জ্বলদর্চি

ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা ২১৮

ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা ২১৮ 
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 

চিত্র গ্রাহক: রাকেশ সিংহ দেব

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? তোমাদের চিঠি লিখতে শুরু করামাত্র কোথা থেকে একটা ছোট্ট দূর্গা টুনটুনি এসে আমার লেখার টেবিলের সামনের জানালার গ্রিলের উপর এসে বসলো। দূর্গা টুনটুনি খুব ছোট্ট পাখি, কলকে ফুলের মধ্যে ঢুকে যেয়ে ওরা কলকে ফুলের মধু খায়। এই ছোট্ট পাখি টাকে দেখে আমার আরো একটা পুঁচকে পাখির কথা মনে পড়ে গেল, সেই পাখি টার নাম হামিং বার্ড। ওদের বাড়ি আমেরিকায়। লম্বায় এরা  মাত্র ২ ইঞ্চি মতো আর ওজন মাত্র ২ গ্রাম। অবশ্য বড় প্রজাতির ও হামিং বার্ড হয় কম বেশি ৯ ইঞ্চি লম্বা ও হয় তারা।  হামিং বার্ড কি খায় জানো? দূর্গা টুনটুনির মতো এরাও ফুলের মধু খায় আর তার সাথে অবশ্য উড়ন্ত পোকা মাকড় ও খায়। সব থেকে আশ্চর্য ব্যাপার হলো এদের হৃৎস্পন্দন মিনিটে ১২০০ বার, আর এরা শ্বাস নেয় মিনিটে প্রায় ২৫০ বার। প্রকৃতির কি অদ্ভুত সব ব্যাপার-স্যাপার তাই না! 
এবার তবে চিঠি শেষ করি, সবাই ভালো থাকো। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতা দি

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 

তেত্রিশ পর্ব

রতনতনু ঘাটী

হেডস্যার নবনীতবাবু আর মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি তড়িঘড়ি হেঁটে যাচ্ছিলেন অনীক দত্তের বাড়ির দিকে। ছেলেমেয়েগুলো ক্রিকেট কোচিংয়ে গেছে অনীক দত্তের উঠোনের ছোট্ট মাঠে। ক্রিকেট টিমের সঙ্গে যদিও আছেন দেবোপমস্যার, তবুও, নবনীতস্যারের মুখের চিন্তার ছায়াটা চট করে মিলিয়ে গেল না। অমন সময় দূর থেকে ক্রিকেট টিমের কোলাহল শুনতে পেলেন নবনীতস্যার। কানখাড়া করে সেদিকে তাকিয়ে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে হেডস্যার বললেন, ‘ওই শুনতে পাচ্ছেন তো মুকুলবাবু, আমাদের ক্রিকেট টিম ফিরে আসছে?’

   ‘আপনার বড় ভরসা হলেন দেবোপমস্যার, ওঁকে ভরসা করাই যায় একশো ভাগ।’ কথাগুলো বলে অনীক দত্তদের পুকুরের পুব পাড়ের হেলে-পড়া করঞ্জা গাছের নিচু ডাল থেকে ঝুলে পড়া চ্যাপটা ফলগুলোকে দেখে হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘আমরা ছেলেবেলায় অমন শুকনো করঞ্জা ফল দিয়ে পুকুরে অনেক সময় ব্যাঙলাফ খেলেছি! মনে পড়ে আপনার নবনীতস্যার?’ 

   হাসতে-হাসতে নবনীতস্যার বললেন, ‘ছেলেবেলার স্মৃতির কথা তত কী আর স্পষ্ট মনে পড়ে মুকুলকৃষ্ণবাবু? তবে করঞ্জা গাছের পাশের ওই গাছটিকে দেখুন। ওটাকে আমরা বানরলাঠি বা সোনালু গাছ বলতাম। আমাদের গ্রামে অমন ছেলেবেলায় গ্রীষ্মের দুপুরে ঝাঁকড়া বটগাছের তলায় আমরা সমবয়সি ছেলেমেয়েরা মিলে কী যে কাণ্ড করতাম। বড় ছেলেরা ওই সোনালু গাছ মানে বানরলাঠি গাছ থেকে লম্বা-লম্বা লাঠির মতো দেখতে ফলগুলো পেড়ে আনত। তারপর আমরা সেই ফলকে এক-একটা তরবারি হিসেবে হাতে নিয়ে রাম-রাবণের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলতাম। সারা বিকেলটাই কেটে যেই মিথ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায়। সে এক দিন ছিল!’

   এমন সময় ক্রিকেট টিম নিয়ে দেবোপমস্যার চলে এলেন। নবনীতস্যারকে আর অনীক দত্তদের বাড়িতে যেতে হল না। নবনীতস্যার বললেন, ‘চলো দেবোপম। আমরা স্কুলমাঠের দিকে যাই। ছেলেরা ব্যাট-বল-উইকেট গুছিয়ে রেখে দিক স্কুলের ক্রিকেটকৌমুদী রুমে। তারপর স্কুলের মাঠের উপরের শেডের কাজ কতখানি এগিয়েছে আমরা সকলে মিলে দেখতে যাই। মুকুলবাবুও সঙ্গে থাকুন!’

