জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১০

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১০
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 
চিত্রগ্রাহক : রাকেশ সিংহ দেব 

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
আশা করি  সবাই নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো। পত্রিকা তোমাদের কেমন লাগছে? ভালো লাগছে নাকি মোটামুটি লাগছে?  কারো কারো কি একদম ই ভালো লাগছে না ? আচ্ছা একটা কাজ করা যাক, কার কেমন লাগছে সেটা আমাকে লিখে জানাও। আমি তোমাদের চিঠিপত্র নিয়ে বরং আর একটা নতুন বিভাগ শুরু করি । কি গো সবাই লিখবে তো ? অবশ্যই লিখে জানাবে কিন্তু। সেই সঙ্গে তোমাদের পরামর্শ চাই যে নতুন আর কি কি বিভাগ শুরু করা যায় আমাদের পত্রিকাতে। শুধু ছোটরা কেন , বড় রাও তাদের মতামত অবশ্যই জানান। 
আজ তাহলে এই পর্যন্তই, সবাই ভালো থাকো, সুস্থ থাকো। অনেক ভালবাসা নিও সবাই। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতা দি


মানুষের জন্য/ বিশ্বজিৎ সিন্ হা

আমায় একটু রঙ দিন তো!
 একটু নীল রঙ;
কল কারখানার কালো ধোঁয়ায়
আকাশ যে আর দেখাই যায়না,
একটু নীল রঙ করে দিই।

একটু সবুজ রঙ দিতে পারেন,
পীচ যে মাটিকে ঢেকে ফেলেছে
একটু সবুজ রঙ দিয়ে দেখি
আবার প্রকৃ তিটা সবুজ  হয় কি-না!

এবার একটু সাদা রঙ দিন।
প্রতি হিংসা,বিদ্বেষে পুড়ে মানুষের মনগুলো কুৎসিত
হয়ে গেছে;
একটু সাদা রঙ ছুঁইয়ে দেখি
আবার সুন্দর 
করা যায় কিনা!

সবশেষে,একটু লাল রঙ দিন আমায়
ঐ জীবন্ত মৃ তদেহগুলোর ওপর
একবার ছুঁইয়ে দেখি,
ওরা আবার জীবন ফিরে পায় কি-না!
শুভশ্রী সরকার 
শ্রেণী- একাদশ, সুখচর শতদল বালিকা বিদ্যায়তন

ফুলবাগান 
দুরন্ত বিজলী 

টগর ফুলে ভ্রমর বসে 
মৌমাছি গাঁদা ফুলে,
শিউলিতলায় শিউলিফুল 
কোঁচড়ে ভরে তুলে।

জবাফুলে ছেয়ে আছে 
সবুজ গাছের ডালপালা,
পুকুর জলে পদ্ম ভাসে
মাধবী গাঁথে মালা।

ফুটে আছে কত গোলাপ 
বাতাসে দোলে গাছে,
চাঁপা ফুলের হাসি পাতার 
উপরে ভেসে আছে।

নানা রকম ফুলগুলি সব  
এই পৃথিবীতে ফোটে,
সে রূপ সুধা পানের সুযোগ 
মানুষের ভাগ্যেই জোটে।

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ : পঁচিশ   

রতনতনু ঘাটী

রোদে ঝলমল করছে স্কুলের গোটা মাঠটা। আকাশ থেকে তাকিয়ে   দেখছে ক্রিকেট প্লেয়ারদের। এবার রোরো হাত তুলে বল করতে ডাকল ধৃতি নায়েককে। ধৃতি জোরে-বোলার। কিন্তু আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের যশপ্রীত বুমরার মতো বল ঘোরাতে জানে। এর বল দেখে যেমন ব্যাটার বুঝতে পারে না, বুমরার বল উইকেটের উপর আছড়ে পড়বে, নাকি নো বল হবে! ধৃতির বলও ওরকম। ব্যাটারদের বুঝতে একদম দেয় না।

