জ্বলদর্চি

স্বপ্নের আত্মপ্রকাশ /দীপশ্রী সেনগুপ্ত


স্বপ্নের আত্মপ্রকাশ 

দীপশ্রী সেনগুপ্ত

স্বপ্ন দেখি কি না? হ্যাঁ, দেখি তো! প্রায়ই দেখি, বলা যায়—প্রায় রোজই দেখি। আমার মনে হয় সবাই স্বপ্ন দেখে। সবাইকে তো আর জিজ্ঞাসা করে জানা হয় না, কিন্তু স্বপ্ন সকলেই দেখে।
কিন্তু আবার দিবাস্বপ্ন বলে একটা ব্যাপার আছে, সেটাও মাঝে মাঝে দেখি; দেখতে বেশ ভালোই লাগে। দিবাস্বপ্ন নিয়ে অনেক ঠাট্টা-বিদ্রূপ প্রচলিত আছে—আমি কিন্তু দিবাস্বপ্ন দেখতেও ভালোবাসি। হয়তো নিজেকে মহাকাশচারী ভেবে বসলাম; ভাবতে ভাবতে পত্রিকা, বই, ইতিউতি আর এটা-সেটায় যেমন পড়েছি, মনে মনে ঠিক তেমনিভাবে খাওয়া-দাওয়া, অন্যান্য কাজ, যে জন্য আমাকে মহাকাশে পাঠানো হলো, তার তত্ত্বতালাশ করা—সব সেভাবেই করতে থাকলাম, সবটাই মনে মনে! ওই যে, "কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে"।
স্বপ্ন কোনো হেলাফেলার ব্যাপার নয়। মনোবিদেরা একে নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছেন। প্রথমেই অবধারিতভাবে আসে ফ্রয়েডের তত্ত্ব—অর্থাৎ অবদমিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কার্ল ইয়ুঙের মতে, মনের অবচেতন স্তরের বার্তা স্বপ্নের মাধ্যমে চেতন স্তরে পৌঁছায়। এটি আত্মসমীক্ষার উপায়। হবসন ম্যাককার্লের মতে, স্বপ্নের মাধ্যমে ব্রেন সারাদিনের কাজকর্মের মধ্যে একটা যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করে। কারো কারো মতে, এটি সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায়; স্মৃতির গ্রন্থিবন্ধনেরও উপায় হলো স্বপ্ন। অন্য অনেকের মতে আবার, বিপদের মোকাবিলা করার রিহার্সাল হয় স্বপ্নের মাধ্যমে।
তত্ত্বের কথা থাক, স্বপ্ন দেখেছিল বলেই না মানুষ ক্রমশ উন্নতি করতে পেরেছে? Wright ভাইয়েরা আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছিল বলেই মানুষ আজ সত্যিই আকাশপথে চলাচল করতে পারছে। কত সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই জীবনে সফল ও প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। খুব সাধারণ মানুষও কোনো না কোনো স্বপ্ন দেখেন, তাকে সফল করার জন্য জীবন বেয়ে চলেন। অনেক সময় আবার কোনো বিশেষ স্বপ্ন সার্থক করার পথে চলতে চলতে অন্য কোনো স্বপ্ন সার্থক হয়ে যায়, সেটিও কম পাওয়া নয়।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন সবাই দেখে, রোজ না হলেও দেখে। বলা হয়, গভীর ঘুমে স্বপ্ন আসে না; তা হলেও স্বপ্নিল নিদ্রাভঙ্গে কিন্তু সবসময় অপূর্ণ নিদ্রার অতৃপ্তি থাকে না, বরং অনেক সময়েই বেশ পরিপাটি, টানটান ঘুমের আমেজ থেকে যায়।
আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে মানুষের মনের তিনটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে—জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি। এঁদের মতে, জগৎ-জীবন যাপন হলো স্বপ্নাবস্থা। চেতন এবং অবচেতন ছাড়াও তাঁরা মনের একটি অতিচেতন স্তরের কথাও উল্লেখ করেছেন।
সে যাই হোক, স্বপ্ন দেখতে, বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে আমি ভালোবাসি; অবশ্য দুঃস্বপ্ন বা nightmare হলে আলাদা কথা। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে অনেক অচেনা জায়গা, চেনা মানুষের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। চেনা জায়গাও যেন স্বপ্নে একটু অন্য রকম দেখায়। নিজেকে কখনও দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। অনেক সময় অনেক অসম্ভব জায়গায় অনেক অসম্ভব ঘটনা ঘটে; যার বা যাদের সাথে দেখা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও, সেরকম কারোর সাথে স্বপ্নে দেখা হলে, কথা হলে কেমন লাগে? ঘুম ভাঙলে মন ভারাক্রান্ত হয় ঠিকই, সাক্ষাৎকারের মধুর রেশ কিন্তু থেকেই যায়।
এবার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার উদাহরণ দিই, নিজের কথাই বলি—অনেক সময় বাড়ির কিছু কিছু জিনিস, যেগুলো আগে প্রয়োজনীয় থাকলেও পরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে, প্রাণে ধরে ফেলে দেওয়া যায় না (কারণ, তারা স্মৃতিভারে জর্জরিত)। এরকমই একটি পরিত্যক্ত চেয়ার একদিন হঠাৎ কথা বলে উঠেছিল। সে যে নতুন অবস্থায় কত মূল্যবান, অপরিহার্য ছিল; বাড়ির সবাই তাকে চাইতো, সম্মানিত অতিথির আপ্যায়নে তাকেই ব্যবহার করা হতো—এতে তার কেমন অহঙ্কার হয়! সেদিনের কথা মনে করে আজকের এই পরিত্যক্ত আপদ-বালাই কেঁদে উঠেছিল; শুনেছিলাম তার নীরব কথা আর কান্না।
এই তো সেদিনের কথা, এক বিদুষী বন্ধু মৈথিলী ভাষায়, বরিষণ-ধারার অনুষঙ্গে, অপরূপ এক স্বরচিত বিরহ-গাথা লিখে পাঠিয়েছিল; আরেক বিদুষী সুরেলা বন্ধু তাতে জাগিয়েছিল সুরের স্পন্দন। ব্যস! আর যায় কোথায়! নানা প্রতিবন্ধকতা ও বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে মন, প্রাণ, পদসঞ্চালনা ও অঙ্গুলিহেলনে বাঙ্ময় নৃত্যছন্দ হয়ে উঠতে কোনো বাধাই হলো না। দৃশ্যমান জগতের গভীর-গহনে যে চিরবিরহী সত্তার আভাস, যিনি ধ্যানগম্য, তিনি মুহূর্তে প্রকাশিত হলেন নৃত্যব্যঞ্জনায়!
স্বপ্নের আত্মপ্রকাশ?
🍂

Post a Comment

0 Comments