শ চাই যে নতুন আর কি কি বিভাগ শুরু করা যায় আমাদের পত্রিকাতে। শুধু ছোটরা কেন , বড় রাও তাদের মতামত অবশ্যই জানান।
আজ তাহলে এই পর্যন্তই, সবাই ভালো থাকো, সুস্থ থাকো। অনেক ভালবাসা নিও সবাই।
ইতি - তোমাদের স্বাগতা দি
মানুষের জন্য/ বিশ্বজিৎ সিন্ হা
আমায় একটু রঙ দিন তো!
একটু নীল রঙ;
কল কারখানার কালো ধোঁয়ায়
আকাশ যে আর দেখাই যায়না,
একটু নীল রঙ করে দিই।
একটু সবুজ রঙ দিতে পারেন,
পীচ যে মাটিকে ঢেকে ফেলেছে
একটু সবুজ রঙ দিয়ে দেখি
আবার প্রকৃ তিটা সবুজ হয় কি-না!
এবার একটু সাদা রঙ দিন।
প্রতি হিংসা,বিদ্বেষে পুড়ে মানুষের মনগুলো কুৎসিত
হয়ে গেছে;
একটু সাদা রঙ ছুঁইয়ে দেখি
আবার সুন্দর
করা যায় কিনা!
সবশেষে,একটু লাল রঙ দিন আমায়
ঐ জীবন্ত মৃ তদেহগুলোর ওপর
একবার ছুঁইয়ে দেখি,
ওরা আবার জীবন ফিরে পায় কি-না!
শুভশ্রী সরকার
শ্রেণী- একাদশ, সুখচর শতদল বালিকা বিদ্যায়তন
ফুলবাগান
দুরন্ত বিজলী
টগর ফুলে ভ্রমর বসে
মৌমাছি গাঁদা ফুলে,
শিউলিতলায় শিউলিফুল
কোঁচড়ে ভরে তুলে।
জবাফুলে ছেয়ে আছে
সবুজ গাছের ডালপালা,
পুকুর জলে পদ্ম ভাসে
মাধবী গাঁথে মালা।
ফুটে আছে কত গোলাপ
বাতাসে দোলে গাছে,
চাঁপা ফুলের হাসি পাতার
উপরে ভেসে আছে।
নানা রকম ফুলগুলি সব
এই পৃথিবীতে ফোটে,
সে রূপ সুধা পানের সুযোগ
মানুষের ভাগ্যেই জোটে।
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ : পঁচিশ
রতনতনু ঘাটী
রোদে ঝলমল করছে স্কুলের গোটা মাঠটা। আকাশ থেকে তাকিয়ে দেখছে ক্রিকেট প্লেয়ারদের। এবার রোরো হাত তুলে বল করতে ডাকল ধৃতি নায়েককে। ধৃতি জোরে-বোলার। কিন্তু আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের যশপ্রীত বুমরার মতো বল ঘোরাতে জানে। এর বল দেখে যেমন ব্যাটার বুঝতে পারে না, বুমরার বল উইকেটের উপর আছড়ে পড়বে, নাকি নো বল হবে! ধৃতির বলও ওরকম। ব্যাটারদের বুঝতে একদম দেয় না।
ওদিকে লোকনের জায়গায় ক্রিজে এসে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছে সি-সেকশানের ব্যাটার রকি দেববর্মা। রকির তত কবজিতে জোর নেই সকলেই জানে। তাই সব সময় সে ছক্কা হাঁকাতে পারে না বটে, কিন্তু এক ওভারের তিনটে বলে তিনটে বাউন্ডারি মারতে পারে, এমন উদাহরণ আছে। রকি ধৃতির প্রথম বলে জোরের সঙ্গে বাউন্ডারি মারল। এবার পরের বল ধৃতির। এবারও সপাটে বাউন্ডারি তুলে নিল রকি। সকলেই আশায় ছিল, তৃতীয় বলটাতেও রকি চার মারবে। না, তা আর হল না। রকি বলের নাগাল পেল না, ব্যাটেই লাগাতে পারল না বলটা। বল গড়িয়ে চলে গেল ফিল্ডারের হাতে। ধৃতির ওভার থেকে মোট আট রান হল রকির।
এবার সি-সেকশানের চতুর্থ ওভারের ব্যাটিংয়ের জন্যে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকল রকি। বল করতে এবার রোরো পাঠাল অরিত্র বর্মণকে।
ততক্ষণে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি ডি এম সাহেবকে তাঁর অফিসে পৌঁছে দিয়ে খেলার মাঠে ফিরে এলেন। এসে দেখলেন, অরিত্র তার ওভারের প্রথম বলটা করার জন্যে দৌড় শুরু করল। প্রথম বলটা করল দারুণ স্পিন বল। বলটা আস্তে করে উইকেটের পাশ দিয়ে চলে গেল উইকেট কিপারের হাতে। রকি বলটার নাগালই করতে পারল না। তাই এই বলে কোনও রান হল না রকির! সেকেন্ড বলটা তত জোরে ছিল না। বলটা ছুটে এসে ক্রিজে গড়িয়ে এসে উইকেটের খানিকটা আগে ড্রপ খেয়ে লাফিয়ে উঠে রকির ব্যাটে এসে লাগল। রকি ব্যাট চালাল বটে। একটু দেরি হয়ে গেছে! তেমন ভাবে ব্যাটে-বলে হল না। ব্যাটের কানায় লেগে বল থার্ডম্যান অঞ্চলে মাঠের মধ্যেই থেমে গেল। ভাল বোঝাপড়া ছিল ওদিকের ব্যাটারের সঙ্গে। দৌড়ে এই ফাঁকে দু’ রান তুলে নিল রকি দেববর্মা।
এবার ওভারের শেষ বল করল অরিত্র। বলটা হুক করে নিজের মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠিয়ে দিল উইকেটকিপারের পিছন দিক দিয়ে। কোনও ফিল্ডার ছিল না। তাই বিনা বাধায় বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে চলে গেল। রকির সংগ্রহে চলে এল চার রান, নট আউট রকি।
সি-সেকশান এবার লাস্ট ওভার ব্যাট করবে। রোরো একটু ভেবে নিল মিনিট তিনেক। নিজেদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কিছু একটা আলোচনাও সেরে নিল।
তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বল করতে এগিয়ে এল রোরো নিজেই। ওদিকে রকি দেববর্মাকে আউট করা যায়নি তখনও। এবার ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের কাঁধেই বোলিংয়ংর দায়িত্ব তুলে নিল রোরো।
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনাদের এই রোরো ছেলেটি খুব ম্যাচিওর। ও দেখল, যখন কোনও মতেই উইকেট ফেলা যাচ্ছে না, তখন নিজেই ঝুঁকি নিয়ে বল করতে এগিয়ে এল। দেখি কেমন বল করে রোরো। শুনেছি রোরো খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে ভাল ব্যাটসম্যানও কিন্তু কখনও কখনও দুর্দান্ত বল করতে পারে। তার বড় উদাহরণ আমাদের সচিন তেন্ডুলকর।’
হেডস্যার চোখের চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কীরকম?’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বললেন, ‘১৯৯৩ সালে ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইন্ডিয়ার ফাইনাল টেস্ট খেলা। আমি যথারীতি ক্লাব হাউসের পাশে জমিয়ে বসে খেলা দেখছিলাম। ভারত প্রথমে ব্যাট করতে এসে ওদের সামনে রেখেছিল ২২৬ রানের টার্গেট। ওই রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে ক্যারিবিয়ানদের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৬ রান, হাতে ছিল ৩ উইকেট। ভারতের অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন তখন অবাক কাণ্ড করে বসলেন। শেষ ওভারে বল করার জন্যে বল তুলে দিলেন তরুণ ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকরের হাতে।’
‘আমরা দর্শকরা মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু নির্ভীক চিত্তে সচিন বল করতে এগিয়ে এলেন। প্রথম বলটি করলেন ডট বল। এই বলে কোনও রান হল না। আস্তে করে হাত ঘুরিয়ে দ্বিতীয় বল করলেন সচিন। ঠুকুস করে এক রান নিলেন
ব্রায়ান লারা। তৃতীয় বলে দুম করে কেনি বেঞ্জামিন রান আউট হয়ে গেলেন। তখন ইডেন গার্ডেন্স উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। এবার চতুর্থ বল করলেন সচিন। এই বলে কোনও রান হল না! এবার পঞ্চম বল করলেন সচিন। রান আউট হয়ে গেলেন কার্টলে অ্যামব্রোস। এবার ওভারের শেষ বল করলেন সচিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা কোনও রান নিতে পারলেনই না। বরং রান আউট হয়ে গেলেন ইয়ান বিশপ। শেষ ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে সেবার ইন্ডিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের সেই দুরন্ত বেলিং কখনও ভুলতে পারিনি!’
রোরোর প্রথম বলটা এল ডট বল। কোনও রান তুলতে পারল না রকি দেববর্মা। এবার রোরোর সেকেন্ড বল এল। এটা পুরোপুরি ঘূর্ণি বল। রকি চোখ বুজে মারতে গিয়ে সটান ফিল্ডার কাহ্ন ব্যানার্জির হাতে ধরা পড়ে গেল। রকি আউট!
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বলে উঠলেন, ‘কী নবনীতস্যার? বলেছিলাম না? দেখলেন তো, রোরো কী কাণ্ডটাই না ঘটিয়ে ফেলল?’
হেডস্যার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। এবার সি-সেকশানের ক্যাপটেন লোকন ব্যাট করতে পাঠাল সারিন দাসকে। সারিন ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই লাস্ট বলটা রোরোর হাত থেকে বুলেটের মতো ক্ষিপ্র গতিতে এসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্প ছিটকে দিল। শূন্য রানে আউট হয়ে গেল সারিন দাস।
সি-সেকশান পাঁচ ওভারের খেলায় এই ইনিংসে করল মোট বাহান্ন রান। দেবোপমস্যার ফার্স্ট হাফের বিরতির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে ডেকে বললেন, ‘এই যে সম্মতিচরণ, অনেকক্ষণ তো খেলা হল! এবার একটু চা-পানের ব্যবস্থা হোক!’
ঘন্টিদাদু তৈরিই চিলেন। তক্ষুনি চায়ের কেটলি আর পেপার কাপ নিয়ে এসে হাজির হলেন। প্রথমে হেডস্যারকে চা দিলেন। হেডস্যার একটা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ‘আহাহা, সম্মতিচরণ, আগে অতিথিকে চা দিতে হয়! মুকুলকৃষ্ণবাবু আমাদের অতিথি, জানো উনি কত বড় মানুষ! সঙ্গে বিস্কুটও দিও!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘না না, স্যার আপনি আমাকে এখনও আপন করে নিতে পারেননি দেখছি! আমি আপনারই হিতাকাঙ্ক্ষী!’
