দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১১ই সেপ্টেম্বর, জাতীয় বন শহীদ দিবস।
জাতীয় বন শহীদ দিবস কি, এই দিবসটি কেন পালন করা হয় এবং এর গুরুত্ব কতটা আসুন সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
অরণ্যের জন্য আত্মত্যাগের অমর স্মৃতি
প্রকৃতি আমাদের জীবনের নীরব অভিভাবক। বৃক্ষের ছায়ায় মানুষ আশ্রয় পায়, অরণ্য আমাদের শ্বাসের বাতাস নির্মল রাখে, নদী ও মাটিকে বাঁচিয়ে রাখে বনভূমি। অথচ সেই অরণ্য রক্ষার সংগ্রামে কত মানুষ যে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের কথা আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই। সেই আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দিন জাতীয় বন শহিদ দিবস ১১ই সেপ্টেম্বর। ভারতে বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু বনকর্মী, বনরক্ষী এবং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু একটি সরকারি দায়িত্ব পালনের ঘটনা নয়, এটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা, কর্তব্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতীয় বন শহিদ দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজস্থানের খেজরলি গ্রামের এক ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের কাহিনি। ১৭৩০ সালে মহারাজা অভয় সিংহের নির্দেশে খেজরলি অঞ্চলে খেজরি গাছ কাটতে লোক পাঠানো হলে বিশনোই সম্প্রদায়ের মানুষ তার প্রতিবাদ করেন। অমৃতা দেবী বিশনোই গাছকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়ে যে প্রতিবাদের সূচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে এক বৃহৎ আত্মত্যাগে রূপ নেয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, অমৃতা দেবীসহ ৩৬৩ জন বিশনোই গাছ রক্ষার জন্য প্রাণ দেন। তাঁদের সেই আত্মবলিদান আজও ভারতের পরিবেশ-চেতনার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। খেজরির সেই সবুজ বৃক্ষ তখন শুধু একটি গাছ ছিল না, মানুষের কাছে তা ছিল জীবন, আশ্রয় ও অস্তিত্বের প্রতীক। তাই গাছকে জড়িয়ে ধরে জীবন দেওয়ার সেই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত।
🍂
আজকের পৃথিবীতে বনভূমি নানা কারণে ক্রমশ চাপের মুখে। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন, বনভূমি দখল, আগুন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অরণ্যের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে বিপন্ন করছে। বন হারালে শুধু গাছ হারায় না, হারিয়ে যায় পাখির বাসা, পশুর আবাসস্থল, অসংখ্য উদ্ভিদপ্রজাতি, মাটির উর্বরতা এবং জলধারণের ক্ষমতা। অরণ্য ধ্বংসের সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যৎও অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে পড়ে। এই কারণেই বনকর্মীদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম পাহাড়, ঘন জঙ্গল কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তাঁরা বন পাহারা দেন, অবৈধ বৃক্ষচ্ছেদন ও শিকার রোধ করেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করেন এবং অরণ্যের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই জীবন হারিয়েছেন। তাঁদের স্মরণ করা মানে কেবল তাঁদের নাম উচ্চারণ করা নয়, তাঁদের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা।
বন শহিদ দিবস আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগের নয়, প্রতিটি মানুষের। একটি বৃক্ষ রোপণ করা, অকারণে গাছ না কাটা, বনভূমিতে আবর্জনা না ফেলা, বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, এই ছোট, ছোট কাজগুলোও পরিবেশ রক্ষার বড় আন্দোলনের অংশ হতে পারে। আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে কেবল রাস্তা, বাড়ি, কারখানা ও নগরের বিস্তারের সঙ্গে বিচার করি। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষের অগ্রগতির সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে। অরণ্যকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আজ আমাদের প্রয়োজন এমন এক উন্নয়ন-ভাবনা, যেখানে অর্থনীতি ও পরিবেশ পাশাপাশি এগিয়ে চলে। জাতীয় বন শহিদ দিবস সেই বিবেককে জাগিয়ে তোলার দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যাঁরা বন রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা আসলে শুধু গাছ বা জঙ্গল রক্ষা করেননি, তাঁরা রক্ষা করেছেন আমাদের ভবিষ্যৎ। তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্য তখনই সত্যিকার অর্থে দেওয়া হবে, যখন আমরা অরণ্যকে সম্পদ হিসেবে নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে শিখব। একটি গাছের ছায়ায় হয়তো আমরা আজ একটু বিশ্রাম নিই, কিন্তু সেই ছায়া তৈরি হতে লেগেছে বহু বছর। একটি অরণ্য গড়ে উঠতে লাগে শতাব্দী, অথচ ধ্বংস হতে পারে কয়েক ঘণ্টায়। তাই বন রক্ষার প্রতিটি প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য একটি আশার বীজ।
জাতীয় বন শহিদ দিবসে তাই আমাদের শপথ হোক,
0 Comments