জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা - ২২০

ছোটোবেলা -২২০
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে
চিত্র: রাকেশ সিংহ দেব

সম্পাদকীয়

ছোট্ট বন্ধুরা, 

কেমন আছো সবাই? নিশ্চয়ই পড়াশোনা, আঁকা, গান, নাচ, সাঁতার, ক্যারাটে, খেলা, চেস, মিউজিক সব কিছু নিয়ে খুব ব্যস্ত। ঠিক ই তো। ব্যস্ততা ছাড়া শুধু মাত্র অবকাশ, হয়তো কিছু দিনের জন্য ভালো লাগে কিন্তু তারপর ই বড্ড বেশি বোর লাগে, তাই না? আচ্ছা একটা কাজ করা যাক, এই সপ্তাহে যারা যারা একটু রেস্ট নিচ্ছো, তারা আমার জন্য ঝটপট একটা করে ছবি এঁকে ফেলো অথবা ছোট্ট করে কিছু লিখে ফেলো, ছড়া বা গল্প যাই হোক। তাহলে কথা রইলো কিন্তু। এই সপ্তাহে তোমরা আমাকে ছবি আর লেখা পাঠাচ্ছো। ভুলো না কিন্তু। আসলে কি হয়েছে বলো তো , তোমরা গত দু'সপ্তাহ কিছু ই পাঠাওনি, তাই আমার ভাঁড়ার ও প্রায় খালি হয়ে গেছে। 

ভালো থাকো সবাই বাড়ির সবাইকে নিয়ে। ভালোবাসা নিও। 

ইতি তোমাদের স্বাগতা দি।


৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস 

দীপালি সাহু

এই বিশেষ দিনে সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাকে জানাই আমার  আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

আমি একজন psychologist হিসেবে প্রতিদিন মানুষের মন নিয়ে কাজ করি। আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বলতে পারি—

একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য  শুধু বাড়িতে গড়ে ওঠে না স্কুলও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ psychological environment.

একজন শিশু যখন স্কুলে আসে, সে শুধু বই খাতা নিয়ে আসে না।সে সঙ্গে নিয়ে আসে তার আনন্দ, ভয়,কষ্ট, যন্ত্রনা, স্বপ্ন,অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা এবং অনেক না-বলা কথা।

কখনও কখনও একটি শিশুর খারাপ ফলাফলের পিছনে আলস্য থাকে না—থাকতে পারে anxiety।

ক্লাসে মন না দেওয়ার পিছনে অবাধ্যতা নয়—থাকতে পারে emotional distress।

হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার পিছনে attitude নয়—থাকতে পারে কোনো অস্বস্তি বা কষ্ট।প্রত্যেক আচরণের পেছনে থাকে, না বলা গল্প। আমরা আচরণ দেখে বিচার করি। গল্পটা অনুচ্চারিত থেকে যায়।

এই জায়গায় একজন শিক্ষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

কারণ একজন শিক্ষক প্রতিদিন শিশুটিকে দেখেন।

তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন।

কে আগের মতো কথা বলছে না, কে হঠাৎ একা হয়ে যাচ্ছে, কে বারবার রেগে যাচ্ছে—এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো অনেক সময় একজন শিক্ষকই সবার আগে দেখতে পান।

তাই একজন শিক্ষককে আমি শুধু educator হিসেবে দেখি না।তিনি একজন observer, mentor এবং অনেক সময় একজন শিশুর প্রথম emotional support। কি ভাবতে হবে তা অনেকে শেখাতে পারেন কিন্তু আপনারা  শেখান কিভাবে ভাবতে হবে। আর এখানেই শিক্ষার সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক।জ্ঞান আমাদের তথ্য দেয়,কিন্তু চেতনা আমাদের সেই জ্ঞানকে অর্থ দিতে শেখায়। কারণ জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে,কিন্তু চেতনা মানুষকে মানবিক করে। আমরা জানি Every child needs at least one adult who believes in them.।অনেক সময় সেই একজন বাবা মা, আত্মীয় স্বজন বা রক্তের সম্পর্কের কেউ হন না। বরং আপনারাই তাঁদের জীবনে সেই বিশেষ কেউ হয়ে ওঠেন।কত সময় আপনারাই আমাকে ফোন করে বা স্কুলে গেলে জানিয়েছেন কোন বাচ্চা কি সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের প্রজ্ঞায় সেটা ধরা পড়েছে।আমাদের দর্শনের একটি গভীর প্রশ্ন—

“আমি কে?”

