চিত্রা ভট্টাচার্য্য
ভ্রমর কালো চোখের পাতায় জড়িয়ে সোনালী স্বপ্ন
বুকের মাঝে ঝড় তুলেছে কল্পলোকের কাব্য।
অন্ধকারে ভাঙা পথে খেয়ালি স্বপ্ন যায় ছুঁয়ে সে
অজানা দেশের রাজপথেতে নব প্রভাতের সূর্য।
স্বপ্নেরা সব ডানা মেলেছে আকাশের মহাশূন্যে
রূঢ় বাস্তবের কঠিন দেওয়াল ভাঙবে হেলায় --
প্রাসাদগড়া ভালোবাসার স্বপ্ন জয়ের মন্ত্রে।
Hমানব জীবনের এক বড়ো অবলম্বন সোনালী স্বপ্নের জালবুনে কাল যাপন করা। শিশু মনে জ্ঞানের আলো প্রকাশের পর থেকেই জীবনের পলপল বিকাশের মধ্যে স্বপ্নের জগৎ আপন অস্তিত্বের সাড়া জাগিয়ে তোলে। মাটির পৃথিবীতে নির্ভয়ে পা ফেলে এগিয়ে চলা শৈশব থেকে বাল্যে বা কৈশোর থেকে যৌবনে ,প্রৌঢ়ত্বে বা বার্ধক্যে জীবনের প্রতিক্ষণে বড়ো বড়ো দুচোখের পাতায় ভেসে বেড়ানো শতশত রঙিন স্বপ্নের হাতছানি। সে স্বপ্ন তে অনুক্ষণ জড়িয়ে থেকে ভেসে বেড়ায় কত আশার বাণী। শুধু স্বপ্ন দেখার সৌভাগ্যে কত না পাওয়ায় বেদনা ভরা অসম্পূর্ন প্রাণ ধন্য হয়ে ওঠে নব জীবনের বহমান আনন্দ স্রোতের ধারায়। রূঢ় কঠিন বাস্তবের ছেঁড়া পালে ভাসা হতাশায় আহত মুমুর্ষ জীবন কে ও শেষ মুহূর্তে বাঁচার তাগিদে অদ্ভুত প্রেরণায় জাগিয়ে তুলতে পারে একমাত্র অলীকস্বপ্ন।
সহায় সম্বলহীন জীবনের কাছে স্বপ্নই ভরসা হয় মুক্ত বিহঙ্গের মত আপন খেয়ালে বেঁচে থাকার উৎসাহ জোগানোর। স্বপ্ন শেখায় অন্তহীন আশার আলো দেখাতে। চঞ্চল বলাকার পাখার মত মানুষ এক খুশির স্বর্গে অনুক্ষণ বিচরণ করে। স্বপ্ন সফলের আনন্দে তাই সানন্দে পথের বাঁধন যত অনিমেষে ছিন্ন করে ছুটে চলে জীবনের অভীষ্ট পূরণের লক্ষ্যে।
🍂
স্বপ্ন সম্বন্ধে অনেক দর্শন, বিজ্ঞান, কাহিনি প্রচলিত আছে। স্বপ্নবিজ্ঞানের ইংরেজি নাম Oneirology। কিছু স্বপ্নবিজ্ঞানীর মতে নিদ্রার যে পর্যায়ে কেবল অক্ষিগোলক দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু বাকি শরীর শিথিল (সাময়িকভাবে প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হয়ে যায় সেই REM (Rapid eye movement, দ্রুত চক্ষু আন্দোলন) দশায় মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন মানব জীবনের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবচেতনভাবে অনুভব করে থাকে। ঘটনাগুলি কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়। অধিকাংশ সময় দ্রষ্টা নিজে সেই ঘটনায় অংশগ্রহণ করছে বলে মনে করতে থাকে। অনেক সময়ই পুরনো অভিজ্ঞতার টুকরো স্মৃতি কল্পনায় বিভিন্নভাবে জুড়ে ও পরিবর্তিত হয়ে সম্ভব অসম্ভব সব ঘটনা স্বপ্নের রূপ নেয়।
