জ্বলদর্চি

২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫সাল, জাপানের আত্মসমর্পণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫সাল, জাপানের আত্মসমর্পণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২রা সেপ্টেম্বর, এই দিনে জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়, এই দিবসটির গুরুত্ব কি এবং এই সম্পর্কে আসুন সবকিছুই বিস্তারিত ভাবে জেনে নিই।
যুদ্ধের অবসান,শান্তির প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিল ১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর। ইতিহাসের কিছু তারিখ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার স্মৃতি, বেদনা ও শিক্ষার প্রতীক। ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ তেমনই এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলা সেই ভয়াবহ যুদ্ধ পৃথিবীকে দিয়েছিল ধ্বংস, মৃত্যু, উদ্বাস্তু জীবন ও অসংখ্য মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি। তাই ২রা সেপ্টেম্বর একই সঙ্গে একটি যুদ্ধের সমাপ্তি এবং শান্তির নতুন প্রত্যাশার সূচনাদিন। ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। শুরুতে ইউরোপকেন্দ্রিক হলেও দ্রুত এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। জার্মানি, ইতালি ও জাপানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অক্ষশক্তি; তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ মিত্রশক্তি। যুদ্ধের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের দুর্ভোগ। শহরের পর শহর ধ্বংস হয়, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয় এবং অগণিত পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জনকে।
🍂

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপান ছিল, অক্ষশক্তির অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি। ১৯৪১ সালের পার্ল হারবার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে। এরপর প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘ কয়েক বছরের যুদ্ধে ধীরে, ধীরে জাপানের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হতে থাকে।
১৯৪৫ সালে ইউরোপে যুদ্ধের অবসান হলেও জাপান তখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। আগস্ট মাসে যুদ্ধের গতিপথ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ৬ই আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ই আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একের পর এক আঘাতে, জাপানের নেতৃত্ব বুঝতে পারে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়।
১৫ই আগস্ট ১৯৪৫ সালে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো রেডিও ভাষণের মাধ্যমে জনগণকে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানান। সেই মুহূর্তে দীর্ঘ যুদ্ধের অস্ত্রধ্বনি কার্যত থেমে যায়। কিন্তু যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির জন্য বাকি ছিল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন, ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সাল।
টোকিও উপসাগরে নোঙর করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ USS Missouri তে অনুষ্ঠিত হয় জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। মিত্রশক্তির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জাপানের প্রতিনিধিরা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। মিত্রশক্তির পক্ষে অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার। জাপানের পক্ষে দলিলে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামোরু শিগেমিৎসু এবং জেনারেল ইয়োশিজিরো উমেজু। স্বাক্ষরের সেই মুহূর্তে শুধু একটি রাষ্ট্র আত্মসমর্পণ করেনি, শেষ হয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধের একটি অধ্যায়। বিশ্ব যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর নতুন করে শান্তির আলো দেখার সুযোগ পেল, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও তার ক্ষত তখনও গভীর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি, কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছিল। ইউরোপ ও এশিয়ার বহু শহর পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। নাৎসি গণহত্যার নির্মমতা এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ মানবতার সামনে তুলে ধরেছিল যুদ্ধের চরম নিষ্ঠুরতা। যুদ্ধের পর বিশ্ব উপলব্ধি করল, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। এই উপলব্ধিরই একটি বড় ফল ছিল জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের বিশ্বব্যাপী সংঘাত আর না ঘটে, সেই প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে।
জাপানের ক্ষেত্রেও ২রা সেপ্টেম্বর ছিল এক যুগসন্ধিক্ষণ। যুদ্ধোত্তর সময়ে দেশটি সামরিক সম্প্রসারণের পথ থেকে সরে এসে পুনর্গঠন ও শান্তির পথে এগিয়ে যায়। পরবর্তী কয়েক দশকে জাপান অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করে। ধ্বংসের মধ্য থেকেও একটি জাতি কীভাবে পুনর্গঠিত হতে পারে, জাপানের ইতিহাস তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আজ ২রা সেপ্টেম্বর আমাদের কাছে শুধু অতীতের একটি তারিখ নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী ও পরাজিত দুই পক্ষই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। সাধারণ মানুষ হারায় তাদের স্বজন, ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন। তাই যুদ্ধের চেয়ে শান্তির মূল্য যে কত বেশি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস তার সবচেয়ে কঠিন প্রমাণ।
২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ আমাদের শেখায়, ধ্বংসের চেয়ে নির্মাণ, প্রতিহিংসার চেয়ে সহমর্মিতা এবং যুদ্ধের চেয়ে শান্তিই মানবসভ্যতার প্রকৃত পথ। সেই ঐতিহাসিক দিনের স্মৃতি তাই আমাদের কাছে কেবল অতীতের গল্প নয়, এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একটি অঙ্গীকার, যুদ্ধ নয়, শান্তিই হোক মানবজাতির চূড়ান্ত লক্ষ্য।

Post a Comment

0 Comments