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কোনো বইয়ে পাওয়া যায় না।

নিজেকে দেখা, নিজের চিন্তাকে দেখা, নিজের আবেগকে বোঝা, নিজের ভুলকে স্বীকার করা এবং অন্য মানুষের অস্তিত্বকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আত্মচেতনা তৈরি হয়।

একজন শিক্ষক সেই যাত্রার একজন সহযাত্রী। সবাই ভালো থাকুন, ওদের পাশে থাকুন।                 

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ

 পঁয়ত্রিশ পর্ব

রতনতনু ঘাটী

   দু’জন ক্রিকেট-প্রিয় মানুষ ক্রিকেটের প্রসঙ্গ পেলে বড্ড ছেলেমানুষ হয়ে ওঠেন। আজও তার কমতি দেখা গেল না। ডি এম সাহেবের অফিসে যাওয়ার পথে একটা ছাতিমতলার মোড় পড়ে। সেখানে রাখহরির চায়ের দোকান আছে। পিসবোর্ডের উপর নিজের হাতে কালো কালি দিয়ে লিখে রেখেছে ‘রাখহরির বিখ্যাত চায়ের দোকান’ কথাগুলো। নিজেই  লিখে নিয়েছে। বোর্ড তৈরি করার মতো অত পয়সা কোথায় রাখহরির? নবনীতস্যার রাখহরির দোকানের গায়ে সাইকেলটা হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে বললেন, ‘সম্মতিচরণ দাসের হাতের চা আজ ঠিক জমেনি, বুঝলেন তো মুকুলবাবু। চলুন, দু’জনে জমিয়ে এক কাপ করে রাখহরির চা খাই!’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘ডি এম সাহেবের কাছে যাওয়ার দেরি হয়ে যাবে না তো?’

   একটু পরে মুকুলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের যেন ক’টায় ডেকেছেন ডি এম সাহেব?’

   ‘স্যার সেরকম টাইম মেনশান করে বলেননি। বলেছেন, হাতের কাজ সেরে একবার যেন আমরা যাই!’ রাখহরির বাঁশের বেঞ্চের উপর বসতে বসতে নবনীতস্যার রাখহরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার চায়ের দোকানের বোর্ডটা তুমিই লিখেছ তো?’

   জিভ কেটে রাখহরি বলল, ‘কেন স্যার, কোনও বানান ভুল হয়ে গেছে নাকি?’

   ‘না না! বানান ভুল কিচ্ছু হয়নি। তা ছাড়া...’

   ‘হ্যাঁ স্যার, নিজের দোকানের বোর্ড আমি নিজেই লিখেছি। ‘হস্তাক্ষর’ সাইন বোর্ডের দোকান থেকে বোর্ডটা বানিয়ে আনতে গেলে কত টাকা পড়ে যেত বলুন তো? তার চেয়ে নিজের দোকানের বোর্ড নিজেই বানিয়ে নিয়েছি!’

   ‘বোর্ডে তোমার পদবিটা লিখে দিলে না কেন? তোমার পদবিটা কী যেন?’

   রাখহরি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘রাখহরির চায়ের দোকান মানে রাখহরির দোকান। সক্কলে ছাতিমতলার মোড়ের রাখহরির চায়ের দোকান একডাকে চেনে। বসুন স্যার, ভাল করে দুধের সর দিয়ে ঘন করে চা বানিয়ে দিচ্ছি!’

🍂

   পাশ থেকে মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘রাখহরি, তুমি আমার চায়ে চিনিটা দিও না! আমার শুগার আছে কিনা!’

   রাখহরি চায়ের কাচের গ্লাসে চিনি গলতে গুলতে বলল, ‘কে আর অত দেখতে আসছে বলুন? নিজের চায়ের চিনি নিজেই খাবেন!’

   ‘না না রাখহরি। বাড়ি পর্যন্ত খবর পৌঁছতে কতটুকু আর সময় লাগবে? ঠিক মন্দাকিনীর কানে পৌঁছে যাবে!’

   রাখহরি কান উঁচু করে জিজ্ঞেস করল , ‘মন্দাকিনী কে স্যার?’

   ‘আমার গিন্নি! তোমার দোকানে বসে চিনি দেওয়া চা খেয়েছি শুনলে কুরুক্ষেত্র বাধাবে বাড়িতে!’

