জ্বলদর্চি

টোগালু গোমবেয়াট্টা এবং ভীমাভ্ভা দেবী /সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

টোগালু গোমবেয়াট্টা এবং ভীমাভ্ভা দেবী 

সোমনাথ মুখোপাধ্যায় 


ছোট বেলার স্মৃতি বিজড়িত এক অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে বরং শুরু করা যাক আজকের আখ্যান। আমাদের প্রতিবেশী দুই দাদা টুনু এবং ঝুনু হোলো এই গল্পের দুই অকথিত নায়ক। আমার থেকে কিছুটা বড়ো হলেও মেলামেশায় আমরা সবাই ছিলাম একেবারে গলায় গলায়। এক ধুন্ধুমার বর্ষার দিনে ঝুনু দা ডেকে বললো – আজ সন্ধ্যায় আমাদের ঘরে আসিস, একটা নতুন জিনিস দেখাবো! গলার স্বরে কেমন একটা রহস্যের আভাস পেয়েই তক্কে তক্কে থাকি কখন সন্ধ্যা নামে।

অন্ধকার ঘরে ওদের পড়ার টেবিলের পেছনে একটা সাদা কাপড় টাঙানো হয়েছে। ছোট একটা টুলের ওপর রাখা কাগজের বাক্সের ভেতর আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাক্সের সামনের অংশটা কাটা। সেখানে রাখা রয়েছে বেশ কিছু কার্ড। আমরা অধৈর্য হয়ে উঠছি দেখে টুনু - ঝুনুর শ্যাডো শো শুরু হয়ে যায়। রামায়ণের চিরপরিচিত কাহিনির খণ্ড খণ্ড ঘটনাকে নিয়ে টুনু ঝুনুর শ্যাডো শো। টুনু দা একটার পর একটা ছবি তুলে ধরে আর ঝুনু দা কাগজের একটা চোঙ মুখের সামনে ধরে ছবির বিবরণী দিতে দিতে টানা গল্প বলে চলে। আমরা সবাই মিলে দারুন উপভোগ করি গোটা বিষয়টাই। এ ছিল শ্যাডো পাপেট্রির এক আশ্চর্য প্রতিরূপ। শৈশব, কৈশোরের ব্যস্ততা ছেড়ে বুড়ো বয়সের চৌহদ্দিতে ঢুকেও ভুলতে পারিনি ফেলে আসা দিনের সেই আনন্দময় স্মৃতি। নিজের খেয়ালেই কাগজ কুদে তৈরি করেছিলাম সহজ পাঠের বেশ কয়েকটি চরিত্রকে। টর্চের আলোর সামনে ছবিগুলো ধরতেই সাদা দেওয়ালে ভেসে ওঠে একের পর এক চরিত্র। সেসব দেখে নিজে আনন্দ পেলেও আশেপাশে তার ভাগীদার কেউই ছিলোনা।

আজ এতোকাল পরে এই কথাগুলো হঠাৎ করে মনে পড়লো প্রবীণা শিল্পী ভীমাভ্ভা দেবীর ছবি দেখে। পুরো নাম ভীমাভ্ভা ডোড্ডাবালাপ্পা সিলেক্যাথারা । লম্বা চওড়া নাম।দক্ষিণী মানুষদের নাম অনেকটা এমনই হয় বটে! জানতে ইচ্ছে হচ্ছেতো ইনি আসলে কে? ভীমাভ্ভা হলেন একজন টোগালু গোমবেয়াট্টা শিল্পী। স্পষ্ট হলো না তো? হবে কি করে? আমি যে এখন কন্নড় ভাষায় কথা বলছি। ওই ভাষায় লেদার শ্যাডো পাপেট্রিকে যে ওই নামেই ডাকা হয়। তাহলে দুয়ে দুয়ে মিলে কী দাঁড়ালো? ভীমাভ্ভা দেবী হলেন দেশের প্রবীণাতমা লেদার শ্যাডো পাপেট্রি শিল্পী যাঁকে এইবছর পদ্ম সম্মান জানানো হয়েছে এই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করে।

