চীন দেশের গল্প: ১২(জাদুকরী টাকার থলি)বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ
(একটি ওয়াই ই লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেনঃ জন মিনফোর্ড)
সে বহু দিন আগের কথা। এক পাহাড়ের কোলে, ছোট্ট এক উপত্যকায় এক তরুণ কাঠুরে আর তার বউ বাস করত। একখান খড়ের কুঁড়েঘর ছাড়া তাদের সংসারে আর কোনো সহায়-সম্বল ছিল না। অভাব তাদের পিছু ছাড়ত না। তারা দিন এনে দিন খেত। প্রতিদিন নিয়ম করে তাদের পাহাড়ে যেতে হতো কাঠ কাটতে। পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজ দুই বোঝা করে জ্বালানি কাঠ কাটত তারা। তারপর সেই কাঠের বোঝা পিঠে বয়ে নিয়ে যেত দূরের হাটে। তা বিক্রি করে যে দু-চার আনা পয়সা মিলত, তা দিয়েই কোনোমতে চলত তাদের
হাড় হাভাতে কঠিন জীবন।
একদিন হলো কী, সাতসকালে পাহাড়ে গিয়ে কাঠ কেটে ভরদুপুরে ঘরে ফিরল সেই তরুণ দম্পতি। বরাবরের মতো দুই বোঝা কাঠ নিয়ে এসেছিল তারা। এক বোঝা কাঠ তারা রেখে দিল রান্নাঘরে—নিজেদের হাঁড়ি চড়াবার জন্য। আর অন্য ভারী বোঝাটি সযতনে রেখে দিল বাড়ির উঠোনে। মনে মনে ভাবল, আগামিকাল কাকভোরে এই বোঝাটি হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবে, আর তা থেকে পাওয়া পয়সা দিয়ে ঘরের জন্য চাল-ডাল কিনে আনবে। কিন্তু নিয়তির পরিহাস!
পরের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দম্পতির চোখ তো ছানাবড়া! ধড়ফড় করে উঠে তারা দেখল, উঠোনে রাখা সাধের কাঠের বোঝাটি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! চারিদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজল তারা, কিন্তু কোথাও তার চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। অগত্যা উপায় না দেখে, নিজেদের ব্যবহারের জন্য রান্নাঘরে রাখা কাঠের বোঝাটিই তাদের হাটে নিয়ে যেতে হলো। পেটের দায়ে মনের দুঃখে সেটাই বিক্রি করে দিল তারা।
সেইদিনই বুক বেঁধে তারা আবার পাহাড়ে গেল। আগের মতোই হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আবারও দুই বোঝা কাঠ কেটে আনল। মনে মনে ভাবল, দেখিই না কী হয়! এবারও এক বোঝা নিজেদের জন্য রেখে, অন্য বোঝাটি হাটে বিক্রির আশায় উঠোনেই রেখে দিল। কিন্তু কপাল মন্দ!
🍂
পরের দিন সকালে উঠে দেখে, এবারও উঠোনের কাঠের বোঝাটি উধাও! ঠিক যেন কোনো অলৌকিক মায়াবলে রাতের অন্ধকারে কাঠগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। দম্পতি তো অবাক, এ কেমন চোরের উপদ্রব রে বাবা!
টানা তিন দিন আর চার দিনের বেলাতেও ঠিক একই কাণ্ড ঘটল! উঠোনে রাখা কাঠের বোঝাটি রোজই রাতের অন্ধকারে গায়েব হয়ে যেতে লাগল। এবার সেই তরুণ কাঠুরের মনে খটকা লাগল। সে বুঝল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়—নিশ্চয়ই কোনো গোলমেলে বা অলৌকিক কাণ্ডকারখানা ঘটছে এর পেছনে!যেমন ভাবা, তেমন কাজ!