এর পর মুকুলকৃষ্ণবাবুকে আগে চা দিলেন ঘন্টিদাদু। তারপর হেডস্যারকে দিলেন। এর পর অন্য স্যার এবং ম্যামদের চা দিলেন ঘন্টিদাদু। তারপর চা দিলেন আশপাশের গ্রামের মান্যবর অমূল্য ধর, একাদশী পাল, অভিরূপ দলুইকে এবং মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তকে। সেই সঙ্গে পারুলমণিকেও চা দিলেন ঘন্টিদাদু। লজ্জিত মুখে পারুলমণি চায়ের কাপটা নিজের হাতে ধরল।
দুটো টিমেরই ক্রিকেটারদের হাতে দেবোপমস্যার চকোলেট বার তুলে দিলেন। এরপর দেবোপমস্যার ঘোষণা করলেন, ‘এবার পরের পাঁচ ওভারের খেলা শুরু হবে। মানে সেকেন্ড ইনিংস। এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো মজুমদার এবং সি-সেকশানের ক্যাপ্টেন লোকন দাস। তোমরা তৈরি হয়ে নাও তোমাদে টিম নিয়ে।’
বিকেলের আকাশ আজ যেন বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের আলো আজ বেশি করে গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠটাকে আলোকিত করে তুলছে। এ-সেকশানের ব্যাটিং মানে ওপেনাল রোরো। রোরো তার দাদুর কাশ্মির থেকে দেওয়া ব্যাটটা নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে ক্রিজে এসে দাঁড়াল। দর্শকদের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠ। ক্রিজে ব্যাট হাতে তখন ওদিকে দাঁড়িয়ে পড়েছে মহিন দত্ত। সকলেই জানে মহিন দত্ত ক্লাসের মধ্যে অঙ্কে তুখোড়! দেবোপমস্যার মহিন সম্পর্কে বলেন, ‘যারা অঙ্কে ভাল হয়, তারা গ্রিপের মধ্যে থাকা বল ছাড়া কেলার চেষ্টাই করে না।’ মহিনকে ব্যাট হাতে দেখে স্যার বললেন, ‘মহিন, তুমি বলগুলো ছেড়ে-ছেড়ে খেলো না! আমরা তোমার হাতের সেই বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখতে তাকিয়ে আছি।’
মুখে কিছুই বলল না মহিন। শুধু মুচকি হাসল একবার।
বল করতে পাঠাল লোকন দাস ওদের বাঁ-হাতি বোলার নাতাশা চক্রবর্তীকে। নাতাশার ঘূর্ণি বলের সামনে কতক্ষণ টিঁকতে পারে রোরো, সকলের মনে এখন একটাই প্রশ্ন।
প্রথম নাতাশা এমন ঘূর্ণি বল করল যে, রোরো ঠিক যেন বলটা ক্রিজের উপর দেখতেই পেল না। রোরোর মতো ব্যাটারও প্রথম বলে একটাও রান নিতে পারল না, বলটা ব্যাটেই লাগাতে পারল না রোরো। নিজেকে হতাশায় ডুবিয়ে রোরো চোখে-মুখে ক্ষিপ্রতা ফুটিয়ে তুলল। নাতাশার দ্বিতীয় বলটা গড়ানে বল ছিল। নাতাশা এরকমই করে। ব্যাটারকে পরের বলটা খেলার সুযোগ করে দেয়। মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘দেখলেন নবনীতস্যার। ওই রোগা শ্যামলা মেয়েটার কী ধুরন্ধর বুদ্ধি! ব্যাটসম্যানকে বুঝতেই দিল না এবারের বলটা তাকে জোরে মারতে হবে, নাকি তুলে মারতে হবে।’
মুকুলকৃষ্ণবাবুর কথাই ঠিক হল। রোরো দনোমনো করল। বলটা খেলবে নাকি ছেড়ে দেবে? শেষমেশ বলটা উড়িয়ে দিল রোরো বাউন্ডারি সীমানার বাইরে। মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘রোরো, অসাধারণ মেরেছ। এর পরের বলটায় আমরা ছক্কা দেখতে চাই!’