   ওদিকে লোকনের জায়গায় ক্রিজে এসে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছে সি-সেকশানের ব্যাটার রকি দেববর্মা। রকির তত কবজিতে জোর নেই সকলেই জানে। তাই সব সময় সে ছক্কা হাঁকাতে পারে না বটে, কিন্তু এক ওভারের তিনটে বলে তিনটে বাউন্ডারি মারতে পারে, এমন উদাহরণ আছে। রকি ধৃতির প্রথম বলে জোরের সঙ্গে বাউন্ডারি মারল। এবার পরের বল ধৃতির। এবারও সপাটে বাউন্ডারি তুলে নিল রকি। সকলেই আশায় ছিল, তৃতীয় বলটাতেও রকি চার মারবে। না, তা আর হল না। রকি বলের নাগাল পেল না, ব্যাটেই লাগাতে পারল না বলটা। বল গড়িয়ে চলে গেল ফিল্ডারের হাতে। ধৃতির ওভার থেকে মোট আট রান হল রকির। 

   এবার সি-সেকশানের চতুর্থ ওভারের ব্যাটিংয়ের জন্যে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকল রকি। বল করতে এবার রোরো পাঠাল অরিত্র বর্মণকে।

    ততক্ষণে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি ডি এম সাহেবকে তাঁর অফিসে পৌঁছে দিয়ে খেলার মাঠে ফিরে এলেন। এসে দেখলেন, অরিত্র তার ওভারের প্রথম বলটা করার জন্যে দৌড় শুরু করল। প্রথম বলটা করল দারুণ স্পিন বল। বলটা আস্তে করে উইকেটের পাশ দিয়ে চলে গেল উইকেট কিপারের হাতে। রকি বলটার নাগালই করতে পারল না। তাই এই বলে কোনও রান হল না রকির! সেকেন্ড বলটা তত জোরে ছিল না। বলটা ছুটে এসে ক্রিজে গড়িয়ে এসে উইকেটের খানিকটা আগে ড্রপ খেয়ে লাফিয়ে উঠে রকির ব্যাটে এসে লাগল। রকি ব্যাট চালাল বটে। একটু দেরি হয়ে গেছে! তেমন ভাবে ব্যাটে-বলে হল না। ব্যাটের কানায় লেগে বল থার্ডম্যান অঞ্চলে মাঠের মধ্যেই থেমে গেল। ভাল বোঝাপড়া ছিল ওদিকের ব্যাটারের সঙ্গে। দৌড়ে এই ফাঁকে দু’ রান তুলে নিল রকি দেববর্মা। 

   এবার ওভারের শেষ বল করল অরিত্র। বলটা হুক করে নিজের মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠিয়ে দিল উইকেটকিপারের পিছন দিক দিয়ে। কোনও ফিল্ডার ছিল না। তাই বিনা বাধায় বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে চলে গেল। রকির সংগ্রহে চলে এল চার রান, নট আউট রকি।

   সি-সেকশান এবার লাস্ট ওভার ব্যাট করবে। রোরো একটু ভেবে নিল মিনিট তিনেক। নিজেদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কিছু একটা আলোচনাও সেরে নিল।

   তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বল করতে এগিয়ে এল রোরো নিজেই। ওদিকে রকি দেববর্মাকে আউট করা যায়নি তখনও। এবার ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের কাঁধেই বোলিংয়ংর দায়িত্ব তুলে নিল রোরো। 

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনাদের এই রোরো ছেলেটি খুব ম্যাচিওর। ও দেখল, যখন কোনও মতেই উইকেট ফেলা যাচ্ছে না, তখন নিজেই ঝুঁকি নিয়ে বল করতে এগিয়ে এল। দেখি কেমন বল করে রোরো। শুনেছি রোরো খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে ভাল ব্যাটসম্যানও কিন্তু কখনও কখনও দুর্দান্ত বল করতে পারে। তার বড় উদাহরণ আমাদের সচিন তেন্ডুলকর।’

   হেডস্যার চোখের চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কীরকম?’ 

