জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড/পর্ব ২ : বিশ্বাসঘাতক/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড
পর্ব ২ : বিশ্বাসঘাতক
কমলিকা ভট্টাচার্য

লন্ডনের গ্রীষ্ম তখন আরও গাঢ় হয়েছে।
রাত সাড়ে ন'টা পর্যন্ত আকাশে আলো থাকে। টেমসের দুই তীরে ভিড়। কেউ নদীর ধারে বসে বই পড়ছে, কেউ সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে, কেউ আবার হাতে কফির কাপ নিয়ে নীরবে সূর্যাস্ত দেখছে। শহর যেন আলোয় ভরা। অথচ সেই আলোর মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে হাঁটছিল দর্শন।
সেই রাতের পর থেকে তার জীবন যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।
একটি জীবন, যা সবাই দেখছে।
আর একটি জীবন, যা শুধু সে নিজে জানে।
গভীর রাতে একটি কালো গাড়ি এসে থামল পুরোনো ডকল্যান্ডস এলাকার কাছে। বহুদিনের পরিত্যক্ত গুদামঘর। একসময় এখান থেকেই হারগ্রিভ তার গোপন গবেষণার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত।
দর্শন ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল।
অন্ধকার ঘরের মাঝখানে একটি মাত্র আলো জ্বলছিল।
সেই আলোর নীচে বসে ছিল হারগ্রিভ।
বয়স তার শরীরকে ক্লান্ত করেছে, কিন্তু চোখের শীতল নিষ্ঠুরতা আজও একই রকম।
দর্শনকে দেখে সে মৃদু হেসে বলল,
— "আমি জানতাম, তুমি ফিরে আসবে।"
দর্শনের গলায় কোনো আবেগ নেই।
— "আমি ফিরে আসিনি। দরকারে এসেছি।"
হারগ্রিভ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
— "দরকারটাই তো মানুষকে বদলে দেয়।"
দর্শন চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর হারগ্রিভ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "আদর্শ সেন কেমন আছে?"
দর্শন এক মুহূর্তও দেরি করল না।
— "বেঁচে আছে।"
হারগ্রিভের চোখে বিজয়ের ঝলক ফুটে উঠল।
— "তাহলে তুমি তাকে খুঁজে পেয়েছ!"
— "হ্যাঁ।"
— "তার স্মৃতি?"
— "পুরোটা ফেরেনি।"
হারগ্রিভ ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকল।
— "তুমি তাকে ফিরিয়ে আনবে?"
দর্শন তার চোখের দিকে তাকাল।
— "না।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর হারগ্রিভের মুখে ধীরে ধীরে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।
🍂
— "অবশেষে তুমি বুঝেছ।"
দর্শনের কণ্ঠ বরফের মতো ঠান্ডা।
— "আদরের স্মৃতি ফিরে এলে সে আবার আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হবে।"
হারগ্রিভ হেসে উঠল।
— "ঠিক এটাই শুনতে চেয়েছিলাম।"
দর্শন আবার বলল,
— "কিন্তু আদরের বেঁচে থাকা দরকার।"
— "কেন?"
— "তার মস্তিষ্কের ভেতরে এখনও সেই প্রযুক্তির শেষ স্তরটা রয়ে গেছে। সম্পূর্ণ নিউরাল আর্কিটেকচার। কোনো সার্ভারে নেই। কোনো ডেটাবেসে নেই। সেটা না পাওয়া পর্যন্ত তাকে হারানো যাবে না।"
হারগ্রিভ উঠে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে দর্শনের চারপাশে হাঁটতে লাগল।
— "মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্মৃতি। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও তাই। স্মৃতি মুছে দিলে মানুষকে নতুন করে লেখা যায়।"
দর্শন কোনো উত্তর দিল না।
হারগ্রিভ থেমে তার কাঁধে হাত রাখল।
— "আজ থেকে তুমি আর আমি একই দলে।"
দর্শন হাত বাড়িয়ে দিল।
দু'জনের হাত মিলল।
ঘরের কোণে বসানো নিরাপত্তা ক্যামেরার লাল আলো একবার জ্বলে উঠল।
হারগ্রিভ তৃপ্তির হাসি হাসল।
সে বুঝতেই পারল না, ঠিক সেই মুহূর্তে দর্শনের সিস্টেম নিঃশব্দে তার ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেছে।

