জ্বলদর্চি

প্রাচ্যের ভেনিস /দ্যুতি রায়

প্রাচ্যের ভেনিস 

দ্যুতি রায়

  সময়টা জানুয়ারী মাস। শীত বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে । সুন্দর সকাল, ফুরফুরে মন । গাড়ির যাত্রী আমি আর আমার তিরাশি বছরের চঞ্চল মাতা।জয়পুর থেকে গাড়িতে উঠলাম । গন্তব্যের ঠিক নেই, তবে রাজস্থানের বিশেষ কয়েকটা জায়গা। ড্রাইভারের নাম  ইমরান খান।   
রাজস্থানের রাস্তাও বেশ ভালো তবে ক্ষনে ক্ষণে টোল ট্যাক্স দিতে হয় l রাজস্থান মানে যে মরুভূমি না, এখন সেটা নেই বললেই চলে। এটা শুনে মায়ের বিশেষ ভালো লাগলো না ।

   প্রথমে গেলাম পুষ্কর তীর্থ l  প্রজাপতি ব্রহ্মার মন্দির পৃথিবীতে খুব  কমই আছে l কথিত আছে, পিতামহ ব্রহ্মা স্বর্গলোক থেকে নিজের  কর কমল থেকে এক পদ্ম পৃথিবীতে নিক্ষেপ করেন। সেটাতেই পুষ্কর সরোবরের সূচনা । লেকটি ঘিরে বাহান্ন ঘাট ও নানান মন্দির আছে l তবে আশ্চর্যের কথা, ব্রহ্মার মন্দিরে কোনো পূজো হয়না l
🍂

      প্রচলিত লোককথা আছে যে, ব্রহ্মা যজ্ঞ  করবেন। তাঁর অর্ধাঙ্গিনী সাবিত্রী অঙ্গ সজ্জায় সময় অতিবাহিত করছিলেন। মাহেন্দ্রক্ষণ শেষ হবার আগে ব্রহ্মা সরস্বতী দেবীর পাণি গ্রহণ করে যজ্ঞ সমাপন করেন l অতঃপর সব শুনে, দেবী সাবিত্রী মর্মাহত হয়ে, অভিসম্পাত দেন যে, কোনোদিন ওই মন্দিরে ব্রহ্মার পুজো হবে না । দূরের পাহাড়ে গিয়ে তিনি অবস্থান করেন, আর ওখানেই বরাবর থেকে যান। কোনো মানবীর স্বামীর উপর রাগ হলে ছাদে যায়, আর ক্ষিদে পেলেই সুড়সুড় করে নামে l
আজ রাত্রে আমরা কোথাও রাত্রিবাস করবো। তারপর পূর্বদিকের ভেনিস, উদয়পুরে যাবো l কে বানালো এই অপরূপ নগরী ?

     এবার আমরা টাইম মেশিনে পিছন ফিরে যাবো। সেই মহিয়সী নারী ধাত্রী পান্নার কথা, মনে পড়ে ? বন্দী রানা বিক্রমাদিত্য ও নাবালক রানা উদয় সিংহকে (প্রথম)কে, বনবীর হত্যা করলো! তারপর সে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো। উদ্দেশ্য, ছোট্ট রাজপুত্রকে খুন করবে সে। রাজ্যের উত্তরাধিকারী, রাজপুত্রকে এক ঝুড়ির মধ্যে রেখে অনুচর দ্বারা প্রাসাদের বাইরে পাচার করে পান্না বাই । এদিকে নিজের সন্তানকে রাজবেশ পরিয়ে চোখের সামনে নিহত হতে দেখেছিলো, সেই মহান দাই l তারপর শিশু
রাজকুমারকে নিয়ে চিতোর থেকে কুম্ভল গড়, দুর্গম পর্বত জঙ্গল পার হয়ে, মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে নিয়ে গিয়েছিল সে।