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বললেন, ‘১৯৯৩ সালে ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইন্ডিয়ার ফাইনাল টেস্ট খেলা। আমি যথারীতি ক্লাব হাউসের পাশে জমিয়ে বসে খেলা দেখছিলাম। ভারত প্রথমে ব্যাট করতে এসে ওদের সামনে রেখেছিল ২২৬ রানের টার্গেট। ওই রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে ক্যারিবিয়ানদের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৬ রান, হাতে ছিল ৩ উইকেট। ভারতের অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন তখন অবাক কাণ্ড করে বসলেন। শেষ ওভারে বল করার জন্যে বল তুলে দিলেন তরুণ ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকরের হাতে।’

   ‘আমরা দর্শকরা মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু নির্ভীক চিত্তে সচিন বল করতে এগিয়ে এলেন। প্রথম বলটি করলেন ডট বল। এই বলে কোনও রান হল না। আস্তে করে হাত ঘুরিয়ে দ্বিতীয় বল করলেন সচিন। ঠুকুস করে এক রান নিলেন

ব্রায়ান লারা। তৃতীয় বলে দুম করে কেনি বেঞ্জামিন রান আউট হয়ে গেলেন। তখন ইডেন গার্ডেন্স উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। এবার চতুর্থ বল করলেন সচিন। এই বলে কোনও রান হল না! এবার পঞ্চম বল করলেন সচিন। রান আউট হয়ে গেলেন কার্টলে অ্যামব্রোস। এবার ওভারের শেষ বল করলেন সচিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা কোনও রান নিতে পারলেনই না। বরং রান আউট হয়ে গেলেন ইয়ান বিশপ। শেষ ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে সেবার ইন্ডিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের সেই দুরন্ত বেলিং কখনও ভুলতে পারিনি!’

   রোরোর প্রথম বলটা এল ডট বল। কোনও রান তুলতে পারল না রকি দেববর্মা। এবার রোরোর সেকেন্ড বল এল। এটা পুরোপুরি ঘূর্ণি বল। রকি চোখ বুজে মারতে গিয়ে সটান ফিল্ডার কাহ্ন ব্যানার্জির হাতে ধরা পড়ে গেল। রকি আউট!

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বলে উঠলেন, ‘কী নবনীতস্যার? বলেছিলাম না? দেখলেন তো, রোরো কী কাণ্ডটাই না ঘটিয়ে ফেলল?’

   হেডস্যার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। এবার সি-সেকশানের ক্যাপটেন লোকন ব্যাট করতে পাঠাল সারিন দাসকে। সারিন ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই লাস্ট বলটা রোরোর হাত থেকে বুলেটের মতো ক্ষিপ্র গতিতে এসে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্প ছিটকে দিল। শূন্য রানে আউট হয়ে গেল সারিন দাস। 

   সি-সেকশান পাঁচ ওভারের খেলায় এই ইনিংসে করল মোট বাহান্ন রান। দেবোপমস্যার ফার্স্ট হাফের বিরতির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে ডেকে বললেন, ‘এই যে সম্মতিচরণ, অনেকক্ষণ তো খেলা হল! এবার একটু চা-পানের ব্যবস্থা হোক!’

   ঘন্টিদাদু তৈরিই চিলেন। তক্ষুনি চায়ের কেটলি আর পেপার কাপ নিয়ে এসে হাজির হলেন। প্রথমে হেডস্যারকে চা দিলেন। হেডস্যার একটা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ‘আহাহা, সম্মতিচরণ, আগে অতিথিকে চা দিতে হয়! মুকুলকৃষ্ণবাবু আমাদের অতিথি, জানো উনি কত বড় মানুষ! সঙ্গে বিস্কুটও দিও!’

    মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘না না, স্যার আপনি আমাকে এখনও আপন করে নিতে পারেননি দেখছি! আমি আপনারই হিতাকাঙ্ক্ষী!’

