জ্বলদর্চি

গিংগো বাইলোবা/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩৯
গিংগো বাইলোবা

ভাস্করব্রত পতি

প্রায় কুড়ি কোটি বছর আগেকার কথা। মেসোজোয়িক যুগের টায়াস্কি পিরিয়ড। জন্ম নিল গিংগোয়েলিস পর্ব। যার অধীনে ১৬ টি 'গণ' এবং অসংখ্য প্রজাতির গাছ ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকে তাদের আধিক্য। ট্রায়াসিক পেরিয়ে জুরাসিক যুগ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত গিংগোয়েলিস পর্বের গাছগুলি। তখন ডাইনোসরদের যুগ। কিন্তু এরপরই ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল গাছের সংখ্যা। মোটামুটি ক্রিটেসিয়াস থেকে সিনোজোয়িক যুগ পর্যন্ত পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলেও আজ এদের মধ্যে কেবলমাত্র একটি গাছই টিকে আছে। বেঁচে আছে। 'সবেধন নীলমণি' সেই ২০ কোটি বছর আগেকার গাছটির নাম 'গিংগো বাইলোবা'। প্যালিওবোটানিষ্টদের আখ্যানে তা 'জীবন্ত জীবাশ্ম'। লিভিং ফসিল। 
দার্জিলিংয়ের লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেনের গিংগো বাইলোবা গাছ। ছবি : Manu Kar

বর্তমানে গিংগো বাইলোবা সারা পৃথিবীতে খুব কম পরিমাণেই টিকে আছে। পূর্ব চিন দেশের চিকিয়াং শহরই এর মূল বাসস্থান। এছাড়া দক্ষিণ চিনেও অল্পবিস্তর বেঁচে আছে। চিন ছাড়াও জাপানে বেশ কিছু গাছ রয়েছে। সেখানকার বিভিন্ন মন্দিরের সামনে একে রোপণ করা হয় 'পবিত্র গাছ' হিসেবে। তবে অন্যান্য অনেক দেশে আজকাল 'ওরনামেন্টাল প্ল্যান্ট' হিসেবেও লাগানো হয়েছে। মূলত: সাবট্রপিক্যাল এবং টেম্পারেট এলাকা গিংগো বাইলোবার আদর্শ বাসস্থান। 

১৭৭১ সালে ক্যারোলাস লিনিয়াসই প্রথম গাছটির নামকরণ করেন। তবে ১৯৪৪ এ মোল, ১৯৪৬ পুল্লি, ১৯৪৮ ওয়াইডার এবং ১৯৪৯ এ থোম্মেন এই নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের কথায় চৈনিক ভাষা অনুযায়ী 'গিংগো' কথাটির বদলে হওয়া উচিত 'গিংকো'। যদিও তা ধোপে টেকেনি। তবে এটা ঠিক, লিনিয়াসের অনেক আগে ১৬৯০ সালে জাপানে প্রথম ইউরোপিয়ান হিসেবে গাছটি প্রথম লক্ষ্য করেন কেইমফার। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় পূর্ব চিন থেকে প্রথম ইউরোপ পাড়ি দেয় গিংগো। এরপর এর গন্তব্যস্থল হয় আমেরিকা। ইউরোপ এবং আমেরিকায় সফলভাবেই চাষ করা শুরু হয় 'ছায়াগাছ' হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এমনকি ভারতের মাটিতেও পদার্পন ঘটেছে গিংগোর। 

পাতিয়ালার পাঞ্জাবি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গাছটি লাগিয়েছেন ড. এস এস বীর (১৯৭০-৭১)। মানালি (ম্যাল রোড), দেরাদুন, মিশৌরি ছাড়াও আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার 'লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেন' (স্থাপিত ১৮৭৮) এর প্রধান সংরক্ষণ অফিস ও হার্বেরিয়াম এলাকার পাশে আরও একটি জীবন্ত জীবাশ্ম গাছ Metasequoia glyptostroboides (Dawn Redwood) এর পাশে এই 'গিংগো বাইলোবা' গাছ দাঁড়িয়ে আছে। এটি চিন থেকে আনা হয়েছিল। এই গাছটি উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গাছ। ডিপার্টমেন্টাল এক্সকার্সনে গিয়ে এই জিমনোস্পার্মটিকে পর্যবেক্ষণ করতেই হয়। 

এটিই পৃথিবীর একমাত্র প্রাচীনতম 'ভাস্কুলার প্ল্যান্ট' এর প্রজাতি। উদ্ভিদবিজ্ঞানী পি সি বশিষ্ঠ এর কথায়, তবে মোটেই সবচেয়ে প্রাচীন ভাস্কুলার প্ল্যান্ট-এর 'গণ' (জেনাস) নয়। কেন না সেলাজিনেল্লা এবং লাইকোপোডিয়াম এই দুটি টেরিডোফাইটার 'গণ' আরও বেশি প্রাচীন। অ্যাডিয়েন্টাম নামক এক প্রকার 'মেইডেন হেয়ার ফার্ণ' এর মতো গিংগো বাইলোবার পাতাগুলির সাদৃশ্য থাকায় একে ইউরোপীয়রা ডাকে 'মেইডেন হেয়ার ট্রি' নামে। এদেশে হিন্দিতে একে বলা হয় 'বাল কুমারী'। যেহেতু এর সমসাময়িক সব গাছই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং জীবাশ্মে পরিণত হয়েছে অথচ কোনওরকম পরিবর্তন ছাড়াই এটি আজও টিকে আছে, তাই এটি হল জীবন্ত জীবাশ্ম। উল্লেখ্য, কচ্ছপ, প্লাটিপাসও জীবন্ত জীবাশ্ম।