   ‘কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কথা বলছেন তো? ওই যে রামায়ণ না মহাভারত, কোন বইতে যেন ওই যুদ্ধের কথা লেখা আছে? কবে পড়েছি, সেসব কি আর এখন মনে আছে স্যার? তবে সে তো বহু পুরনো কাহিনি। এখন কোনও কারণে ওরকম যুদ্ধ বাধলেও, তেমন দানা বাধবে না। আপনি নিশ্চিন্তে চা খান! দেখছেন না, ইরান-আমেরিকা কী যুদ্ধটাই না লড়ছে আজ কতদিন ধরে! কেউ কি হার মানছে?’

   নবনীতস্যার গলা তুলে বললেন, ‘তা রাখহরি, তুমি তো নানারকম খোঁজখবর রাখো দেখছি!’

   ‘ওসব কারেন্ট খবর রাখতে হয় স্যার। কতজন চা খেতে এসে কেউ এই ডোনাল্ড ট্রামের ভুল ধরছে তো, কেউ নরেন্দ্র মোদীর উচিত-অনুচিত নিয়ে তর্ক জুড়ছে! কথার পিঠে কথার তাল দিতে হয়। না হলে চায়ের দোকান চলে না!’

   চা শেষ করে উঠে পড়লেন নবনীতস্যার। বললেন, ‘চলুন মুকুলবাবু, রাখহরির চা খেয়ে মেজাজটা ফিরে এল, নাকি বলুন!’

   দু’জনে সাইকেল নিয়ে প্যাডেলে পা রাখলেন। নবনীতস্যার গলা তুলে বললেন, ‘রাখহরি, তোমার চা-টা ভারী সুন্দর হয়েছে। চলি রাখহরি!’

   ডি এম অফিসে ওঁদের পৌঁছতে আরও মিনিট কুড়ি সময় লেগে গেল। ডি এম সাহেবের চেম্বারের পরদা বাতাসে উড়ে যেতে উনি ভিতর থেকে দেখতে পেয়ে গেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে গলা তুলে বলে উঠলেন, ‘আসুন আপনারা। আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছি।’

   ডি এম কর্ণার্জুন পাল মানুষটি খুবই হৃদয়বান। যেমন-তেমন ডি এম নন! এলাকার উন্নয়নের জন্যে সব সময় ভাবেন। কেমন সহজে মন্ত্রীসভা থেকে নবীনগঞ্জ জেলার জন্যে একটা স্টেডিয়াম আদায় করে নিলেন! আজ সকাল থেকে কোথায় স্টেডিয়াম তৈরি হবে, তারই জন্যে দৌড়ঝাঁপ করেছেন। জেলার প্ল্যানিং কমিটির কর্তাদের সঙ্গে মিটিং করেছেন, সাইটে গিয়ে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের জন্যে জায়গা ঠিক করে এসেছেন। সেই সুখবরটা দেওয়ার জন্যে কর্ণার্জুন পাল এই দুই ক্রিকেটপ্রেমী মানুষকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ডি এম সাহেব এতদিনে এটা স্পষ্ট জেনে গেছেন, ক্রিকেট নিয়ে চারদিকে যত হুল্লোড়ই হোক না কেন, ক্রিকেটে যথার্থ নিবেদিতপ্রাণ মানুষ খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যায় না। সকলেই ওই উপর-উপর আগ্রহ দেখায়। কিন্তু কাজ করতে এগিয়ে আসে ক’জন?

   কর্ণার্জুন পাল প্রথমে বেয়ারাকে চা দিতে বললেন। চায়ের কথা শুনে নবনীতস্যার বললেন, ‘আমরা এইমাত্র ছাতিমতলার মোড়ে রাখহরির চায়ের দোকানে চা খেয়ে এসেছি!’

   ডি এম সাহেব বললেন, ‘এটা ভারী অন্যায় করেছেন স্যার! আমার কাছে আসছেন, আমি ডেকেছি আপনাদের, অথছ রাখহরির দোকানে চা খেয়ে এলেন, এটা ভাল হল না স্যার! চা খেতেই হবে আমার সঙ্গে। আপনারা দু’জন আসবেন ভেবে আমি স্টেডিয়ামের জায়গা নির্ধারণ করে ফিরে এসে চা-তেষ্টা পেলেও চা খাইনি।’

    চা এসে গেল টেবিলে। কর্ণার্জুন পাল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘মুকুলকৃষ্ণবাবু, আমাদের স্টেডিয়ামের কাজ শেষ হতে এক বছর সময় লাগবে। কাজ কিছুটা এগোলে, মানে আরও মাস ছ’য়েক পরে আমরা খবরের কাগজে আন্তঃস্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্যে টিম জমা দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেব। মুকুলবাবু, আপনি বিজ্ঞাপনের কপিটা ভাল করে তৈরি করে দেবেন তো!’ 

