ভারতের জাতীয় পতাকার বিবর্তন
তারাশংকর দে
ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস আসলে কেবল একটি পতাকার নকশা বদলের ইতিহাস নয়—এটি স্বদেশি আন্দোলন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মনির্ভরতার দীর্ঘ সংগ্রামের দৃশ্যমান দলিল। বর্তমান তেরঙা পতাকা ১৯৪৭ সালে চূড়ান্ত রূপ পেলেও তার পেছনে রয়েছে একাধিক পতাকার বিবর্তন। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ১৯০৬ সালে কলকাতায় প্রথম জাতীয়তাবাদী পতাকা উত্তোলন থেকে ১৯৪৭ সালের তেরঙা পর্যন্ত এই যাত্রা স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা ও জাতীয় পতাকার বিবর্তন
১. ১৯০৬—প্রথম জাতীয়তাবাদী পতাকা
ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা হিসেবে সাধারণত ৭ আগস্ট ১৯০৬ কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে উত্তোলিত পতাকাটিকেই উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে জায়গাটি গ্রিন পার্ক নামে পরিচিত। এটি হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের আবহে।
পতাকাটিতে ছিল তিনটি সমান্তরাল অনুভূমিক রং—লাল, হলুদ ও সবুজ।
উপরের লাল অংশে ছিল পদ্মফুলের প্রতীক।
মাঝের হলুদ অংশে লেখা ছিল ‘বন্দে মাতরম্’।
নিচের সবুজ অংশে সূর্য ও চাঁদের প্রতীক ছিল।
এই পতাকা আজকের জাতীয় পতাকা ছিল না; বরং এটি ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রথম প্রতীক। তবু স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ঐতিহাসিক সতর্কতা: ‘ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা’ বলতে ১৯০৬-এর কলকাতা পতাকাকে সরকারি ও জনপ্রিয় ইতিহাসে সাধারণত বোঝানো হয়। তবে তারও আগে জাতীয়তাবাদী প্রতীক বা পতাকার কিছু নকশা নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। তাই ‘প্রথম’ শব্দটি ব্যবহার করার সময় এই পার্থক্যটি মনে রাখা প্রয়োজন।
২. ১৯০৭—ভিকাজি কামার পতাকা
১৯০৭ সালে বিপ্লবী মাদাম ভিকাজি কামা বিদেশের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতার পতাকা তুলে ধরেন। প্যারিসে তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই পতাকার ইতিহাস বিশেষভাবে যুক্ত; পরবর্তীতে এটি আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনেও প্রদর্শিত হয়েছিল বলে সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে।
এই পতাকা ১৯০৬-এর পতাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও কিছু পরিবর্তন ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ভারতের স্বাধীনতার দাবি এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে গেল।
মাদাম কামার এই ভূমিকা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আন্তর্জাতিকীকরণের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
৩. ১৯১৭—হোম রুল আন্দোলনের পতাকা
১৯১৭ সালে অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলক হোম রুল আন্দোলনের সময় একটি নতুন পতাকা ব্যবহার করেন। এটি আগের পতাকাগুলির তুলনায় অনেক বেশি জটিল ছিল।
এই পতাকায় ছিল—
পাঁচটি লাল ও চারটি সবুজ অনুভূমিক দাগ,
সাতটি তারা, যা সপ্তর্ষিমণ্ডল-এর বিন্যাসে সাজানো,
এক কোণে ব্রিটিশ Union Jack,
এবং চাঁদ-তারার প্রতীক।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় লক্ষণীয়—ভারত তখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন। তাই পতাকায় Union Jack-এর উপস্থিতি সেই সময়কার স্বশাসনের দাবি, সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি নয়—এই রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করেছিল।
৪. ১৯২১—পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার নকশা
জাতীয় পতাকার বিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯২১ সালে।
বেজওয়াড়া—বর্তমান বিজয়ওয়াড়া—এ অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনের সময় অন্ধ্রপ্রদেশের পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া একটি পতাকার নকশা তৈরি করে মহাত্মা গান্ধীর কাছে উপস্থাপন করেন।
প্রাথমিক নকশায় ছিল—
লাল,
সবুজ,
এই দুই রং। সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণে এগুলিকে তৎকালীন সময়ে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। গান্ধীজি পতাকায় সাদা রং এবং চরকা যুক্ত করার পরামর্শ দেন।
সাদা রংটি অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এবং চরকা স্বদেশি, শ্রম, আত্মনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এখানেই বর্তমান তেরঙার সঙ্গে পতাকার বিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র তৈরি হয়।