       অতঃপর, সেই রাজপুত্র বড় হয়ে চিতোর জিতে নিলো। বানাস নদীর কূলে, পনেরশো তিপান্ন খ্রিস্টাব্দে নিজের নামে নতুন রাজধানী পত্তন করলেন সেই রাজপুরুষ। তিনি হলেন
উদয়সিংহ।

   উদয়পুরে যাবার ইচ্ছেটা ছিল বহুদিনের। আমরা প্রথমে এলাম লেক  পিছোলায় । লেক অনেক দেখেছি তবে এই লেকটা দেখে, কিছুক্ষন বাক্যহারা হয়ে গেলাম।  এ যে  রূপকথার পুরী l ঘন নীল  রঙের জলরাশির উপরে দুধ সাদা প্রাসাদ ও প্রমোদ ভবন। ওপারে সবুজ ধূসর পর্বত,  বিনীতভাবে আসমানী নীলে মিশে গেছে। যেখানে সেখানে ছবি তুললেই হবে পিকচার পোস্টকার্ড। এর মাঝে নৌকা বিহার, যেন  নীলিমায় নীলের স্বপ্ন রাজ্যে ভেসে চলা। সময়ের জ্ঞান থাকে না, শুধু চোখে অধরাকে ধরার নেশা। ভেনিসে সাগরের জল, আর গলির জলে গন্ডোলা,  চারধারে অপরূপ মর্মর স্থাপত্য ! সেও সুন্দর তবে আমাদের প্রাচ্যের ভেনিস বড় মায়া মাখানো সৌন্দর্য। 

         সকালের শুদ্ধ স্নিগ্ধতা, আর রূপ নগরীর মাদকতা,  মন চাইলো এক কাপ গরম কফি। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওপরে রেস্তোরা আছে। রেস্তোরায় এসে  বিরক্ত হলাম, জল নেই, ওয়াশরুম নেই। কফি ও রেস্ট রুম পেতে হলে  কর্নিমাতা রোপ ওয়ের টিকিট নিতে হবে। মা ইমরানের সাথে গল্প করুক আমি কর্নিমাতা দর্শন করে আসি।

      দারুন লাগলো  রোপওয়েতে যেতে l আরো ভালো করে পাখির চোখে দর্শন করলাম উদয় রানার রূপ নগরী l দেবীদর্শনও হলো ll

     এবার গন্তব্য সিটি প্যালেস । আমাদের টিকেট আছে আর গাড়ির টিকেট আড়াইশো টাকা। লেকের পারে রাস্তা গেছে ঘুরে। দ্বারপাল হলো দুই হস্তি। গেট অতিক্রম করে, সুরম্য কানন পার হয়ে, মূল প্রাসাদের দ্বার। ভিতরে গিয়ে, দেখি কি ভীষণ উঁচু এই প্রাসাদ, উঠবো কি করে ? আমার পায়ে চোট আছে । সিকিউরিটি চেক করে সবাই লাইন দিয়ে সিঁড়ি ভাঙছে। আমরা এক গাছতলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এই সময়ে এক হোমরা চোমরা লোক আসছিল আমাদের দিকে।  মাকে বাঙলাতেই বলছিলাম যে, কেন যে এরা লিফট  তৈরী করে না ! উনি কি বুঝলেন কে জানে, আমায় বললেন যে, ম্যানেজমেন্টকে বলে লিফটের স্লিপ আনতে। ভাবলাম, যাক বাবা, লিফট আছে তাহলে। সেই লোককে, খুঁজে পেতে  লিফটের স্লিপ আনলাম। আমাদের সঙ্গে সাজপোশাক পরা এক গার্ডকে দেওয়া হলো। গার্ড মশাই আমাদের অন্যদিকে নিয়ে গেলো। তারপর কয়েকটা ধাপ সিঁড়ি ভেঙে, আরো একটা দরজার তালা খুললো সে। এরপর মেহগনি কাঠের সোনালী কারুকার্য করা একটা মিনি লিফটে ঢুকতে বললো সে। অপরূপ সে লিফট, যেন এক অ্যান্টিক আর্ট। সেটা নাকি উনিশশো চল্লিশে, বার্মিংহাম থেকে জাহাজে এসেছিলো l ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে রানাজীর কোমর ভেঙে যায়, তখন ওটা আনা হলো । ভিনটেজ লিফট ।
 সিকিউরিটি চেকিং নেই আমাদের, তার উপর ফ্রি গাইড! এবার দুইতলা গেলাম, গার্ড তালা খুলে লিফটে ঢোকালো।  তারপর তিনতলা। কোমর ভাঙা রানার শোবার ঘর, বসবার ঘর মায়ে বাথরুম,  কমোড সব দেখলাম। নিচে নামার জন্য, আবার দরজার  তালা খুলে সেই  লিফট যেতে হবে । এবার লিফটের জন্যে অনেক  ক্যান্ডিডেট লাইনে আছে। কিছু বিদেশিনী আছে, কিন্তু গার্ড ওদের মুখের উপর লিফট বন্ধ করলো। শুনতে পেলাম কেউ বলছে" ইয়ে লোগ রাজাজিকে খাস রিস্তেদার  হ্যায় ।" পুরোটা পথ আমি মাকে বলতে থাকি, "বলো, এই রাজার তোমার কে হয়?"

