(দ্বিতীয় পর্ব)
সৌমেন রায়
চিত্র – কল্লোল মজুমদার
(প্রথম পর্বের শেষ অংশ -একদিন ভোরবেলা স্বপ্ন দেখল সে পাখি হয়ে চারিদিকে উড়ে বেড়াচ্ছে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়! ঘুম ভেঙে যেতেই তিতলির মনে হলো তার হাত দুটো কেমন যেন সুড়সুড় করছে। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে দুটো হাতেই রোম গুলো জড়িয়ে গেছে।দেখতে অনেকটা ছোট ছোট পালকের মতো লাগছে।)
‘আমি কি সত্যিই পাখি হয়ে যাবো? আমার হাত দুটো ডানা হয়ে যাবে ?কি মজা ,কি মজা !আমি উড়বো আর উড়বো।’
‘উড়ে যাব মামা বাড়ি
উড়ে যাব স্কুল,
উড়ে যাবো আকাশেতে
হবে নাকো পথ ভুল।‘
‘কিন্তু -- কিন্তু মা আমাকে ভালোবাসবে তো? বন্ধুরা যদি চিনতে না পারে? তাহলে কি হবে?’
তিতলির মনে দোলাচল। বাইরের কেউ যাতে বুঝতে না পারে তিতলি বাড়িতে সারাদিন ফুলহাতা ফ্রক পরে থাকে। কদিন ধরে বৃষ্টির জন্য একটু ঠাণ্ডা ভাব। তাই সন্দেহ হয়নি কারো। মাঝে মাঝে হাতদুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে পালকগুলো বড় হচ্ছে কিনা।
সেদিন সন্ধ্যা থেকে ঝরঝর করে অবিরাম ধারায় বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে, সঙ্গে প্রবল বজ্রপাত।এতো বজ্রপাত তিতলি আগে দেখেনি। রাতে ভালো ঘুম হলনা তার। ভোরের দিকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই প্রথম মনে পড়ল টুনটুনি কয়েকদিন আসেনি। কিছু হয়নিতো বাচ্চাগুলোর? বাইরে তাকিয়ে দেখল দুটো ঘুঘু পাখি সেগুনের বড় পাতার নিচের একটা ডালে বসে আছে গা ঘেষাঘেষি করে। কিন্তু টুনটুনির পাত্তা নেই। আজ সকাল থেকে নাকটা আবার যেন সুড়সুড় করছে তিতলির। মুখ ধুতে গিয়ে বেসিনের আয়নার মুখটা দেখে অবাক হয়ে যায় সে। নাক আর ঠোট লালচে হয়ে গেছে! একটু যেন লম্বাও হয়ে গেছে! এবার খুব ভয় পেয়ে গেল সে।
‘ঠোঁট, নাক লম্বা হলে কেমন লাগবে! আমাকেও কি পোকা ধরে খেতে হবে নাকি?’
‘টুনটুনির মতো মা – বাবাকে ছেড়ে আমি কিছুতেই থাকতে পারব না।‘
‘মা,মা আমরা যে ‘সোয়ান লেক’ সিনেমাটা দেখেছিলাম। সেই ঘটনাটা কি সত্যি?’ এক ছুটে রান্না ঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো।
‘কোন সিনেমাটা বলতো?’
‘ওই তো গত বছর চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখলাম। রাজকন্যাকে একটা দুষ্টু লোক রাজহাঁস করে দিয়েছে।‘
‘ তাই কখনও সত্যি হয়? ওগুলো রূপকথার গল্প। রূপকথায়, পুরাণে এরকম নানা রকম কল্পনা থাকে।‘
‘আচ্ছা মা, আমি যদি পাখি হয়ে যাই তোমরা আমায় ভালবাসবে?’
হো হো করে হেসে মা বলল,‘ এই বকবক করিস না তো! অনেক কাজ বাকি।যা পড়তে বোস।‘
তিতলি চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ মায়ের চোখ পড়ল তার নাকের দিকে।
‘এই দাঁড়া দাঁড়া। নাকটা ,ঠোঁটটা ফুলে গেছে কেন?’
‘ও কিছু না।‘ বলে পালাচ্ছিল তিতলি। মা ছাড়লো না। বলল বিকেলে নিয়ে যাবে ডাক্তার কাকুর কাছে। পড়ার ঘরে গিয়ে তিতলি রূপকথার গল্পের বই খুলে খুঁজতে লাগলো মানুষের পাখি হওয়ার কোন গল্প আছে কিনা !
বাগানের একদিকে মানকচু গাছগুলো বড় হয়ে ঝোপের মত হয়েছে। পড়তে পড়তে সেদিকে চোখ যেতেই তিতলি দেখল সেই ঝোপের মধ্যে থেকে উঁকি দিল একটা অদ্ভুত জন্তু। মুখটা হাঁসের মতো, পিছনে সজারুর মত কাঁটা। হাসজারু ! পাশ থেকে উকি দিল আর একটা। হাতির মত মাথা,তিমির মত লেজ। হাতিমির ! এইরকম জন্তুর কথা সে সুকুমার রায়ের ছড়ায় পড়েছে। এরা কি সত্যি আছে নাকি? দুটোই ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসছে ।
তারপর দুজনেই বিচ্ছিরি গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
‘কোথাকার তুই কেরে, নাম নেই ধাম নেই! হি --,হি ---,হি – হি ---!’ তারপর ডানদিক - বামদিক ঘাড় দোলাতে লাগলো।
হঠাৎ দেখতে পেল টুনটুনি একটু দূরেই বসে আছে।
তিতলি চেঁচিয়ে উঠল, ‘ বন্ধু ওরা কে গো ? ওরা কি এখানে থাকে?’