ঘুমের গভীরে অবচেতন মনে জাগে এক নতুন আশার জগৎ যেখানে অসম্ভবের রাজ্যে বাধাহীন ,গন্ডিহীন মুক্তির আনন্দে বিচরণ করে নিজেকে একটি রাতের রাজা ভাবলেও কী বা যায় আসে ? কোনো নিষিদ্ধ সীমানার বিধি বিধান ও নেই। একলা মনের যত আশা ভরসা ,যত না-বলা কথা মুছে ব্যর্থতার কালো ছায়ার অবগুন্ঠনে ঢাকা পড়ে সব অপারগতা ,নীরবতা। স্বপ্ন নির্দ্বিধায় নিশির ডাকের মত ডাক দিয়ে ডেকে নিয়ে যায় দূরদূরান্তে অবাস্তবের জগতে। জীবন রথের চাকার ওঠা নামায় প্রতিদিনের কঠোর লড়াইয়ে এই ভাঙা গড়ার খেলায় স্বপ্ন যেন রশি হাতে দিক নির্ণয় করে দেয়। নিত্য নতুন আশা পূরণের দাবিতে স্বপনের জাল বোনা ছাড়া এ জীবন কখনো সম্পূর্ণ হয় না। বাস্তবের এই কঠিন লড়াইয়ের মাটিতে অনবরত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে স্বপ্নেরা আশা জাগিয়ে সৃষ্টি করে নতুন এক ভালোবাসার জগৎ। বিস্তীর্ণ অন্ধকারের বিপদ সংকুল অরণ্য পথে চলতে এক চিলতে আলোর মত হয়ে সে আগামীর পথপ্রদর্শক।কখনো জীবনের শুকিয়ে যাওয়া মরা গাঙে জোয়ার আনে। নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখে অসহায় মানুষ আর তাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। প্রতিপলে দুর্বিপাক সহ্যকরে ও বাঁচার প্রেরণা যোগায় স্বপ্ন --বাঁচতে শেখায় ।
১৯০০ এর দশকের প্রথম দিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনোবিশ্লেষণের মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা বিকাশ করেছিলেন তাছাড়া স্বপ্নের তত্ত্ব ও তাদের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বলে ছিলেন " গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্বিগ্নতা প্রকাশের মাধ্যমকে অবলম্বন করে যা প্রায়ই দমনমূলক শৈশব স্মৃতি বা আচ্ছন্নতা সম্পর্কিত। অধিকন্তু, তিনি বিশ্বাস করতেন যে বস্তুগতভাবে তার স্বপ্নের বিষয়টি অবশ্যই যৌন উত্তেজনা মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। Interpretation of Dreams (1899) এর মধ্যে, ফ্রয়েড স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার জন্য একটি মানসিক কৌশলকে বিকশিত করেছিলেন ,--তিনি বলেন , স্বপ্ন বিভিন্ন প্রকৃতির হতে পারে । যেমন, ভয়ঙ্কর, উত্তেজনাপূর্ণ, জাদুকর, মর্মান্তিক, সাহসিক, বা যৌন উত্তেজনা সংক্রান্ত । স্বপ্নের ঘটনাগুলি সাধারণত যিনি স্বপ্ন দেখেন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে । ব্যতিক্রম কিছু স্বপ্ন আছে যেখানে স্বপ্নদর্শক আত্ম সচেতনতার পরিচয় দেয়। মাঝে মাঝে স্বপ্নের মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে সৃজনশীল চিন্তাধারার উদ্রেক হতে পারে যার ফলে সে অনুপ্রেরণাও অনুভব করতে পারে।"