পঞ্চম দিনের মাথায় কাঠুরে এক বুদ্ধি আঁটল। সে উঠোনের কাঠের বোঝার মাঝখানটা একটু ফাঁপা করে খোপের মতো বানাল, আর চুপিচুপি নিজে গিয়ে তার ভেতর সেঁধিয়ে রইল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে আস্ত একজন মানুষ লুকিয়ে আছে। দেখতে দেখতে রাত নিঝুম হলো। অন্ধকারে চার দিক ঠাহর করা কঠিন। ঠিক মাঝরাতে হঠাৎ আকাশ চিরে এক মস্ত বড় দড়ি তরতর করে নিচে নেমে এলো! সেই দড়িটা নিজে থেকেই কাঠের বোঝার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে গেল, আর চোখের পলকে ভেতরের কাঠুরে সমেত পুরো বোঝাটাকে টেনে একেবারে মেঘের উপরে, স্বর্গের মুলুকে তুলে নিয়ে চলে গেল!
স্বর্গে পৌঁছাতেই কাঠুরে দেখল, দূর থেকে এক দয়ালু চেহারার, ধবধবে সাদা চুলের বুড়ো দাদু হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। বুড়ো দাদু পরম যত্নে কাঠের বোঝার বাঁধন খুলে ফেললেন। কিন্তু যেই না বাঁধন আলগা হলো, ভেতর থেকে আস্ত এক জ্যান্ত মানুষকে বেরিয়ে আসতে দেখে বুড়ো দাদু তো অবাক!
তিনি কাঠুরেকে জিজ্ঞেস করলেন, "হ্যাঁ রে বাছা, অন্য সব মানুষ তো দিনে মাত্র এক বোঝাই কাঠ কাটে। তা তুই কেন প্রতিদিন এমন নিয়ম করে দুই বোঝা কাঠ কাটতে যাস?"
কাঠুরে তখন বুড়ো দাদুকে হাতজোড় করে একটা প্রণাম ঠুকল। তারপর বিনীত সুরে বলল, "দাদু গো, আমরা যে বড় কপালপোড়া, একদম নিঃস্ব! ঘরে আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সেই দুঃখেই আমি আর আমার বউ মিলে জান লড়িয়ে দিনে দুই বোঝা কাঠ কাটি। তার মধ্যে এক বোঝা আমরা নিজেদের রান্নার জন্য রাখি আর অপর বোঝাটি হাটে নিয়ে যাই। তা বেচে যে কটা পয়সা পাই, তা দিয়েই কোনোমতে চাল কিনে ভাতের ফ্যান ফুটিয়ে খাই।"
কাঠুরের এই সরল স্বীকারোক্তি শুনে সেই সাদা চুলের বুড়ো দাদুর মনে মনে বড্ড করুনা হল। তিনি হাহা করে হেসে স্নেহের সুরে বললেন, "আমি অনেক দিন ধরেই তোদের ওপর নজর রাখছি রে বাছা। তোরা দুজনেই বড্ড ভালো আর সৎ। তোদের এই অভাবের সংসারে তোরা যে কতখানি খাটতে পারিস, তাও আমি দেখেছি। তাই আমি তোকে একটা গুপ্তধন দেব। এটা সাথে করে ঘরে নিয়ে যা, তোদের রুটি-রুজির আর কোনোদিন অভাব থাকবে না।"
বুড়ো দাদুর কথা শেষ হতে না হতেই, কোথা থেকে যেন সাতজন ডানাওয়ালা পরী উড়ে এলো! তারা সেই তরুণ কাঠুরের হাত ধরে এক রাজকীয়, চোখধাঁধানো সুন্দর প্রাসাদে নিয়ে গেল। সেই প্রাসাদের সোনার কারুকাজ করা ছাদ আর চকচকে টালির দেওয়াল থেকে এমন তীব্র আলো বের হচ্ছিল যে, ভেতরে পা রাখামাত্রই কাঠুরের চোখ ধাঁধিয়ে গেল! প্রাসাদের ভেতরে থরে থরে সাজানো ছিল দুনিয়ার সব আজব আর দুর্লভ জিনিস, যা কাঠুরে তার বাপের জন্মেও দেখেনি।একটা মহলে গিয়ে কাঠুরে দেখল, চারদিকের দেওয়ালে হরেক রকম আকৃতির আর মাপের টাকার থলি ঝুলছে।