   অমন সময় ছেলেমেয়েরা ফিরে এল মাঠে। হেডস্যার লোকনকে দেখে কাছে ডাকলেন, ‘লোকন, তুমি আজ ক্রিকেট কোচিংয়ের সময় অনীকবাবুর পুকুরে ক’বার বল ফেলেছ? মানে ক’টা চার আর ছয় হাঁকিয়েছ?’

   লাজুক মুখে নত হয়ে চুপ করে থাকল লোকন। পাশ থেকে এ-সেকশানের ধৃতি নায়েক বলে উঠল, ‘স্যার লোকন ছ’টা চার এবং চারটা ছয় মেরেছে। আপনি জাল দিয়ে গিরে দিয়েছেন বলে বল পুকুরের জলে পড়েনি। না হলে কী যে হত!’

   হেডস্যারের পাশ থেকে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘দেখলেন তো নবনীতস্যার, ইতিমধ্যে লোকনের ফ্যানও তৈরি হয়ে গেছে দেখছি? সি-সেকশানের ধৃতি কেমন প্রসংশা করে কথাটা বলল? সত্যিই লোকন ছেলেটার মনের জোর দারুণ!’ 

   ‘তা যা বলেছেন! তবে আমি বিশ্বাস করি, লোকনের মনের এত জোর এসেছে ওর দিদি পারুলমণির কাছ থেকে। পারুলমণি মেয়েটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ঠিকই, কিন্তু ভাইয়ের জন্যে কী না করতে পারে? সব সময় লোকনের মনে এগিয়ে চলার শক্তি জুগিয়ে চলে।’

   তক্ষুনি হেডস্যারের ফোন বেজে উঠল। স্যার ফোনটা ধরে উদ্বেগের গলায় আঁতকে উঠে বললেন, ‘কী বলছেন? আমাদের ছোট জগৎপুরের অভিরূপ দলুই? কখন ঘটল? কেন, কী হয়েছিল? কী বললেন? ম্যাসিভ হার্টঅ্যাটাক? এর আগে মাস ছয়েক আগেও তো একবার ওঁর অ্যাটাক হয়েছিল? সেবার সামলে নিয়েছিলেন।’

   হেডস্যার ফোনটা স্পিকারে করে দিলেন। ওদিক থেকে একজন মহিলার গলা শোনা গেল, ‘স্যার, নবীনগঞ্জ জেলা হালপাতালে এখন অভিরূপবাবুর মরদেহ রয়েছে। উনি এত দরদি মানুষ ছিলেন। সকলের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।’

   হেডস্যার উত্তরে বললেন, ‘উনি খেলাধুলোও খুব ভালবাসতেন। এই তো আমাদের স্কুলের মাঠের শেড তৈরির জন্যে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অভিরূপবাবু। সে টাকা আমাদের মুকুলবাবুর হাতে পাঠিয়েও দিয়েছিলেন। আমাকে বলেও ছিলেন, ‘স্যার যে সময়টা নির্বাচন করেছেন, আমার ওই সময়টা বাইরে যাওয়ার কথা নেই। আমি ছোট জগৎপুরেই থাকব। দরকার হলে স্যার ফাইনাল খেলা পরিচালনার ছোটখাটো কোনও কাজ থাকলে আমাকে দেবেন, আমি দাঁড়িয়ে থেকে সে কাজ করার চেষ্টা করব।’ 

   পাশ থেকে মুকুলবাবু জানতে চাইলেন, ‘কে ফোনে খবরটা জানাচ্ছেন?’ 

   হেডস্যার বললেন, ‘মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্ত অভিরূপবাবুর অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতলে। উনি এখনও জেলা হাসপাতালেই আছেন।’

🍂

   ওদিক থেকে সেঁজুতি সামন্ত বললেন, ‘স্যার, মরদেহ আমরা কাল সকালে আপনার স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এখন তো সন্ধে হয়ে এসেছে। ওঁর বাড়ির লোকজনও এখানে আছেন। ওঁদেরও বলছি সে কথা।’

   হেডস্যার বললেন, ‘সেইমতো ব্যবস্থাই করুন! আমরা সকালে দশটার সময় প্রেয়ারের পর ওঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাব! অভিরূপবাবুর মরদেহ এখানেই আসুক!’

   ফোন কেটে দিলেন হেডস্যার। তাঁর মুখটা ভরা বর্ষার মেঘের মতো থমথম করছে। চোখ দুটো জলে ভেজা। হেডস্যারের কথা শুনে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন মুকুলকৃষ্ণবাবু এবং দেবোপমস্যার। ছেলেমেয়েরা থম হয়ে শুনছিল অভিরূপবাবুর মৃত্যুসংবাদ। সকলের দিকে তাকিয়ে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি শোককাতর গলায় বললেন, ‘মানুষের মনের জোর থাকলে তবেই না অনেক আসন্ন বিপদকে ওভারকাম করা যায়। সে জোর তো সকলের থাকে না নবনীতস্যার!’

