দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৮শে আগস্ট, রাখি বন্ধন দিবস। ছোটবেলা থেকেই আমরা এই বন্ধনের সঙ্গে পরিচিত কিন্তু রাখি বন্ধনের অজানা অনেক তথ্য আছে সেগুলো জানতেই আজকের এই লেখা, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই
ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক রাখি বন্ধন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের বাহক। রাখী বন্ধন বা রক্ষাবন্ধন তেমনই একটি উৎসব। সাধারণভাবে আমরা একে ভাই-বোনের ভালোবাসার উৎসব হিসেবেই জানি। কিন্তু রাখী বন্ধনের ইতিহাস ও তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক সম্প্রীতি, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব এবং একতার এক অসাধারণ বার্তা। 'রাখী’ মূলত একটি সুতো, কিন্তু এই সামান্য সুতোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিশ্বাস ও ভালোবাসার গভীর অর্থ। রাখী পরানোর মাধ্যমে প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করা হয় এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা হয়। প্রচলিত রীতিতে বোন ভাইয়ের হাতে রাখী পরায়, ভাই বোনকে উপহার দেয় এবং তার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে আধুনিক সময়ে এই সম্পর্কের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। রক্ষাবন্ধনের ইতিহাস নিয়ে নানা পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে মহাভারতের সঙ্গে যুক্ত একটি জনপ্রিয় কাহিনিতে দ্রৌপদী ও শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কের কথা বলা হয়। আবার রাজপুত ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত কিছু কাহিনিতেও রাখীকে সুরক্ষা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাই এগুলোকে মূলত লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি হিসেবে দেখা হয়। রাখী বন্ধনের একটি অপেক্ষাকৃত কম-আলোচিত অধ্যায় রয়েছে আধুনিক ভারতের ইতিহাসে। ১৯০৫সালে বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখী বন্ধনকে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেন। বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার মানুষের মধ্যে বিভেদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষকে একে অপরের হাতে রাখী পরিয়ে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। অর্থাৎ রাখী তখন কেবল ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক।
🍂
এই ঘটনাটি রাখী বন্ধনের অর্থকে নতুন মাত্রা দেয়। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি নয়, বরং হৃদয়ের বন্ধনই ছিল প্রকৃত শক্তি। একই সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের হাতে রাখী পরিয়ে যেন ঘোষণা করেছিলেন, ভিন্নতা থাকলেও আমরা একে অপরের আপনজন। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত আজও রাখী বন্ধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য বহন করে।
রাখী বন্ধনের আরেকটি সুন্দর দিক হলো, এর পারস্পরিকতা। ‘রক্ষা’ শব্দটি শুনলে অনেক সময় মনে হয়, কেবল ভাইই বোনকে রক্ষা করবে, কিন্তু প্রকৃত সম্পর্ক কখনও একতরফা নয়। জীবনের বিপদে ভাই যেমন বোনের পাশে থাকে, তেমনি বোনও ভাইয়ের দুঃসময়ে সাহস, স্নেহ ও সহযোগিতা দেয়। তাই রাখীর আসল বার্তা হলো, “আমি তোমার পাশে আছি, তুমিও আমার পাশে থেকো।”
আজকের ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। পড়াশোনা, কাজ কিংবা জীবনের নানা ব্যস্ততায় ভাই-বোন অনেক সময় দূরে থাকে। রাখী বন্ধন সেই দূরত্বকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়। দূরে থাকা মানুষও ফোন, ভিডিও কল কিংবা বার্তার মাধ্যমে এই দিনটি উদ্যাপন করে, ফলে এই উৎসবটি শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আচার নয়, এটি সম্পর্ককে নতুন করে মনে করার একটি উপলক্ষ। রাখীর পরিবেশগত দিকটিও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজারে নানা ধরনের প্লাস্টিক, কৃত্রিম উপাদান ও অতিরিক্ত মোড়কযুক্ত রাখী পাওয়া যায়। এর পরিবর্তে সুতো, কাগজ, কাপড়, কাঠ বা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি রাখী ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকেই এখন নিজের হাতে রাখী তৈরি করেন। এতে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সৃজনশীলতাও প্রকাশ পায়। রাখী বন্ধন আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, সম্পর্ক শুধু রক্তের বন্ধনে তৈরি হয় না, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্মানের মাধ্যমেও মানুষ পরস্পরের আপন হয়ে উঠতে পারে, তাই আজকের দিনে রাখীর বার্তা ভাই-বোনের গণ্ডি পেরিয়ে বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং বৃহত্তর সমাজের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
আমাদের সমাজে নানা ধরনের বিভেদ ও মতপার্থক্য রয়েছে, কিন্তু সেই বিভেদ দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একে অপরকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। রাখীর ছোট্ট সুতো তাই প্রতীকী অর্থে অনেক বড় একটি বার্তা বহন করে, বিভেদের দেয়াল নয়, সম্পর্কের সেতু গড়ে তুলতে হবে। রাখী বন্ধন শুধু একটি উৎসব নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, আস্থা ও সম্প্রীতির এক মানবিক উৎসব। ভাই-বোনের স্নেহের সম্পর্ক থেকে শুরু করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা, রাখীর ইতিহাস আমাদের দেখায়, একটি ছোট্ট সুতোও কখনও, কখনও মানুষের হৃদয়কে বড় একটি বন্ধনে যুক্ত করতে পারে। রাখী তাই শুধু হাতে বাঁধা হয় না, রাখী বাঁধা হয় হৃদয়ে। সেই বন্ধন যদি পারিবারিক সম্পর্ক ছাড়িয়ে সমাজ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসায় বিস্তৃত হয়, তবেই রক্ষাবন্ধনের প্রকৃত তাৎপর্য সার্থক হবে।
0 Comments