সাথী
(প্রথম পর্ব)
সৌমেন রায়
চিত্র – কল্লোল মজুমদার
বুবাই একদিন রাস্তা থেকে আনল ধরে লালুকে। ফুটফুটে মেটে-লাল কুকুরের ছানা সে। মুখখানি বেশ কোমল লাগে সাদা এক তিলকে।
বাজখাই গলায় বললে বাবা ‘রাস্তার কুকুর ঘরে কেন? এক্ষুনি কর বের’।
ভয়ে বুবাই নামিয়ে দিল ছানাটাকে মাটিতে। ছোট্ট ছানা ছুট্টে গিয়ে থাবা দিয়ে টানতে লাগলো পা বাবার । চোখ নামিয়ে দেখে বাবা কুকুর ছানা ডাকছে তাকে, থাবা দিয়ে।
বলছে যেন ‘অত খারাপ নই গো জেঠু, রেখে দেখো একবারটি’।
বাবা একটুখানি পিছিয়ে যেতেই ছুটে গিয়ে আঙুলগুলো দিল চেটে । হাসছিল মা কান্ড দেখে কুকুর ছানার । মায়া হল বাবারও বোধহয় তাই দেখে।
বলল তখন ‘ঠিক আছে, রাখো তবে’।
বুবাই ওর রেখেছিল নাম লালু। স্কুল যাওয়ার সময় বেলতলার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিত রোজ। রাস্তা থেকে দেখা যেত ছোট্ট এক পাহাড় । পাহাড়টাও রোজ যেতো ওদের সঙ্গে স্কুলে। ফেরার সময় রূপখানি তার পাল্টে যেতো বেশ, সূর্যি মামার আলো পড়ে। কেমন করে বুঝতো লালু? ছুটির সময় এগিয়ে যেতো আনতে তাদের খানিক দূরে। গ্রীষ্মকালে সকাল বেলা স্কুল হতো বুবাইদের। মজার সময় ছিল সে এক। স্কুল থেকে ফিরে, ব্যাগটা ফেলেই সোজা পুকুরে। জলের মধ্যেই চলত খেলা, গাছ থেকে জলে লাফিয়ে পড়া। টুবাই আবার পড়ার আগেই শূন্যে খেত তিনটে পাক। অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় বসে দেখতো লালু চুপচাপ। মাঝে মধ্যে হলে দেরি মা বেরোত লাঠি হাতে। দেখেই মাকে উঠত লালু ছায়ার থেকে। করতো তাদের সাবধান মোলায়েম এক সুরে। লক্ষ্মীছানা হয়ে ওরা উঠত তখন পাড়ে।
ঠাকুমা একদিন বলে, ‘আমার খুব হাসের ডিম খেতে মন করে।‘
পরের দিনই হাট থেকে জেঠু আনলো দুটো হাঁসের বাচ্চা ঘরে।
বড় হয়ে তাদের মধ্যে একটা হাঁস হলো খানিক বড়। গলাটা তার নীলাভ সবুজ এবং চকচকে। হাঁটাচলাতে তার আবার রাজার মতো ভাব। অমন সুন্দর গলার জন্য নাম পেলো সে সুগ্রীব, জেঠুর থেকে। সুখী হলো নাম অন্য হাঁসের। খুললে ভাঁড়ি সকাল বেলা বেরিয়ে খানিক প্যাক প্যাক করত দুটিতে। একটুখানি ভেঙে আড়মোড়া দুজন মিলে যেত চলে পুকুরে। সারাটা দিন ডুবিয়ে গলা কি সব খেত জলের থেকে । ভাসতো তখন পা দুটি আর লেজটি জলের উপরে। মাঝে মাঝে পুকুর পাড়ে, বাঁশের ঝাড়ে, দাঁড়িয়ে থাকতো একপায়ে। ঠোঁটটা তখন থাকতো গোঁজা পালকের ভেতরে। শীতকালেতে সন্ধ্যা নামতো ঝুপ করে। সেইরকমই একটা দিনে ফিরতে দেরি হচ্ছিল সুগ্রীবদের। এক দুষ্টু শেয়াল সুযোগ বুঝে পিছন থেকে ধরতে গেছিল সুখীরে। ভাগ্যিস লালু ছিল আশেপাশে। তাই সে যাত্রায় সুখী গেলো বেঁচে। পাহাড়ের দিক থেকে মাঝে মাঝেই শেয়াল আসত গ্রামের মাঝে। তারপরেই লালু আর সুগ্রীবের ভাব গেলো জমে । ওদের পাহারা দিয়ে রোজ বিকেলে, আনতো লালু সাবধানে। কানা উঁচু থালায় করে ঠাকুমা দিতো খুদ -কুড়ো। খপ খপ করে পলক ফেলতে করত শেষ দুজন মিলে। খেলা শেষে সেই সময়ে ঢুকত বুবাই,ঘামে ভেজা শরীরে।
ছুটে এসে লালু তখন দুখানি পা তুলে দিত বুবাইয়ের শরীরে। বলতো যেনো,’ ‘আমায় তুমি কর আদর অনেক করে’। মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে করতে হতো আদর তারে,সেইক্ষণে। সুগ্রীবও এসে জুটত তাদের মাঝখানে। আদুরে মুখে দেখতো সুখী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। খানিক পরে প্যাক প্যাক করে দুবার দিত ডাক । বলত যেন, ‘হচ্ছে দেরি। ঘরে অনেক কাজ’। সামনে দুঃখী, পিছনে সুখী ঢুকতো গিয়ে ভাঁড়িতে। রেখেছিল তুলে, খান কয় ছবি, জেঠু ওদের বন্ধুত্বের।
একটি দিনে সকাল বেলা, ডিমের জন্য হাত ঢোকাতে ভাঁড়িতে, সুখী কামড়ে দিল ঠাকুমাকে।
‘সুখী বাচ্চা ফোটাতে চায়’, হেসে বললো ঠাকুমা।
কয়েকদিনের ডিম দিল রেখে করে খড়ের বিছানা। সুখী বসে দিত তা, পুকুরে যেত না। খিদে পেলে প্যাক প্যাক করে ডাকতো ঠাকুমাকে। খাবার ওকে দিতে হতো ওখানেতেই। কিছুদিন পর ফুটে ডিম বাচ্চা হলো বের । কি সুন্দর কুচু কুচু সব বাচ্চাগুলো সকাল বেলা সুখীর পিছনে পুকুরের দিকে যেত চলে। লাইন দিয়ে নামতো জলে। বসে পুকুর ঘাটে, দেখতো লালু তাদের খেলা অপলক নয়নে।
(পরের অংশ পরের পর্বে)
2 Comments
এই গল্পে লেখক মশাই কি নতুন কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চাইছেন গল্পের গঠন কাঠামো নিয়ে? পড়তে গিয়ে তেমনি মনে হলো।
ReplyDeleteহ্যাঁ।ঠিকই বলেছেন। একটু পরীক্ষা করার ইচ্ছে হলো।ফলাফল আপনারা বলবেন।
Delete