জ্বলদর্চি

স্মৃতি গদ্য : সে দিন ভরা সাঁঝে: চিত্রা ভট্টাচার্য্য

স্মৃতি গদ্য 
সে দিন ভরা সাঁঝে 
    
চিত্রা ভট্টাচার্য্য           
 
শ্রাবণের জলভারে নত মেঘের আকাশ, এক পশলা বৃষ্টি ভেজা দুপুরে মুম্বাই এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে পর্ণা বসে আছে । আজ বেশ কিছু দিন বাদে ছন্নছাড়া ফেরারী মনে ওর ঘরে ফেরার তাগিদের অনুভব । সামনে বিশাল মোটা স্বচ্ছ কাঁচের দেওয়াল। এদিকে ইন্ডিগো আর ভিস্তারার আড্ডা, সমানে আকাশ মাটি কাঁপিয়ে নামা ওঠা চলছে একালের বিস্ময় বিজ্ঞানের অগ্রদূতের। পর্ণা হেসে বলে "যান্ত্রিক বিহঙ্গ"। পাখির মত নির্ভয়ে ডানা মেলে আকাশ টাকে আপন করে নিয়ে দূর দূরান্তে পাড়ি দিয়ে নিমেষে পৌঁছে     যায়, ওর ভারী অবাক লাগে! বিজ্ঞানের এই দ্রুত অগ্রগতি। সময় একেবারে ঘড়ির কাঁটায় মাপা, এক মিনিট এদিক ওদিক হবার যো নেই। কিন্তু যখন লেট করে! পাগলের মত লাগে। একরাশ বিরক্তির শেষ থাকে না।                                           

ওর হাতে এখন অঢেল সময়। এত দ্রুত গতির চলার সাথে তাল মিলিয়ে ঝাপ্সা আকাশটার দিকে চেয়ে বসেই থাকে ।
 হাতে নাই বা থাকলো পেন্সিল নোটবুক! স্মার্ট ফোন রয়েছে ! হিজিবিজি লেখা আঁকিবুকি কাটা ছবি তোলা আর দেখার, একাকী মনের একমাত্র সঙ্গী। আঙুলের মাথায় শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই  লেখারাও গোটা গোটা ছাপার অক্ষরে হাজির হয়ে যায়।
     
বিস্তর অভিমান বুকে নিয়ে স্তব্ধ ঘোলাটে বিবর্ণ শ্রাবণের মেঘেরা কালো কাজল চোখে নেমে আসে মাটির বুকে। ভাষাহারা দৃষ্টিতে একটানা চেয়ে থেকে। আজ ওর বিদায়ী বেলাতে ও অভিমানীর একটু ও পরিবর্তন নেই।  এমন হতাশ করা ক্লান্ত মেঘের ধূসরিমার অবয়বের ওপর , একরাশ ধুয়োয় কুন্ডলি পাকানো দাপুটে মেঘেদের আসা যাওয়া--- সমস্ত দিগন্তের ওপর তর্জনী তুলে শাসন করে চলেছে কোন অধিকারে কে জানে? কিন্তু ঐ ঘোলাটে বিষন্নতার বুক ভরে জমে থাকা অভিমানের ও কোনো হদিস খুঁজে পায়না আজো ।                                                                              
সেই সাত সকাল থেকেই ওর আনমোনা মন বিচ্ছেদের ব্যথায় ভারাক্রান্ত। এ জীবনের একান্ত আপন অতিপ্রিয় যা কিছু নিজের-- সব সময়ের কাছে জমা রেখে ফিরে চলেছে আপন গৃহতলে। কান পেতে শুনছে,মন যেন বলছে, ''তুমি যা -ও -ও -যে তোমারই পাশে থাকে। ''                        
ভোর বেলায় সে সময়ে আজ ও তাকিয়ে ছিলো পথের দিকে চেয়ে? কাকে হঠাৎ কাছে পাবে বলে --মন কেন এমন উতলা হয়? ও জানেনা, শুধুই জানে তাকে দেখতে ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া ওর ছোট্ট ভাইটির মত। মন মানে না, যদি ও জানে সে কেমন করে হবে? অসম্ভব! আবার আর এক মন বলে,হতেও তো পারে। হয়তো কোনো মতে সে এই মহারাষ্ট্রের দেশে সে চলে এসেছে। ওই যে মুখের সাথে কত মিল? কিন্তু অনেক টা একই রকম দেখতে।  পর্ণার মনে হাজার প্রশ্ন উঁকি দিলে কী হবে আজ পর্যন্ত তেমন ভাবে কোনো পরিচয় ই তো গড়ে ওঠেনি। 
🍂