🍂

এই সময়ের বিনোদন বা মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবে পাপেট্রি বা পুতুল নাচ তার আগের গরিমা হারিয়েছে, অথচ আমাদের দেশে পুতুল নাচের এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত পরম্পরা রয়েছে। আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে এই লোকপরম্পরার অপার ঐশ্বর্য। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের ধর্মীয়, সামাজিক, সাহিত্য এবং নান্দনিক ঐতিহ্য। কথিত আছে যে চতুরানন ব্রহ্মা তাঁর পত্নী সরস্বতী দেবীর মনোরঞ্জনের জন্য প্রথম পুতুল তৈরি করান। পরবর্তী কালে পুতুল নাচের প্রতি আগ্রহ জাগতে দেখে ব্রহ্মা সেই শিল্পীকে ভাট নাম দিয়ে মর্ত্যে নির্বাসিত করেন। এই ভাটেরাই হলো আদি পুতুল নাচিয়ে।

আমাদের দেশসহ গোটা দুনিয়ায় প্রচলিত রয়েছে চারটি প্রধান ধরনের নাচিয়ে পুতুল– গ্লাভ পাপেট বা দস্তানা পুতুল, স্ট্রিং পাপেট বা তার পুতুল, রড পাপেট বা ডাঙ্  পুতুল এবং শ্যাডো পাপেট বা ছায়া পুতুল। আমাদের আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভীমাভ্ভা দেবী হলেন এই চতুর্থ ঘরাণার বিশিষ্ট পুতুল নাচিয়ে। পুতুলেরা তো আর নিজে থেকে নেচে উঠতে পারেনা, তাদের নাচাতে হয়, দক্ষ পুতুল নাচিয়েরা তাদের হাতের ছোঁয়ায় পুতুলে প্রাণসঞ্চার করেন, দর্শকরা আমোদিত হয়।

লেদার পাপেট তৈরির কাজটাও বেশ শ্রম সাপেক্ষ কাজ। চামড়ার হাট থেকে প্রথমে কাঁচা চামড়া কিনে আনা হয়। একাজের জন্য শিল্পীদের পছন্দ ছাগলের চামড়া। সেটিকে নানান উপায়ে পাকা করে বিশেষ উপায়ে একেবারে পাতলা পার্চমেন্ট কাগজের মতো তৈরি করা হয় যাতে তার ভেতর দিয়ে সহজেই আলো চলাচল করতে পারে। এরপর শুকনো চামড়ার ওপর এঁকে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট চরিত্রের ছবি। তারপর শুরু হয় খোদাইয়ের কাজ। এজন্য শিল্পীরা নিজেরাই তৈরি করে নেন কিছু সাধারণ যন্ত্র উপকরণ। এরপর শুরু হয় তাকে রাঙিয়ে তোলার কাজ। সাধারণভাবে খুব উজ্জ্বল রঙে রঙিন করে তোলা হয় গোটা ছবিটিকে। খুব দক্ষতার সঙ্গে আলো চলাচলের জন্য কতগুলো ফাঁক তৈরি করা হয় যাতে তার ভেতর দিয়ে সহজেই আলো চলাচল করতে পারে। এরপর আউটলাইন বরাবর ছবিটিকে কেটে নেয় কারিগর শিল্পীরা। দেহের প্রতিটি অঙ্গকেও আলাদা আলাদা করে কেটে নিতে হয় যাতে প্রয়োজনমতো সেগুলোকে নাড়িয়ে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা যায়। এরপর ছবির পেছনে প্রয়োজনমতো বাঁশের কাঠি জুড়ে দেওয়া হয় যাতে নাচিয়ে শিল্পীরা হাতের কসরতে সহজেই পুতুলগুলোকে নাচাতে পারে। এবার পুতুল নাচের পালা শুরু হবে। আপনারা তৈরি তো? আজকের শিল্পী হলেন লেদার শ্যাডো পাপেট্রির বর্ষীয়সী শিল্পী পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপ্ত শ্রীমতী ভীমাভ্ভা ডোড্ডাবালাপ্পা সিলেক্যাথারা । ঐ যে কনসার্ট শুরু হয়েছে। আর কোনো কথা নয়।

