তবুও আছি
কর্মব্যস্ত শহরের যানজটে জড়িয়ে থাকা পথের মাঝখানে দ্রুতগামী কোনো বাস
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গড়িয়ে যায়,
দুধারের ধানখেত দেখতে দেখতে যাওয়া রেলযাত্রীরা
বেলাইন হয়ে যাওয়া বাহনের সাথে সাথে মুখ থুবড়ে পড়ে।
স্বপ্নের উড়ানে ওঠা যাত্রীরা ভূপতিত হয় রুক্ষ জমিতে।
তবুও বাস,রেল, উড়োজাহাজের হাতে হাত মিলিয়ে চলি আমরা।
লাল চেলি পরে বধূবেশে নতুন জীবনের আঙিনায় প্রবেশের স্বপ্ন আঁকা মায়াবী কাজল চোখে পরা
তরুণীর দেহ ক্ষতবিক্ষত হয় হবু স্বামী ও তার বন্ধুদের হাতে।
কাজ সেরে দিনের শেষে ছোট্ট ঘরের আলোছায়ামাখা স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় সাত পাকে ঘোরা তরুণ
মিথ্যা মামলার বকলস গলায় পরে বিচারের আশায় ঘোরে দ্বারে দ্বারে।
তবুও পুরুষ প্রেমিক হতে চায়, নারী হতে চায় কারোর চোখের প্রেয়সী।
ঈর্ষার বীজ অল্পেই দেয় কাজে, আপন কাকার বাড়ির জলের ট্যাঙ্কে মেলে ভাইপো,ভাইঝিদের ফুটফুটে মুখ।
তবুও সমাজের অভিধান থেকে বাদ পড়ে না আত্মীয়স্বজনের মতো শব্দগুলো।
এক অখ্যাত গ্রামের আপনভোলা মানুষ শব্দের মাকুতে চরিত্র বুনে
অতি কষ্টে পাওয়া অন্তর্জালের একটু আভার মধ্যেই
ইলেকট্রনিক ডাকবাক্সে ফেলে দেয় বাস্তব আর কল্পনার রংতুলিতে আঁকা কবিতা, গল্প,উপন্যাস।
প্রত্যুত্তরে আসে জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ্য । তবুও কলমঘোড়া টগবগ করে ছোটে ।
মাটির প্রদীপ হয়ে বেঁচে থাকে আশা, বিশ্বাস।
পায়ের বেগেই পথ কেটে যায়
কলকাতা থেকে অনতিদূরে মফস্সলের এই শহরের প্রধান রাস্তায়
সিংহভাগ জুড়ে থাকা নামিদামি সংস্থার পোশাক,খাবার,জুতোর দোকান নিয়ে ফুটপাথ,
সেখানে চলতে দেখা যাচ্ছে এক রোগা দীর্ঘাঙ্গী মেয়েকে।
হন্তদন্ত হয়ে অনেকেই যায়। এই চলাটা ঠিক তেমন নয়।
ফুটবলের মাঠে তাড়া খাওয়া খেলোয়াড় যেমন
প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে কাটিয়ে উত্তেজনা বুকে চেপে
গোলপোস্টের জালে বল ছুড়ে মারেন,এই তরুণীও
চলেছে পথচারীদের টপকে টপকে।
স্কুলে পড়াকালীন পরিচিতরা জানত ক্লাস থেকে একসাথে বেরোলেও
চোখের নিমেষে মেয়েটি পৌঁছে যাবে চার হাত দূরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তার ক্লাস ছিল ছয় তলায়।সহপাঠীরা মাঝে মাঝে রুদ্ধশ্বাসে
ঊর্ধ্বগামী বা নিম্নগামী লিফটের খাঁচা থেকে দাঁড়িয়ে দেখত
সেই মেয়ের সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করে লিফটে থাকা লোকদের হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
প্রতিবারই ব্যর্থ হত,জোরে জোরে শ্বাস নিত।
তবুও তাকে থামানো যেত না। আড়ালে হাসাহাসি করে সবাই বলত পাগল।
এ মেয়ে মুখচোরা হলেও তার সাথে আমার প্রাণের বন্ধুত্ব।
তাই তার ক্লান্ত মুখে ফুটে ওঠা তৃপ্তির আভাটুকু আমার চোখ এড়ায় না।