পাওয়াইয়ে শোবার ঘরের চারতলার জানলা দিয়ে যে আকাশ রোজ দেখে -- যে গভীর অরণ্য আপন আনন্দে দেখা দেয়,  টলটলে নীলজলে ভরা যে লেকের লেজ টুকু চোখে পরে তাও দেখায় ওর ভারী আগ্রহ  ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে একটুও ক্লান্তি আসেনা । সেখানে এক গভীর প্রত্যাশা নিয়ে অকারন সময় চলে যায়। এক চিন্তা মনের মাঝে ঘুরে বেড়ায় ।  সে কেন এলো না? সে তো আসেনি। আবার কবে আসবে ও  এখানে ? আবার কবে দেখা হবে?

জানালা দিয়ে নীচে তাকালে পীচ ঢালা কালো আঁকাবাঁকা রাস্তা টা চলে গিয়েছে সেই কত দৃরের পথে। ঐ ঢলঢলে জলে ভরা লেকের পশ্চিমপারের শেষ সীমানায়, বাঁশের মাচা দিয়ে বানানো লম্বা সাঁকোটি পার হলে তারপরের চালা ঘরটি তে থাকে বলেছিল । সারা সকাল তখন ও জানলায় পর্ণা ঠায় দাঁড়িয়ে--- মনের মাঝে এক বারটি দেখা পাওয়ার ক্ষীন বাসনা । 

সে তো রৌদ্রে বাদলে, দিনে এমনকি রাতের বেলায় ও দেখেছে এই ঘন অন্ধকারে  নির্ভয়ে বাঁশিতে আকুল করা গানের সুরে, কত যে রাগ রাগিনীর ধুন বাজিয়ে বুনোপথ কাঁপিয়ে আপন মনে এগিয়ে যায়। ওর ভোরের আলোয় ভৈরবি রাগিনী তে  ঘুম ভাঙ্গায় আর গভীর রাতে কাফি রাগের সুর তুলে ঠিক এই পথে চলে যায় ও তখন ঘুমের সাগরে স্বপ্নের তরী ভাসিয়ে পাড়ি দেয়।।
 
পর্ণা ওকে বাঁশিয়ালা নামেই চেনে । কখনো ঐ পথে প্রাতঃ ভ্রমণের সময় কখনো বা সাঁঝে যাওয়া আসার পথে বাঁশিয়ালার সাথে ওর দেখা হয় । সদ্য কৈশোর পেরিয়েছে,লম্বা ফর্সা রোগাটে চেহারা,গালে হালকা কচি ঘাসের মত দাড়ি,  পুরুষত্বের দাবি জানিয়ে অহংকারী গোপের রেখা বেশ স্পষ্ট। হয়তো কলেজের প্রথমবর্ষ।  কিন্তু ওর বাঁশির সুরে জাদু আছে। মোহিত করা আওয়াজে এমন বাতাস কাঁপানো সুরের মূর্ছনায় মন উদাস হয়ে যায়। বাতাস বয়ে বেড়ায় কোন সাগর পাড়ের বালুচরে।                                 

