জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড/পর্ব ৪ : মুখোশের আড়ালে/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড
পর্ব ৪ : মুখোশের আড়ালে
কমলিকা ভট্টাচার্য

লন্ডনে তখন গ্রীষ্মের মাঝামাঝি।
রাত সাড়ে ন'টা পর্যন্ত সূর্যের আলো শহরের গায়ে লেগে থাকে। ভোর চারটের কিছু পরেই আবার দিনের শুরু। এত অল্প অন্ধকারের মধ্যে যেন মানুষের গোপন সত্যগুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রোজকার মত সেদিনও কলেজের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার যথারীতি ব্যস্ত। কোথাও নিউরাল ইন্টারফেস নিয়ে পরীক্ষা চলছে, কোথাও কৃত্রিম অঙ্গের নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই কয়েক সপ্তাহে গবেষণাগারের সকলের নজর কেড়েছে একটি বিষয়।
আদর্শ সেনের গবেষণা যেন হঠাৎ অসম্ভব দ্রুত এগোতে শুরু করেছে।
যে কাজ শেষ করতে অন্তত ছয় মাস লাগার কথা ছিল, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ।
অনেকেই বিস্মিত।
কেউ বলছে, "আদর্শ যেন আগের থেকেও অনেক বেশি পরিণত হয়ে গেছে।"
কেউ আবার বলছে, "এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসই বদলে দেবে।"
কিন্তু কেউ জানে না—এই গবেষণাগারে এখন কাজ করছে আদর নয়, দর্শন।
আদরের অসমাপ্ত গবেষণাপত্র, নোট, নকশা আর পরীক্ষার ফলাফল—সবকিছু নতুন করে সাজিয়ে তুলছে সে। কোথাও কোনো ত্রুটি থাকলে সংশোধন করছে, কোথাও আবার নতুন সমাধান যোগ করছে। কিন্তু প্রতিটি গবেষণাপত্রে, প্রতিটি নকশায়, প্রতিটি সাফল্যের পাশে লেখা থাকছে একটাই নাম—
আদর্শ সেন।
নিজের জন্য কোনো স্বীকৃতি সে চায় না।
তার কাছে এই গবেষণার প্রকৃত মালিক আদরই।
দুপুরের দিকে প্রফেসর হ্যারিসন নিজের অফিসে বসে কিছু নথি দেখছিলেন।
দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।
"মে আই কাম ইন?"
হ্যারিসন মুখ তুলে তাকালেন।
"এসো... আদ..."
শব্দটা শেষ করার আগেই তিনি থেমে গেলেন।
একটু হেসে বললেন,
"না, এখন আর ভুল হয় না। এসো, দর্শন।"
দর্শন ভিতরে ঢুকে দাঁড়াল।
হ্যারিসনের সামনে তাকে কখনও আদরের অভিনয় করতে হয় না। কলেজে একমাত্র তিনিই জানেন—বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গবেষণা করছে, সে আদর্শ নয়, দর্শন।
হ্যারিসন টেবিলের ওপর রাখা একটি মোটা ফাইল তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
"দেখো।"
দর্শন ফাইল খুলল।
ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা, আন্তর্জাতিক চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বৈজ্ঞানিক সম্মেলন—একটার পর একটা আমন্ত্রণপত্র।
সবগুলোর বক্তব্য এক।
তারা আদর্শ সেনের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে চায়।
হ্যারিসন ধীরে বললেন,
"সমস্যাটা দিন দিন বাড়ছে।"
দর্শন শান্ত স্বরে বলল,
"সবগুলো আমন্ত্রণ বাতিল করে দিন।"
হ্যারিসন মাথা নাড়লেন।
"এভাবে আর কতদিন?"
দর্শন চুপ করে রইল।
হ্যারিসন আবার বললেন,
"তুমি জানো, গবেষণার এই স্তরে পৌঁছালে মানুষ শুধু গবেষণাপত্র পড়ে সন্তুষ্ট থাকে না। তারা গবেষকের সঙ্গে কথা বলতে চায়। প্রশ্ন করতে চায়। আলোচনা করতে চায়।"
তিনি একটু থেমে দর্শনের চোখের দিকে তাকালেন।
"কাউকে না কাউকে তো সামনে আনতেই হবে।"
দর্শন কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে ধীরে বলল,
"আর্দশকেও তো সামনে আনা যাবে না,আর তা ছাড়া, এই সব আবিষ্কার আদরের। আমি শুধু তার মস্তিষ্কের জ্ঞান ব্যবহার করছি, তার চিন্তা অনুযায়ী কাজ করছি। সম্মানটা তারই প্রাপ্য।

