মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৪
ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া (প্রধান শিক্ষক, কবি, সম্পাদক, মেদিনীপুর)
ভাস্করব্রত পতি
কালো পিচের রাস্তা। সাদা রঙ দিয়ে মার্কিং করা দাগ রাস্তার দুপাশে। ফুটপাতে লাল মোরামের পোচ। সেই রাস্তা চলেছে ঘন সবুজ শালবনের জঙ্গলের বুক চিরে। জঙ্গলের প্রান্তে এক প্রত্যন্ত জনপদ। জঙ্গলমহলের চিরচেনা পরিবেশে দণ্ডায়মান বিদ্যামন্দির মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠ। যার রঙ মনের রঙে রাঙানো।
শালগাছে মোড়া সেই পিচ রাস্তা ধরে আর প্রকৃতির ভালোবাসা কুড়োতে কুড়োতে বাইক চেপে নিত্যদিন সেই স্কুলে যাওয়া যাঁর, তিনি এই মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া। একাধারে কবি, লেখক, প্রবন্ধকার। অন্যদিকে কুসুমকোমল ছাত্র ছাত্রীদের প্রতি অসামান্য দায়িত্ব এবং কর্তব্যপালনে একমেবাদ্বিতীয়ম শিক্ষক। তাঁর জীবনের সিলেবাসে প্রোথিত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বেসর্বা হয়ে প্রাণপাত পরিশ্রমের সাথে সফল বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব। শিক্ষার বিস্তারে নিত্যনতুন ভাবনাচিন্তা করা, অভিভাবকদের ওজর আপত্তি মেটানো, স্থানীয় জনগনের আবদার অভিযোগ সামলানো, প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব পালন করা আর সর্বোপরি বিদ্যালয় পরিসরে কঠিন কঠোর শৃঙ্খলা পালন, নিবিড় পাঠদান ও ছাত্র ছাত্রীদের মোটিভেশন করার মাধ্যমেই তাঁর দীর্ঘ শিক্ষক জীবন। তাঁর এই অযান্ত্রিক কাজের সুবাদে আগামী ৫ ই সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষক দিবসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে প্রদান করবে Prestigious 'বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬'। যা মৌপালের মতো নিরীহ প্রান্তিক এলাকার মানুষের কাছে অনির্বচনীয় প্রাপ্তি।
রাজ্যে এসেছে নতুন সরকার। নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা। সেই ভাবনার আলোয় আলোকিত পাহাড় থেকে সাগর। এ রাজ্যের শিক্ষাপ্রসারে এবং প্রচারে ঐকান্তিক প্রয়াস পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। 'বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬' সেই গঠনমূলক চিন্তাভাবনার ফসল। ড. প্রসূন কুমার পড়িয়াকে এই সম্মান দেওয়ার মাধ্যমে আসলে এরাজ্যের সকল শিক্ষক সমাজকেই সম্মানিত করা হল। অনুপ্রেরণা হয়ে উঠলেন তিনি। এই শিক্ষককে দেখে অন্যান্যরাও অনুপ্রাণিত হয়ে উঠবে অচিরেই। ভালো কাজ করতে থাকলে একসময় তার জন্য যথার্থ কদর মিলবেই। হয়তো তা দেরীতে হতে পারে। কিন্তু মিলবেই। ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া তা আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন। পরিশ্রমের মূল্য বিফলে যায়না। সদর্থক ভাবনার ব্যক্তি তার মূল্য দিতে জানে। তিনি তা পেয়েছেন।
শুধুমাত্র শিক্ষক দিবসের এই সরকারি সম্মান নয়, এর আগেও শিক্ষক হিসেবে তিনি পেয়েছেন 'বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড', 'আচার্যরত্ন সম্মান', 'শিক্ষকজ্যোতি সম্মান', 'গুরু সম্মান' সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। কবি এবং সাহিত্যিক হিসেবে 'রূপসী বাংলা পুরস্কার' ও 'জঙ্গলমহল উদ্যোগ সম্মাননা'য় ভূষিত হয়েছেন। সর্বোপরি শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং শিক্ষা আধিকারিকদের আস্থা ও ভালোবাসাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। যা সবসময় অকৃত্রিম এবং অবিচল। অমূল্য সেই স্বীকৃতি। তাঁর সাধের মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠও পেয়েছে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার, শিশুমিত্র পুরস্কার, সেরার সেরা বিদ্যালয় পুরস্কার সহ রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বহু সম্মাননা। এহেন শিক্ষা নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে পেলেন শিক্ষকদের জন্য রাজ্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার 'বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬'।
বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া
১৯৭১ এর ৩ রা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর বি এড এবং পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। প্রথমে পূর্ব মেদিনীপুরের কৃষ্ণগঞ্জ কৃষি শিল্প বিদ্যালয় এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে বর্তমান স্কুলে যোগদান করেন। মেদিনীপুর জেলার এই সুপরিচিত 'মানুষ রতন'টির চিন্তাভাবনা এবং কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজেও নিরন্তরভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ক্রীড়াক্ষেত্রে জেলা এবং রাজ্যস্তরে মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণ করে। জাতীয় পর্যায়ে ছাত্র প্রদীপ মান্ডির অংশগ্রহণ এবং সুব্রত কাপে জেলা পর্যায়ে রানার্স আপ হওয়া এই বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিকতম সাফল্য। কলা উৎসবে রাজ্য পর্যায়ে অংশগ্রহণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