সেদিন  মুগ্ধ হয়ে দেখেছিল লম্বা দেবদারু শিরিষ গাছগুলোর ডালপালায় হাওয়ার দুলুনি তে সরুসরু পাতায়  নাচন লেগেছে। বয়সের ভারে হলদে হয়ে যাওয়া পুরোনো পাতা শনশন শব্দে একটু হাওয়াতেই ঝরঝর করে চক্রাকারে ঘুরে নীচে পড়ছে। কাঠবেড়ালী দুটো একদৌড়ে তরিৎ গতিতে লেজটাকে স্বরবর্ণের লি-কারের মত তুলে ডালপালা বেয়ে লম্বা গাছ গুলোর মগ ডালে। পাতার আড়ালে নিশ্চিন্তে বাঁধা পাখির বাসায় ডাকাতের মত হামলে পরে সদ্য ফোঁটা ডিম গুলো কে আত্মসাৎ করার ফন্দি তে কী প্রানান্তকর চেষ্টা ! এত তৎপরতা ওদের লোলুপ নীরিহ চোখের দৃষ্টিতে ? দূর্বল পাখিগুলো শুধু চিঁচিঁ করে ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ডানা ঝাপ্টে প্রতিবাদের ঝড় তোলে।

 পর্ণা দেখছে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া বা বৃষ্টিতে ও পাখির বাসা  অটুট থাকে ,পাখির বাচ্চারাও গড়িয়ে পড়ে না। কালো মেঘের আড়াল থেকে এক আধ পশলা জোরদার বৃষ্টি ঝরে পড়লে গাছের পাতা থেকে জল গড়ায় টপ টপ টপ। জানলার কাঁচ সরিয়ে হাত পেতে সে বৃষ্টির জল গন্ডুষ ভরে নিতে কী যে পরম সুখ। ছোট বেলার বৃষ্টি ভেজা দিনের আনন্দানুভূতি সবলে মন কে নাড়া দিয়ে যায়। বসে থেকে কত যে কাজ অকাজের কথা মনে পড়ে। ভারী আশ্চর্য্য বোধহয়, যখন হাওয়ার থেকেও মনের ভাবনারা সব দ্রুত গতিতে চলতে থাকে।          

আজ মোটেই বৃষ্টি হয়নি,তবু ঝাপ্সা আলোয় ঢাকা চারিদিকের নিথর প্রকৃতি। কি কথা বলবে বলে দুরু দুরু বুকে এসেছিল ধূসর মেঘেরা যেন পদ্মবনে পা টিপে টিপে চলা অভিসারিকা। তার একমাত্র সম্বল জলে ভিজে যাওয়া দুরন্ত যৌবন। অনেক নীচে বইছে সরু একফালি পাওয়াইয়ের শাখা নদী।এতদিন সে ছিল বনতলের নিবিড় ছায়ায় ঢাকা জলধারা-- পর্ণা তার ও এক নতুন  নামাকরণ করেছে সুপ্তশ্রী -- ঘুমিয়ে থাকা সুন্দরী । বুনো গাছের স্নেহের ছায়ায় আঁচলের তলে সবুজ ঘন অন্ধকারে ঝিরিঝিরি  সুর তুলে বইতে থাকে সংগোপনে। রূপালী মাছেরা অবাধে খেলে বেড়ায় সেই ঘোলা জলে। আর নিত্য বাঁধা ধরা রুটিন থেকে  ক্লাস পালানো ছেলের দল গামছা দিয়ে অতি নিপুনতায় মাছ ধরে  বিজয় গর্বে এই পথে সারাদিন কাটিয়ে বিকেলে ঘরে ফিরতে দেখেছে ।  

এখন বর্ষার ঘোর প্লাবনে সে সূতোর মত জলধারায় লেগেছে উচ্ছ্বাস, কলকল ছলছল হাসিতে ভেজা তার দুই চোখের কোণ ভরা শ্রাবণের টল মল আর্দ্র অশ্রু বিন্দু নিয়ে এসেছিল করুণ  মুখে ওকে বিদায়ী জানাতে। ছদ্ম হাসির রেখা টেনে বলেছিল আবার কবে আসবে গো ?                                                  
মেঘের ছায়া ঘেরা নিদাঘের বেলা আনমনে কেটে যায়।  কবে আবার অবাক বিষন্নতা কাটিয়ে চলবো সোজা পথের ডাকে। একরাশ অবান্তর চিন্তারা মাথায় ঘুর পাক খায়। ঝিঁঝিঁ পোকারা ঝিনঝিন সুরে ঐ মাঝ দুপুরে ও বুনো অন্ধকারের তলে ঘুরে বেড়ায়। 