টুনটুনিতে এদিক ওদিক তাকালো। কিন্তু কোন উত্তর দিল না।
তিতলি জানালার কাছে এসে আবার বলল, ‘ কথা বলছো না কেনো বন্ধু? তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?’
এতক্ষণে টুনটুনি ওকে দেখতে পেল। উড়ে এসে ওর কাছে বসলো। কিন্তু পরক্ষণেই ফুস করে উড়ে গেল। ওর মুখ দেখে মনে হল যেন খুব ভয় পেয়ে গেছে।
তিতলি ভাবলো ‘ বন্ধু কি আমায় চিনতে পারল না? নাকি আমার ঠোট নাক দেখে ভয়ে পালিয়ে গেল?হাসজারু আর হাতিমির কি তাহলে ঠিকই বলছে? সত্যি তো! আমার যদি ডানা বের হয় তাহলে আমি কি হবো? না মানুষ না পাখি! কি হবে তখন? সবাই কি আমাকে দেখে টুনটুনির মতো ভয়ে পালাবে?’
ঘেমে উঠলো তিতলি। সর্বনাশ ! যদি সত্যি এরকম হয়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসে সে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রূপকথার গল্প পড়তে পড়তে।
‘ ও স্বপ্ন দেখছিলাম তাহলে।বাঁচা গেল বাবা !’
ব্যাপারটা স্বপ্ন হলেও ভয়টা কিন্তু গেল না।বিকেলে বাবা নিয়ে গেল ডাক্তার কাকুর কাছে। ডাক্তার কাকু দেখে বললেন,‘ফাঙ্গাস ইনফেকশন হতে পারে। এই সময় রোগের উপদ্রব বাড়ে। সাবধানে থাকবি রে বুড়ি। এরপর একটু হাত পায়ের চুলকানি শুরু হবে। বেশি চুলকোস না, তাহলে ছড়িয়ে পড়বে।‘
কয়েকটা ওষুধ দিয়ে বললেন , ‘না কমলে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।‘
কিন্তু তিতলি তো জানে আসলে কি হয়েছে।
তিতলির দুটো দিন কাটল খুব অস্থিরতায়। সে এখনো প্রকৃতিকে ভালোবাসে কিন্তু সে আর পাখি হতে চায় না। তৃতীয় দিন সকালে ঘুম ভেঙে অজান্তেই হাতটা চলে গেল নাকে। না, নাকটা তো ফুলা বা ব্যথা কিছু নেই। হাত দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো। একটু যেন স্বাভাবিক লাগছে।তবে কি ব্যাপারটা তার মনের ভুল ছিল ? তাই বা কি করে হয়।ডাক্তার কাকু তো দেখল।এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ জানালার বাইরে টুনটুনির ডাক শুনতে পেল। সে তবে এসেছে এতদিন পর। উকি দিয়ে দেখল একটা নয়, দুটো টুনটুনি।আকারে যেন একটু ছোট। বন্ধু টুনটুনির বাচ্চা নাকি? তাই হবে। বাচ্চা দুটো এসে বসলো ওর জানলায়।
একজন বলল, ‘শোনো আমাদের মা হল তোমার বন্ধু।‘
‘ সে কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল তিতলি।
অন্যজন উত্তর দিল ,‘ আমরা বড় হতেই তো মা চলে গেছে। তবে দুটো কথা তোমায় বলতে বলে গেছে।‘
চঞ্চল হয়ে উঠলো তিতলির মন।
‘ কি কথা বলেছে?’
‘ মানুষের ওড়ার জন্য ডানা লাগে না গো। তোমার মনই পারবে তোমাকে মুক্ত করতে। তার দোরগুলো খুলে দাও।সাহসে ভর করে আকাশের দিকে তাকাও, তুমিও হয়ে যাবে মুক্ত বিহঙ্গ।‘
বলেই পাখি দুটি ফুরুত ফুরুত করে দুজন দুদিকে উড়ে গেল।
তিতলি অবাক হয়ে আকাশটার দিকে তাকালো। বিরাট একটা নীল আকাশ –-- অনন্ত –--অসীম ---
6 Comments
খুব ভালো লাগলো। আজকাল কল্পনার ডানায় ভর করে মনপাখি হয়ে উড়ে যেতে চায়না কেউ। তিতলি চেয়েছিল কারণ সে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। টুনটুনি তার বন্ধু। সত্যিটা ওই ছোট্ট টুনটুনিরাই জানিয়েছে -- মানুষের ওড়ার জন্য ডানা লাগেনা গো। আমরা যে ডানা ছাড়াই হিল্লি দিল্লি উড়তে পারি। সৌমেন কে অভিনন্দন যে তিনি তিতলিকে উড়োজাহাজের খোলে ঢুকিয়ে দেননি। তাহলেই ফ্যান্টাসি উবে যেতো। লিখুন লিখুন আরও লিখুন।
ReplyDeleteধন্যবাদ ।মনোযোগ সহকারে পড়েছেন 🙏
Delete🙏🙏🙏🙏🙏
ReplyDelete🙏🙏
Deleteগল্পগুলি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা মনে হচ্ছে । প্রতিটির বিষয় আলাদা আলাদা। ছোটদের মনের কাছাকাছি। 💐
ReplyDeleteআপনি মনোজ্ঞ পাঠক। উদ্দেশ্য আছে অবশ্যই।সফল কিনা সে বলার অধিকার আমার নেই।উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে পরের গল্পটি হয়তো বিতর্কের জন্ম দেবে।
ReplyDelete