সাজানো গোছানো বিদ্যালয় 'মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠ'
মৌপাল গ্রামের পাশাপাশি রয়েছে চ্যাংশোল, নতুনডিহি, নোনাশোল, জলহরি, ভুরসার মতো জঙ্গলঘেরা গ্রাম। সেখানে এখনও শিক্ষার আলো সেভাবে পৌঁছায়নি। মানুষও তেমন সচেতনও নন। স্কুলছুটের সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি কম বয়সে অনেক মেয়ের বিয়েও দিয়ে দেয় অভিভাবকরা। প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে এখন নানাভাবে সেইসব স্কুলছুটদের মৌপাল স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। স্কুলের উদ্যোগে বাল্যবিবাহ রোধেও এলাকার মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। স্কুলের সহযোগিতায় স্কুল ক্যাম্পাসে মঞ্চস্থ করা হয় নাটক 'তিনটি মেয়ের গল্প'। ড. প্রসূনকুমার পড়িয়ার কথায়, "শুধু মৌপাল বা আশপাশের এলাকা নয়। জঙ্গলমহলের অনেক এলাকায় এমন সমস্যা রয়েছে। মেয়েদের যখন পড়াশোনা ও খেলাধুলা করার বয়স, তখন তাঁদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের সচেতন করতেই এহেন উদ্যোগ।" এই বিদ্যালয়ের ছাত্রী বাসন্তী টুডু সম্প্রতি নিজের বিয়ে রুখতে সমর্থ হয়েছিল বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক শিক্ষিকার অনুপ্রেরণায়। তৎকালীন জেলাশাসক খুরশিদ আলী কাদেরী তাঁকে সম্মানিত করেছেন।
বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয়েছে 'প্রজাপতি সংরক্ষণ স্থল'। পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদের সহায়তায় অভিনব উদ্যোগের কারিগর এই প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের ফলের বাগানে রয়েছে আম, পেয়ারা, আপেল, আঙুর, কমলালেবুর মতো ফলকর গাছ এবং গাঁদা, কেতকি, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া, পিটুনিয়া, গোলাপের সমাহার। ভেষজ বাগানে মিলবে কালমেঘ, হরিতকী, আমলকি, তুলসী, নিম, পুদিনা, আয়াপান, থানকুনি, ধুতুরা, ব্রাহ্মীর আধিক্য। আর সব্জি হিসেবে তো আছেই কুমড়ো, বেগুন, পেঁপে, ভেণ্ডির লকলকে গাছ। এইসব গাছেদের পাতায় পাতায়, ফুলে ফুলে ডানা মেলে ঘুরে বেড়ায় রঙবেরঙের প্রজাপতির দল। যা আসলে অপাপবিদ্ধ কচিকাঁচাদের মনের খোরাক জোগাতে বদ্ধপরিকর।
বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে একটি আদর্শ শিক্ষাবান্ধব প্রতিষ্ঠানের সফল উদাহরণস্বরূপ। এখানে Hostel Building, Mini Indoor Games and Recreation Complex, Boundary Wall, Ideal Painted Students Friendly Classroom, Smart Classroom and Computer Laboratory, Flower Fruit Vegetable & Medicinal Plant Garden, Digital Attendance System, Solar System এবং Sports & Cultural Training Unit গড়ে তোলা হয়েছে। যা এক অনন্য এবং সুশোভিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়বাহক।
প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া
ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন 'জীবন দর্পণ' প্রকাশিত হয়েছে ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। জেলার তথা রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিক প্রবন্ধকার গবেষক লেখকের লেখায় পরিপুষ্ট এবং পরিপূর্ণ ছিল তা। তিনি লিখেছেন বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই। বাংলা প্রবন্ধের বই 'প্রসঙ্গ : শিক্ষা ও সাহিত্য' প্রকাশিত হয়েছে জলদ্বর্চি প্রকাশন (২০০০) থেকে। ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধের বই 'Essays on Absurd Theatre' প্রকাশ করেছেন জলদ্বর্চি প্রকাশন (২০১০) থেকে। কবির লেখা কাব্যগ্রন্থ 'জেগে আছি অন্ধকারে'ও জলদ্বর্চি প্রকাশ (২০১০) করেছে। এছাড়াও তাঁর লেখা 'The Study of Basic English Grammar, Translation & Composition (Tapati Publishers, Jointly written with Susil Kumar Das, January 2026) বইটি ছাত্র ছাত্রীদের জন্য খুবই উপযোগী একটি গ্রন্থ। সম্প্রতি Edvicon Publishing House থেকে যৌথভাবে অমিয় কুমার মান্নার সঙ্গে লেখা 'ভেষজ গাছপালা' (দ্বিতীয় সংস্করণ ২০২৬) বইটি পাঠকসমাজে সমাদৃত হয়েছে দারুণভাবে। এছাড়াও শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমাজ বিষয়ক তাঁর লেখা নানা প্রবন্ধ এবং কবিতা জেলা ও রাজ্যস্তরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিতভাবে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব পত্রিকা 'ইচ্ছেডানা' তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বহু সমাজকল্যাণমূলক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা, মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি। একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে দেশ ও সমাজের সেবায় আত্মনিয়োগ করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন নিজের জেদ, ত্যাগ এবং আগ্রহকে পাথেয় করে। সফলতা পেয়েছেন নিবিড়ভাবে লেগে থাকার ফলে। ড. প্রসূন কুমার পড়িয়ার বক্তব্য, বিদ্যাপীঠ সহ দেশ ও জাতির সামগ্রিক কল্যাণই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য।
🍂
0 Comments