পরের বল করতে দৌড় শুরু করল নাতাশা। একশো কিলোমিটার বেগে বলটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল গোলার মতো গতিতে। জোরে ধেয়ে আসা গোলার মতো বলকে খেলতেও পারে রোরো। চোখ ধাঁধানো মারে বলটা ছক্কা হয়ে দর্শকদের মাঝখানে গিয়ে পড়ল। এই ওভারে দশ রান তুলে নিল রোরো। তবু তার মুখ দেখে মনে হল, সে খুশি নয়।
পরের ওভার বল করতে পাঠাল লোকন দাস, সুরথ দিন্দাকে। কেউ ভাবেনি, লোকন ভাল বোলার থাকতে সুরথকে পাঠাবে। সুরথের প্রথম বলটা ফুলটস বল ছিল। অনায়াসে রোরো বলটাকে উইকেট কিপারের পাশ দিয়ে সীমানার দিকে পাঠিয়ে দিল। উইকেট কিপার লোকন লাফ দিয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠেও বলের নাগাল পেল না। এবারও চার রান নিতে অসুবিধে হল না রোরোর।
পরের বলটা উইকেটের অনেকটা বাইরে ছিল। রোরো খেলার চেষ্টাই করল না। রান নিতে পারল না রোরো। তার পরের বলটা স্পিন ছিল। বলটা মারব মারব করেও রোরো ব্যাটটা তুলেও নামিয়ে নিল। ওভারের লাস্ট বলটাতেও রান এল না রোরোর। বিরাট কোহলি রান না পেলে যেমন করে ব্যাটটা ঝাঁকিয়ে শ্যাডো প্র্যাকটিসের ভঙ্গি করে, অমন করে রোরো দর্শকদের দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিল।
পরের ওভারে লোকন বল করতে পাঠাল তাহিরা দত্তকে। তাহিরা দত্ত ভাল ব্যাটার। দারুণ রান তুলতে পারে। কিন্তু...রোরো বুঝে উঠতে পারল না, এমন সময় লোকন কেন তাহিরাকে বল করতে পাঠাল? শক্ত হাতে ব্যাটটা ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল রোরো। এই ওভারের পর পর তিনটে বলে রোরো তিনটে বাউন্ডারি মারল।
লোকন দেখল রোরোকে কোনও ভাবে আটকাতে পারছে না। রোরোও এভাবে ব্যাট চালালে একাই দরকারি রান তুলে নেবে। শেষমেশ ইনিংসের শেষে এ-সেকশান ছাপান্ন তুলে আজকের খেলায় জিতে গেল। দেবোপমস্যার ঘোষণা করলেন, ‘রোরো একাই একশো হয়ে ম্যাচটাকে টেনে নিয়ে গেল।’ তারপর লোকনের দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, ‘লোকন, তোমার অমন মারকুটে ব্যাটিং কাজে লাগল না। তবে তুমি দারুণ খেলেছ! এই ভাবেই ব্যাটিংটা করবে।’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি ক্রিজের দিকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন লোকনকে। বললেন, ‘লোকন, তুমি আমাদের বৈভব সূর্যবংশী! ফাইনালের দিন তোমার জন্যে একটা ভাল কিছু উপহার অপেক্ষা করবে!’
দেবোপমস্যার এ-সেকশানকে বললেন, ‘তোমরা ব্যাট, বল আর উইকেট গুছিয়ে ক্রীড়াকৌমুদী রুমে চলো এসো।’ এবার লোকনকে বললেন, ‘লোকন তুমি দিদিকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি চলে যাও! সোমবার স্কুলে এসো। তখন কথা হবে।’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে বললেন, ‘স্যার, চলুন, আমরা আপনার রুমে খানিক বসি। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথাও আছে!’ দেবোপমকে বললেন, ‘তুমিও দেবোপম, স্যারের রুমে একবার চলে এসো! দরকারি কথা আছে।’
লোকন তাকে দেওয়া দেবোপম স্যারের ব্যাটটা দোলাতে দোলাতে দিদির সামনে এসে বলল, ‘দিদি, তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাক। আমি ব্যাটটা ক্রীড়াকৌমুদী রুমে রেখে এক্ষুনি আসছি!’
তক্ষুনি ফিরে এল লোকন। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে বিকেলের মেঘের গায়ে। ফট করে হঠাৎ আকাশের আলোটা নিভে এল দেখতে দেখতে। লোকন এসে পারুলমণির হাতটা ধরে বলল, ‘চল দিদি!’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমরা আজ জিততে পারলাম না রে দিদি!’
পারুলমণি বলল, ‘তুই তো তোর সব শক্তি দিয়ে খেলেছিস রে ভাই! বাবা আকাশ থেকে তোর খেলা দেখেছে! পরের খেলাগুলোয় আরও অনেক ভাল করতে হবে!’
মোরামের পথ ধরে ভাই আর দিদিতে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে বাড়ির কাছে চলে এল। ওদের বাড়ির বেড়ার ধরে লাগানো বনশিমুলের গাছগুলো কবে-কবে ঝোপের চেহারা নিয়েছে। পারুলমণি বলল, ‘ভাই কাল তো রোববার। কাল রাধাপিসির রান্না হয়ে গেলে তুই আর রাধাপিসি মিলে বনশিমুলের ডালগুলো ছেঁটে দিস তো! আমি রাধাপিসিকে বলে দেব!’
লোকন বলল, ‘আচ্ছা!’ তারপর দরজার তালাটা খুলে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে লোকন বলল, ‘দিদি, আগে গিয়ে দেখি অন্ধ মাছটার সঙ্গে ভাল মাছটার বন্ধুত্ব হল কিনা!’