ওর এলোমেলো চিন্তায়  বাধা পড়লো।  ফোনে টুংটাং করে  প্রতিবেশি বন্ধুর ম্যাসেজ ঢুকতে দেখে ইনবক্স খুলে চমকে ওঠে । "তোমার বাঁশিয়ালা কাল রাতে পাহাড়ি বুনো পথে চলতে গিয়ে বিষাক্ত কোনো সর্পদংশনে ভারী অসুস্থ। হসপিটালে জীবন মৃত্যুর সংগ্রামে চলছে। সাংঘাতিক লড়াই। এখনো জ্ঞান আসেনি। অবস্থা সংকট জনক। " 
পর্ণা ভাবছে কী করবে এখন? ফেরার পথ নেই,চোখ ভরে অঝোরে গরম তরলের ধারা নামছে।

লাইনে দাঁড়াতে হবে প্লেনে বোর্ড করার নির্দেশ এল।        এবং বোর্ডিঙ ও হয়ে গিয়েছে। ভিস্তারার উইন্ডো সীটে সীটবেল্ট যন্ত্র চালিতের মত আটকে জানলার কাঁচে মুখ রাখে। রানওয়ে দিয়ে প্লেন ছুটতে শুরু করেছে।  এক বুক নিঃশ্বাস ভরে নিয়ে নিমেষে ঝাঁকুনি খেয়ে ওপর আকাশে ভাসতে শুরু করলো ওর যান্ত্রিক বিহঙ্গ। 

রইলো পড়ে নীচে বিলাসী শহরের আকাশছোঁয়া অট্টলিকার ঠাঁট বাট। রাশিরাশি ইট কাঠের ঘরবাড়ি, পাওয়াইয়ের মাঠ ঘাট নদনদী বন উপবন আর ওর মৃত্যু পথ যাত্রী  বাঁশিয়ালা।আকাশে ভেসে ভাষাহীন চোখে নীচে আরব সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের খেলা দেখছে।  সব ছেড়ে এবার মায়াময় পৃথিবীর উর্দ্ধ থেকে আরো উর্দ্ধ পথে ও উড়ে চলেছে । মেঘের সমুদ্র মেঘের স্বপ্ন পুরী  মেঘের রাজপ্রাসাদ।  নীলাম্বরী আকাশে মেঘের মিনারে কত শত কারুকার্যের দৃশ্য।  সোনালী ডানার পালকের স্তরেস্তরে ঘুমন্ত চোখের পাতা। 

বিকেলের শেষ রোদ এসে জানলায় দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়ে যায় আয় কে যাবি আয় সাদা ভেলায় পাল তুলে মেঘের সমুদ্রে ভাসতে ? সেখানে তারা দের দেশে রাজপুরি তে চলবে আজ রাতভর উৎসব। কিন্তু মনের অতলে এক চিন্তা --         " বাঁশিয়ালা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে? পড়শীবন্ধু মিতা টেক্সট করেছে, রাতের বেলায়  হসপিটালে নিয়ে যেতে বেশ দেরী হয়েছিল।  তাই কী জানি! এ যাত্রায় কপালে কী আছে? "
পর্ণা একমনে মঙ্গলময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায়, ও কে জিতিয়ে দাও ঠাকুর। ' আবার যেন ফিরে এসে ওকে দেখতে পাই। আবার ওর বাঁশি যেন বাজে। 
ছোটভাই টা কবে যেন হারিয়ে গিয়েছিল? --কেউ খুঁজে পায়নি এখনো । 

দাপুটে রক্তিম সূর্য এতক্ষন পর দেখা দিলো এমন বিদায়ী বেলায়। গত একমাসে এই প্রথম তার দেখা পাওয়া গেল। সে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায় গোধূলির আলোয় কমলা রাঙা সাজো সাজো রব চারদিকের নীলদিগন্ত জুড়ে। সপ্তরথীর চাকায় ও সজোরে টান লেগেছে, সে ও যাবে সব অভিমান মুছে ফেলে রাতের জলসাঘরের নিমন্ত্রণে।

Post a Comment

0 Comments