জীবনের অর্থ স্বপ্ন ব্যাপক ভাবে বদলে দিতে পারে। স্বপ্ন ছাড়া জীবন প্রায় অগাধ সমুদ্রের জলরাশির বুকে দিকনির্দেশনাহীন হালভাঙা নৌকার মত, যার কোনো গন্তব্য থাকে না। কোনো বিশেষজ্ঞের মতে ''এ কথা কিন্তু ধ্রুব সত্য বলেও ধরা যায় না যে আসলে স্বপ্ন মানুষকে এগিয়ে চলার জ্বালানি যোগায়। কারো মতে এটি কেবল বেঁচে থাকার তাগিদ নয়, বরং বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক শক্তি। কারো মতে ভবিষ্যৎ গড়ার অনুপ্রেরণা। কেউ আবার বলেন , ''স্বপ্ন শুধুই মিথ্যায় বিচরণ। সে কখনো সত্যি নয়। তবে কঠিন পরিশ্রমে স্বপ্ন সত্যি হয় অনেক সময়। ''
মনের গভীরে যে স্বপ্ন কে অহোরাত্র লালন করা চলে তা অবশ্যই পজিটিভ হওয়া উচিত। নিজের যোগ্যতা এবং পারিপার্শ্বিক বিবেচনার অনুসারে তাকে মনে স্থান দেওয়া ও একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হবে স্বপ্ন কে বাস্তবায়িত করার উদ্যম। যে বিষয়টি নিয়েই স্বপ্ন দেখা হোক না কেন তা ধীরস্থির ভাবে ভেবে চিন্তে নিয়ে বাস্তবায়িত করার জন্য দৃঢ় আত্মপ্রতিজ্ঞ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টা থাকা উচিত যা অচিরে নিয়ে যাবে লক্ষ্য পূরণের পথে। তবেই স্বপ্ন সফল হতে পারে।অবশ্য একসাথে একাধিক স্বপ্ন মনের কোণে বাসা বাধলে আসল স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে মন লক্ষ্য ভ্রষ্ট হবে। তখন জীবনে কষ্টের বোঝা হবে করুণ বেদনা দায়ক তখন সে ভারীবোঝা বহন করাও হবে বিশেষ দায় এবং সে দায় বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতানুযায়ী ---
"অন্যের কথা ভেবে নিজের স্বপ্নকে সাজাবে না। কারণ একমাত্র তুমিই শুধু অনুভব করতে পারবে তোমার চাওয়া পাওয়াগুলোকে। নিজের স্বপ্নকে বুঝে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করো।"(ব্রায়ান ডাইসন।)
" স্বপ্ন পূরণই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তাই বলে স্বপ্নকে ত্যাগ করে নয়, তাকে সঙ্গে নিয়ে চলো। কারণ স্বপ্ন ছাড়া জীবন অর্থহীন” ~(ব্রায়ান ডাইসন।)
"ভুলে গেলে চলবে না, জীবন কোনো প্রতিযোগিতা নয়; কিন্তু জীবন মানে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে অবিরাম পরিভ্রমণ। আর প্রতিটা ধাপেই আমাদের বিচরণ করতে হবে। আর এ ভ্রমণ হতে হবে উপভোগ্য।"
--(ব্রায়ান ডাইসন।)
পরিশেষে বলাযায় অনেক মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। স্বপ্নতে আনন্দ খুঁজে পান। এই স্বপ্ন দেখা সুস্থ ভাবে বাঁচার একটি উপকরণ। একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখার জন্য সুন্দর একটি মনের সাথে সুস্থ সবল শরীর চাই যার প্রভাবে সমৃদ্ধময় জীবনের সফল স্বপ্ন ধরাদেয়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট স্বপ্ন গুলো কাকতালীয় ভাবে জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে মিলে যায় অর্থাৎ অধুরা স্বপ্ন সত্যি হয়ে দেখা দিলে মন তখন অজানা বিস্ময়ে আনন্দে ভরে ওঠে।
0 Comments