জাতীয় চক্ষুদান পক্ষ
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৫ শে আগস্ট থেকে ৮ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় চক্ষুদান পক্ষ। চোখ মানব জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেটি ছাড়া আমাদের জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আসুন এই সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জেনে নিই।
আলো ফিরুক সবার জীবনে, চোখ মানুষের অন্যতম মূল্যবান অঙ্গ। চোখের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখি, আপনজনকে চিনতে পারি, বই পড়ি, কাজ করি এবং জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি, কিন্তু নানা কারণে অনেক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধকার জীবনের মুখোমুখি হন। তাঁদের জীবনে আবার আলো ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো চক্ষুদান। চক্ষুদান সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ভারতে জাতীয় চক্ষুদান পক্ষ পালন করা হয়।
চক্ষুদান আসলে মৃত্যুর পর নিজের চোখের কর্নিয়া দান করার একটি মহৎ মানবিক উদ্যোগ। একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর দান করা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিহীন কোনো মানুষের জীবনে নতুন করে আলোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে, অর্থাৎ একজন মানুষের মৃত্যুর পরেও তাঁর চোখ অন্য একজনকে পৃথিবী দেখার সুযোগ করে দিতে পারে। এই ভাবনাটিই চক্ষুদানকে একটি অনন্য মানবিক দানে পরিণত করেছে।
আমাদের সমাজে এখনও চক্ষুদান সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, চক্ষুদান করলে মৃত ব্যক্তির মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়, আবার কেউ, কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক কুসংস্কারের কারণে চক্ষুদানে আগ্রহী হন না। বাস্তবে সঠিক পদ্ধতিতে কর্নিয়া সংগ্রহ করা হলে, মৃত ব্যক্তির চেহারায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয় না। তাই ভয় বা ভুল ধারণার কারণে চক্ষুদানের মতো মহৎ কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত নয়।
চক্ষুদানের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবদ্দশায় কেউ চক্ষুদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা চক্ষু-ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, কারণ মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্নিয়া সংগ্রহ করা জরুরি। তাই পরিবারের সদস্যদেরও এ বিষয়ে আগে থেকেই সচেতন থাকা প্রয়োজন।
🍂
জাতীয় চক্ষুদান পক্ষের মূল উদ্দেশ্য শুধু চক্ষুদানের অঙ্গীকার করানো নয়, মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ জাগিয়ে তোলাও এর অন্যতম লক্ষ্য। বিদ্যালয়, কলেজ, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই সময়ে সচেতনতামূলক আলোচনা, প্রচারাভিযান, শিবির ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে চক্ষুদানের গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো অত্যন্ত জরুরি।
চক্ষুদান কোনো আর্থিক লাভের বিষয় নয়। এটি এমন এক দান, যার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ের পরও অন্যের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে যেতে পারেন। রক্তদান যেমন অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনই চক্ষুদান একজন দৃষ্টিহীন মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পৃথিবীর দরজা খুলে দিতে পারে। তাই চক্ষুদানকে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলা যায়, তবে চক্ষুদান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, কর্নিয়া দান ও সম্পূর্ণ চোখ প্রতিস্থাপন এক বিষয় নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট নিয়ম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়। তাই এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চক্ষু-ব্যাংক এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য জানা উচিত।
আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা পদ্ধতি বহু মানুষের দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের সহযোগিতা। পর্যাপ্ত চক্ষুদাতা না থাকলে এই চিকিৎসার সুফল সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই প্রত্যেক সচেতন মানুষের উচিত চক্ষুদান সম্পর্কে জানা এবং নিজের পরিবার ও পরিচিতদের মধ্যেও এই বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা। জাতীয় চক্ষুদান পক্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও অর্থবহ হতে পারে। মৃত্যুর পর আমাদের দেহের একটি ছোট অংশও যদি কোনো মানুষের জীবনে আলো ফিরিয়ে আনার কাজে লাগে, তবে তার চেয়ে বড় মানবিক উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে?
0 Comments