আমি দেখি জীবনের দেওয়া প্রশংসার জৌলুসের আড়ালে থাকা উপহাস, প্রতারণাকে
নস্যাৎ করে এগিয়ে চলা একক মানুষ।
আমি দেখি বারংবার ব্যর্থ হয়েও সমগ্র সত্তা দিয়ে
নিজের অসীম ক্ষমতাকে বিশ্বাস করতে চাওয়া নারীকে।
আমার পৃথিবী
মালিকের মেয়ে, দিদি বলেই ডাকি তাকে। সে আমার মাকে বলে কবিতা।
ছোটবেলা থেকে আমার মায়ের কোলে পিঠেই মানুষ।
মালকিনের দেখাদেখি কবিতা ডাক অভ্যাস করেছিল,চোদ্দো বছর বয়সে এসেও বদলায়নি।
তার চাকরি করা বাবা মায়ের কেউ একজন ছুটি নিয়ে বাড়িতে থাকলেই মা-এর ছুটি।
দৈনিক নব্বই টাকাও গচ্ছা যায়। দিদির বাবা মা রোজই অফিসে দেরি করে, মাঝে মাঝে হাফ ছুটি নিয়ে
বাড়ি আসে।কে জানে, মাসের শেষে মাইনে কাটে কি না! আমার বাবা মাতাল,
শুনেছি আমার এক মাস বয়স থেকেই অন্য একজনের সাথে থাকা শুরু করেছিল,
আজও সেখানেই আছে।পলেস্তারা খসে পড়া দেওয়াল ঘেরা আমার স্কুলবাড়িতে থাকা খাতায়
বাবার নাম দেখে মা অগ্নিশর্মা হলেও কিছু বলতে পারে না,
পাকাপাকি নামটা সরাতে নাকি অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়।
মালিক মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে গিয়ে নীচু স্বরে কথা বলে,
ভাসা ভাসা শুনে কিছু আঁচ করে মালকিন কখনও প্রশ্রয়মিশ্রিত হাসে, কখনও কথা বন্ধ করে দেয়।
মালকিন অফিস ছুটির পর মাঝে মাঝে চলে যায় স্কুলের বন্ধুর বাড়ি।
মালিক সোফায় বসে স্কচ হাতে বিরহের গান শোনেন।
তবুও প্রতি বছর ধুমধাম করে এদের বিবাহবার্ষিকী পালিত হয়,
সেদিন মা পায় একশো কুড়ি টাকা।
এই সপ্তাহ পুরোটাই মায়ের ছুটি।কর্তা গিন্নি ঘরেই থাকবেন দিদিকে আগলাতে।
দিদি নাকি সারাক্ষণ কাঁদে।পড়াশোনা,গিটার,টেবিল টেনিস,সাঁতার কিছুই ভাল লাগছে না।
স্বাদ বদল করতে বাড়িতে এসেছে তানপুরা,দাবার বোর্ড।
তিনজন মানুষ সপ্তাহ শেষে দিদির কথা শোনে।
স্কুল ফেরত আমি একদিন গেলাম সাপলুডো খেলতে।সাবধানে দান ফেলে
আমার গুটিটা সাপের মুখে নিয়ে গিয়ে নিমেষে এক পয়েন্টে নেমে গিয়ে দিদিকে জিতিয়ে দিলাম।
যেমন করে এসেছি সেই ছোটবেলা থেকে একবার ভুল করে জিতে গিয়ে
ওর থেকে চড় খাওয়ার পর থেকে। অদ্ভুত! আজ জিতেও চিৎকার করে আমাকে ধমক দিল।
মালকিন ছুটে এসে রেগে লাল হয়ে আমাকে বলল – “কি বলেছিস ওকে?”, মালিক ঠান্ডা গলায় বলল -
“বাড়ি যাও।” স্কুল ছুটির তিন ঘন্টা পরে খিদে চেপেই বাড়ি ফিরলাম। এক ফোঁটা কাঁদিনি।
আমার দু’চোখে যে স্বপ্ন আন্তর্জাতিক স্তরে পদার্থবিদ্যায় সোনার মেডেল পাওয়ার।
স্কুলের দিদিমণিরা চাঁদা তুলে ট্যাব কিনে দিয়েছে।অনেকের ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড-ও জানি।
সেই চাবি দিয়ে স্বপ্নলোকের অচিনপুরের তালা খোলার জন্য আমি সারারাত জেগে থাকি খাতা কলম নিয়ে।
শুধু সেখানে ঠিকমতো দাগ কাটতে না পারলে সস্তা পাতাগুলো নোনা জলে বড্ড বেশি রকম ভিজে যায়।
0 Comments