   হেডস্যার বললেন, ‘আমাদের কত জনেরই বা তেমন শক্তি আছে মুকুলবাবু?’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, ‘পৃথিবীতে কত মানুষ কতভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেন! পৃথিবীকে জানতেও দেন না, তাঁর যন্ত্রণার কথা, তাঁর লড়াইয়ের কথা। আমি একজন মানুষের কথা বলব। যেহেতু আমি ক্রিকেট জগতের মানুষ, তাই আমার চিন্তায়, ভাবনায় ছড়িয়ে থাকেন সেই সব ক্রিকেট-মানুষরাই। এমন একজন ক্রিকেট-মানুষ ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং পৃথিবীখ্যাত ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার টনি গ্রেগ। তাঁর পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ার জুড়ে, এমনকী ক্রিকেট জীবনের পরও তিনি মৃগী অসুখে ভুগতেন। তাঁর যখন মাত্র চোদ্দো বছর বয়স, তখন তিনি প্রথম মৃগী অসুখে আক্রান্ত হন। আর মৃগী  এমন একটা অসুখ, যে-কখন যে-কোনও অবস্থায় আক্রমণ করতে পার। সে তিনি ব্যাটিং বা বোলিং করার সময়ও মৃগী রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এই নিশ্চয়তাহীন মৃগীরোগ নিয়েই তিনি খেলে গেছেন। ক্রিকেটে তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার। সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি রান করেছেন গোটা ক্রিকেট জীবনে। একশো একচল্লিশটি টেস্ট উইকেট ছিল তাঁর সংগ্রহে।’

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘আমরা টনি গ্রেগকে তো তাঁর খেলা দিয়েই চিনি! এই অসুখের কথা শুনিনি তো কখনও?’

   ‘টনি গ্রেগকে জানবে না কেন দেবোপম? বিখ্যাত ক্রিকেটার ছিলেন।’ মুকুলবাবু গলায় দৃঢ়তা এনে বললেন, ‘কিন্তু তাঁর সম্পর্কে যে কথাটি বড় আশ্চর্যের, তা হল, তিনি ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর অসুস্থতার কথা প্রথম ঘোষণা করেছিলেন। এর আগে পৃথিবী জানত না তাঁর অসুখের কথা। দু’ হাজার বারো সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে টনি গ্রেগ মারা যান। জীবনের শেষ দিকে টনি গ্রেগ ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়েও মরণপণ লড়াই করে গেছেন। কী অবাক কথা, বলো দেবোপম? সমস্ত জীবনে এত অকথিত যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেছেন তিনি নিজেই!’

   হেডস্যার গলায় বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, ‘মানুষের কী অপরিসীম সহ্যক্ষমতা! এত যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, অথছ মুখ ফুটে বলেননি কখনও? মানুষ কেমন করে এই অসীম সহ্যক্ষমতা অর্জন করেন মুকুলবাবু?’

   হেডস্যারের কথা শুনে মিটিমিটি হাসছিলেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। দেবোপমস্যারের ক্রিকেট-টিমের সদস্যরা অবাক হয়ে শুনছিল এই মরণজয়ী ক্রিকেটারের জীবনের গল্প। 

   দেবোপমস্যার জেদের গলায় বললেন, ‘মুকুলকৃষ্ণস্যার, আমাদের টিমের ছোটদের এরকম জীবনজয়ী আরও একটা-দুটো গল্প শোনান না, তা হলে ওরাও প্রেরণা পাবে জীবনযুদ্ধকে জেতার।’

   মুকুলবাবু ইতঃস্তত করলেন, ‘আজ থাক দেবোপম! আজ এখন সূর্যদেব পাটে যাওয়ার তোড়জোড় করছেন। ছেলেমেয়েরাও খেলে এসেছে। ক্লান্ত ওরা।’

   লোকন দাস অনুরোধের গলায় বলল, ‘মুকুলকৃষ্ণস্যার, আর একটা এরকম গল্প আপনি আমাদের শোনান। আমরা সেই জীবনজোড়া প্রেরণার কথা ভাবতে-ভাবতে বাড়ি ফিরে যাই?’ 

   এখন যতদিন অনীকদাদুর বাড়ির উঠোনে ক্রিকেট প্র্যাকটিস হবে, দেবোপমস্যার বলে দিয়েছেন, ‘আলাদা করে সেকশান ওয়াইজ তোমাদের প্র্যাকটিস কারানো যাবে না! তাই সকলে জটলা করেই প্র্যাকটিস করো।’ আজও সব সেকশানের ক্রিকেটারই এসেছিল। এইট ডি-সেকশানের রুচিকা গুপ্ত মুকুলস্যারকে বলল, ‘আজ আর মাত্র একজনের গল্প বলুন। তারপর আমরা বানই চলে যাই!’

   নাছোড় ছেলেমেয়েদের অনুরোধ ফেলতে পারলেন না মুকুলবাবু। বললেন, ‘আচ্ছা, আর একটাই গল্প আজ বলব। এর পর সন্ধে নেমে পড়বে ঝুপ করে। তোমাদেরও তো বাড়ি ফিরতে হবে?’ 

   ততক্ষণে শেডের কনট্রাক্টর মনোজ চাকলাদারও এসে দাঁড়িয়েছেন মুকুলবাবুর গল্পের পিছনে। মনোজবাবু বললেন, ‘আমি গল্প শোনার লোভে আর দূরে থাকতে পারলাম না। এসে যোগ দিলাম!’

