দূর দেশের লোকগল্প—২৯৮
হাতির লেজ
মোজাম্বিক (আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
এক দেশে এক মহিলা বাস করতেন। তাঁর তিনটি ছেলে। ছেলেরা তাদের মাকে খুব ভালোবাসত এবং সবসময় তাঁকে খুশি রাখার চেষ্টা করত।
দিন যায়। সময়ের সাথে সাথে মা একসময় খুব বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়লেন। তিন ভাই তখন চিন্তা করতে লাগল, মায়ের তো দিন শেষ হয়ে আসছে। এ সময় মাকে পরম আনন্দ দেওয়ার জন্য তারা কী করতে পারে।
বড় ছেলে প্রতিজ্ঞা করল, মা মারা গেলে, সে পাথর কেটে তাঁর জন্য একটি সুন্দর সমাধি তৈরি করবে।
মেজো ছেলে বলল, সে একটি চমৎকার কফিন তৈরি করবে মায়ের জন্য।
আর, ছোট ছেলে বলল, আমি যাব এবং রাজকুমারীর হাতির লেজ নিয়ে এসে, মায়ের কফিনের ভেতর দেব।
কিন্তু ছেলেটার জানা ছিল না, এই প্রতিজ্ঞাটি রক্ষা করা ছিল বাকি সবার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
বেশি দিন গেল না। একদিন তাদের মা মারা গেলেন। ছোট ছেলেটি কোথায় সেই লেজ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র না জেনে, তখনই খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
তিন সপ্তাহ ভ্রমণ হয়ে গিয়েছে তার। অবশেষে একদিন সে একটি ছোট গ্রামে এসে পৌঁছাল। সেখানে তার সাথে এক বুড়ির দেখা। বুড়ি ছেলেটিকে দেখে, বেশ অবাক হল। বুড়ি বলল-- এর আগে কোনো মানুষ এই জায়গায় আসেনি। তুমি কেন এসেছ?
ছেলেটি তখন রাজকুমারীর হাতির লেজ খোঁজার গল্পটি তাঁকে খুলে বলল। বুড়ি উত্তর দিল, এই গ্রামটিই হলো সমস্ত হাতিদের বাসস্থান। রাজকুমারীর হাতি প্রতি রাতে এখানেই ঘুমায়।
কিন্তু বুড়ি তাকে সতর্ক করে বলল যে, হাতিরা যদি তাকে দেখতে পায়, তারা কিন্তু তাকে মেরে ফেলবে। যুবকটি তখন বুড়িকে অনুরোধ করে বলল—আমাকে কোথাও একটু লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে দাও তুমি।
বুড়ি তাকে এক বিশাল কাঠের স্তূপের মধ্যে লুকিয়ে রাখল।
বুড়ি তাকে আরও বলল-- হাতিরা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, তখন তুমি চুপিসারে উঠে, পূর্ব কোণে চলে যাবে। সেখানেই তুমি রাজকুমারীর হাতিকে দেখতে পাবে। একদম নির্ভীকভাবে হেঁটে যেতে হবে তোমাকে। এক্টুও ভয় পেলে চলবে না। লেজটি কেটে, একইভাবে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু যদি তুমি চোরের মতো লুকিয়ে বা গুটিগুটি পায়ে হাঁটার চেষ্টা কর, তবে হাতিরা জেগে উঠবে এবং তোমাকে ধরে ফেলবে।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে হাতিরা ফিরে এল। তারা এসেই বুড়িকে বলল-- মানুষের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে যেন।
বুড়ি তাদের আশ্বস্ত করে বলল-- এটা তোমাদের ভুল ধারণা। মানুষ কোথা থেকে আসব এখানে?
রাতের খাবার তৈরি ছিল হাতিদের। তারা খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে চলে গেল।
মধ্যরাতে যুবকটি উঠে দাঁড়াল এবং যেখানে রাজকুমারীর হাতি ঘুমাচ্ছিল, সেখানে নির্ভীকভাবে হেঁটে গেল। টুক করে লেজটি কেটে নিয়ে, যেভাবে গিয়েছিল ঠিক সেভাবেই ফিরে এল। তারপর তাকে আর পায় কে। বুড়িকে ধন্যবাদ জানিয়ে, লেজটি খুব সাবধানে গুছিয়ে নিয়ে, বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ভোর হতেই হাতিরা জেগে উঠল। একজন বলল সে স্বপ্ন দেখেছে যে রাজকুমারীর হাতির লেজ চুরি হয়ে গেছে। বাকিরা এমন কথা ভাবার জন্য তাকে মারধর করল। দ্বিতীয় আরেকজন হাতি বলল, সেও একই স্বপ্ন দেখেছে। তখন সবাই মিলে তাকেও মারধর করা হলো।
তখন হাতিদের সর্দার বলল—নিজেদের মধ্যে মারামারি করে লাভ কী? স্বপ্নটি সত্যি কি না, একবার গিয়ে দেখে আসাই তো ভালো।
হাতিরা সেটাই করল। তারা গিয়ে দেখল, রাজকুমারীর হাতি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু তার লেজটি নাই। লেজটা যে কাটা গেছে, সেটুকুও সে জানে না।
সবাই মিলে তাকে জাগিয়ে তুলল। সর্দার সব দেখে, চোরের সন্ধানে পাঠিয়ে দিল হাতিদের। হাতিরা সবাই মিলে সেই যুবকের পিছু তাড়া করতে শুরু করল।
হাতিরা এত দ্রুত দৌড়াচ্ছিল যে বেলা দূপুর না হতেই যুবকের নাগাল পেয়ে গেল। হাতিদের আসতে দেখে যুবকটি বেশ ভয় পেয়ে গেল। কী করে রেহাই পাওয়া যায় এদের হাত থেকে?