শুভা সানঝা , স্বাগত। আমি ভীমাভ্ভা । ভীমাভ্ভা ডোড্ডাবালাপ্পা সিলেক্যাথারা। আমি একজন লোকশিল্পী, পুতুল নাচিয়ে। আমার বয়স ৯৬ বছর। না না, চমকে উঠবেন না আপনারা। আমি জন্মেছিলাম ১৯২৯ সালে কর্ণাটক রাজ্যের কোপ্পাল জেলার মোরানালা গ্রামের এক টোগালু গোমবেয়াট্টা শিল্পী পরিবারে। আমাদের পরিবার পুরুষ পরম্পরা কয়েক শতক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কর্ণাটক রাজ্যের গুটিকয়েক পরিবার এখনও চামড়ার তৈরি পুতুল নাচিয়ে হিসেবে কোনোরকমে এই লোকশিল্পের ধারাকে টিকিয়ে রেখেছে। আমি গর্বিত যে এই ধারার সঙ্গে আমি ও আমার পরিবার এখনও যুক্ত রয়েছি,এই বহমান ধারার উত্তরসূরি হিসেবে। আজ‌ও আমাদের দিন গুজরান হয় এই জনপ্রিয় লোকশিল্পের চর্চার মাধ্যমে।

আমাদের পরিবার যেহেতু এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাই একজন পুতুল নাচিয়ে হিসেবে আমার তালিম শুরু হয় আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে। বিগত সাত দশকের‌ও বেশি সময় ধরে আমি এই শিল্পের সাধনা করে চলেছি। এক মঞ্চ থেকে অন্য স্থানের পৃথক মঞ্চে উৎসুক দর্শকদের সামনে আমি অসীম ধৈর্য্য আর নিষ্ঠার সঙ্গে চামড়ার তৈরি ছায়া পুতুল চরিত্রদের দর্শকদের সামনে হাজির করেছি ক্লান্তিহীনভাবে। এই প্রজন্মের দর্শকরা এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের ধারা সম্পর্কে উদাসীন থাকলেও আমরা পরম নিষ্ঠায় তাকে যথাসম্ভব সচল রেখেছি। আজকের এই ব্যস্ত উদাসীন দুনিয়ার যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করিনা কেন দর্শকরা আজ‌ও আমাদের সাদরে গ্রহণ করে নেন। এই বয়সে এসেও আমি প্রতিটি অনুষ্ঠান থেকে নতুন করে শেখার প্রেরণা পাই। টোগালু গোমবেয়াট্টা তাই আমার কাছে নিছক একটি শিল্প ধারা নয়,এ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ , আমার অন্তর্লীন যাপনের অঙ্গ।  চামড়ার তৈরি পুতুলেরা যখন আমার বা আমাদের হাতের ছোঁয়ায় সচল প্রাণবন্ত হয়ে উঠে সাদা পর্দার ওপর নড়াচড়া করতে থাকে তখন আড়ালে থাকা নাচিয়েদের কারিকুরির কথা দর্শকদের মাথাতেই আসেনা। ঈশ্বর যেমন অলক্ষ্যে থেকে আমাদের নাচান, আমরা পুতুলনাচিয়েরাও ঠিক তেমনি আড়ালে লুকিয়ে থেকে পুতুলদের ইচ্ছে মতো নাচাই, মানুষের মনোরঞ্জন করি। কাহিনির ঠাসবুনোট, যন্ত্রসংগীতের সুর মূর্ছনা আর নাচিয়েদের হাতের কারসাজির কল্যাণে প্রতিটি নাচের আসর ভরপুর আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে।

মানুষের কাছে এখনও পৌরাণিক কাহিনীর আকর্ষণ রয়েছে। তাই আমাদের পুতুল নাচের আসরে রামায়ণ,মহাভারতের সুমহান চরিত্ররাই উঠে আসে বারংবার। দর্শকরা মা সীতার কষ্ট দেখে ব্যথিত হয় , আবার লঙ্কা দহনের পর্বে হনুমানের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে প্রবল উল্লাস করে। আসলে এই কাহিনিগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জুড়ে আছে তাই দর্শকেরা সহজেই পুতুল নাচের কাহিনির সঙ্গে নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের অনুভূতিকে সহজেই যুক্ত করতে পারে। এছাড়া আমাদের দেশের নানান জনপ্রিয় লোককথার কাহিনিও ঠাঁই পায় আমার উপস্থাপনায়। 