   হেডস্যার বললেন, ‘বেশ করেছেন মনোববাবু। এসব গল্পও আপনাদের মতো মানুষ শুনলে আমাদের শেড তৈরির কাজেরও অগ্রগতি হবে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু স্বভাববশতঃ খানিক থেমে সকলের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। ততক্ষণে হেডস্যার বললেন, ‘আমি কোথায় কোন কাগজে পড়েছিলাম এখন আর ঠিক মনে নেই। আমাদের ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনি একটা সুন্দর কথা বলেছেন, ‘খেলার মাঠে জয়-পরাজয় দুটোই আছে, কিন্তু জীবনের মাঠে শুধুই জয় থাকাটাই উচিত। আমি কথাটা কোনও দিন ভুলব না!’  

   ক্রিকেট-টিম সজোরে হাততালি দিয়ে উঠল। এবার মুকুলস্যার বললেন, ‘আমি ক্রিকেট সম্পর্কে যেটুকু খবর রাখি, জানি, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে নিখুঁত টেকনিকের প্রতীক হিসেবে ধরা হয় লিটল মাস্টার সুনীল গাওস্করকে। যখন লাল বলের ক্রিকেটের সঙ্গে হিট বা রিভার্স সুইপের সঙ্গে পরিচয় হয়নি ক্রিকেটারদের, তখন বিপক্ষকে আটকে নিজের দলকে বাঁচাতে গাওস্কর একবার এমন দারুণ বুদ্ধি খাটিয়েছিলেন, যা ক্রিকেটের ইতিহাস ঘাঁটলে খুব একটা বেশি পাওয়া যায় না।’

   হেডস্যার গলায় বিস্ময় ফুটিয়ে মুকুলকৃষ্ণস্যারের কথার তারিফ করে বললেন, ‘আপনি যে কোথা থেকে এমন অজানা গল্প আমাদের শোনান, আমরা অবাক না হয়ে পারি না! বলুন, বলুন!’

   ‘তখন সময়টা ছিল উনিশশো একাশি-বিরাশি মরশুম। রঞ্জি ট্রফিতে বেঙ্গালুরুতে মুখোমুখি হয়েছিল তখনকার বোম্বে মানে এখনকার মুম্বই ও কর্ণাটক। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে কর্ণাটকের বাঁহাতি স্পিনার রঘুরাম ভাটের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে বোম্বের প্রথম ইনিংস দু’শো একাত্তর রানে শেষ হয়ে গেল। সেই ইনিংসে একাই আটটি উইকেট নিলেন রঘুরম ভাট। তিনি পিচের রাফ জায়গাটা কাজে লাগিয়ে বাজিমাত করেছিলেন।’ থামলেন মুকুলবাবু। খুদে ক্রিকেটাররা অবাক হয়ে শুনছে। বি-সেকশানের মায়ামি দেব কৌতূহলি গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর? বলুন, বলুন!’

   ফের মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘দ্বিতীয় ইনিংসেও দেখা গেল একই ছবি। পিচের ভাঙা জায়গা বা রাফ ব্যবহার করে বোম্বের টপ অর্ডার একাই ধ্বংস করে দিলেন রঘুরাম ভাট, তুলে নিলেন আরও পাঁচটি উইকেট। বোম্বে যখন নিশ্চিত হারের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তখন দলের পরাজয় ঠেকাতে বুদ্ধি খাটালেন অধিনায়ক গাওস্কর।’

   কনট্রাক্টর মনোজ চাকলাদার গলায় কৌতূহল ফুটিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী বুদ্ধি বের করলেন শুনি?’


   মুকুলবাবু বললেন, ‘সেটাই তো বলছি! গাওস্কর দেখলেন, দলের সব প্লেয়ারই হানহাতি আর এটাকেই কাজে লাগাচ্ছেন রঘুরাম ভাট। তখন স্পিনারকে বিভ্রান্ত করতে গাওস্কর ডানহাতি থেকে নিজেই বাঁ হাতে ব্যাট করতে শুরু করলেন। তিনি বাঁহাতি হিসেবে গার্ড নিলেন।’

   দেবোপমস্যার অবাক হয়ে বলে উঠলেন, ‘বলছেন কী? এও কি সম্ভব?’    

    মুকুলবাবু দু’ চোখ নাচিয়ে ভুরু জোড়াকে কপালে তুলে বললেন, ‘বাঁহাতি হওয়ার কারণে হল কী, উইকেটের রাফ থেকে বল ঘুরে বাইরের দিকে যাওয়ার বদলে সরাসরি গাওস্করের দিকে আসতে শুরু করল। তখন গাওস্কর  সহজেই প্যাড ও ব্যাট দিয়ে সামলে দিতে লাগলেন।’ 

   হেডস্যার নবনীতবাবু গলা তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই না হলে আমাদের সুনীল গাওস্কর!’