(এর পর ছাব্বিশ পর্ব)
পুতুলের ভাইফোঁটা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়
' সোনার তরী ' নামে একটা বাড়ি আছে সারদা কলোনিতে। সেই বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্যের নাম পুতুল। তিন বছরের পুতুল ভারী মিষ্টি মেয়ে, হাতে পায়ে চঞ্চল নয়, খাওয়াদাওয়ায় লক্ষ্মী। ব্যস, মায়েরা তো এই রকমই চায়।
পুতুল ওর বাবা মা দাদা দিদি আর ঝন্টুকাকার সঙ্গে থাকে। ওর ঠাকুরদাদাকে ও দাদা বলে আর ঠাকুরমাকে বলে দিদি। ঝন্টুকাকা ওদের বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করে। বাজার করা থেকে ছাদের গাছে জল দেওয়া, বড়কর্তার পান সেজে দেওয়া, বড়মার বড়ি দিয়ে দেওয়া -- সব করে।
পুতুলদের বাড়ির একতলায় কারখানা আছে। সেখানে নানা রকম খাম তৈরি হয়। পুতুলের দাদা এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন ওর বাবা দেখে। কারখানায় এগারো জন কাজ করে। তারাও সবাই পুতুলকে খুব ভালোবাসে। পুতুল যখন বাবার কোলে চড়ে নীচে নামে, প্রত্যেকে এসে ওকে আদর করে। পুতুল হাসে আর অনেক ছড়া শোনায়। কিন্তু অন্য কারো কোলে ও যায় না।
পুতুলের তিন জন দাদা আছে। বুয়ার দুই ছেলে আর কাকাইয়ের এক ছেলে। ওর একজনই পিসি, তাকে পুতুল বুয়া বলে ডাকে। ওর বাবার খুড়তুতো ভাইকে ও কাকাই বলে ডাকে। দাদাদের ডাকে দাদাভাই, দাদামনি আর ছোদ্দা।
বাড়ির যে কোনো অনুষ্ঠানে সবাই আসে, খুব হইচই আনন্দ হয়। পুতুলের জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসে। হেয়ার ব্যান্ড, রঙিন ক্লিপ, জামা। পুতুলের আবার খেলনা পুতুল আছে। আরও নানা রকম খেলনাও আছে। সবাই দেয় তাই অনেক অনেক আছে। পুতুলের মা মাঝে মাঝে কারখানার কাকুদের ছেলেমেয়েদের জন্যে কিছু কিছু খেলনা দিয়ে দেয়।
দিন যাচ্ছে, রাত যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, বছর ঘুরে যাচ্ছে, পুতুলও ধীরে ধীরে বড় হয় যাচ্ছে। এখন পুতুলের ছ' বছর বয়েস। এই বছর ভাইফোঁটা দিতে পারবে সে। ওদের বাড়িতে নিয়ম আছে, পাঁচ বছর বয়েস না হলে বোন ভাইফোঁটা দিতে পারবে না, ভাইও পাঁচ বছরের আগে ফোঁটা নিতে পারবে না। ভাইফোঁটার দিন বাড়িতে ভালো ভালো রান্না হয়। পুতুলের বিমামা আসে ওর মায়ের জন্যে শাড়ি, ভাগ্নির জন্যে মজার মজার খেলনা নিয়ে, ছবির বই নিয়ে।
পুতুলের মায়ের একজনই ভাই, নাম বিতনু। সিঙ্গাপুরে থাকে। পুজোর সময়ে আসে, ভাইফোঁটা কাটিয়ে তারপর ফেরত যায়। পুতুল বলে বিমামা। সিঙ্গাপুর খুব সুন্দর দেশ। সেই দেশের গল্প শোনায় বিতনু, চুপটি করে বসে শোনে পুতুল। কিন্তু মামা যখন জিগ্যেস করে, ' আমার সঙ্গে যাবি? ' তখন কিন্তু ঘাড় নেড়ে না বলে পুতুল। মাকে ছেড়ে ও মোটেই থাকতে পারবে না। মামা ওকে পুতু বলে ডাকে। মা যদি যায়, তাহলে ও যাবে।
পুতুল যত বড় হচ্ছে তত ওর মধ্যে স্বভাবের কিছু পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। যেমন, প্রচন্ড জল ঘাঁটার প্রবণতা হয়েছে ওর। খাবার খেয়ে মুখ ধুতে গিয়ে কুলকুচি করেই যায়, করেই যায়। হাত ধুতেই থাকে। ওর মা বকা দেয়। ' পুতুল, কল বন্ধ কর শিগগির। হাতে হাজা হয়ে যাবে এবার। ' তখন সে কল বন্ধ করে। যখনই হাত ধোয়, তখনি বেশ খানিক্ষন জল ঘেঁটে নেয় ও।
যত দিন যেতে লাগল, পুতুলের মধ্যে আরো কিছু কিছু অদ্ভুত অভ্যেস দেখা দিল। হাত ধোবার পর ও সেই হাতে কিছু ধরতে চায় না। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে টিফিন খেয়ে হাত মুখ ধোবার পর পুতুলের দাদা বললেন, ' সোনামা, ঘরের টেবিলে আমার চশমাটা আছে, এনে দিবি? '
' আমি যে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছি দাদা। ' ওর দাদা কিছু বললেন না কিন্তু কষ্ট পেলেন। হাত ধুয়ে নিয়েছে তো কী হয়েছে, আর একবার ধুতো নাহয়। এই অভ্যেসটা মোটেই ভালো নয়।