গিংগোয়েলিস পর্বকে দুটি ফ্যামিলিতে (পরিবার) ভাগ করেছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্পর্ণি (১৯৬৫)। ট্রাইকোপিটিয়েসী এবং গিংগোয়েসী। এই দুটি ফ্যামিলির মধ্যে একমাত্র গিংগো বাইলোবা ছাড়া বাকি সব যেমন ট্রাইকোপিটিস, উইন্ডওয়ারডিয়া, স্যাপোরটিয়া, ডাইকোফাইলাম, স্টেফানোফাইলাম, বেইরা, ফিনোবেইরা, গিংগোয়েটিস, আরসিওবেইরা, গিংগোডিয়াম, এরিটমোফাইলাম পৃথিবী থেকে বহু বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
পাতিয়ালার পাঞ্জাবি ইউনিভার্সিটিতে ড. এস এস বীরের লাগানো গিংগো গাছ। ছবি : Nidhan Singh

গিংগো বাইলোবা Ginkgoaceae পরিবারভুক্ত। এই বিরল প্রজাতির জিমনোস্পার্ম উদ্ভিদটি ভারতে সফলভাবেই চাষ করা গেছে। মাইনাস ৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রাতেও এই গাছ বেঁচে থাকে। কিন্তু এত কম তাপমাত্রায় 'রিপ্রোডাকটিভ সাইকেল' সম্পূর্ণ করা যায়না। তবে গরম আবহাওয়ায় এই গাছের বৃদ্ধি কমে যায়। মোটামুটি ১০০ ফুট দীর্ঘ হয়। প্রথম ২৫-৩০ বছর গাছটি সোজা বেড়ে চলে। ঢালু এবং সমতল উভয় এলাকাতেই জন্মায়।

গিংগো বাইলোবার বেশ কিছু বিচিত্র রকম বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য গাছের সঙ্গে মেলে না। এদের মূলে 'ট্যাপ রুট সিস্টেম' আছে। পাতাগুলি দ্বিধাবিভক্ত। শিরাবিন্যাস ওপেন ডায়কোটোমাস। খুব ধীরে বাড়ে। কাষ্ঠল অংশ 'পিকনোসাইলিক'। ক্যাটকিন পুষ্পবিন্যাস পরিলক্ষিত হয়। ওভিউলে টেন্ট্রাপোল দেখা যায়, যা কিনা কর্ডেইটেলিস-এর ওভিউলের সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করে। বীজ বেশ বড় এবং রসালো। স্পারমাটোজয়েডগুলি গতিশীল এবং এর মধ্যে পাকানো থাকে 'সিলিয়া'। গিংগোর পাতার সঙ্গে অ্যাডিয়েন্টাম ফার্ণের 'পিনি'র যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। শরৎকাল নাগাদ পাতা ঝরে যায়। পাতা ঝরার আগে সুন্দর স্বর্ণালী হলুদ রঙের ছোপ আসে।
রাস্তার পাশে গিংগো গাছ

কমবয়সী গিংগো বাইলোবার কোনটি পুরুষ গাছ এবং কোনটি স্ত্রী গাছ তা বোঝা বেশ কঠিন। একমাত্র বোঝা সম্ভব 'ফ্রাকটিফিকেসান' এর সময়। বাতাসের মাধ্যমে 'অ্যানিমোফাইলাস' পরাগসংযোগ হয়। এটি মূলত ওরনামেন্টাল প্ল্যান্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তার পাশে একে লাগানো হয়। আমেরিকায় ছায়াগাছ হিসেবে কাজে লাগলেও চিন ও জাপানের মানুষ একে পুজো করে। ১৯৪৮ সাল থেকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়  দুটি গিংগো পাতা। যার নকশা তখন করেছিলেন শোইচি হোশিনো। গত ২০০৪ সালে আবার নতুন করে নকশা করার পর এটি এখন এই টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো হয়ে ওঠে। তেমনি ১৯৯১ থেকে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও লোগো হলো এই গিংগো পাতা। 
গিংগো বাইলোবা

গিংগো গাছের বীজ পুড়িয়ে অনেকেই খায়। এর অঙ্গসংস্থানগত বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে এটি সম্পূর্ণ কনিফেরোফাইটিক। আবার প্রজনন বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক সাইকাডের চরিত্রের মতোই। এমনকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া কর্ডেইটেলিস ও সাইকাডিওডস-এর সাথেও মিল আছে। বিজ্ঞানী ডেলিভেরোয়াস (১৯৭২), ফাস্টার ও গিফোর্ড (১৯৫৯) এই মিল পেয়েছেন। আর তাই গিংগো বাইলোবা 'জীবন্ত জীবাশ্ম'। লিভিং ফসিল।

চিত্র কৃতজ্ঞতা : মানু কর, নিধান সিং

🍂

Post a Comment

0 Comments