পরীরা মুচকি হেসে তাকে বলল, "এর মধ্যে তোমার কোন থলিটা সবচেয়ে বেশি পছন্দ বলো তো? যেটা খুশি বেছে নিয়ে মনের আনন্দে বাড়ি চলে যাও।" আনন্দে আর ভয়ে তো কাঠুরের বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল! সে লোভ সামলাতে না পেরে এক কোণে ঝুলে থাকা হিরে-জহুরতে ঠাসা, গোলগাল আর ফোলা মতন মস্ত বড় একটা থলি দেখিয়ে বলল, "আমার ওই থলিটাই চাই! ওই যে দামী জিনিসে ঠাসা গোল থলিটা, ওটাই আমাকে দাও।" এই বলে সে সবচেয়ে বড় থলিটা দেওয়াল থেকে পেড়ে নিল।
ঠিক তখনই, সেই ধপধপে সাদা চুলের বুড়ো দাদু গম্ভীর মুখে সেই মহলে এসে ঢুকলেন। কাঠুরেকে ধমক দিয়ে তিনি বললেন, "না রে বাছা, ও থলি তুই নিতে পারবি না! ওটা তোর জন্য নয়। আমি তোকে একটা একদম খালি, শূন্য থলি দেব। সেই থলি থেকে তুই প্রতিদিন নিয়ম করে ঠিক একটি করে রূপোর মুদ্রা বের করতে পারবি, তার এক রত্তিও বেশি নয়!"
বুড়ো দাদুর কথা শুনে কাঠুরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো। সে সেই খালি থলিটা হাত পেতে নিল এবং সেই আকাশছোঁয়া মস্ত বড় দড়িটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আবার তরতর করে নিচের মর্ত্যলোকে, নিজের ঘরের উঠোনে নেমে এলো।
বাড়ি ফিরেই কাঠুরে তার বউয়ের হাতে জাদু থলিটা তুলে দিল এবং স্বর্গের মুলুকে যা যা ঘটেছে, তার আদ্যোপান্ত সব খুলে বলল। সব শুনে কাঠুরের বউ তো খুশিতে আত্মহারা! এরপর থেকে তাদের এক নতুন নিয়ম হলো। দিনের বেলা তারা বরাবরের মতোই পাহাড়ে যেত কাঠ কাটতে।
কিন্তু সাঁঝের বেলা অন্ধকার নামলেই তারা ঘরের দোরগোড়া শক্ত করে বন্ধ করে দিত। তারপর সেই খালি থলিতে হাত ছোঁয়াতেই—ঝনঝন শব্দে আস্ত এক টুকরো খাঁটি রূপোর তাল গড়িয়ে পড়ত তাদের হাতের তালুর ওপর! মেপে দেখলে দেখা যেত, ওজনে সেটি ঠিক একটি রূপোর মুদ্রার সমান। প্রতিদিন নিয়ম করে ঠিক একটি রূপোর মুদ্রাই থলি থেকে বের হতো, তার এক রত্তি বেশিও নয়। কাঠুরের বউ সেই রূপোর মুদ্রাগুলো পরম যত্নে একটা একটা করে জমিয়ে রাখতে লাগল।দেখতে দেখতে দিন কাটতে লাগল।
একদিন কাঠুরে তার বউকে বলল, "হ্যাঁ গো, চলো না এবার একটা বলদ কিনি?" কিন্তু তার বউ বুদ্ধিমান, সে রাজি হলো না। কিছুদিন পর কাঠুরে আবার ঘ্যানঘ্যান করে বলল, "তাহলে চলো কয়েক বিঘা চাষের জমিই কিনে ফেলি?" বউ এবারও সায় দিল না। আরও কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর, বউ নিজে থেকেই সাধ আহ্লাদ করে বলল, "তার চেয়ে চলো, আমাদের ভাঙাচোরা ঘরটা বদলে একটা নতুন দেখে সুন্দর খড়ের কুঁড়েঘর বানাই।" কিন্তু এত এত টাকা জমতে দেখে কাঠুরের হাত তো তখন নিশপিশ করছে! সে সব টাকা খরচ করার জন্য উসখুস করতে করতে বলল, "আরে ধুর! যখন হাতে এতই কড়ি রয়েছে, তখন ছোটখাটো কুঁড়েঘর কেন? চলো, ইঁট-সুরকি দিয়ে একখানা মস্ত বড় দালান বাড়ি হাঁকাই!"