   ‘শুনুন না! চমকের এখানেই শেষ নয়।’ বলে থামলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। তারপর বললেন, ‘বিপক্ষ দল যখন দেখল রঘুরামের বাঁহাতি স্পেল খুব একটা কাজে আসছে না, তখন অন্য প্রান্ত থেকে ডানহাতি স্পিনারকে এনে বল করাতে শুরু করল কর্ণাটক। একদিকে বাঁহাতি এবং অন্যদিকে ডানহাতি স্পিনারকে খেলতে অবশ্য গাওস্করের আদৌ কোনও সমস্যাই হয়নি। গাওস্কর কত বড় ব্যাটসম্যান ছিলেন, এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়। কারণ, ডানহাতি স্পিনার বি বিজয়কৃষ্ণকে গাওস্কর খেলতে লাগলেন ডান হাতে। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাঁ হাতে ব্যাট করে আঠারো রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবুর গল্প যখন বড় কোনও দিকে বাঁক নেয়, তখন তিনি মিটিমিটি হাসতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ থেমে থাকেন। এখনও থেমে থেকে হাসতে হাসতে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘গাওস্কর এবং সতীর্থ গুলাম পারকারের এই জুটিতে ভর করে শেষ দিনের খেলার শেষে ন’ উইকেটে দু’শো আঠারো রান তুলে ম্যাচ ড্র করে বোম্বে।’

   মুকুলবাবু গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, ‘জানেন নবনীতস্যার, আমি তখন শুধু খেলা দেখতামই না, খেলার রিপোর্টিংও মন দিয়ে পড়তাম। আমার তখন ক্রিকেটের রিপোর্টিং পনতে দারুণ ভাল লাগত। পরে এক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাওস্কর বলেছিলেন, তা এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে। গাওস্কর বলেছিলেন, ‘রঘুরাম ভাটের বল যেভাবে ঘুরছিল, ডানহাতে ব্যাট করলে আমাদের বাঁচার কোনও উপায়ই ছিল না। তাই দলকে বাঁচাতে আমি বাঁহাতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’ বলে থামলেন মুকুলবাবু।

   কন্ট্রাক্টর মনোজ চাকলাদার বললেন, ‘আপনার ক্রিকেটের এই টানটান গল্পগুলো নিয়ে একটা বই লিখে ফেলুন মুকুলস্যার। না হলে ক্রিকেটের এই সব অজানা কথা ক্রিকেটপ্রেমী মানুষদের কাছে চিরদিন অজানাই থেকে যাবে!’

হা-হা-হা করে হাসি ছড়িয়ে দিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। বিনয়ী গলায় বললেন, ‘আমার দ্বারা বই লেখা কি সম্ভব মনোজবাবু? আমার কথা যে আপনাদের ভাল লাগছে, ছোটরা মন দিয়ে শুনছে, এই তো ঢের!’

   হেডস্যার মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন, ‘আমরা আরও এক-দু’দিন আপনার ক্রিকেটের গল্প শুনব, বুঝলেন মুকুলবাবু! আজকের মতো সক্কলে বাড়ই যাই?’

   ক্রিকেট-টিমসহ সকলে বাড়ির পথ ধরলেন। ততক্ষণে গল্পের আকর্ষণে কারও চোখেই পড়েনি, আকাশে গায়ে একটি-দুটি করে তারা ফুটতে শুরু করেছে! সন্ধ্যাতারা সব তারাকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বল করে আকাশের গায়ে!

(এর পর ৩৪ পর্ব)                                                                         

আয় ছুটে আয়
দুরন্ত বিজলী 

এই টুসি তুই ভিজবি নাকি 
আয় ছুটে আয় এই উঠোনে,
মেঘ জমেছে আকাশ তলে 
ছায়ার ভেতর গাছের বনে।

আয় তবে আয় টুম্পা টোটন
বৃষ্টি এবার নামল বলে,
আয় ছুটে আয় ছোট্ট টিটু 
কদমতলায় মাঠের কোলে।

আসবি যদি ছুটে আসিস
আমরা সবাই নাচছি এখন,
ঝিরিঝিরি ঝরছে ধারা 
থেমে যাবে যখন তখন।

বৃষ্টি এখন মাখছি আমরা 
ঝমঝমিয়ে বাজছে নূপুর,
এখন আমরা গাইছি সবাই 
রবিঠাকুর টাপুর টুপুর।
শেফালী সিং, ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী,চন্দ্রী চন্দ্রশেখর হাইস্কুল

