জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/ পর্ব ২৫/প্রীতম সেনগুপ্ত


ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ২৫

প্রীতম সেনগুপ্ত 


‘ধর্ম ও নীতি’ বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ আশীর্বাদধন্য বৈষ্ণবাচার্য বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বা গোঁসাইজীর বিচারটি এইরকম ‘...ধর্ম্ম বলিতে কি বুঝিবে? যেমন আগুনের ধর্ম্ম দাহিকা শক্তি, জলের ধর্ম্ম শীতলতা, ধর্ম্মও সেইরূপ মানবের স্বভাব। যাহা সত্য, অসত্য; জ্ঞানী অজ্ঞানী শিশু বৃদ্ধ প্রভৃতি সকলপ্রকার --অবস্থাপন্ন লোকের মধ্যেই সাধারণভাবে আছে, তাহাই মানবের স্বাভাবিক গুণ। এই গুণ তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। জ্ঞান, প্রেম, ইচ্ছা। এই তিন গুণের উৎকর্ষ সাধনই মানবজীবনের উদ্দেশ্য --- ইহাই মানবধর্ম্ম।

ধর্ম্ম সত্য বস্তু। যে সত্য সর্ব্বসাধারণের নিকটে সত্য বলিয়া প্রতীত হয়, যাহা প্রত্যেক জাতিতে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ে  সত্য বলিয়া বিশ্বাস করে, যাহাতে ব্যক্তিবিশেষেরও মতবিরোধ নাই, যাহা সকলের পক্ষেই সত্য, তাহাই মানব প্রকৃতির ভোগ্য ---- স্বভাবের সত্য।

জগৎকে কেহ সৃষ্টি করিয়াছেন, জগৎ আছে, আমি একজন আছি। এই তিনটি জ্ঞান সমস্ত মানবের স্বাভাবিক। ইহা কোথাও শিখিতে হয় না। সত্য কথা বলা উচিত, অন্যের প্রতি অত্যাচার করা অসঙ্গত, ইত্যাদি কতকগুলি বিষয়ও স্বভাবের সত্য। যেখানে মনুষ্য আছে, সেখানেই এ সকল সত্য ; সত্যবোধ স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গে আছে। মনের এ সকল সরল সত্যকে যিনি যে পরিমাণে বুঝিতে পারিবেন, জ্ঞান তাঁর নিকটে সেই পরিমাণে প্রকাশিত হইবে। সরল সত্যের অনুসরণ করিলেই ধর্ম্ম লাভ করা যায়। মানবের যথার্থ প্রকৃতি বা সরল সত্যই মানবের ধর্ম্ম। সন্তুষ্ট চিত্ত না হইলে ধর্ম্ম কখনও লাভ হয় না। সরলভাবে সত্য পালন করিলেই চিত্তে সন্তোষ লাভ হয়। অসত্য কার্য্য, অসত্য চিন্তা করিলে চিত্তে অসন্তোষ জন্মায়, সন্তুষ্টচিত্ত হইতে হইলে সরলভাবে সত্যের অনুসরণ করিতে হয়।

সরল সত্যের যিনি অনুষ্ঠান করিবেন, তিনি প্রাণের স্বাভাবিক বৃত্তির অনুরোধেই করিবেন; কিছুরই অপেক্ষা রাখিবেন না; দশের দিকে, সমাজের দিকে, কারও উপকার বা অনিষ্টের দিকে --- এমন কি, নিজেরও মঙ্গল অমঙ্গলের দিকে --- দৃষ্টিশূন্য হইবেন; আপন কর্ত্তব্য আপন মনে করিয়া যাইবেন। তাঁর কার্য্য লোক-দেখান হইবে না। কারও দিকে না তাকাইয়া, চন্দ্র সূর্যের মত, আপন কাজ নীরবে করিয়া যাইবেন। এইরূপে কেহ চলিলে, চতুর্দ্দিকে লোকে তাঁর জীবন দেখিয়া জীবন পাইবে, ধন্য হইবে।

নীতি কি? যে সকল সরল সত্যের কথা বলা হইল --- অর্থাৎ সত্য কথা বলা, কারও অপকার না করা, অশ্লীল ও অনিষ্টকর ব্যবহার হইতে বিরত থাকা ইত্যাদি ---- তাহাই সাধারণ নীতি। এই সাধারণ নীতি সর্ব্ববাদিসম্মত। প্রাকৃতিক ও মানবজাতির স্বাভাবিক নীতি ---  ইহা সকলের পালনীয়। ইহা-ভিন্ন আরও অন্যপ্রকারের নীতি আছে। তাহা দেশভেদে, কালভেদে ও পাত্রভেদে কখনও আবশ্যক হয়, আবার কখনও বা হয়ও না। এই নীতি সকল স্থানে সমান নয়। ...

মানুষের কর্ত্তব্য সকলেরই এক না হইলেও দেশগত, সমাজগত, কালগত নীতি এবং যে যাহা কর্ত্তব্য বলিয়া স্বীকার করিয়া নেয় তাহা পরিষ্কার অন্যায় বোধ না হওয়া পর্যন্ত সর্বতোভাবে প্রতিপালন করা আবশ্যক।’ (শ্রীশ্রী সদগুরুসঙ্গ, কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ) 

স্বামী বিবেকানন্দ ‘গীতা প্রসঙ্গ’ তে বলছেন --- ‘কর্ম কর। অনাসক্ত হও। ইহাই সম্পূর্ণ কর্মরহস্য। যদি আসক্ত হও, দুঃখ আসিবে।’ ( স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা,৮ম খণ্ড )

🍂

Post a Comment

0 Comments