   তারপর নবনীতস্যারের দিকে তাকিয়ে ডি এম সাহেব বললেন, ‘আপনিই স্কুল-ক্রিকেট নিয়ে আমাকে প্রথম পথ দেখিয়েছেন স্যার। আপনার গগনজ্যোতি স্কুলের ক্লাস এইটের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন দেখেই তো এই টুর্নামেন্টের কথা আমার মাথায় প্রথম আসে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু মুখে সামান্য হাসি ছড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘জানেন তো স্যার, কোনও একটি নির্দিষ্ট দিনে বা বছরে প্রথম স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয়নি ভারতে এ কথা ঠিক। তবে আমাদের দেশের স্কুল ক্রিকেটের ইতিহাস অনেক পুরনো।’

   ডি এম সাহেবের গলায় বিস্ময় ফুটে উঠল। তিনি জানতে চাইলেন, ‘তাই নাকি? স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সম্পর্কে কিছু বলুন না মুকুলকৃষ্ণবাবু। আমারও তো জেনে রাখা দরকার।’

   নবনীতস্যার মুকুলকৃষ্ণবাবুর ক্রিকেট দক্ষতার প্রশংসা করে বলে উঠলেন, ‘ওঁর সব যেন মুখস্ত হয়ে আছে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘নানা সময়ে অনেক আঞ্চলিক সংস্থা স্থানীয় এবং  জাতীয় পর্যায়ে আলাদা আলাদা করে স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট পরিচালনা করেছে। আমি একজন ক্রিকেটারের অজানা একটা গল্প বলি বরং।’  

   নবনীতস্যার বললেন, ‘বলুন না মুকুলবাবু!’           

   মুকুলবাবু চায়ে আবাম করে চুমুক দিয়ে ডি এম সাহেবের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘আপনি যশস্বী জয়সওয়ালের নাম এখন শুনেছেন নিশ্চই! মাত্র তেরো বছর বয়সেই যশস্বী জওসওয়াল ক্রিকেট খেলার জন্য উত্তর প্রদেশের একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন। সে গ্রামটার নাম সুরিয়া। মুম্বইয়ের মতো একটা বড় ব্যস্ততম শহরে নিজের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য যশস্বীকে ভীষণ লড়াই করতে হয়েছিল। প্রথম দিকে তো তাঁর মাথা গোঁজার মতো কোনও বাড়িই ছিল না। সেই সময় মুম্বইয়ের এক দুধওলা রাতে ঘুমনোর জন্য একটু থাকার জায়গা দিয়েছিল যশস্বীকে। কিন্তু সেই দুধওলা আবার একটা শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিল, যশস্বীকে তার দুধ বিক্রির কাজে সাহায্য করতে হবে। যশস্বী সারাদিন ক্রিকেট নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে, দুধ বিক্রির কাজে সাহায্য করতে পারতেন না। তার ফলে একদিন ওই দুধওলা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। এর পর মুম্বইয়ের আজাদ ময়দানে একটি তাঁবুতে গিয়ে থাকার আশ্রয় নিয়েছিলেন যশস্বী। সেই তাঁবুতে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে হত যশস্বীকে।’

   ডি এম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘যশস্বীর জীবন শুরু হয়েছিল এভাবে? আমরা জানিই না।’

   ‘শুনলে অবাক হয়ে যাবেন কর্ণার্জুনস্যার, নিজের খরচ চালানোর জন্য অবসর সময়ে যশ্স্বী মুম্বইয়ের রাস্তার ধারে  ফুচকাও বিক্রি করতেন। ভারতের এই বাঁ-হাতি ব্যাটার মুম্বইয়ে আয়োজিত হ্যারিস শিল্ড টুর্নামেন্টে খেলতে নেমে প্রচারের আলোয় চলে আসেন। একটি ম্যাচে নেমে তিনি তিনশো উনিশ রান করেন। এর পর থেকে তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দু’ হাজার আঠারো সালে অনূর্ধ্ব-উনিশ দলে তাঁকে নির্বাচন করা হয়েছিল। সেবার হ্যারিস শিল্ডে সর্বপ্রথম নজর কেড়েছিলেন যশস্বী। এখন তিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের তরুণ ওপেনার।’

   ডি এম সাহেব সহানুভূতির গলায় বললেন, ‘আমাদের কাজ হবে এই রকম নতুন প্রতিভাকে সুযোগ করে দেওয়া!’

