জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা/জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

গুচ্ছ কবিতা
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় 

নরমরোদের গায়ে লিখে দিই জয়পুর, বিজয়ের হারানো ঠিকানা
সামনে হঠাৎ জেগে উঠলো জঙ্গলের রেল হল্ট 'বিরসা মুণ্ডা'।
তিনি বিরসা পুরুষ একা ও একক, অনন্য। পাথর কেটে যেন
কোনও ভাস্করের কাজ। চানবেলার রোদ তখন হলুদরঙে
লিখে দিচ্ছে দু-চারটে ঝরাপাতার পদাবলি। একটু আগেই
ঝাঁটি কুড়িয়ে ফিরে গ্যাছে ঝুনিমাসি আর বুনিমাসি, তাদের মুখথেকে নির্ঘাত উড়ে গ্যাছে ভাজা জর্দার গন্ধ।
আর ফেলে গ্যাছে দৈনন্দিন গল্পের ভার। একটু পরেই ফিরবে
বুধনের দল সঙ্গে মালতি আর ললিতা মাঝিন, মাথায় অদ্ভুত
ভারসাম্যে ঝুড়ির উপর কোদাল। পার হই ঢালু আর উঁচু রাস্তা,
সামনে কংসাবতীর শুকনো কান্না পার হলেই দীঘলছায়া শালবন,
নরম হাওয়া যেন বলে ওঠে, বেশ সময়ে এসেছো তো !
সামনেই টুসু ভাসান আর মকর পরব। দুপুরের সুর তখন অবেলায়
বাঁধা। দূরে কারা যেন মৃদুসুরে গাইছে সাঁওতালি গান তার সাথে
বন্যমাদলের দ্রিম দ্রিম, মানে অনুশীলন ! অনুশীলন !
ডাহুকের ডাক শুনে মনে হয় সে-ও গলা সেধে নিচ্ছে।আদিবাসী
বাঁশির চেনা সুরে যদি ফিরে আসে ছেলেবেলা, খালপার, তাকে
দুহাতে কুড়িয়ে নিতে ভুলি না। হাতির দলও থেমে যায়, ভারী পায়ে
পাখোয়াজ বোল। জেগে ওঠে মল্লভূমের আদি রাজধানী প্রদ্যুম্নপুর।
সামনেই দেখি বটতলার জমাটি চা-দোকানের চালা ডাকছে। বাতার
বেঞ্চে বসে চায়ের চুমুকে পোড়া শালপাতার ভুরভুর গন্ধ, বুঝে নিই
ধন্য আমি। সে যে দামি তন্দুরি চায়ের চেয়ে ঢের বেশি স্বাদু।
গর্বের প্রত্নসম্পদের মতো সেই প্রত্নপাতার গন্ধ-চা।

বলতে বাধ্য হই, জয়পুর, প্রিয় জয়পুর, তুমি ডুবিয়ে দিচ্ছো গ্রামীণ
প্রেমের অমিয়ধারায়, পাখির ডাকে, আমোদরের মৃদুহাসিতে,
ঢোলসমুদ্রের ঘনজলে, ঢেউয়ের আঘ্রাণে।
তোমাকে আপন করি, তোমাতে যাপন করি চাঁদজাগা রাত আর
সবুজ দুপুর অমলিন। মুখে মুখে শুনে নিই তোমার সন্ধ্যার গল্পগাথা।
রূপকথামাখা তোমার কথকথায়, গানে, ভাবনায় নিজেকে রাঙিয়ে
তুলি আগামী বসন্তের প্রিয় রঙে। জয়পুর। প্রিয় জয়পুর।

🍂


একদিন আলোর সরণি বেয়ে

একদিন কোনো এক স্মৃতিময় উপপথে
লেখা হয় কবির নাম। উজ্জ্বল।
সেই পথে একঝাঁক বুনোহাঁস ডেকে ওঠে।
পরিযায়ী শীত ফেলছে ক্ষীণতর শ্বাস।
গাঢ় আলাপন।
ল্যাটেরাইট স্তুপ থেকে তুলে আনে
একটি উদাত্ত গান, দরাজবুক, সিংহদুয়ার।
আমাদের এক অহংকারে লক্ষ অলংকার
মেলে দেয় চেনা সুখের ইতিকথা।
যে বিকেলে চারণকবির কথা
বিলম্বিত আলোয় বাঁধা।

চারণকবি বৈদ্যনাথকে নিবেদিত 

লেবেল

দিনগুলো উড়িয়ে দিচ্ছি ভ্যারেন্ডার বুদবুদে
গাছতলায় শিউলিরা বলেছিল, উৎসব।
লাজুক স্বপ্নে মুক্তির সুখ বোঝেনি কেউ,
কাশেরা চাদর পেতে সন্ন্যাসীর গোঁফদাড়ির মতো
শণ উড়িয়ে শরতের গল্পে বিয়াল্লিশ দিনের স্বপ্ন মেশায়,
শরতের অপ্রিয় বন্ধু বৃষ্টিকুয়াশার একঘেঁয়েমি,
নাছোড় কাঁটার খিচখিচ
দূরের চোখে পাখির উড়ান খোঁজে বিশ্রাম, কুড়িয়ে নেবে
চেনা বিছানার খিদে রাজকন্যা বা রাজপুত্র চেনে না,
জানে সমর্পণ, নিজেকে নির্লিপ্ত মিলিয়ে দেওয়া 

ভরপেট নির্লোভ ময়ালের কাছে মাংসপিণ্ডের চেয়ে বেশি
কাম্য আলিবাবার গল্প আর রত্নাকরগুহার অনন্য বিলাস
পসরাসাজানো বিকেলে প্রলয়পুরুষ নেই ভাঁজে ভাঁজে
কুপন চেটানো, বঁড়শিতে কেঁচো, এক-একটা চারে ঘাই মারে
দু-একটা শাল, শোল, বোয়াল...

বিক্ষিপ্ত গল্পগুলো হাত-পা ভাঙা দ-য়ের দাঁতখিঁচুনি
উৎসব পোশাক থেকে গর্ব টেনে উধাও কামধেনু চেনা ছক
সুখের বাজনা বাজে ভুল বাণিজ্যে গাঁথা কুশীলব উধাও
কোথায় ঝোলাই কান্নার দাগ, স্টিকারে যত ভুল বোঝাবুঝি
আর বিচ্ছেদ,  শংসাপত্রগুলোতে মাঙ্কিপক্স ফুটে।

Post a Comment

0 Comments