জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯৫ পণ্ডিতের মুর্খামী /আর্জেন্টিনা (দক্ষিণ আফ্রিকা)/চিন্ময় দাশ

 

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯৫

 পণ্ডিতের মুর্খামী

 আর্জেন্টিনা (দক্ষিণ আফ্রিকা)

চিন্ময় দাশ


[পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইঁদুরের বসবাস আছে আর্জেন্টিনায়। সেখানে তাদের নাম-- ক্যাপিবারা। একজাতের শেয়াল আছে সে দেশে। নাম—পাম্পাস ফক্স। এক পাম্পাস আর এক ক্যাপিবারা—দুই বন্ধুর এক ঘটনা নিয়ে এই গল্পটি। এখানে আমরা ‘শেয়াল’ এবং ‘ইঁদুর’ নামই ব্যবহার করলাম।] 

বহু ব-হু-কা-ল আগের কথা। এক শেয়াল আর ইঁদুর দুজনের মধ্যে ভারি ভাবসাব। দিনের অনেকটা সময় একসাথে থাকে দুজনে। হাজার রকম গল্পগুজব। নানান আলোচনা। হাসি-ঠাট্টার বিরাম নাই। বেশ সময় কেটে যায় দুটির। 

একদিন কুইন ভাবল, এভাবে গল্পগুজব করে কি সারা জীবন চলবে? কিছু কাজকর্মও করা দরকার। অনেক ভেবে ঠিক করল, কিছু চাষবাস করলে মন্দ হয় না। কিছু ঝামেলা আছে বটে, খাটাখাটুনি করতে হবে। তবে, তার ফলও তো পাওয়া যাবে। ফসল উঠবে যখন, তখন কতো মজা। পায়ের উপর পা তুলে, বসে বসে খাওয়া যাবে।

মন যখন বলছে, দেরি করে কাজ কী? কাজে লেগে পড়লেই হয়। বনের ঠিক বাইরে অনেকটা ফাঁকা জমি। ছোট একটা নদীও বয়ে গেছে পাশ দিয়ে। জলের অভাব হবে না এখানে।

ঘুরে ঘুরে জায়গাটা পরখ করে নিল ভালো করে। এবার মনে পড়ল খরগোশগুলোর কথা। ফসল ফলাব আমি। আর হতভাগাগুলো এসে সব সাবাড় করে যাবে। আঁটোসাটো করে একটা বেড়া দেওয়া দরকার। 

আসলে সময়টা তখন দুই বন্ধুর আড্ডা দেওয়ার সময়। শেয়াল এসে হাজির। কিন্তু ব্যাপার দেখে তার তো চোখ উঠে গেল কপালে। এসব কি করছে তার বন্ধু? মাথায় ঢুকছে না কিছু। কি সুন্দর নরম রোদ্দুর। নদীর পাড়ে বসে গল্প করবার সেরা সময়। আর এ হতভাগা কিনা কাজ করতে লেগে গেছে!

--কী হোল, ভায়া? সক্কাল সক্কাল বেড়া বাঁধতে লেগেছ কেন?

ইঁদুর বলল—চাষবাস করব ঠিক করেছি, বুঝলে? পেটও ভরবে। বাড়তি ফসল হাটে বেচে দিলে, দুটো পয়সাও আসবে হাতে। 

শেয়াল একটু অবাক হয়ে গেল। ব্যাপারটা ঠিকঠাক মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ টাকা করতে চাইছে কেন তার বন্ধু? নিশ্চয় বড়লোক হবার ধান্দা। টেক্কা দিতে চায় আমাকে। তার মানে, বনের মধ্যে কেউকেটা হয়ে উঠতে চাইছে। সবাই তখন বেশ মান্যগণ্য করবে ওকে।

শেয়াল অতি ধুরন্ধর জীব। হোলই বা বন্ধু। ইঁদুরের উন্নতি সে সইবে না কোন মতেই। সাথে সাথেই ফন্দী এঁটে নিল মনে মনে। এই চাষবাস থেকে নিজের টাকা করে নিতে হবে। খাটাখাটুনি করবে ইঁদুর। ফায়দা তুলব আমি। দেখতে দেখতে আমিই বড়লোক হয়ে যাব ইঁদুরের চেয়ে। 

🍂

সোজা  ইঁদুরের কাছটিতে গিয়ে হাজির। সে বেচারা তখন ঘেমে নেয়ে অস্থির। শেয়াল বলল—এই জমি কিনতে, আর বেড়া দিতে তোমার নিশ্চয় অনেক খরচ হয়েছে?