হ্যারিসন ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
দর্শন এবার গম্ভীর গলায় বলল,
"তার বিপদের কথা কি আপনি ভুলে গেছেন? হারগ্রিভ এখনও বেঁচে আছে। আদর প্রকাশ্যে এলে সে আবার ওকে খুঁজে নেবে।"
হ্যারিসন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"ভুলিনি। এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি।"
ঘরের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল।
জানলার বাইরে ছাত্রছাত্রীরা হাসতে হাসতে হেঁটে যাচ্ছে। অথচ এই ঘরের ভেতরে ভবিষ্যতের ভার যেন আরও ভারী হয়ে উঠছে।
হ্যারিসন আবার বললেন,
"কিন্তু এভাবে চিরকাল চলবে না, দর্শন।"
"জানি।"
"আদরকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে তার নিরাপত্তার জন্য। তোমাকেও সবাই আদর ভেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুখোশ একদিন না একদিন খুলবেই।"
দর্শন ধীরে বলল,
"আর ক'টা দিন... শুধু আর ক'টা দিন আমার সময় চাই।"
হ্যারিসন স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
"কেন?"
প্রশ্নটা শুনে দর্শন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
সে উত্তর জানে।
🍂
কিন্তু বলতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,
"সবকিছু এখনও শেষ হয়নি।"
হ্যারিসন তার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
এই কয়েক সপ্তাহে দর্শনের মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।
সে যেন আরও নীরব,
"জানো, আজকাল তোমাকে দেখলে আমার মাঝে মাঝে আদর্শের কথা মনে পড়ে না।"
দর্শন অবাক হয়ে তাকাল।
"মনে হয়, তুমি নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করে ফেলেছ।"
দর্শন আস্তে বলল,
"আমার কোনো পরিচয় নেই, প্রফেসর।"
"আছে।"
হ্যারিসন দৃঢ় স্বরে বললেন,
"হয়তো এখনও পৃথিবী সেটা জানে না। কিন্তু আমি জানি।"
দর্শন কিছু বলল না।
জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে।
হ্যারিসন আবার বললেন,
"একটা কথা মনে রেখো। যত দেরি করবে, তত বেশি প্রশ্ন উঠবে। আর প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন দিতেই হবে।"
দর্শন ধীরে মাথা নাড়ল।
"সময় হলে দেব।"
হ্যারিসন তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি বুঝতে পারলেন—
দর্শন কিছু লুকোচ্ছে।
কিন্তু কী?
সেটা এখনও তাঁর অজানা।
জানালার বাইরে তখন গরমের রোদ একটু একটু করে নরম হয়ে আসছে।

প্রফেসর হ্যারিসনের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দর্শন কিছুক্ষণ করিডরে দাঁড়িয়ে রইল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ করিডরে ছাত্রছাত্রীদের পদচারণা, গবেষকদের ব্যস্ততা, দূরে কোথাও হাসির শব্দ—সবকিছু যেন স্বাভাবিক। অথচ তার ভিতরে তখন এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে।

সে জানে, আর খুব বেশি দিন এই অভিনয় চালিয়ে যাওয়া যাবে না।

কিন্তু এখনও সময় আসেনি।

এখনই যদি আদরকে পৃথিবীর সামনে আনা হয়, তবে হারগ্রিভের নজর আবার তার ওপর পড়বে। এতদিনের সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙে পড়বে।

দর্শন ধীরে ধীরে গবেষণাগারের দিকে হাঁটতে লাগল।

ল্যাবে ঢুকতেই তার সামনে ভেসে উঠল আদরের অসমাপ্ত প্রকল্পের ত্রিমাত্রিক নকশা।

কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে মানুষের জীবন্ত কোষের সংযোগ আরও স্থিতিশীল করার নতুন পদ্ধতি।

আদর এই জায়গাতেই থেমে গিয়েছিল।

দর্শন অনেকক্ষণ নীরবে নকশাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর একে একে নতুন কিছু সমীকরণ যোগ করল। সিগন্যাল ট্রান্সমিশনের ক্ষয় কমানোর একটি নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করল। নিউরাল প্রতিক্রিয়ার সময়ও আগের তুলনায় অনেক কমে এল।

কম্পিউটার কয়েক সেকেন্ড বিশ্লেষণ করে দেখাল—

SIMULATION SUCCESSFUL.

দর্শন চোখ বন্ধ করল।

মৃদু স্বরে বলল,

"এটা আমার কাজ নয়, আদর... এটা তোমারই অসমাপ্ত স্বপ্ন। আমি শুধু পথটা একটু এগিয়ে দিলাম।"

তারপর গবেষণাপত্রের নিচে নিজের নাম না লিখে আবার লিখল—

Principal Researcher : Adarsh Sen

ঠিক সেই সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

একজন তরুণ গবেষক ভিতরে ঢুকল।

"ডক্টর সেন, ইউরোপিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে আবার ই-মেল এসেছে। তারা আগামী মাসে আপনার লাইভ প্রেজেন্টেশন চায়।"

দর্শন শান্তভাবে বলল,

"প্রফেসর হ্যারিসনের কাছে পাঠিয়ে দিন।"

"কিন্তু স্যার, তারা বলেছে এবার আর অনলাইন বক্তব্য নয়। তারা আপনার সঙ্গে সামনাসামনি আলোচনা করতে চায়।"