এবারের জন্মদিনে পুতুলের বাবা ওকে খুব সুন্দর একটা ডেস্ক আর চেয়ার কিনে দিয়েছে। গোলাপি রঙের ডেস্কের ভেতরে বইপত্র পেন পেন্সিল রাখা যাবে আর বাইরেটা বার্বি ডলের প্রিন্ট। ডেস্কের সঙ্গে মানানসই চেয়ারও আছে, সেটাও গোলাপি রঙের। আর আছে ছোট্ট একটা মিষ্টি তালা। ডেস্কে তালা দিয়ে রাখা যায়। পুতুলের খুব পছন্দ হয়েছে।
বাবাকে অনেক আদর করে দিল পুতুল । ডেস্কে নিজের বই খাতা পেন্সিল ইরেজার পেন সব গুছিয়ে রেখে তালা লাগিয়ে দেয় সে। তালা লাগিয়ে বার বার টেনে দেখে তালাটা লেগেছে কিনা। ওর বাবা বলে, ' ওরে, ওটা ছোট্ট পলকা তালা, অত টানাটানি করলে ভেঙে যাবে। ' পুতুল খেলতে গিয়েও পুতুলের জামার বোতাম লাগিয়ে বার বার টিপে দেখে। ওর মা লক্ষ করলে বকা দেয় কিন্তু সব সময় তো চোখের সামনে থাকে না পুতুল।
দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল। পুজোয় ভীড় ঠেলে ঠাকুর দেখতে যেতে সোনার তরীর কেউই পছন্দ করে না। পুতুলও বায়না করে না। পুজো মানেই হল দেদার খাওয়া দাওয়া। পুজোর সময় ফুচকা আর আইসক্রিম খাওয়ায় ছাড় দেয় বাড়ি থেকে। আর সেটাই পুতুলের পুজোর মজা।
পুজো শেষ হতেই গুটি গুটি চলে এল কালীপুজো। কালীপুজোয় বাজি ফাটায় পুতুলরা তবে শব্দবাজি একদম নয়। কেবল আলোর বাজি পোড়ায় ওরা। পুতুল বেশ ভীতু। ও নিজে খুব একটা বাজি পোড়ায় না, তবে দেখতে ভালোবাসে। পুতুলের বুয়া বলে, ' বাজির শব্দে, আলোতে পশু পাখিদের খুব অসুবিধে হয়, কষ্ট হয়। বাজি পোড়ানো উচিত নয়। ' দাদাভাই বলে, ' যদি কেউ বাজি না কেনে তাহলে যারা বাজি বানায় তাদের চলবে কী করে? ' এই সব তক্কাতক্কির মধ্যে আলোর বাজি রঙ ছড়াতে থাকে।
কালীপুজো মিটতেই চলে এল ভাইফোঁটা। পুজোর পরের দিনই বিতনু চলে এল পুতুলদের বাড়ি। পুতুলের মায়ের খুব আনন্দ। বাড়ির সকলের জন্যই উপহার নিয়ে এসেছে বিতনু তার মধ্যে পুতুলের স্পেশাল গিফট। চুম্বক দেওয়া ব্লক যেগুলো দিয়ে একশো রকম জিনিস বানানো যায়। বাড়ি থেকে গাড়ি -- সব। পুতুল তো এই গেম পেয়েই ছবি দেখে দেখে বানাতে বসে পড়ল।
ভাইফোঁটার দিন পুতুলের মা উঠে পড়ল ভোরবেলা। বিমলাপিসির সঙ্গে হাত লাগিয়ে রান্না সেরে ফেলল। পুতুলকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ' উঠে পড়ো সোনামা, ব্রাশ করে অল্প কিছু খেয়ে স্নান সেরে নাও। আজ তুমি প্রথম ভাইফোঁটা দেবে। ' পুতুলও চট করে উঠে পড়ল। মায়ের কথামতো অল্প খেয়ে স্নান সেরে নতুন জামা পরল। পুজোতে ওর অনেকগুলো জামা হয়েছে। সব পরা হয়নি। তাই আজকেও নতুন জামা পরল।
বুয়া আর কাকাই এসে গেছে। যারা যারা ফোঁটা নেবে তারা মেঝেতে পাতা আসনে পর পর বসে পড়েছে। পুতুলের মা একটা নতুন থালায় সাদা চন্দন, লাল চন্দন, ঘি, দই, দুব্বো আর ধান রেখেছে। একটা প্রদীপ রাখা আছে আর আছে শাঁখ।
প্রথমে পুতুলের বাবাকে ফোঁটা দিল বুয়া। তারপর পুতুলের মা দিল তার ভাইক্কে ফোঁটা। এইবার পুতুলের পালা। এই সময় ঘটল একটা কাণ্ড! পুতুল কিছুতেই চন্দ, ঘি, দইতে হাত দেবে না। শুকনো আঙুল দিয়ে ফোঁটা দেবে বলে বায়না করতে লাগল। ওর মা প্রথমে বুঝিয়ে বলল কেন সবগুলোতেই আঙুল ঠেকাতে হয়। কিন্তু পুতুল অনড়। সে শুধু কপালে হাত ছোঁয়াবে ব্যস।
পুতুলের মা রেগে গেল। মেয়ের চুলের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিতে বলল, ' প্রথম ফোঁটা দিতে এসে কীরকম অসভ্যতা করছে দেখো। কেউ ওকে কোনো গিফট দেবে না। ' যেই না বলা অমনি পুতুল দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। বাকীরা সবাই বলল, ' আহা, ছেলেমানুষ, ওসবে না হাত দিতে চাইলে নাই দিল। মারলে কেন? দেখো দেখি, মেয়েটা কোথায় গেল। '
পুতুলের মা বলল, ' কোথায় আর যাবে, ঘরে খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে দেখো গে। ' সবাই আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। ওদের শোবার ঘরে পুতুল নেই। সব ঘর খোঁজা হল, বারান্দা, ছাদ -- কোথাও পুতুল নেই। এবার ওর মা ভয় পেয়ে গেল। কোথায় গেল মেয়েটা!