     একতলায় আছে সুসজ্জিত ঘোড়া, পালকি,  রুপোর বাসন, তখনকার জামা কাপড় আরও কত কি বৈভবের জিনিসপত্র l

       এবার মধ্যাহ্ন ভোজনের পালা । যেমনি বাইরে বেরুলাম, অমনি এক দুর্দান্ত রেস্তোরা দেখি। ভালো করে খেলাম। মা নিলো ভেজ থালি আর আমি পিজ্জা। এবার গন্তব্য ফতে সাগর কিন্তু  বিধি বাম একটু যেতেই, গাড়ি গোঁ গোঁ করতে শুরু করলো । ইমরান বললো গ্যারেজে দিতে হবে ।  কি হবে এবার? খোঁজো গ্যারেজ।

     তবে  কথায় বলে, ভালো মানুষের সাথে ভালোই হয়। পথের মোড় ঘুরতেই গ্যারেজ, পার্টস লাগানো হলো ।

        মহরানা ফতে সিংহের নামে ফতে সাগর লেক।  মানুষে বানানো এক লেক । লেকের ভিতরে নৌকোর আকারে চিড়িয়াখানা আর নেহেরু পার্ক । সরোবরের মাঝে, সুন্দর ফোয়ারা।    সন্ধ্যেবেলা, নানা রঙের লাইট জ্বলে, আর জলে প্রতিফলন তার হয়। আবিরের মত ছড়িয়ে পড়ে নানা রঙের ঝর্নার জলধারা।

     এবার যেতে হবে মতি মাগরি বা পার্ল হিলে। রানা প্রতাপ স্মারক ও মিউজিয়াম। ব্রোঞ্জের প্রতিকৃতি আছে, রানা প্রতাপ সহ চেতক ঘোড়া। উপর থেকে জাপানীজ রক গার্ডেন দেখা গেলো ।
  বেলা যে পড়ে আসে, এখনো কত কি দেখার বাকি।
     আরো গেলাম " সেহেলিয়ো  কি বাড়ি " আট চল্লিশটা বান্ধবী সহ, বিয়ের পর রাজকুমারী, উদয়পুরে আসেন। রাজকুমারীর সখীদের সৌজন্যে এই প্রমোদ কানন তৈরী হলো।

 শেষ দর্শনীয় ছিল, একটি চত্বর মাঝে সুন্দর ফোয়ারা।

    এবার ফেরার পালা। এখান থেকে চিতোর একশো পনেরো কিলোমিটার পথ। অন্ধকার নেমে আসে। এখন সাড়ে সাতটা বাজে। আজ নতুন হোটেল খুঁজতে হবে ! চিতোর অভিমুখে চলতে থাকে আমাদের গাড়িটা। 

Post a Comment

0 Comments