    এর পর মুকুলকৃষ্ণবাবুকে আগে চা দিলেন ঘন্টিদাদু। তারপর হেডস্যারকে দিলেন। এর পর অন্য স্যার এবং ম্যামদের চা দিলেন ঘন্টিদাদু। তারপর চা দিলেন আশপাশের গ্রামের মান্যবর অমূল্য ধর, একাদশী পাল, অভিরূপ দলুইকে এবং মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্তকে। সেই সঙ্গে পারুলমণিকেও চা দিলেন ঘন্টিদাদু। লজ্জিত মুখে পারুলমণি চায়ের কাপটা নিজের হাতে ধরল।

   দুটো টিমেরই ক্রিকেটারদের হাতে দেবোপমস্যার চকোলেট বার তুলে দিলেন। এরপর দেবোপমস্যার ঘোষণা করলেন, ‘এবার পরের পাঁচ ওভারের খেলা শুরু হবে। মানে সেকেন্ড ইনিংস। এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো মজুমদার এবং সি-সেকশানের ক্যাপ্টেন লোকন দাস। তোমরা তৈরি হয়ে নাও তোমাদে টিম  নিয়ে।’

   বিকেলের আকাশ আজ যেন বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের আলো আজ বেশি করে গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠটাকে আলোকিত করে তুলছে। এ-সেকশানের ব্যাটিং মানে ওপেনাল রোরো। রোরো তার দাদুর কাশ্মির থেকে দেওয়া ব্যাটটা নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে ক্রিজে এসে দাঁড়াল। দর্শকদের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠ। ক্রিজে ব্যাট হাতে তখন ওদিকে দাঁড়িয়ে পড়েছে মহিন দত্ত। সকলেই জানে মহিন দত্ত ক্লাসের মধ্যে অঙ্কে তুখোড়! দেবোপমস্যার মহিন সম্পর্কে বলেন, ‘যারা অঙ্কে ভাল হয়, তারা গ্রিপের মধ্যে থাকা বল ছাড়া কেলার চেষ্টাই করে না।’ মহিনকে ব্যাট হাতে দেখে স্যার বললেন, ‘মহিন, তুমি বলগুলো ছেড়ে-ছেড়ে খেলো না! আমরা তোমার হাতের সেই বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখতে তাকিয়ে আছি।’

   মুখে কিছুই বলল না মহিন। শুধু মুচকি হাসল একবার। 

   বল করতে পাঠাল লোকন দাস ওদের বাঁ-হাতি বোলার নাতাশা চক্রবর্তীকে। নাতাশার ঘূর্ণি বলের সামনে কতক্ষণ টিঁকতে পারে রোরো, সকলের মনে এখন একটাই প্রশ্ন।

   প্রথম নাতাশা এমন ঘূর্ণি বল করল যে, রোরো ঠিক যেন বলটা ক্রিজের উপর দেখতেই পেল না। রোরোর মতো ব্যাটারও প্রথম বলে একটাও রান নিতে পারল না, বলটা ব্যাটেই লাগাতে পারল না রোরো। নিজেকে হতাশায় ডুবিয়ে রোরো চোখে-মুখে ক্ষিপ্রতা ফুটিয়ে তুলল। নাতাশার দ্বিতীয় বলটা গড়ানে বল ছিল। নাতাশা এরকমই করে। ব্যাটারকে পরের বলটা খেলার সুযোগ করে দেয়। মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘দেখলেন নবনীতস্যার। ওই রোগা শ্যামলা মেয়েটার কী ধুরন্ধর বুদ্ধি! ব্যাটসম্যানকে বুঝতেই দিল না এবারের বলটা তাকে জোরে মারতে হবে, নাকি তুলে মারতে হবে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবুর কথাই ঠিক হল। রোরো দনোমনো করল। বলটা খেলবে নাকি ছেড়ে দেবে? শেষমেশ বলটা উড়িয়ে দিল রোরো বাউন্ডারি সীমানার বাইরে। মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘রোরো, অসাধারণ মেরেছ। এর পরের বলটায় আমরা ছক্কা দেখতে চাই!’