পুতুলের দাদা বিষয়টা শুনে বললেন, ' এই সামান্য বিষয়ের জন্য মেয়েটাকে মারলে বৌমা। আজ একটা শুভদিনে আমার দিদিসোনাকে কাঁদালে। ' পুতুলের মা'র এবার কান্না পেয়ে গেল। আঁচলে চোখ মুছে পুতুলের বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ' কোথায় যেতে পারে মেয়েটা, আমি তো কিছুতেই বুঝতে পারছি না। ' পুতুলের বাবাও ঘাবড়ে গেছে।
এমন সময় শোনা গেল কেউ বলছে, ' পেয়েছি, পুতুলরাণীকে পেয়েছি। ' দেখা গেল, পুতুলের দাদামণি ঠাকুরঘরে পুতুলকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই সেখানে পৌঁছতে সে বলল, ' এই টেবিলের তলায় পুতুল বসেছিল। টেবিলে ঢাকাটা যেহেতু মাটি অবধি, তাই দেখা যায়নি। চল, তোর গিফটটা দেখবি চল। ' সকলে মিলে পুতুলকে খুব আদর করে দিল। সুন্দর সুন্দর উপহার পেল পুতুল। তখনকার মতো সব ভুলে গিয়ে উপহারগুলো নিয়ে বসে পড়ল।
পুতুল যত বড় হতে লাগল, ততই নানারকম বাতিক তার স্বভাবে দেখা যেতে লাগল। নিজের তোয়ালে মেলতে সে পাঁচ মিনিট সময় নিচ্ছে। টানটান করে মেলার পর হয়তো হাওয়াতে বা হাত লেগে সামান্য বেঁকে গেলেই আবার সেটাকে একেবারে টান করতে লেগে পড়ে পুতুল। ওর মা যদি বলে, ' অ্যাই, কী করছিস এতক্ষণ ধরে? ' পুতুল হেসে চলে আসে। এখন বড় হয়েছে বলে আর কাঁদে না।
পুতুলের বাবার এই বিষয় গুলো এবার একটু সিরিয়াস মনে হয়। সে তার এক ডাক্তার বন্ধুকে বিষয়টা খুলে বলে। ছোটবেলা থেকে এখন অবধি যা যা করে পুতুল। তখন সেই ডাক্তার বন্ধু বলে, ' এটা একটা অসুখ বলতে পারিস। একে বলে ওসিডি অর্থাৎ অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার। যার এই রোগ আছে, যে কোনো কাজ যতক্ষণ না তার মনের মতো হচ্ছে ততক্ষণ সেটা করেই যাবে। সূচীবাইও হয় এরা। বার বার হাত ধুতে থাকে। এসব বাতিক ক্রমশ বাড়ে।'
চিন্তায় পড়ে যায় পুতুলের বাবা। বন্ধুকে জিগ্যেস করে, ' তাহলে কী করা যায়? আমি তো দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছি রে। '
ডাক্তার বন্ধু বলে, ' অত ভাবার কিছু নেই। আর একটু বড় হলে ওকে বোঝাতে হবে যে এই অভ্যেসগুলো ঠিক নয়। বলতে বলতে খানিকটা ঠিক হবে। আর একন্তই যদি না হয় তাহলে কাউন্সেলিং করাতে হবে। পুরোটা না হলেও বেশিটাই ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না। এ রোগ বহু বহু মানুষের আছে। '
পুতুলের বাবা বাড়ি ফিরে ওর মাকে সব বলে। ওরা দুজনে ঠিক করে, যখনই পুতুল এই কাজগুলো করবে, ওরা বোঝাবে যে এমন করা ভালো নয়। সেইমতোই চলতে লাগল। পুতুল বেশি হাত ধুতে থাকলে ওর মা বলে, ' তুই জানিস পুতুল, কত কত মানুষ পরিষ্কার জল পায় না। মাইলের পর মাইল তাদের যেতে হয় জল আনতে। আর কিছু বছরের মধ্যে আমরাও আর জল পাব না। মাটির তলার জলের ভান্ডার প্রচন্ড কমে গেছে। তুই যে এত জল নষ্ট করিস, এই জলে কতজনের প্রয়োজন মিতে যেতে পারে। এত জল নষ্ট করা কি উচিত?'