শেষ বেঞ্চের নায়করা
শতভিষা ঘোষ‌

স্কুলের পেছনের বেঞ্চগুলো যেন আলাদা এক জগৎ। সেখানে ক্লাসের নিয়মগুলো ঠিক অতটা কড়া নয়, বকাঝকার শব্দগুলোও যেন হালকা হয়ে আসে। সেখানে বসে থাকা ছেলেগুলোও কিছুটা আলাদা। ওরা পড়াশোনায় হয়তো প্রথম নয়, কিন্তু হাসির গল্পে, নিঃশব্দ দুষ্টুমিতে, আর ছোট ছোট স্বপ্নে ওরাই সবার আগে। স্কুলের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে যেন পুরো ক্লাসরুমটা এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। কেউ হুড়মুড়িয়ে ব্যাগ গুছোচ্ছে, কেউ বইয়ের ভাঁজে চিরকুট লুকিয়ে রাখছে। টিচার ঠিক পেছন ফিরে ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু লিখছেন, আর সেই সুযোগেই শেষ বেঞ্চের চারজন সৈনিক তাদের গোপন মিশনে নেমে পড়েছে। শুভ, ঋতব্রত, অভীক আর সায়ন, চারটি নাম, অথচ একসঙ্গে তারা যেন একটাই গল্প। ক্লাসের খাতায় তারা ছিল "লাস্ট বেঞ্চার," কিন্তু একে অপরের কাছে? তারা ছিল চিরকালের নায়ক।
একদিন ক্লাসে ম্যাথের স্যার এলেন। গম্ভীর মুখে ডায়াসে উঠে বললেন,"আজ সবার হোমওয়ার্ক চেক হবে।"‌ চারজনের মুখ শুকিয়ে গেল। হোমওয়ার্ক? ওরা তো সেটাকে মনে মনে কল্পনার জগতে পাঠিয়ে দিয়েছে আগেই! "ভাই, প্ল্যান বি?" ফিসফিস করে বলল অভীক। "নাহ! আজ প্ল্যান সি!" শুভ জবাব দিল। প্ল্যান সি মানে হচ্ছে, চরম অভিনয়। শুভ আচমকা বলল,"স্যার, আমার পেনসিল বক্স থেকে হঠাৎ একটা সাপ বেরিয়ে গিয়েছিল! আমি তো ভয়ে হোমওয়ার্কই করতে পারিনি!"ঋতব্রত বলল,"স্যার, আমি তো গতকাল চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম… হঠাৎ মনে হলো, যদি চাঁদে ম্যাথের ক্লাস হতো? সেই ভাবনায়ই ঘুমিয়ে পড়েছি!" স্যার বিস্ময়ে চেয়ে থাকলেন। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "কাল সবাই যেন ডাবল হোমওয়ার্ক করে নিয়ে আসে!" চারজনের মুখে হাসি। মিশন সফল!
স্কুলের মাঠে অন্যরা যখন ক্রিকেট ব্যাট হাতে চিৎকার করে, ওরা তখন ছায়ার নিচে বসে গল্প বানায়। কেউ কখনো বলে,"ভেবেছিস, যদি একদিন মেঘের গায়ে বসা যেত?"
"আর যদি স্কুলটা হঠাৎ মেঘের ওপরে ভেসে যেত?"
এমন অলীক কল্পনায় বাস্তবের ক্লান্তি ধুয়ে যায়। ক্লাসের পড়া যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, ওরা মিলে ঠিক করে ফেলে ‘প্ল্যান বি’  কখনো বইয়ের ফাঁকে সুতোর মতো লেখা চিরকুট, কখনো মুচকি হেসে স্যারের চোখ ফাঁকি দেওয়া।
তবে ওদের বন্ধুত্বের আসল রং দেখা গিয়েছিল একদিন, যখন অভীক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে শুভরা অস্থির মনে তাকিয়ে থাকত। ক্লাসের শূন্য বেঞ্চটা যেন আরও ফাঁকা লাগত।
ঋতব্রত বলেছিল,
"স্কুলটা তো অভীকের হাসি ছাড়া কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেছে।" সায়ন গম্ভীর মুখে বলেছিল, "বন্ধু না থাকলে জয়ধ্বনি দিয়েও কোনো খেলা জেতা যায় না।"
সেদিন স্কুল ছুটির পর ব্যাগ কাঁধে তুলে চারজনের তিনজন ছুটেছিল অভীকের বাড়ির দিকে। অভীকের ক্লান্ত চোখেও সেদিন ছিল অদ্ভুত এক আলো -- "তোরা এসেছিস?"
শুভ হেসে বলেছিল,‌ "বন্ধুর দরজায় দাঁড়ানোটা তো আমাদের জয়।"
সময় চলে যায়। ক্লাসের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা অঙ্কগুলো মুছে যায়, কিন্তু শেষ বেঞ্চের গল্পগুলো কখনোই মুছে যায় না। পরীক্ষার খাতায় হয়তো ওদের নামের পাশে লাল কালি বসে থাকত, কিন্তু জীবনের খাতায় ওরা ছিল চিরসবুজ।
একদিন স্কুলের শেষ ঘণ্টা বাজবে। ব্যাগের চাপে আর ক্লাসের বেঞ্চগুলো যেন আরও ভারী হয়ে উঠবে। কিন্তু শেষ বেঞ্চের সেই নায়করা জানবে তারা  জিতেছে। কারণ তারা পরীক্ষার অগোচরে থাকা  জীবনের পরীক্ষার ফলাফলে সর্বদা প্রথম।

৩৩ গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ তেত্রিশ পর্ব

  মরদেহ রয়েছে। উনি এত দরদি মানুষ ছিলেন। সকলের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।’

   

   ওদিক থেকে সেঁজুতি সামন্ত বললেন, ‘স্যার, মরদেহ আমরা কাল সকালে আপনার স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এখন তো সন্ধে হয়ে এসেছে। ওঁর বাড়ির লোকজনও এখানে আছেন। ওঁদেরও বলছি সে কথা।’

   

    ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং পৃথিবীখ্যাত ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার টনি গ্রেগ। তাঁর পুরো 

    এত অকথিত যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেছেন তিনি নিজেই!’

   

    আর একটা এরকম গল্প আপনি আমাদের শোনান। আমরা সেই জীবনজোড়া প্রেরণার কথা ভাবতে-ভাবতে বাড়ি ফিরে যাই?’ 