সময় বদলে গেছে অনেক। বদলে যাচ্ছে মানুষের পছন্দ অপছন্দ, ভালো লাগা বা না লাগা সবকিছু। এই সময়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে টোগালু গোমবেয়াট্টার মতো এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় মনোরঞ্জন মাধ্যমের স্থিতি আজ টালমাটাল। শিল্পের হাল দুর্বল হলে তার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা ভালো থাকে কী করে? ভীমাভ্ভারা ভালো নেই। তবুও কর্ণাটকের এই সুপ্রাচীন লোক ধারাটিকে সজীব রাখতে এই বয়সেও লড়ে যাচ্ছেন তিনি। নতুন প্রজন্মকে এই পরম্পরায় দীক্ষিত করতে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আশা করেন যে একদিন আবার নতুন অরুণোদয় হবে তাঁর শিষ্যদের হাত ধরে। ভীমাভ্ভা দেবী  কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করেন ধূনি জ্বালিয়ে বসে থাকলে একদিন না একদিন কোনো নবীন অগ্নিহোত্রীর হাতে তা আবার প্রজ্জ্বলিত হবে।

আমরাও যে তেমনটাই আশা করি।

Post a Comment

10 Comments

  1. অঞ্জনা মুখার্জিAugust 22, 2026

    অসম্ভব সুন্দর একটা লেখা পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য জ্বলদর্চিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমাদের পত্রিকা বিষয়গৌরবী হয়ে উঠছে নতুন করে। মনে হলো সামনে বসে পুতুল নাচ উপভোগ করলাম।

    ReplyDelete
  2. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়August 22, 2026

    একটি পত্রিকার চরিত্রায়নে পাঠক পাঠিকাদের ভূমিকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। লেখকদের এই চাওয়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই চলতে হয়। পত্রিকা সংগঠক এই দুই প্রান্তের মধ্যে সেতু বাঁধেন। জ্বলদর্চির পাতায় আমি নতুন। আরও বেশি বেশি করে জ্বলদর্চির পাশে থাকুন সবাই।

    ReplyDelete
  3. একটা দারুন অজানা জিনিস জানলাম ও আপনি এটা সুন্দর লিখেছেন ও বুঝিয়েছেন।

    ReplyDelete
  4. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়August 22, 2026

    সব কৃতিত্ব ওই ৯৬ বছর বয়সী মানুষটির যিনি এখনও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । আমরা তো সবাই তাঁর কাছে ঋণী।

    ReplyDelete
  5. খুব সুন্দর লেখা।পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।

    ReplyDelete
  6. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়August 22, 2026

    ধন্যবাদ মতামত জানানোর জন্য। জ্বলদর্চির সাথে থাকুন।

    ReplyDelete
  7. ছোট্ট বেলার পুতুল নাচ দেখার স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ,কী যে ভালো লাগতো শুধু ভালো লাগা নয় ছিলো বিস্ময় ,কি করে পুতুলদের নিয়ে এমন নাচানো কথা বলানো সম্ভব হয়, যদিও বড় হওয়ার সাথে সাথে সে বিস্ময় কিছু টা কাটলেও ভালোবাসাটা রয়ে গেছে শেষ এই কয়েক মাস আগে তৃপ্তি মিত্র সভা ঘরে সুন্দরবনের শিল্পীদের পুতুল নাটক দেখতে ছুটেছিলাম । কিন্তু আজ আপনার লেখা থেকে কিভাবে পুতুল বানানো হয় আর ভীমভ্ ভা দেবীর কথা জানতে পেরে সমৃদ্ধ হলাম।শুধু নস্টালজিয়া থেকে নয় শিল্প -সংস্কৃতির ঐতিহ্য কে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই পুতুল নাচ কে বাঁচিয়ে রাখা দরকার।

    ReplyDelete
  8. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়August 22, 2026

    ধন্যবাদ। বিস্ময় আর ভালোবাসা এই দুটোই হলো মানুষের মহা সম্পদ। এ দুটোকেই বয়ে নিয়ে যেতে হবে চিরকাল। ভীমাভ্ভা দেবীরা নিবিষ্ট সাধিকা। তাঁদের প্রণাম।

    ReplyDelete
  9. Khub bhalo laglo , anek kichu jante parlam

    ReplyDelete
  10. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়August 22, 2026

    জানাটা কি খুব কাজের মনে হলো ? ভালো থাকবেন।

    ReplyDelete