--সে তো হয়েছেই। ঘাম মুছতে মুছতে জবাব দিল ইঁদুর। 

--এক কাজ করি, এসো। চাষবাসটা দুজনে মিলে করি। এবার তো বীজ জোগাড় করতে হবে। তবে, ভালো জাতের বীজ না হলে, ফসল কিন্তু ভালো পাওয়া যাবে না।

ইঁদুর বলল—সে তো ঠিক। ভালো বীজ মানেই হোল বেশি ফসল, বেশি লাভ। 

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শেয়াল বলল—সেটাই তো বলছি। জমি কিনতে অনেক খরচাপাতি হয়েছে তোমার। তার পর, ভালো জাতের বীজ কেনা কী সম্ভব হবে তোমার পক্ষে? আর ভালো বীজ না হলে, পুরোটাই তো জলে যাবে। 

--তুমি কী বলছ, খোলসা করে বলো, শুনি।

শেয়াল তো এই মওকা খুঁজছিল। বলল-- কিছু টাকা আমারও আছে। জমি তুমি কিনেছ। তাই বীজের দামটা আমিই দেব। সেরা বীজই আনতে হবে। তবে, একটা শর্ত আছে আমার।

--বলো, তোমার কী শর্ত?

শেয়াল বলল—দ্যাখো, ভাই। বীজ যেহেতু আমি আনাব, আমিই ঠিক করব ফসলের কোন দিকটা আমি নেব। খুব অন্যায্য বললাম কি?

শেয়ালের অনেক বুদ্ধি, ইঁদুর সেটা ভালই জানে। এটাও জানে, ভারি ধুরন্ধরও। তাই বলে, ইঁদুরও খুব একটা বোকা নয়। কিছু একটা ফন্দী যে শেয়াল এঁটেছে, এটা অনুমান হচ্ছে তার। 

ইঁদুর এটাও ভাবল, ভালো জাতের বীজ জোগাড় করতে হলে, শেয়ালকে সাথে নিতেই হবে তার। সে রাজি হয়ে গেল—অবশ্যই তাই হবে। তাছাড়া, তোমার মত বন্ধুর সাথে মিলেজুলে চাষ করলে, আমারও তো লাভ। সবটা কী আমার একার হাতে হোত ভালো করে?

শেয়াল মনে মনে ভারি পুলকিত। প্যাঁচে পড়ে গেছে বোকাটা—এই ভেবে, বলল—তাহলে এবারের চাষে মাটির তলায় যা থাকবে, সেটা তোমার। আর উপরের যা কিছু, সেসব আমি নেব। রাজি? 

শেয়াল যে ভয়াণক কিছু ফন্দি এঁটেছে, অনুমান করতে অসুবিধা হোল না। ইঁদুর মনে মনে বলল—দাঁড়া, হতচ্ছাড়া। বন্ধুর সাথে চালাকি করতে নেমেছিস। মজা দেখাচ্ছি। কত ধানে কত চাল, বুঝিয়ে ছাড়ব। মুখ আলো করে বলল—কেন রাজী হব না? তুমি কি আমার পর? 

শেয়াল ভারি খুশি-- আর একটা কথা বলি, বন্ধু। বয়স হয়েছে। ছোটাদৌড়া করতে হাঁফিয়ে উঠি আজকাল। হাটেবাটে যাওয়াট ধকল হয়ে যাবে আমার পক্ষে। বীজটা তুমিই আনবে। ভালো জিনিষ নিও। পয়সার কথা ভাবতে হবে না। যা লাগবে, আমি দিচ্ছি।

হাতে স্বর্গ পেয়ে গেল ইঁদুর। মুখে বলল—ওঃ ঠিক আছে। বন্ধুর জন্য এটুকু করতে, গতর ক্ষয়ে যাবে না আমার। বীজ আনার ভার তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও। দেখে নিও, হাটের সেরা বীজই জোগাড় করে আনব আমি।

পর দিন সকাল হয়েছে । ফুরফুরে মন মেজাজ। বাজারে গিয়ে বেছে বেছে সেরা জাতের আলুবীজ কিনে আনল ইঁদুর।