   পরের বল করতে দৌড় শুরু করল নাতাশা। একশো কিলোমিটার বেগে বলটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল গোলার মতো গতিতে। জোরে ধেয়ে আসা গোলার মতো বলকে খেলতেও পারে রোরো। চোখ ধাঁধানো মারে বলটা ছক্কা হয়ে দর্শকদের মাঝখানে গিয়ে পড়ল। এই ওভারে দশ রান তুলে নিল রোরো। তবু তার মুখ দেখে মনে হল, সে খুশি নয়।

   পরের ওভার বল করতে পাঠাল লোকন দাস, সুরথ দিন্দাকে। কেউ ভাবেনি, লোকন ভাল বোলার থাকতে সুরথকে পাঠাবে। সুরথের প্রথম বলটা ফুলটস বল ছিল। অনায়াসে রোরো বলটাকে উইকেট কিপারের পাশ দিয়ে সীমানার দিকে পাঠিয়ে দিল। উইকেট কিপার লোকন লাফ দিয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠেও বলের নাগাল পেল না। এবারও চার রান নিতে অসুবিধে হল না রোরোর। 

   পরের বলটা উইকেটের অনেকটা বাইরে ছিল। রোরো খেলার চেষ্টাই করল না। রান নিতে পারল না রোরো। তার পরের বলটা স্পিন ছিল। বলটা মারব মারব করেও রোরো ব্যাটটা তুলেও নামিয়ে নিল। ওভারের লাস্ট বলটাতেও রান এল না রোরোর। বিরাট কোহলি রান না পেলে যেমন করে ব্যাটটা ঝাঁকিয়ে শ্যাডো প্র্যাকটিসের ভঙ্গি করে, অমন করে রোরো দর্শকদের দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিল।

   পরের ওভারে লোকন বল করতে পাঠাল তাহিরা দত্তকে। তাহিরা দত্ত ভাল ব্যাটার। দারুণ রান তুলতে পারে। কিন্তু...রোরো বুঝে উঠতে পারল না, এমন সময় লোকন কেন তাহিরাকে বল করতে পাঠাল? শক্ত হাতে ব্যাটটা ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল রোরো। এই ওভারের পর পর তিনটে বলে রোরো তিনটে বাউন্ডারি মারল। 

   লোকন দেখল রোরোকে কোনও ভাবে আটকাতে পারছে না। রোরোও এভাবে ব্যাট চালালে একাই দরকারি রান তুলে নেবে। শেষমেশ ইনিংসের শেষে এ-সেকশান ছাপান্ন তুলে আজকের খেলায় জিতে গেল। দেবোপমস্যার ঘোষণা করলেন, ‘রোরো একাই একশো হয়ে ম্যাচটাকে টেনে নিয়ে গেল।’ তারপর লোকনের দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, ‘লোকন, তোমার অমন মারকুটে ব্যাটিং কাজে লাগল না। তবে তুমি দারুণ খেলেছ! এই ভাবেই ব্যাটিংটা করবে।’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি ক্রিজের দিকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন লোকনকে। বললেন, ‘লোকন, তুমি আমাদের বৈভব সূর্যবংশী! ফাইনালের দিন তোমার জন্যে একটা ভাল কিছু উপহার অপেক্ষা করবে!’

   দেবোপমস্যার এ-সেকশানকে বললেন, ‘তোমরা ব্যাট, বল আর উইকেট গুছিয়ে ক্রীড়াকৌমুদী রুমে চলো এসো।’ এবার লোকনকে বললেন, ‘লোকন তুমি দিদিকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি চলে যাও! সোমবার স্কুলে এসো। তখন কথা হবে।’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হেডস্যারকে বললেন, ‘স্যার, চলুন, আমরা আপনার রুমে খানিক বসি। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথাও আছে!’ দেবোপমকে বললেন, ‘তুমিও দেবোপম, স্যারের রুমে একবার চলে এসো! দরকারি কথা আছে।’ 

   লোকন তাকে দেওয়া দেবোপম স্যারের ব্যাটটা দোলাতে দোলাতে দিদির সামনে এসে বলল, ‘দিদি, তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাক। আমি ব্যাটটা ক্রীড়াকৌমুদী রুমে রেখে এক্ষুনি আসছি!’