হয়েছে কী, এই ছেলেটার একটা প্রিয় মূর্তি ছিল। সব সময় নিজের ঝাঁকড়া চুলের ভিতর লুকিয়ে রাখত মূর্তিটাকে। বিপদের সময় মূর্তিটার কথাই প্রথমে মনে পড়ল তার। চিৎকার করে বলল-- ও আমার জুজু দেপোর (এটাই তার মূর্তির নাম।)! এই বিপদে আমি এখন কী করব?
জুজু দেপোর বলল—একটাই উপায় আছে। কাঁধের উপর দিয়ে একটা ডাল ছুঁড়ে দাও পেছন দিকে।
ছেলেটি তা-ই করল। একেবারে ভোজবাজির মতো ব্যাপার। মাটিতে পড়বার সাথে সাথে, সেটি একটি বিশাল গাছে পরিণত হল। যা হাতিদের পথ আটকে দিল। হাতিরাও থেমে গিয়ে, গাছটির ডালপালা ভেঙে খেতে শুরু করে দিল। তাতে কিছুটা সময় চলে গেল তাদের।
কিন্তু জোর দৌড় লাগিয়ে, এগিয়ে যাওয়া ছেলেটিকে আবারও সামনে পেয়ে গেল হাতিরা। ছেলেটিও আবার চিৎকার করে বলল-- ও আমার জুজু দেপোর! আমি এখন আবার কী করব?
জুজু দেপোর বলল-- তোমার পেছনে যে ভুট্টার মোচাটি রাখা আছে, ওটা ছুঁড়ে দাও।
ছেলেটি তা-ই করল এবং মোচাটা মাটিতে পড়বার সাথে সাথে, সেখানে বিশাল একটা ভুট্টার খেত জেগে উঠল।
হাতিরা তো আহ্লাদে আটখানা। খেতে নেমে ভুট্টা খেতে শুরু করে দিল। খেতে খেতে পথ করে এগিয়ে, যখন তারা খেতের অন্য প্রান্তে পৌঁছাল, ততক্ষণে ছেলেটি বাড়ি পৌঁছে গেছে।
অগত্যা হাতিরা তাড়া করা ছেড়ে দিয়ে, নিজেদের ডেরায় ফিরে চলল। কিন্তু রাজকুমারীর হাতির লেজটা তো ছেলেটি ঘরে নিয়ে এসেছে। লেজটা ভাবল, আমি এই ধৃষ্ট ছেলেটিকে শাস্তি না দিয়ে থামব না।
যাওয়া আসায় বেশ ধকল গিয়েছে। হাতির লেজটা আলনায় তুলে রেখে ছেলেটা গিয়েছে নদীতে স্নান করতে। সেই সুযোগে লেজটা নিজে একটি মেয়ে সেজ ফেলেছে। অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। এমন সুন্দরী এই এলাকায় কেউ কোন দিন দেখেনি।
পরমা সুন্দরী মেয়েটি গ্রামের দিকে এগিয়ে চলল। হাতে লাউয়ের তৈরি একটা করতাল। গ্রামের যত যুবক ছেলে সবাই ভীড় করে এসেছে, মেয়েটিকে বিয়ে করতে চায় তারা।
বুড়োরাও সবাই চায়, এমন একটি মেয়ে তার বাড়িতে ছেলের বউ করে নিয়ে যাবে। মেয়েটি হেসে বলল—যে কেউ এই করতালে তীর ছুড়ে নিশানা লাগাতে পারবে, সে-ই তাকে কনে হিসেবে পাবে।
যুবকেরা সবাই চেষ্টা করল এবং সবাই ব্যর্থ হলো। তখন গ্রামের মোড়ল বলল—বুড়ির ছোট ছেলেকে খবর দাও। একমাত্র সেই পারবে তীর বিঁধতে।
অনেকের বিশ্বাস হচ্ছে না। মোড়ল জবাব দিল—যে ছেলে রাজকুমারীর হাতির লেজ কেটে আনতে পারে, করতালে তীর মারাটা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।
মেয়েটি তো তাকেই শিক্ষা দিতে চাইছে। সে বলল—তাহলে তাকেই ডাকো। এমন কাজ যে পেরেছে, সেই পুরুষকে আমি বিয়ে করব। সে করতালের মাঝে তীর মারতে পারুক, আর নাই পারুক।
স্নান সেরে, ছেলেটি গিয়েছিল মাঠে লাঙল দিতে। তাকে মাঠ থেকে ডেকে আনা হলো। তাকে তার সৌভাগ্যের কথা জানানো হলো। সে কিন্তু এ কথা শুনে মোটেও আনন্দিত হলো না। তার মন বলছে, নিশ্চয় মেয়েটি কোনো ফন্দি আঁটছে।
যাইহোক, সে এল এবং মোড়লের কথায় একটি তীর ছুঁড়ল। অবাক ব্যাপার, কেউ যা পারেনি, তীরটা একেবারে করতালের ঠিক মাঝখানে গিয়ে লাগল। সারা মাঠ হই-হই করে উঠল। ধুমধাম করে মেয়েটির সাথে বিয়ে হয়ে গেল তার।