বউ তার স্বামীকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কাঠুরের সেই একরোখা জেদের কাছে শেষমেশ হার মেনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার বড় বাড়ির প্রস্তাবেই রাজি হতে হলো।
যেমন কথা তেমন কাজ! কাঠুরে তখন ইঁট, টালি আর কাঠ কিনতে জলের মতো পয়সা ওড়াতে লাগল। সাথে নামী-দামী সব রাজমিস্ত্রি আর কাঠমিস্ত্রিদের ডেকে এনে কাজে লাগিয়ে দিল। সেই থেকে কাঠুরে আর তার বউয়ের পাহাড়ে গিয়ে কষ্ট করে কাঠ কাটার পাট একেবারেই চুকে গেল। কিন্তু হায়রে কপাল! একদিন দেখা গেল জমানো রূপোর মুদ্রা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, অথচ সাধের দালান বাড়িটার কাজ এখনো অর্ধেকও শেষ হয়নি। কাঠুরের মনের কোণে তখন লোভের পোকা নড়ে উঠল। সে ভাবল, থলি থেকে যদি আরও কিছু রূপো বের করে নেওয়া যায়, তবে কেমন হয়! যেমন ভাবা, বউকে কিচ্ছু না জানিয়ে সে চুপিচুপি সেই একই দিনে দ্বিতীয়বারের মতো জাদুকরী থলির মুখটা খুলে ফেলল। আর অলৌকিক কাণ্ড! ঝনঝন শব্দে ধপধপে সাদা এক টুকরো রূপোর তাল মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
হাতে কাঁচা টাকা পেয়ে কাঠুরের লোভ এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে তর সইতে না পেরে তৃতীয়বারের মতো থলিটা খুলল এবং আবারও এক টুকরো রূপো পেয়ে গেল। সে মনে মনে ভারী খুশি হয়ে ভাবল, "আরে খাসা বুদ্ধি! এভাবে যদি থলি থেকে রূপো বের করতে থাকি, তবে তো চোখের পলকে আমার এই মস্ত বড় দালান বাড়ির কাজ শেষ হয়ে যাবে!"সে তখন স্বর্গের সেই সাদা চুলের বুড়ো দাদুর কড়া হুঁশিয়ারির কথা একেবারে ভুলে গেল। যেই না সে লোভের বশে চতুর্থবারের মতো থলিটির মুখ খুলল, অমনি তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! থলিটা এখন একেবারে শূন্য, ফোঁ ফাঁ! অলৌকিক জাদু থলিটা এখন সাধারণ এক টুকরো পুরনো কাপড়ের থলিতে পরিণত হয়েছে। হতভম্ব কাঠুরে যখন পেছন ফিরে তার সেই অসম্পূর্ণ দালান বাড়িটার দিকে তাকাল, দেখল সেখানে আর কোনো ইঁটের দালান নেই! চোখের পলকে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িটা মায়াবলে হাওয়া হয়ে গেছে। আর তার জায়গায় ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে তাদের সেই পুরনো ভাঙাচোরা খড়ের কুঁড়েঘরটি।
সব হারিয়ে কাঠুরে মনের দুঃখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তখন তার লক্ষ্মী বউটি তার পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত সুরে বলল, "কেঁদো না গো। স্বর্গের সেই জাদু থলির ওপর এভাবে ভরসা করা আমাদের একদম উচিত হয়নি। চলো, আমরা কাল থেকেই আবার আগের মতো পাহাড়ে গিয়ে কাঠ কাটি। কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে রুটি-রুজি আসে, সেটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আর আসল সুখের।"
0 Comments