' হাত মুখ ধুচ্ছি তো মা। ভালো করে না ধুলে এঁটো লেগে থাকবে। '
' আয়না দেখে আয়, একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। বলেছি না, বেশি জল ঘাঁটলে হাতে হাজা হবে, তখন দেখবি কেমন কষ্ট। '
পুতুলের এখন পনেরো বছর বয়েস। ক্লাস টেনে পড়ে। ওর অসুখটা এখন আর নেই বললেই চলে। সামান্য যেটুকু আছে, তা ধরার মতো নয়। বাবা মায়ের ক্রমাগত সতর্ক করা এবং পুতুল নিজের চেষ্টায় ওই অসুখের বেড়াজাল থেকে বেরতে পেরেছে। এখন পুতুল খুব সুন্দর করে ভাইফোঁটা দেয়। নিজেই চন্দন বাটে, দই আর ঘি রেখে থালা সাজায়। দাদারা সবাই একমাত্র বোনের ফোঁটা পেয়ে খুব খুশি হয় আর চমৎকার সব উপহার দেয় পুতুলকে।
ইচ্ছে থাকলে মানুষ সব পারে। ইচ্ছেই শক্তি।
ডাক্তার বাবুর কলমে- ৩
চেম্বারে রাজুকে নিয়ে ওর মা রেগুলার চেক আপ করাতে নিয়ে এসে বলল " দেখুন না ডাক্তার বাবু রাজু একেবারেই জল খেতে চায় না। সারাদিন জলের গ্লাস নিয়ে ওর পেছন পেছন দৌড়তে হয়" । এই ধরনের সমস্যা আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখতে ও শুনতে হয় । তাই আজ বাচ্চারা তাদের ওজন অনুযায়ী কত পরিমাণ জল খাবে তার একটা হিসেব দেবার চেষ্টা করলাম।
প্রথমে বলি, ১ থেকে ১০ কেজি ওজনের জন্য, কেজি প্রতি ১০০ মিলি লিটার জলের প্রয়োজন। অর্থাৎ কোনো বাচ্চার ওজন যদি ৯ কেজি হয় তাহলে ঐ বাচ্চাটির ৯ × ১০০ = ৯০০ মিলি লিটার জলের প্রয়োজন। তাহলে এটা বোঝা গেলো যে ১০ কেজি ওজনের বাচ্চার প্রয়োজন ১ লিটার জল। এবার আসি ১১ থেকে ২০ কেজি ওজনের জন্য কত পরিমাণ জল খাবে। এক্ষেত্রে প্রথমে পেয়েছি ১০ কেজির জন্য ১ লিটার জল এবং তারপর থেকে কেজি প্রতি ৫০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন। ধরা যাক একটি বাচ্চার ওজন ১৮ কেজি তাহলে তার জন্য জলের প্রয়োজন ১ লিটার ( ১০০০ মিলি লিটার) এবং সেই সঙ্গে ৮ × ৫০ = ৪০০ মিলি লিটার। অর্থাৎ ১৪০০ মিলি লিটার। এক কথায় দেড় লিটারের থেকে একটু কম । আরো একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০ কেজি ওজনের বাচ্চার জন্য জল প্রয়োজন, ১০ কেজির জন্য ১ লিটার + বাকি ১০ কেজির জন্য ১০× ৫০ = ৫০০ মিলি লিটার । অর্থাৎ সর্বমোট ১৫০০ মিলি লিটার বা এককথায় দেড় লিটার ।
এবার আসা যাক বাচ্চার ওজন যদি ২০ কেজির বেশি হয় তাহলে সে কতটা জল খাবে। তাহলে বাচ্চা যতক্ষণ না প্রাপ্ত বয়স্ক হয় ততক্ষণ কেজি প্রতি ওজনের জন্য ২০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন হবে। ধরা যাক ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো বাচ্চার ওজন ৩০ কেজি তখন প্রথম ২০ কেজির জন্য দেড় লিটার তারপরের বাকি ১০ কেজির জন্য ১০ × ২০ = ২০০ মিলি লিটার। অর্থাৎ ১৫০০ + ২০০ মিলি লিটার = ১৭০০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন।
এবার আসি প্রাপ্ত বয়স্ক দের জন্য কত পরিমাণ জল প্রয়োজন। প্রাপ্ত বয়স্করা তাদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৪০ (চল্লিশ) মিলি লিটার জল প্রয়োজন। এককথায় বলা যায় যে প্রাপ্ত বয়স্করা সারাদিনে ২.৫ লিটার থেকে ৩ লিটার জল প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে বলা যায় আবহাওয়া এবং কাজের ধরনের উপর ব্যাক্তির জল খাবার পরিমাণে তারতম্য হতে পারে।
তবে খুব ছোট বাদ দিয়ে, ছোটরা এবং বড়রা সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস বা দেড় গ্লাস ( মানে তোমরা যত টা খেতে পারবে) হালকা গরম জল খেলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরোতে সাহায্য করে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।
খাবার খাওয়ার সময় এবং খাবার খাওয়ার ঠিক পরেই খুব বেশি পরিমাণে জল খাবে না। এতে হজমের সমস্যা হবে। খাবার খাওয়ার আধ ঘন্টা আগে ও খাবার খাওয়ার আধ ঘন্টা পরে জল খেলে খাবার ভালো হজম হয়।
ঘুমোতে যাওয়ার আধ ঘন্টা আগে জল খাবে, তারপর আর নয়।
ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করার সময় শরীর কে আদ্র রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জল খাবে।
আর একটা কথা, দাঁড়িয়ে জল খাবে না। অবশ্যই বসে জল খাবে, এবং অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে জল খাবে। অযথা অতিরিক্ত জল খাবে না এতে কিডনির উপর চাপ পড়ে। আমাদের মস্তিষ্কের থ্রাস্ট সেন্টার আমাদের শরীরের জলের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই জল তেষ্টা পেলেই জল খেয়ে নিও দেরি না করে। সবাই সুস্থ থাকো এই শুভ কামনা রইলো।
ক্যুইজ: ৯
১. কোন পাঁচটি দেশ রাষ্ট্রপুঞ্জের স্থায়ী সদস্য?
2. জাতীয় দুগ্ধ দিবস কত তারিখ পালন করা হয়?
৩. আয়তনে দিক থেকে ভারতের ক্ষুদ্রতম জেলা কোনটি?
৪. ভারতের নাইটিংগেল বা ভারতের বুলবুল (সঙ্গীত জগতের নয়) কাকে বলা হত?
৫. সত্যজিৎ রায়ের গল্পের চরিত্র প্রফেসর শঙ্কুর বেড়ালের নাম কি?
গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর:
১. সান্দাকফু (৩৬৩৬ মিটার )
2.বাউল
৩. রাঢ় বাংলা (বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান)
৪. পুরুলিয়া
৫.মল্লরাজা
0 Comments