এদিকে মেয়েটি মনে মনে সবসময় তাকে শাস্তি দেওয়ার উপায় খুঁজছিল। বিয়ের পরের রাত। ছেলেটি ঘুমাচ্ছে। তখন মেয়েটি আস্ত একটা হাতিতে পরিণত হলো। পায়ে পিষে মারতে যাবে, ঠিক সময়ে ছেলেটি জেগে উঠল। চিৎকার করে বলল-- ও আমার জুজু দেপোর! আমাকে বাঁচাও!
জুজু দেপোর সাথে সাথে তাকে বিছানায় পড়ে থাকা একটি ঘাসের মাদুরে পরিণত করে দিল। মেয়েটি তাকে আর খুঁজে পেল না।
পরদিন সকালে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল—কাল সারা রাত কোথায় ছিলে তুমি?
ছেলেটি হেসে বলল-- তুমি যখন হাতি সেজেছিলে, তখন আমি সেই মাদুরটি ছিলাম, যার ওপর তুমি সারা রাত শুয়ে ছিলে।
মেয়েটি তখন রাগ করে বিছানা থেকে সব মাদুর নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দিল।
পরের রাতে রাজকুমারী আবারও হাতিতে রূপান্তরিত হলো এবং তার স্বামীকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিল। এবার জুজু দেপোর তাকে একটি সুঁইয়ে পরিণত করল এবং তার স্ত্রী তাকে খুঁজে পেল না।
সকালে সে আবার তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় ছিল। জুজু দেপোর তাকে আবারও সাহায্য করেছে জানতে পেরে, মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিল, যেকোনো উপায়ে হোক, আগে সেই মূর্তিকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে হবে।
পরের দিন ছেলেটি আবার তার খামারে লাঙল দিতে যাচ্ছিল। সে তার বউকে বলল, দূপুর হলে, কাজের জায়গায় আমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসবে।
এবার মেয়েটি মনে মনে পাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এবার আর কিছুতেই রেহাই পাবে না। দূপুরে খামারে খাওয়ার পর, মেয়েটি বলল—অনেক খাটাখাটুনি হয়েছে। এখন আমার কোলে মাথা রেখে, একটু ভালো করে জিরিয়ে নাও।
ছেলেটির মনেই নাই, তার মাথার চুলে জুজু দেপোরটা লুকানো আছে। বউয়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল সে। মেয়েটি তো এরই অপেক্ষায় ছিল। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ার সাথে সাথেই, তার চুল থেকে জুজুটি বের করে নিল এবং একটি বিশাল আগুন তৈরি করে, তাতে ছুড়ে ফেলে দিল।
ছেলেটা জেগে উঠে দেখল, তার বউ আবারও হাতিতে রূপ নিয়েছে। প্রচণ্ড ভয়ে সে চিৎকার করে বলল-- ও আমার জুজু দেপোর! আমি এখন কী করব?
তবে, সে যে উত্তরটি পেল, সেটা এল আগুনের শিখা থেকে— আমি পুড়ছি, আমি পুড়ছি, আমি পুড়ছি।
ছেলেটি কিছু বুঝতে পারল না। সে আবার সাহায্য চাইল। কিন্তু জুজু দেপোরেরও তখন পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। কোন রকমে উত্তর দিল—নিজের হাত দুটো ওপরে তুলে ধরো। মনে করো, তুমি আকাশে উড়ে যাচ্ছো।
সাথে সাথে তাই করল ছেলেটি। আর, সত্যি সত্যি একটা বাজপাখি হয়ে গেল সে। আকাশে উড়ে গেল বড় বড় দুটি ডানা মেলে। মেয়েটি কোন ক্ষতিই করতে পারল না তার।
আর, এ জন্যই বাজপাখিদের প্রায়শই আগুনের ধোঁয়ার উপরে উড়তে দেখা যায়। আজও তারা তাদের পুড়ে যাওয়া জুজু দেপোর-কে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
0 Comments