   তক্ষুনি ফিরে এল লোকন। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে বিকেলের মেঘের গায়ে। ফট করে হঠাৎ আকাশের আলোটা নিভে এল দেখতে দেখতে। লোকন এসে পারুলমণির হাতটা ধরে বলল, ‘চল দিদি!’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমরা আজ জিততে পারলাম না রে দিদি!’

   পারুলমণি বলল, ‘তুই তো তোর সব শক্তি দিয়ে খেলেছিস রে ভাই! বাবা আকাশ থেকে তোর খেলা দেখেছে! পরের খেলাগুলোয় আরও অনেক ভাল করতে হবে!’

   মোরামের পথ ধরে ভাই আর দিদিতে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে বাড়ির কাছে চলে এল। ওদের বাড়ির বেড়ার ধরে লাগানো বনশিমুলের গাছগুলো কবে-কবে ঝোপের চেহারা নিয়েছে। পারুলমণি বলল, ‘ভাই কাল তো রোববার। কাল রাধাপিসির রান্না হয়ে গেলে তুই আর রাধাপিসি মিলে বনশিমুলের ডালগুলো ছেঁটে দিস তো! আমি রাধাপিসিকে বলে দেব!’

   লোকন বলল, ‘আচ্ছা!’ তারপর দরজার তালাটা খুলে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে লোকন বলল, ‘দিদি, আগে গিয়ে দেখি অন্ধ মাছটার সঙ্গে ভাল মাছটার বন্ধুত্ব হল কিনা!’

   (এর পর ছাব্বিশ পর্ব) 