চাষ শুরু হয়েছে। গাছ বাড়ছে তরতরিয়ে। আনন্দ ধরে না শেয়ালের। কিছুদিন বাদে ফুল এসেছে গাছে। ফলও হোল কিছু। শেয়ালের যেন পা পড়ে না মাটিতে। ফলে পাক ধরছে। হলুদ হয়ে গেল সব পাতা। আর দেরি সইছে না শেয়ালের। সব গাছে কেটে নিয়ে চলে গেল সে। 

আসল ফসল তো ছিল মাটির নীচে। সমস্ত আলু পেয়ে গেল ইঁদুর।

শেয়াল যে ঠকে গিয়েছে এবার বুঝতে পারল। রাগ করে বলল—তুমি সব পেয়ে গেলে। আর, একবোঝা গাছই জুটল আমার কপালে। এবার কিন্তু ওটি হবে না। এবার মাটির তলার যা কিছু, পুরো অংশ আমি নেব। উপরের অংশ তোমার।   

ইঁদুর বলল—তোমার পয়সায় বীজ আসবে। তোমার শর্ত তো মানতেই হবে, বন্ধু। তাই হবে।

ইঁদুর জানে, কী করতে হবে। মাটি চষল ভালো করে। সেচ দিল নদী থেকে জল তুলে। বীজ বোনা হয়েছে। সবুজ গাছে সারা মাঠ ভরে উঠেছে। মনে হয়, কেউ যেন মখমল বিছিয়ে রেখেছে মাঠ জুড়ে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। 

গাছে হলুদ রঙ ধরল। শেয়ালের আর ধৈর্য ধরল না। কুইনকে বলল—এবার তোমার গাছ তুমি কেটে নাও। আমি ফসল তুলব।

এবারে মাঠে গম বুনেছিল কুইন। মনের ফূর্তিতে ফসল তুলে নিয়ে চলে গেল সে। আবারও বেমালুক ঠকে গেল শেয়াল। 

রেগে কাঁই হয়ে গেল বেচারা। চেঁচিয়ে বলল—দু’বারই ঠকে গেলাম আমি। কিছুই জুটল না আমার কপালে। একবোঝা গাছপালা আর শেকড়-বাকড়। এদিকে পয়সা-কড়ি যা ছিল, সব শেষ হবার মুখে। আর, তুমি আরামসে রুটি বানিয়ে খাচ্ছো। সাথে মিষ্টি মিষ্টি আলুর দম। আর আমি হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছি। 

ইঁদুর নিরিহ মুখে জবাব দিল—আমার কী দোষ, তুমিই বল। শর্ত যা দিয়েছ, আমি মেনে নিয়েছি। রা-টিও কাড়িনি। কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব বুঝে নিয়েছ তুমি। আমাকে কিছু বলতে পারবে না। 

শেয়াল বলল—ওসব বলাবলির কথা ছাড়। আমি কিছু বলতেও যাচ্ছি না। তবে, এবার একটা কথা বলব।

--বলো, কী বলবে? আমি সবেতেই রাজি আছি। 

শেয়াল বলল—এবার চাষে যা ফলবে, তার উপরের অংশ আমার, নীচের অংশও আমার।

ইঁদুর বলল—এ কথার অর্থ? জমি আমার, সেচের জল আমার। খাটাখাটনিও করব আমি। আর, আমি কিছুই পাব না? এ কেমন বিচার?

--পাবে না কেন। মাঝের সব অংশ তুমি পাবে। 

ইঁদুর সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল। ফন্দি এঁটে নিল মনে মনে। কী করতে হবে, ঠিক করে নিয়েছে সাথেসাথেই। কিন্তু মুখে বিরস ভাব দেখিয়ে বলল—কী আর করা যাবে? আমার তো আর টাকা-পয়সা নাই। তুমি যা বলবে, মেনে নিতেই হবে। 

--ঠিক আছে, বন্ধু। চাষের কাজে নেমে পড়। ক’দিন আমি একটু বেয়াই বাড়ি বেড়িয়ে আসি। ফসলে পাক ধরলে, ডাকবে আমাকে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা বলে রাখি। আমি আসবার আগে, একটা গাছও কিন্তু তুমি তুলবে না।

এবারেও নিরিহ ভাবে মাথা নেড়ে দিল ইঁদুর—তুমি যা বলবে, তাইই হবে। চিন্তা কোর না। 

শেয়াল গেল তার বেয়াই বাড়ি। কুইন গেল মাঠে ফসল বুনতে। শেয়াল শর্ত দিয়ে গিয়েছে, মাটির ওপরে যা ফলবে, তার ওপরের অংশ নেবে, আবার মাটির নীচেরও নেবে। শয়তানটাকে কীভাবে বোকা বানাতে হয়, ভালই জানা আছে তার।