সেদিন রাতে দৃষ্টি একা বসে ছিল।
জানলার বাইরে তখনও আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। লন্ডনের গ্রীষ্মের রাত যেন শেষ হতেও চায় না।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল আদরের কলেজের পুরোনো নথি।
অনেক কষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে সে এগুলো সংগ্রহ করেছে।
অনির্বাণ সেন।
ঋদ্ধিমান।
ইরা।
নাতাশা।
এক এক করে নামগুলো স্পর্শ করল দৃষ্টি।
এতদিন সে কাউকে কিছু জানায়নি।
দর্শনের ওপর বিশ্বাস ছিল।
কিন্তু এখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে।
সে যেন ইচ্ছে করেই আদরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চাইছে না।
আদরের গবেষণার সমস্ত তথ্যও এখন তার নিয়ন্ত্রণে।
সবচেয়ে ভয়ের কথা—দর্শনের কণ্ঠস্বর বদলে গেছে।
যে নীরবতা একসময় আশ্বাস দিত, আজ সেই নীরবতাই তাকে ভয় দেখায়।
অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থেকে অবশেষে সে নম্বর ডায়াল করল।
ভারতে তখন ভোর।
অনির্বাণ ফোন ধরতেই ওপার থেকে কাঁপা গলায় ভেসে এল—
— "আমি... দৃষ্টি বলছি।"
অনির্বাণ যেন স্থির হয়ে গেলেন।
— "দৃষ্টি?... আদর কোথায়? কোনো বিপদ হয়েছে?"
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
— "আদর এখন ঠিক আছে... একটু সময় লাগবে।"
তিনি চিৎকার করে ডাকলেন,
— "ঋদ্ধিমান! ইরা! নাতাশা! সবাই এসো!"
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে দাঁড়াল।
ঋদ্ধিমান ফোনটা হাতে নিলেন।
তার কণ্ঠ আশ্চর্য রকম শান্ত।
— "দৃষ্টি... আমি ঋদ্ধিমান। কী হয়েছে? ধীরে ধীরে সব বলো।"
দৃষ্টি সব বলল।
আদরকে কীভাবে পাওয়া গেছে।
তার কোনো স্মৃতি নেই।
সুসান কীভাবে তাকে আশ্রয় দিয়েছেন।
প্রতিদিন ভায়োলিন বাজিয়ে কীভাবে সে আদরের স্মৃতি ফেরানোর চেষ্টা করছে।
আর তারপর...
দর্শনের কথা।
ঋদ্ধিমান বললেন,
— "তুমি এতদিন এত বিপদের কথা আমাদের কেন জানাওনি?"
দৃষ্টি বলল,
— "দর্শন আমাকে বারণ করেছিল। বলেছিল, আপনারা চিন্তা করবেন।"
সে বলল, দর্শন আদরকে খুঁজে পাওয়ার পর থেকে যেন বদলে গেছে।
সে গবেষণার সব দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়েছে।
অনেক তথ্য লুকিয়ে রাখছে।
আদরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও আর আগের মতো উৎসাহী নয়।
দৃষ্টি থেমে গিয়ে খুব আস্তে বলল,
— "আমি অন্ধ। অনেক কিছু দেখতে পাই না। কিন্তু মানুষের বদলে যাওয়ার শব্দ আমি শুনতে পাই। দর্শনের কণ্ঠস্বর বদলে গেছে।"
ঘরের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা।
নাতাশা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলেন।
ইরা ফিসফিস করে বললেন,
— "দর্শন এমন করতে পারে?"
অনির্বাণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
তার চোখ ভিজে উঠেছে।
তিনি শুধু বললেন,
— "না... কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।"
এতক্ষণ নীরব থাকা ঋদ্ধিমান এবার ধীরে ধীরে বললেন,
— "আমি দর্শনকে তৈরি করেছি।"
সবাই তার দিকে তাকাল।
তিনি আবার বললেন,
— "ওর প্রতিটি শেখা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পরিবর্তনের সাক্ষী আমি।"
তার কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ়।
— "দর্শন ভুল করতে পারে। কিন্তু সে কখনও ইচ্ছে করে আদরের ক্ষতি করবে না। আমি তাকে চিনি।"
দৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল।
— "কিন্তু আমি ওকে আর চিনতে পারছি না..."
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বললেন,
— "হয়তো তুমি যা ভাবছ, তা-ই সত্যি। আবার হয়তো সত্যিটা এখনও আমাদের চোখের আড়ালে।"
অনির্বাণ ধীরে বললেন,
— "আমরা লন্ডনে আসব।"
দৃষ্টি তাড়াতাড়ি বাধা দিল।
— "এখন নয়। হারগ্রিভ জানলে আদর বিপদে পড়বে। ওর স্মৃতিও এখনও ফেরেনি।"
সবাই চুপ করে গেল।
ফোন কেটে যাওয়ার পরও কেউ দীর্ঘক্ষণ কথা বলল না।
প্রত্যেকের মনেই একটাই প্রশ্ন—
দর্শন কি সত্যিই বদলে গেছে?
...
আর ঠিক সেই সময়, লন্ডনের অন্য প্রান্তে, দর্শন আবার হারগ্রিভের পাঠানো একটি গোপন বার্তা খুলল।
স্ক্রিনে মাত্র একটি বাক্য জ্বলছিল—
WELCOME TO MY SIDE.
দর্শন অনেকক্ষণ সেই বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে হাসল।
সেই হাসির অর্থ হারগ্রিভ বুঝল না।
আর পৃথিবীর আর কেউও নয়।

চলবে...

Post a Comment

2 Comments

  1. নভিসের হাতে এমন ভীষণ ভালো লেখা। এটা একটা আবিষ্কার। জটিল বুনুনি, পিচ্ছিল চরিত্র, বিদেশী হাওয়া এক আন্তর্জাতিক ইনটেলেক্টের পরিচয় লাইনে লাইনে। সংগে আছি উৎসুক পাঠক।

    ReplyDelete
  2. কমলিকাAugust 04, 2026

    🙏

    ReplyDelete