বাইশে শ্রাবণ, আত্মবিশ্লেষণের দিন
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
বাইশে শ্রাবণ বিদায়ের দিন থেকে চিরজাগরণের প্রতীক। বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে বাইশে শ্রাবণ এমন একটি দিন, যা শোকের সীমা অতিক্রম করে আত্মবিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ (৭ আগস্ট ১৯৪১) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর মৃত্যু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যাত্রাকে থামিয়ে দেয়নি, বরং নতুনভাবে তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদকে আবিষ্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই বাইশে শ্রাবণ কেবল একটি স্মরণদিবস নয়, এটি আত্মপরিচয় খোঁজারও দিন রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবন ছিল শারীরিক অসুস্থতায় পরিপূর্ণ। তবু তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি। অনেকেই জানেন না, মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেও তিনি কবিতা লিখেছেন এবং মানুষের সভ্যতার সংকট নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। তাঁর শেষদিকের রচনাগুলিতে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ এবং মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়।
বাইশে শ্রাবণ সম্পর্কে একটি কম আলোচিত তথ্য হলো, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর শেষযাত্রার সময় বিপুল জনসমাগমের কারণে নানা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক মানুষ তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে চুল বা ব্যবহৃত সামগ্রীর অংশ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনাটি সেই সময়কার সংবাদপত্রেও আলোচিত হয়েছিল এবং তা প্রমাণ করে, জীবিত অবস্থাতেই তিনি মানুষের হৃদয়ে কত গভীর স্থান অধিকার করেছিলেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাইশে শ্রাবণকে ঘিরে শান্তিনিকেতনে যে স্মরণানুষ্ঠানের প্রচলন হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য কখনোই কেবল শোক প্রকাশ নয়। সেখানে রবীন্দ্রসংগীত, পাঠ, আলোচনা এবং নীরব প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ, এই দিনটি অতীত স্মরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও দিন।
অনেকের অজানা যে, রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর আগে চিকিৎসকদের অনুরোধে অস্ত্রোপচার করাতে রাজি হলেও তিনি চিকিৎসা সম্পর্কে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর চিঠিপত্রে শারীরিক যন্ত্রণা, জীবনবোধ এবং মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর দর্শনেরই প্রতিফলন জীবন ও মৃত্যুকে তিনি একই ধারার দুটি অধ্যায় হিসেবে দেখতেন।
🍂
বাইশে শ্রাবণের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এই দিন নানা আয়োজনে পালিত হয়। তবে এটি কেবল রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের দিন নয়, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিল্প এবং মানবিক মূল্যবোধকে নতুন করে উপলব্ধি করারও উপলক্ষ। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই দিনে তরুণদের জন্য আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও গবেষণামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে আরেকটি কম পরিচিত বিষয় হলো, তাঁর মৃত্যুর পর বিদেশের বহু সংবাদপত্রে তাঁকে শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন আন্তর্জাতিক চিন্তাবিদ ও শিক্ষাদর্শের নির্মাতা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। বিশেষ করে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর শিক্ষাভাবনা নিয়ে সে সময় বিদেশি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আজকের সময়ে বাইশে শ্রাবণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ যখন ক্রমশ একাকিত্ব, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার মুখোমুখি, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম, প্রকৃতিপ্রেম এবং বিশ্বজনীনতার শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর রচনায় যে স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৌন্দর্যচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়, তা আধুনিক সমাজের জন্যও পথপ্রদর্শক।
বাইশে শ্রাবণ কোনো সমাপ্তির দিন নয়। এটি এমন এক স্মরণদিবস, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন স্রষ্টার শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও তাঁর চিন্তা, সাহিত্য এবং আদর্শ যুগের পর যুগ মানুষের জীবনকে আলোকিত করতে পারে। তাই বাইশে শ্রাবণ শোকের নয়, জাগরণের দিন, বিদায়ের নয়, চিরন্তন উপস্থিতির দিন।
0 Comments