     

    করতে শুরু করলেন। তিনি বাঁহাতি হিসেবে গার্ড নিলেন।’


মনের পাঠশালা ৭

দীপালি সাহু 
M.A Psychology ( clinical),  MSW 
working as a counsellor at a govt. hospital
Midnapur. 

 আগের সংখ্যায় বলেছিলাম এবার থেকে কৈশোরের বিভিন্ন টানাপোড়েন নিয়ে লেখা শুরু করবো। প্রথম অধ্যায় হলো “নিজের সাথে লড়াই ” । 

1 . মনের ভেতরের রোলারকোস্টার (মুড সুইং)
মৌলির গল্প:এই ঝকঝকে রোদ ,এই মুষলধারে বৃষ্টি 

মৌলির বয়স এখন ঠিক চৌদ্দ বছর পাঁচ মাস। ইদানিং আয়নার সামনে দাঁড়ালে মৌলির নিজেকে কেমন যেন বড়ো বড়ো লাগে , তার ফ্রকগুলো ও ইদানীং একটু ছোট হয়ে আসছে । নিজের শরীর দেখতে কি সুন্দর লাগে কিন্তু শরীরের এই বদলগুলোর চেয়েও মৌলির  মনের ভিতরে কি যে ঘটছে, সে নিজেই কোনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, সে যেন নিজের ভেতরেই একটা অচেনা মানুষের সাথে বসবাস করছে।কখনো মনের ভিতর ঝর্ণার মতো জল তরঙ্গ বাজে আবার কখনো আগুনের মতো তাপ তৈরী হয় । কেন হয় কিছুতে বুঝতে পারে না । কাউকে বোঝাতেও পারে না ।
আজ সকালের কথাই ধরা যাক। বাইরে চমৎকার মিষ্টি রোদ ছিল। ঘুম থেকে উঠেই মৌলির মনটা কেমন যেন এক অজানা আনন্দে নেচে উঠল। সে বারান্দায় গিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে টবের গাছে জল দিল, ফুলের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলো , ফুলের ছবি তুললো। মাকে এসে একবার জড়িয়ে ধরলো ।তারপর লক্ষ্মী মেয়ের মতো প্রাতরাশ সেরে পড়ার টেবিলে এসে বসল। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দিন।
কিন্তু ঘন্টা খানেক পরে মনের আকাশে হটাৎ কালবৈশাখী ঝড় উঠলো । ঘন্টা খানেক মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর একটু ব্রেকফাস্ট নেওয়ার ইচ্ছে হলো।ভাবলো কালকের ফ্রিজে রাখা কিছুটা চকোলেট খেয়ে জল খেয়ে অংক নিয়ে বসবে।  স্যার এর দেওয়া সবগুলো অংক করে  ফেলবে। যখন ফ্রিজ খুলে দেখল, তার রেখে দেওয়া চকোলেটের শেষ টুকরোটা তার ছোট ভাই খেয়ে ফেলেছে। ব্যস! ওই সামান্য ঘটনাটুকুর পর মৌলির মাথার ভেতর যেন একটা বোমা  ফেটে গেল। সে প্রচণ্ড চিৎকারে পুরো বাড়ি মাথায় তুলল। ভাই কে মারলো । মা যখন এসে শান্ত করতে গেলেন, বললেন বিকালে বাজার করতে গিয়ে শুধু ওর জন্য একটা চকোলেট এনে দেবেন ।মৌলি মায়ের ওপর চিৎকার করে বললো“না আমার ওই চকোলেট টাই চাই ”মাএরকনো কোথায় শুনলো না।  উল্টে মাকে এমন সব কড়া কথা শুনিয়ে দিল, যা সে নিজেও কখনো ভাবেনি। তারপর “তোমরা আমাকে কেউ ভালোবাসো না”বলে নিজের ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদতে বসল।
রাগটা যখন এক ঘণ্টা পর থিতু হলো, বাইরে তখন সত্যি সত্যি ঝুম বৃষ্টি নামল। জানলার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে বসে মৌলির  বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অপরাধবোধে খচখচ করতে লাগল। সে ভাবল—"আচ্ছা, একটা চকোলেটের জন্য আমি মায়ের সাথে অমন নোংরা ব্যবহার কেন করলাম? ছোট ভাইটাকে এমন জোরে মারলাম? “ আমার কি সত্যি কোনো মানসিক রোগ হচ্ছে?" একই দিনে কখনো একরাশ  আনন্দ , কখনো খুব রাগ,  আবার কখনো একরাশ তীব্র অনুশোচনা ।মৌলির  মনে হয়, তার মনের ভেতর যেন একটা রোলারকোস্টার চলছে, যার ব্রেকটা তার নিজের হাতে নেই!
মনের ডায়েরি: "আমি কি আসলেই একটা খারাপ মেয়ে?"
প্রিয় ডায়েরি,
আমি নিজেই জানি না আমার ইদানীং কী হচ্ছে ।একটুতেই আমার গা-জ্বালানো রাগ কেন হয় বল তো? কেন হুট করে কোনো কারণ ছাড়াই একা একা কাঁদতে ইচ্ছে করে? মা-বাবা কাল রাতে খাবার টেবিলে বলছিলেন যে আমি নাকি দিন দিন প্রচণ্ড অহংকারী আর জেদি হয়ে যাচ্ছি। আমি নাকি বড়দের মান-সম্মান করতে শিখছি না ।মা বাবাকে দোষারোপ করলো যে আমি নাকি বাবার আশকারাতেই দিনে দিনে মাথায় উঠছি।  আরো কত কি ....কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে করি না! রাগটা যখন আসে, আমার নিজের শরীরের ওপর, নিজের মুখের কথার ওপর কোনো কন্ট্রোল থাকে না। মনে হয় ভেতর থেকে অন্য কেউ এসে আমাকে দিয়ে এই চিৎকারগুলো করাচ্ছে। রাগ কমে যাওয়ার পর যখন নিজের ভুলটা বুঝতে পারি, তখন নিজের ওপর এত ঘৃণা আর লজ্জা হয় যে কী বলব। সত্যি কি আমি কি দিন দিন একটা খারাপ মানুষ হয়ে যাচ্ছি? আমি তো সবাইকে খুব ভালোবাসি ।সবাই কেন আমার দিকটা একটা বারও বুঝতে চায় না?