🍂

ডাক্তার বাবুর কলমে- ৩ 

চেম্বারে রাজুকে নিয়ে ওর মা রেগুলার চেক আপ করাতে নিয়ে এসে বলল " দেখুন না ডাক্তার বাবু রাজু একেবারেই জল খেতে চায় না। সারাদিন জলের গ্লাস নিয়ে ওর পেছন পেছন দৌড়তে হয়" । এই ধরনের সমস্যা  আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখতে ও শুনতে হয় । তাই আজ বাচ্চারা তাদের ওজন অনুযায়ী কত পরিমাণ জল খাবে তার একটা হিসেব দেবার চেষ্টা করলাম। 
প্রথমে বলি, ১ থেকে ১০ কেজি ওজনের জন্য, কেজি প্রতি ১০০ মিলি লিটার জলের প্রয়োজন। অর্থাৎ কোনো বাচ্চার ওজন যদি ৯ কেজি হয় তাহলে ঐ বাচ্চাটির  ৯ × ১০০ = ৯০০ মিলি লিটার জলের প্রয়োজন। তাহলে এটা বোঝা গেলো যে ১০ কেজি  ওজনের বাচ্চার প্রয়োজন ১ লিটার জল।  এবার আসি ১১  থেকে ২০ কেজি ওজনের জন্য কত পরিমাণ জল খাবে। এক্ষেত্রে প্রথমে পেয়েছি ১০ কেজির জন্য ১ লিটার জল এবং তারপর থেকে কেজি প্রতি ৫০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন।  ধরা যাক একটি বাচ্চার ওজন ১৮ কেজি তাহলে তার জন্য জলের প্রয়োজন ১ লিটার ( ১০০০ মিলি লিটার) এবং সেই সঙ্গে ৮ × ৫০ = ৪০০ মিলি লিটার। অর্থাৎ ১৪০০ মিলি লিটার। এক কথায় দেড় লিটারের থেকে একটু কম ।  আরো একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০ কেজি ওজনের বাচ্চার জন্য জল প্রয়োজন, ১০ কেজির জন্য ১ লিটার + বাকি ১০ কেজির জন্য ১০× ৫০ = ৫০০ মিলি লিটার । অর্থাৎ সর্বমোট ১৫০০ মিলি লিটার বা এককথায় দেড় লিটার । 
এবার আসা যাক বাচ্চার ওজন যদি ২০ কেজির বেশি হয় তাহলে সে কতটা জল খাবে। তাহলে বাচ্চা যতক্ষণ না প্রাপ্ত বয়স্ক হয় ততক্ষণ কেজি প্রতি ওজনের জন্য ২০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন হবে। ধরা যাক ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো বাচ্চার ওজন ৩০ কেজি তখন প্রথম ২০ কেজির জন্য দেড় লিটার তারপরের বাকি ১০ কেজির জন্য ১০ × ২০ = ২০০ মিলি লিটার। অর্থাৎ ১৫০০ + ২০০ মিলি লিটার = ১৭০০ মিলি লিটার জল প্রয়োজন।  
এবার আসি প্রাপ্ত বয়স্ক দের জন্য কত পরিমাণ জল প্রয়োজন। প্রাপ্ত বয়স্করা তাদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৪০ (চল্লিশ) মিলি লিটার জল প্রয়োজন। এককথায় বলা যায় যে প্রাপ্ত বয়স্করা সারাদিনে ২.৫ লিটার থেকে ৩ লিটার জল প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে বলা যায় আবহাওয়া এবং কাজের ধরনের উপর ব্যাক্তির জল খাবার পরিমাণে তারতম্য হতে পারে। 
তবে খুব ছোট বাদ দিয়ে, ছোটরা এবং বড়রা সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস বা দেড় গ্লাস ( মানে তোমরা যত টা খেতে পারবে) হালকা গরম জল খেলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরোতে সাহায্য করে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। 
খাবার খাওয়ার সময় এবং খাবার খাওয়ার ঠিক পরেই খুব বেশি পরিমাণে জল খাবে না। এতে হজমের সমস্যা হবে। খাবার খাওয়ার আধ ঘন্টা আগে ও খাবার খাওয়ার আধ ঘন্টা পরে জল খেলে খাবার ভালো হজম হয়। 
ঘুমোতে যাওয়ার আধ ঘন্টা আগে জল খাবে, তারপর আর নয়। 
ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করার সময় শরীর কে আদ্র রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জল খাবে। 
আর একটা কথা, দাঁড়িয়ে জল খাবে না। অবশ্যই বসে জল খাবে, এবং অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে জল খাবে। অযথা অতিরিক্ত জল খাবে না এতে কিডনির উপর চাপ পড়ে। আমাদের মস্তিষ্কের থ্রাস্ট সেন্টার আমাদের শরীরের জলের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই জল তেষ্টা পেলেই জল খেয়ে নিও দেরি না করে। সবাই সুস্থ থাকো এই শুভ কামনা রইলো।

ক্যুইজ: ৯


১. কোন পাঁচটি দেশ রাষ্ট্রপুঞ্জের স্থায়ী সদস্য? 
2. জাতীয় দুগ্ধ দিবস কত তারিখ পালন করা হয়? 
৩. আয়তনে দিক থেকে ভারতের ক্ষুদ্রতম জেলা কোনটি?  
৪. ভারতের নাইটিংগেল বা ভারতের বুলবুল (সঙ্গীত জগতের নয়) কাকে বলা হত? 
৫. সত্যজিৎ রায়ের গল্পের চরিত্র প্রফেসর শঙ্কুর বেড়ালের নাম কি? 

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 
১. সান্দাকফু (৩৬৩৬ মিটার )
2.বাউল 
৩. রাঢ় বাংলা (বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান)
৪. পুরুলিয়া 
৫.মল্লরাজা

Post a Comment

0 Comments