দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১২ই সেপ্টেম্বর, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস। এই দিবসটি কেন পালন করা হয় এবং এর গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
উন্নয়নের পথে একসঙ্গে এগিয়ে চলা ১২ই সেপ্টেম্বর,জাতিসংঘের দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের পথ শুধু উত্তর থেকে দক্ষিণে সাহায্য প্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিও নিজেদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সম্পদ ভাগ করে একে অপরের অগ্রগতির সঙ্গী হতে পারে। এই পারস্পরিক সহযোগিতার দর্শনই ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা’ নামে পরিচিত। 'দক্ষিণ’ এখানে কোনো ভৌগোলিক দিকের সরল অর্থ বহন করে না। সাধারণভাবে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলির পারস্পরিক সহযোগিতাকে এই ধারণার আওতায় দেখা হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা কিংবা শিক্ষার ঘাটতির মতো অভিন্ন সমস্যার মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা বিনিময়ই এই সহযোগিতার মূল শক্তি।
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ধারণার ভিতরে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি, একটি দেশের সমস্যা অন্য দেশের কাছেও পরিচিত হতে পারে। তাই সমাধানও অনেক সময় দূরবর্তী কোনো উন্নত দেশের মডেল থেকে ধার করার পরিবর্তে একই ধরনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া দেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সম্ভব। স্বল্প ব্যয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষিতে নতুন পদ্ধতি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল এসব ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলির পারস্পরিক শেখার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ভারত নিজে যেমন উন্নয়নের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, তেমনই তার অভিজ্ঞতা এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের কাছে কার্যকর হয়ে উঠেছে। কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ বিনিময় দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে আরও অর্থবহ করেছে। এই সহযোগিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিকতা। এখানে একটি দেশ কেবল দাতা এবং অন্যটি কেবল গ্রহীতা নয়। প্রত্যেক দেশই কিছু দিতে পারে, আবার কিছু শিখতেও পারে। কোনো দেশের কৃষি-অভিজ্ঞতা অন্য দেশের কাজে লাগতে পারে, আবার সেই দেশের জলসংরক্ষণ বা দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা প্রথম দেশটির জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে, অর্থাৎ সহযোগিতা এখানে একমুখী নয়, এটি দুই বা বহু দেশের মধ্যে জ্ঞান ও সম্ভাবনার সেতুবন্ধন।
🍂
আজকের বিশ্বে এই সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দেশের সীমানা মানে না। অতিমারি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বিশ্বব্যাপী সংকটে পরিণত হতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির বৈষম্য সব ক্ষেত্রেই দেশগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাবতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা শুধু উন্নয়নের কৌশল নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তবে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা মানে শুধু সরকারি চুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবন। একজন কৃষক যখন অন্য দেশের কৃষকের কাছ থেকে নতুন চাষপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী যখন আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জন করেন, কোনো স্বাস্থ্যকর্মী যখন অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিষেবা পৌঁছে দেন, তখনই এই সহযোগিতা বাস্তব অর্থে মানুষের কাছে পৌঁছায়। ডিজিটাল বিপ্লব এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরত্ব কমেছে, জ্ঞান বিনিময়ের গতি বেড়েছে। অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবা, ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এই পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই পথ সম্পূর্ণ বাধামুক্ত নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলির আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি অনেক সময় সহযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাই দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করতে হলে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং বাস্তবসম্মত প্রযুক্তি ও অর্থায়নের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
১২ই সেপ্টেম্বরের এই দিবস তাই শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, এটি আত্মনির্ভর উন্নয়নের এক মানবিক দর্শনের প্রতীক। এর বার্তা স্পষ্ট, উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে কাউকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং একে অপরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলির সামনে সমস্যা যেমন অভিন্ন, তেমনই তাদের সম্ভাবনাও বিপুল। সেই সম্ভাবনাকে সহযোগিতার বন্ধনে যুক্ত করা গেলে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। জ্ঞান যখন ভাগ করে নেওয়া হয়, তখন তা কমে না, বরং আরও সমৃদ্ধ হয়। আর সেই ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন কেবল কয়েকটি দেশের অধিকার নয়, বরং সকল মানুষের সম্মিলিত অগ্রযাত্রার নাম।
0 Comments