ছোট বন্ধুরা, মৌলির এই ডায়েরির পাতাটা কি তোমার নিজের জীবনের কোনো এক দিনের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে? যদি মিলে যায়, তবে শুরুতেই বুক থেকে একটা মস্ত বড় পাথর নামিয়ে রাখো—তুমি মোটেও কোনো খারাপ মানুষ হয়ে যাচ্ছ না, আর তোমার কোনো মানসিক রোগও হয়নি! বিজ্ঞান এই খামখেয়ালি মনের খুব সুন্দর এবং নিখুঁত একটা উত্তর আমাদের দিয়েছে।
তুমি যখন বড় হচ্ছ, তখন শুধু তোমার উচ্চতা বাড়ছে না, তোমার মাথার ভেতরের বুদ্ধির বাক্স অর্থাৎ ব্রেন (Brain)-এর ভেতরেও মস্ত বড় একটা কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। নতুন নতুন তার জুড়ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে বুঝতে হলে আমাদের ব্রেনের দুটো অংশকে চিনতে হবে:
আবেগের সুপারফাস্ট ইঞ্জিন: অ্যামিগডালা (Amygdala)
আমাদের ব্রেনের ঠিক মাঝখানটায় বাদামের মতো ছোট্ট একটা অংশ থাকে, যার নাম অ্যামিগডালা।এর কাজ হলো আমাদের তীব্র আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা—যেমন হুট করে রেগে যাওয়া, ভয় পাওয়া, উত্তেজিত হওয়া বা কেঁদে ফেলা। বয়ঃসন্ধিকালে (Adolescence) এই অ্যামিগডালা অংশটি হুট করে খুব শক্তিশালী এবং দ্রুত বড় হয়ে যায়। এর মানে হলো, এই বয়সে তোমার ভেতরের আবেগের ইঞ্জিনটা একটা বুলেট ট্রেনের মতো সুপারফাস্ট স্পিডে চলতে শুরু করেছে।
যুক্তি-বুদ্ধির কাঁচা ব্রেক: প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex)
এবার শোনো আমাদের ব্রেনের ঠিক কপালের পেছনে থাকে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স।এর কাজ হলো ব্রেকের মতো কাজ করা। এটা আমাদেরজে কোনো বিষয় যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায় । কোনো পরিস্থিতি আমাদের ইচ্ছে মতো না হলেও সেটা কিভাবে আয়ত্বে আনবো সেটা শেখায় ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে ।
কিন্তু মুশকিলটা হলো, বিজ্ঞান বলছে মানুষের এই প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বা ব্রেকটা পুরোপুরি তৈরি হতে প্রায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
সহজ ভাষায় বৈজ্ঞানিক সত্যটা তাহলে কী? তোমার ভেতরের আবেগের ইঞ্জিনটা এখন একদম নতুন আর সুপারফাস্ট, কিন্তু সেই আবেগকে থামানোর জন্য যে ব্রেকটা দরকার, সেটা এখনও কাঁচা এবং তৈরি হচ্ছে। গাড়ির ব্রেক যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে চালকের যত ভালো ইচ্ছেই থাকুক না কেন, গাড়ি তো প্রায় ই  নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবেই! তাই হুট করে মুড বদলে যাওয়াটা তোমার দোষ নয়, এটা তোমার ব্রেনের গড়ে ওঠার একটা স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক টানাপোড়েন।  
আজ এই পর্যন্ত থাক । এই রকম অসুবিধার সময় তোমরা  নিজে নিজেকে কিভাবে সাহায্য  করতে পারো সেটাজানার জন্য খুব কৌতূহল হচ্ছে নিশ্চই ।তাহলে পরের পর্বে অবশ্যই চোখ রেখো ।

ক্যুইজ- ১৭ 


১. পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কোনটি? 
2. ফারাক্কা বাঁধ কোন নদীর উপর? 
৩. রেডিও বিঞ্জান এর পথিকৃৎ কে? 
৪. পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে বৃহত্তম মেলা কোনটি? 
৫. পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া কেন বিখ্যাত? 


গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর 

১. লক্ষণ ভোগ 
2. লিচু 
৩. আলিপুর দুয়ার 
৪. এক শৃঙ্গ গন্ডার 
৫. জলপাইগুড়ি

Post a Comment

0 Comments