   মুকুলবাবু গল্প বলার ঢঙে বললেন, ‘একসময় সাংবাদিকরা যশস্বীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি ক্রিকেট খেলে প্রথম স্যালারি পেয়ে কী করেছিলেন?’ এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে টিম ইন্ডিয়ার এই তরুণ ওপেনার কী বলেছিলেন জানেন স্যার?’

   নবনীতস্যার কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘কী বলেছিলেন যশস্বী?’

   ‘পুরো টাকাটাই আমি মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলাম।’ কথাটি বলে মুকুলবাবু তাকিয়ে থাকলেন কর্ণার্জুন সাহেবের মুখের দিকে। 

   কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সকলে। ডি এম সাহেব বললেন, ‘এবার স্কুল ক্রিকেট নিয়ে আরও কিছু বলুন!’

   মুকুলবাবু বললেন, ‘আমার এই মুহূর্তে হ্যারিস শিল্ড বা জাইলস শিল্ডের নাম আমার এক্ষুনি মনে পড়ে যাচ্ছে।  ওদিকে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল বা কর্ণাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলাদা আলাদা স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট পরিচালনা করে আসছে। এই টুর্নামেন্ট থেকে কত ক্রিকেট প্রতিভা যে উঠে এসেছে। কোহলি-রোহিতের ভক্ত আয়ুষের বয়স তখন মাত্র পনেরো। সচিনের নজির ছাপিয়ে গেলেন ছেলেটি। হ্যারিস শিল্ডে অপরাজিত চারশো উনিশ রান করে চমকে দিলেন সকলকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল সেবার পাঁচশো রান করার। কিন্তু ওভার শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে চারশো উনিশ রানে থামতে হয় তাঁকে। জেনারেল এডুকেশন অ্যাকাডেমির হয়ে খেলার সময় একশো বাহান্ন বলে এই রান করেছে আয়ুষ। একবার ভেবে দেখুন!’

   কর্ণার্জুন সাহেব অবাক গলায় বললেন, ‘আমরা কত ক্রিকেটারের এমন উত্থানের খবরই রাখি না!’

মুকুলবাবু বলে উঠলেন, ‘আপনি যে টুর্নামেন্টের সূচনা করবেন আমাদের নবীনগঞ্জে, দেখবেন কত নবীন ছেলেই চমকে দেবে আমাদের। আয়ুষের কথা বললে দিন ফুরিয়ে যাবে স্যার! মুম্বইয়ের ক্রস ময়দানে পার্লে তিলক বিদ্যামন্দিরের বিরুদ্ধে সেবার খেলা ছিল আয়ুষদের। ব্যাট করতে নেমে তেতাল্লিশটি বাউন্ডারি এবং চব্বিশটি সিক্সার মেরেছিল আয়ুষ। পৃথ্বী শ নামে মুম্বইয়ের একজন ব্যাটার দু’ হাজার তেরো সালে করেছিলেন পাঁচশো ছেচল্লিশ রান। তাঁর পরে নাম করতে হয় আরমান জ়াফরের। তিনি করেছিলেন চারশো আটানব্বই রান। আর একজনের কথাও বলতে হয়,  তিনি সরফরাজ় খান। তিনি করেছিলেন চারশো উনচল্লিশ রান। এরকম কত নবীন প্রতিভা যে উঠে আসেন স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট থেকে। আগে স্টেডিয়ামটা তৈরি হয়ে যাক।’

   কথার ফাঁকে নবনীতস্যার বললেন, ‘স্যার, গতকাল আমাদের ছোট জগৎপুর গ্রামের অভিরূপ দলুইয়ের প্রয়াণের খবর শুনেছেন কি? উনি ছিলেন আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের হিতাকাঙ্ক্ষী। আমাদের মাঠের উপরের শেড তৈরির জন্যে উনিও কিছু আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। উনিও ভীষণ ক্রিকেট অনুরাগী ছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের ফাইনালের দিন দরকার হলে উনি সারাদিন মাঠে হাজির থাকবেন, বলে রেখেছিলেন। সে আর হল না!’

   একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নবনীতস্যার। তারপর ডি এম সাহেবকে বললেন, ‘স্যার, একদিন কাজের ফাঁকে আমাদের স্কুলের মাঠের শেডের কাজটা কেমন হচ্ছে দেখতে আসবেন না?’

   কর্ণার্জুনস্যার বললেন, ‘যাব, নিশ্চয়ই যাব! কবে যেন আপনাদের ফাইনাল ম্যাচের দিন ঠিক হয়েছে নবনীতস্যার? হাতের কাজ সরিয়ে তৈরি থাকতে হবে তো! ’

   নবনীতস্যার বললেন, ‘আপনি আমাদের ওই দিনের অনুষ্ঠানের সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করবেন। আপনাকে ওই দিন সারাটা সময়ই আমাদের স্কুলে থাকতে হবে!’

   ‘তা থাকব!’ হঠাৎ মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে কর্ণার্জুনস্যার বললেন, ‘গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনালে কোনও ক্রিকেটারকে আনা যায় না?’

   ‘আমি তো বৈভব সূর্যবংশীর কথা মনে-মনে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু বৈভব এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

   নবনীতস্যার গলাটা গম্ভীর করে বললেন, ‘আমার স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল অনুষ্ঠানে ম্যাচের উদ্বোধকের নাম ঠিক করেই রেখেছি।’

   মুখে কিছু বললেন না কর্ণার্জুনস্যার। তাকিয়ে থাকলেন নবনীতস্যারের দিকে। নামটা শোনার অপেক্ষা করছিলেন। নবনীতস্যার বললেন, ‘আমাদের মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি ওই দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধক। তিনি থাকতে আমরা অন্য কারও কাছে যাবই বা কেন?’

   মুকুলবাবু বললেন, ‘এসবের মধ্যে আবার আমার নাম কেন? আমি তো আগাগোড়া আপনাদের সঙ্গেই আছি?’

   একগাল হাসি হেসে উঠলেন নবনীতস্যার। তখনই ডি এম অফিসের বাইরে বসন্ত দিনের আগমনের এক ঝলক দমকা বাতাস বইতে শুরু করল। উঠে পড়লেন নবনীতস্যার এবং মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। 

(এর পর ৩৬ পর্ব)


ঐশী সামন্ত 
দ্বিতীয় শ্রেণী। বিদ্যাসাগর শিশু নিকেতন। চিড়িমারসাই। মেদিনীপুর।


ছড়ার ছবি 
চিন্ময় দাশ 

একটা ছড়া বিকেল বেলা কাঁসাই নদীর চর 
একটা ছড়া বেলপাহাড়ি পাতায় ছাওয়া ঘর 
একটা ছড়া শালবনিতে মিষ্টি তমাল নদী 
একটা ছড়া দীঘায় সাগর দৌড়ে যেতাম যদি 
একটা ছড়া কুড়চি ফুলের বন মাতানো সুবাস 
একটা ছড়া আগুনরঙা মাদার শিমূল পলাশ 
একটা ছড়া বনের ফাঁকে পাত-কুড়ানির দল 
একটা ছড়া দহন-দিনে কুয়ার শীতল জল 
একটা ছড়া দূরের গাঁয়ে ভাদু-ঝুমুর গান 
একটা ছড়া কেলেঘাইয়ের দু'কূল ডোবা বান 
একটা ছড়া হলদিয়াতে ভোঁ বাজানো জাহাজ 
একটা ছড়া পাঁচরোল গ্রামে শাঁখের কারুকাজ 
একটা ছড়া বাদল দিনে মহিষাদলের রথ 
একটা ছড়া বন-পাহাড়ে রাঙামাটির পথ 
একটা ছড়া মেঠোপথে পাতার বাঁশির সুর 
এই ছড়াটির জলছবিতে জেলা মেদিনীপুর।


ক্যুইজ- ১৯ 

১. পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য মাছ কি? 
2. "মিহিদানা" কোন অঞ্চলের বিখ্যাত মিষ্টি? 
৩. পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম রেল স্টেশন কোনটি? 
৪. ভারতের প্রথম যাদুঘরের নাম কি? 
৫. "ডুয়ার্স" কোথায় অবস্থিত? 

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর

১. পূর্বে বাংলাদেশ, উত্তরে ভূটান, উত্তর পশ্চিমে নেপাল 
2. ২০০১ সালে 
৩. চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী 
৪. ২৯৪ টি 
৫. আম

Post a Comment

0 Comments