দর্শন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শুধু বলল,

"আমি আপাতত কোনো জনসমক্ষে আসছি না।"

গবেষকটি বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাল।

এত বড় সাফল্যের পরও এমন অনীহা—সে যেন বুঝতেই পারল না।

সন্ধ্যা নামতে নামতে আকাশে কালো মেঘ জমল।

লন্ডনের গরমের দিনেও হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে।

টেমসের ওপর ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে বৃত্ত তৈরি করছে।

দর্শন আবার সেই নির্জন গুদামঘরের দিকে এগোল।

হারগ্রিভ আজ অস্বাভাবিক রকম উৎফুল্ল।

"এসো, দর্শন।"

টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরোনো গবেষণার নথি।

"আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।"

দর্শন নির্বিকার।

"কী?"

হারগ্রিভ বিরক্ত মুখে বলল,

"আজ সকালে আমি আমার নিজের ল্যাবের নিরাপত্তা কোডটাই ভুলে গিয়েছিলাম।"

সে হেসে বিষয়টাকে হালকা করার চেষ্টা করল।

"বয়স হচ্ছে বোধহয়।"

দর্শন শান্ত গলায় বলল,

"হতে পারে।"

হারগ্রিভ আবার বলল,

"তারপর দুপুরে একজন গবেষকের নামই মনে করতে পারছিলাম না।"

সে কপালে হাত বুলিয়ে বলল,

"আজকাল এসব কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।"

দর্শন কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখে কোনো বিজয়ের ছাপ নেই।

বরং এক ধরনের বিষণ্ণতা।

সে জানে, প্রতিটি স্মৃতি মুছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারগ্রিভ একটু একটু করে তার নিজের তৈরি অন্ধকারেই হারিয়ে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধে অস্ত্র নেই।

রক্ত নেই।

শুধু স্মৃতির নিঃশব্দ ক্ষয়।

হারগ্রিভ হঠাৎ বলল,

"আদরের খবর কী?"

"একই আছে।"

"স্মৃতি?"

"ফেরেনি।"

হারগ্রিভ তৃপ্তির হাসি হাসল।

"ভালো। যতদিন না আমি ওর মাথার শেষ তথ্যটা পাচ্ছি, ততদিন ও এমনই থাকুক।"

দর্শন ধীরে মাথা নাড়ল।

তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হারগ্রিভের সিস্টেমে আরেকটি ডেটা আপডেট করে দিল।

হারগ্রিভ কিছুই টের পেল না।

সেই সময় বাড়িতে দৃষ্টি আদরের পাশে বসে ছিল।

আজ সে ভায়োলিন বাজাচ্ছিল না।

শুধু গল্প করছিল।

হঠাৎ সে বলল,

"তোমার কি কখনও মনে হয়, তুমি কাউকে খুব ভালোবাসতে?"

আদর অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"মনে হয়..."

"কাকে?"

"মুখটা দেখতে পাই না।"

"শুধু অনুভূতি?"

আদর ধীরে মাথা নাড়ল।

"হ্যাঁ। মনে হয়, কেউ আমার জন্য অনেক অপেক্ষা করছে।"

দৃষ্টির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

সে নিজের চোখের জল লুকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

"হয়তো সত্যিই কেউ অপেক্ষা করছে।"

ঠিক তখনই আদরের মাথায় তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে দুটি মুখ ভেসে উঠল।

অনির্বাণ।

ঋদ্ধিমান।

তারপর আবার সব অন্ধকার।

সে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল।

দৃষ্টি ভয় পেয়ে সুসানকে ডাকল।

সুসান ছুটে এলেন।

আদর শুধু ফিসফিস করে বলল,

"আমি... আমি এদের চিনি..."

"কার কথা বলছ?"

"মনে... করতে... পারছি না..."

দৃষ্টি বুঝল—

স্মৃতি থেমে নেই।

ভেতরে ভেতরে সে ফিরে আসছে।

কিন্তু কেন যেন বারবার অদৃশ্য একটা দেয়ালে গিয়ে আটকে যাচ্ছে।

আর সেই অদৃশ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দর্শন।

কমপক্ষে দৃষ্টির তাই মনে হচ্ছে।

বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।

পশ্চিম আকাশে অস্ত যাওয়া সূর্যের আলো আবার মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

অদ্ভুত এই শহর।

একই দিনে রোদ, বৃষ্টি, আলো, অন্ধকার—সব একসঙ্গে মিশে থাকে।

ঠিক মানুষের মনের মতো।

আর সেই মনগুলোর ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এমন এক ভুল বোঝাবুঝি, যার সত্যিটা এখনও কেউ জানে না।

শুধু দর্শন জানে।

আর সেই সত্যের মূল্য তাকে একদিন নিজের অস্তিত্ব দিয়েই শোধ করতে হবে।

চলবে...

Post a Comment

0 Comments