হাটে গিয়ে এক চক্কর ঘুরে নিল সে। সমস্ত দোকান জরীপ করা হয়ে গেল। মনে মনে ভেবে রাখা জিনিষটা চোখে পড়ছে না। যখন একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা, তখন এক বুড়ির দিকে চোখ গেল। এক ঝুড়ি ভূট্টা নিয়ে বসেছে বুড়ি মানুষটা। হাটের একেবারে এক টেরে বসে আছে। তাই এতক্ষণ চোখে পড়েনি তার। 

ভুট্টাবীজ় দেখে, চোখ নেচে উঠল ইঁদুরের। এটাই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ। পুরো ঝুড়িটাই কিনে, বাড়ির পথ ধরল।

পণ্ডিতকে বোকা বানাতেই হবে আবারও। ভারি যত্ন করে চাষ করছে এবার। মকমকিয়ে বাড়ছে প্রতিটা গাছ। ফল ধরতে শুরু হোল দেখতে দেখতে। ঝোঁকা ঝোঁকা ফুলও এসেছে গাছে গাছে।

 ফল পুরুষ্টু হতে শুরু করেছে এবার। ইঁদুর হুঁশিয়ার হয়ে গেল। ভুট্টাগাছের পাতা লম্বা লম্বা। প্রত্যকটা ফলকে পাতায় জড়িয়ে জড়িয়ে মুড়ে দিল গাছের সাথে। কারও চোখ না পড়ে যেন। 

গাছের পাতায় বাদামী রঙ ধরতে শুরু করেছে। খবর পেয়ে, শেয়াল ফিরে এসেছে। ফসল তোলা হবে। ইঁদুর বলল—গতর খাটাতে হবে না তোমাকে। আমি ফসল তুলে দিচ্ছি। 

শেয়ালের চোখ গাছের দিকে। প্রত্যেকটা গাছের মাথায় গোছা গোছা কিছু একটা ফলে আছে। চোখ চকচক করে উঠল শেয়ালের। মনে ভাবল--ভাগ্যিস মাথা খাটিয়ে ওপর নীচ দুটো অংশই নেব বলে রেখেছিলাম। ওপরে যখন এতো, নীচেও কিছু আছে নিশ্চয়।

ফসল তুলছে ইঁদুর। প্রতিটা গাছ উপড়ে তুলছে। নীচের অংশ আর ডগা কেটে, যত্ন করে গুছিয়ে রাখছে এক দিকে। সেগুলো শেয়ালের ভাগ। 

আসল ফসল তো আছে গাছের মাঝের অংশেই। পাতায় জড়ানো পাকা ভুট্টা সব। পুরুষ্টু দানায় ঠাসা। শেয়াল জানতেও পারল না। মাঝের অংশগুলো আর এক দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল কুইন।

ফসল তোলা শেষ হোল। ভাগাভাগিও। পাতার মোড়ক খুলে ভুট্টা বের করতে লাগল কুইন। দেখতে না দেখতে ঝুড়ি ভরে উঠছে তার। 

শেয়াল দেখল, এবারেও লাভের লাভ কিছুই হয়নি তার। শুধু গোছা গোছা শেকড়, আর কয়েক ঝুড়ি শুকনো ফুল। কোনটাই মুখে তুলবার জিনিষ নয়। 

বার বার তিন বার। বেমালুক ঠকে গেছে শেয়াল পণ্ডিত। কিন্তু কিছু করবার নাই তার। নিজেই শর্ত দিয়ে রেখেছিল সে। ধূর্তামিটা করেছে ইঁদুর। 

বেদম রাগে শেয়ালের মাথা গরম। মাটিতে পা আঁচড়াতে লাগল। চিৎকার করে বলল—এই শেষ। চাষবাস তো করবই না। তোর সাথে আর ভাবসাবও রইল না আমার। আজই আমাদের বন্ধুতবের শেষ দিন।

ইঁদুর কোন জবাব দিল না। মনে ভাবল, ভালোই হোল। আপদ বিদায়। কিছু পয়সা তো জমেছে হাতে। নিজের জমির বীজ এখন নিজেই কিনতে পারব আমি। ভাগিদারীর চাষ আর করতে হবে না আমাকে। 

আনন্দেই দিন কেটে যায় ইঁদুরের !

Post a Comment

0 Comments