ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ২৯
প্রীতম সেনগুপ্ত
সনাতন আধ্যাত্মিক দর্শনে ইহলোক ও পরলোকের সমস্ত কর্মফল ভোগ ত্যাগ করার আকাঙ্ক্ষাকে ‘মোক্ষ’ বা ‘মুক্তি’ বলা হয়। যখন একজন মানুষ পার্থিব জগতের (ইহলোক) সুখ-দুঃখ এবং মৃত্যু পরবর্তী জগতের (পরলোক) সমস্ত রকম ফল পাওয়ার বাসনা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেন, তখন তিনি জন্ম ও মৃত্যুর অন্তহীন চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় এই পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার একটি ধাপ হল নিষ্কাম কর্মযোগ। আমরা এই বিষয়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতর শরণাপন্ন হব। কথামৃত অনুযায়ী ----
ব্রাহ্মভক্ত --- মহাশয় সব ত্যাগ না করলে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না?
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) --- না গো। তোমাদের সব ত্যাগ করতে হবে কেন? তোমরা রসেবশে বেশ আছো। সারে মাতে! (সকলের হাস্য) তোমরা বেশ আছো। নক্স খেলা জান? আমি বেশি কাটিয়ে জ্বলে গেছি। তোমরা খুব সেয়ানা। কেউ দশে আছো, কেউ ছয়ে আছো; কেউ পাঁচে আছো। বেশি কাটাও নাই; তাই আমার মত জ্বলে যাও নাই। খেলা চলছে। এতো বেশ! (সকলের হাস্য)
“সত্য বলছি, তোমরা সংসার করছো, এতে দোষ নাই। তবে ঈশ্বরের দিকে মন রাখতে হবে। তা না হ'লে হবে না। এক হাতে কর্ম্ম করো, আর এক হাতে ঈশ্বরকে ধরে থাকো। কর্ম্ম শেষ হলে দুই হাতে ঈশ্বরকে ধরবে।
‘মন নিয়ে কথা। মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। মন যে রঙ্গে ছোপাবে, সেই রঙ্গে ছুপবে। যেমন ধোপা ঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল, নীলে ছোপাও নীল, সবুজ রঙ্গে ছোপাও সবুজ। যে রঙ্গে ছোপাও সেই রঙ্গেই ছুপবে। দেখনা, যদি একটু ইংরেজি পড়, তো অমনি মুখে ইংরাজী কথা এসে পড়ে! ফুটফাট ইটমিট্ (সকলের হাস্য)। আবার পায়ে বুটজুতা, শিষ্ দিয়ে গান করা; এইসব এসে জুটবে। আবার যদি পণ্ডিত সংস্কৃত পড়ে, অমনি শোলোক ঝাড়বে। মনকে যদি কুসঙ্গে রাখো, তো সেই রকম কথাবার্ত্তা, চিন্তা, হয়ে যাবে। যদি ভক্তের সঙ্গে রাখো, ঈশ্বর চিন্তা, হরিকথা এইসব হবে।
“ মন নিয়েই সব। একপাশে পরিবার, একপাশে সন্তান! একজনকে এক ভাবে, সন্তানকে আর এক ভাবে, আদর করে! কিন্তু একই মন!”
কথামৃত এর আরেকটি জায়গায় নিষ্কাম কর্ম বিষয়ে শ্রীম অর্থাৎ মাস্টারমশাইকে ( কথামৃতে মণি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন) ঠাকুর বলছেন --- নিষ্কাম কর্ম করবে। ঈশ্বর বিদ্যাসাগর যে-কর্ম করে সে ভাল কাজ --- নিষ্কাম কর্ম করার চেষ্টা করে।
মণি--- আজ্ঞা হাঁ। আচ্ছা, যেখানে কর্ম সেখানে কি ঈশ্বর পাওয়া যায়? রাম আর কাম কি এক সঙ্গে হয়? হিন্দীতে একটা কথা সেদিন পড়লাম।
“যাঁহা রাম তাঁহা নাহি কাম, যাঁহা কাম তাঁহা নাহি রাম।”
শ্রীরামকৃষ্ণ --- কর্ম সকলেই করে ---তাঁর নামগুণ করা এও কর্ম -- সোহহংবাদীদের আমিই সেই এই চিন্তাও কর্ম -- নিঃশ্বাস ফেলা এও কর্ম --- কর্ম ত্যাগ করবার জো নাই। তাই কর্ম করবে, কিন্তু ফল ঈশ্বরে সমর্পণ করবে।
0 Comments