৫. ১৯৩১—তেরঙার গুরুত্বপূর্ণ রূপ
১৯৩১ সাল জাতীয় পতাকার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বছর।
এই বছর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একটি গেরুয়া, সাদা ও সবুজ তেরঙা পতাকা গ্রহণ করে। মাঝখানে ছিল মহাত্মা গান্ধীর চরকা।
এই পতাকাটি ছিল বর্তমান জাতীয় পতাকার সরাসরি পূর্বসূরি।
তবে তখন স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে তিনটি রংকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। অর্থাৎ পতাকাটিকে ক্রমশ সর্বভারতীয় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছিল।
চরকা তখন স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক—কারণ এটি ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের বয়কট, খাদি, শ্রম এবং স্বনির্ভরতার ধারণাকে সামনে এনেছিল।
৬. ১৯৪৭—আজকের জাতীয় পতাকার জন্ম
স্বাধীনতা আসন্ন। ১৯৪৭ সালে প্রয়োজন হল এমন একটি পতাকা, যা আর কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, বরং স্বাধীন ভারতের সার্বভৌম রাষ্ট্রের পতাকা হবে।
২২ জুলাই ১৯৪৭ ভারতের গণপরিষদ বর্তমান জাতীয় পতাকা গ্রহণ করে।
এর মূল কাঠামো ১৯৩১-এর তেরঙার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়—
চরকার পরিবর্তে বসানো হয় অশোকচক্র।
অর্থাৎ—
গেরুয়া — সাদা — সবুজ
এবং মাঝখানে
নেভি-ব্লু অশোকচক্র।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে এই পতাকা আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমান জাতীয় পতাকার গঠন
ভারতের জাতীয় পতাকা একটি অনুভূমিক তেরঙা পতাকা।
উপর থেকে নিচে তিনটি সমান অংশ—
গেরুয়া
সাহস, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের ভাব বহন করে।
সাদা
সত্য, শান্তি ও নৈতিকতার প্রতীক।
সবুজ
উন্নতি, সমৃদ্ধি ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ভাব প্রকাশ করে।
মাঝের সাদা অংশের কেন্দ্রে রয়েছে নেভি-ব্লু অশোকচক্র। এর ২৪টি কাঁটা বা স্পোক রয়েছে। এটি সারনাথের অশোকস্তম্ভের সিংহমূর্তির নিচের ধর্মচক্র থেকে নেওয়া।
পতাকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ৩:২।
অশোকচক্র কেন?
চরকা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক; কিন্তু স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকায় এমন একটি প্রতীক প্রয়োজন ছিল, যা কোনো রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।
তাই চরকার পরিবর্তে নেওয়া হয় অশোকচক্র বা ধর্মচক্র।
এর ২৪টি কাঁটা যেন সময়ের অবিরাম গতি, কর্তব্য, ন্যায়, ধর্ম ও অগ্রগতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ফলে পতাকার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির কোনো প্রতীক নয়, বরং চলমান একটি চক্র বসানো হয়েছে—যেন স্বাধীন ভারত থেমে না থেকে ক্রমাগত এগিয়ে চলে।
এক নজরে জাতীয় পতাকার বিবর্তন
সাল পতাকা প্রধান বৈশিষ্ট্য
১৯০৬ কলকাতা পতাকা লাল-হলুদ-সবুজ; পদ্ম, ‘বন্দে মাতরম্’, সূর্য-চন্দ্র
১৯০৭ ভিকাজি কামার পতাকা বিদেশের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতার পতাকা
১৯১৭ হোম রুল পতাকা লাল-সবুজ দাগ, সপ্তর্ষি, Union Jack
১৯২১ পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার নকশা লাল-সবুজ; পরে সাদা ও চরকা যুক্ত
১৯৩১ তেরঙা ও চরকা গেরুয়া-সাদা-সবুজ, কেন্দ্রে চরকা
১৯৪৭ স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা গেরুয়া-সাদা-সবুজ, কেন্দ্রে ২৪-কাঁটার অশোকচক্র
এই ধারাবাহিকতা সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণেও উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় পতাকার বিবর্তনের তাৎপর্য
ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসকে যদি একটি বাক্যে বলা যায়, তাহলে বলা যায়—
“বন্দে মাতরমের আহ্বান থেকে চরকার আত্মনির্ভরতা, আর চরকা থেকে অশোকচক্রের ন্যায় ও অগ্রগতি—এই পথেই ভারতীয় জাতীয় পতাকা স্বাধীনতার প্রতীক থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।”
১৯০৬-এর পতাকায় ছিল বিদ্রোহের সূচনা,
১৯০৭-এ ছিল বিশ্বের কাছে স্বাধীনতার বার্তা,
১৯১৭-এ ছিল স্বশাসনের দাবি,
১৯২১-এ এসেছিল ঐক্য ও স্বদেশির ভাবনা,
১৯৩১-এ তেরঙা পেয়েছিল সর্বভারতীয় পরিচয়,
আর ১৯৪৭-এ অশোকচক্রের মাধ্যমে পতাকা হয়ে উঠেছিল স্বাধীন, সার্বভৌম ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক।
2 Comments
প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। আন্তরিক ধন্যবাদ।
ReplyDeleteছবিগুলো দেওয়া সম্ভব হলে বিষয়টি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো।
ReplyDelete