জ্বলদর্চি

কেন লেখক হওয়া গেল না /দীপশ্রী সেনগুপ্ত

কেন লেখক হওয়া গেল না

 দীপশ্রী সেনগুপ্ত

জগবন্ধু বাবু লিখতে বসেছেন, যেমন প্রায় রোজই বসেন। তবে কথা হলো, লেখা আর তাঁর হয়ে ওঠে না। কারণ? কারণ অসংখ্য বাধা—একমাত্র তিনিই জানেন এ পথে তাঁর জন্য কত বাধা। এমনকি সহধর্মিণী ইরাবতীও এই বাধার কথা জানেন না। জগবন্ধু বাবুর মতে ইরাবতী জানতেও চান না, বুঝতেও চান না। এক সময়ে ফুড কর্পোরেশনে দায়িত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন জগবন্ধু বাবু। লেখালেখির শখ তাঁর বহুদিনের। দেখা হলে প্রায়ই বলতেন, "অনেক সময় মাথায় লেখা গজগজ করে, জানেন? কাগজ-কলম নিয়ে মন স্থির করে বসতে পারব, তবে না? অফিসের ঘানি কে টানবে, বলুন! তারপর ধরুনগে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার তদারকি করা, গিন্নির শরীর-স্বাস্থ্য, মন-মেজাজ জুগিয়ে চলা—সোজা নাকি!"

এতদিনে একটু ফুরসত পেয়ে জানলার ধারের টেবিলে গুছিয়ে বসেছেন। সামনে সুদৃশ্য বাঁধানো খাতা, কফি মগে ধূমায়িত ব্ল্যাক কফি, হাতে দামি কলম—সব আয়োজন সুসম্পন্ন! হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো, জগবন্ধু বাবু কিন্তু হাল আমলের মতো ল্যাপটপে ঝড় তোলেন না। ধীরে-সুস্থে কাগজের বুকে লেখা ফুটিয়ে তারপর সেটিকে ল্যাপটপায়িত করেন। মনে মনে মা সরস্বতীকে স্মরণ করে কলম বাড়িয়ে বসেছেন, ব্যস! শুরু হলো চিল-চিৎকার, পাশের বাড়িতে যুদ্ধ লেগেছে। বছর সাত-আটের রন্টু পড়তে বসবে না, আর ওর মা ওকে পড়তে বসাবেনই। এত চিৎকারে মন অন্যমনস্ক হয় কি না বলুন! আবার মন বসাতে অনেক সময় লাগে। উঠে গিয়ে জানলা বন্ধ করতেই হলো; বাইরের গাছগাছালি, গরু চরে বেড়ানোর দৃশ্য চলে গেল চোখের আড়ালে। এতে লেখার ক্ষতি হয় কি না বলুন! এ যে লেখকের পক্ষে কত বেদনাদায়ক, তা একমাত্র লেখকই জানেন।
🍂
আবার বেশ করে টেনেটুনে মনকে কায়দায় এনে সবে কলম বাগিয়ে বসেছেন, গিন্নি হাজির! "শুনছ, আমার বাবার শরীরটা আবার বেশ খারাপ হয়েছে, একটু আগে মা ফোন করেছিলেন। ভাবছি, আগামীকাল একবার ঘুরে এলে হয়।" দোষের মধ্যে জগবন্ধু বাবু অত খেয়াল না করেই বলে দিলেন, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও, যাও।"

আর যায় কোথায়! গিন্নি বেজায় রেগে গেলেন! অমন কুকুর তাড়ানোর মতো করলে কে না রেগে যাবে বলুন! একেবারে কানের গোড়ায় এসে হাত-পা নেড়ে না-হক হাজার কথা শুনিয়ে গেলেন—"হ্যাঁ, সে তো বলবেই! কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরোলে পাজী—এ তো সবাই জানে। সারা জীবন সব শখ-আহ্লাদ বাদ দিয়ে এই সংসারে খেটে মরলুম, এখন ছেলে-মেয়ে মানুষ হয়ে গেছে, ঘরে সব সময়ের কাজের লোক, এখন আর আমাকে কী দরকার?" আরও কী কী সব বলে গেলেন! লাভের মধ্যে হলো, জগবন্ধু বাবু সামনে খাতা খুলে, হাতে পেন নিয়ে ভাবতে বসলেন—ইরাবতী সংসারের জন্য কী কী শখ কবে কবে বিসর্জন দিয়েছেন।

সাততাড়াতাড়ি চা-জলখাবার খেয়ে লিখতে বসেছিলেন, এক অক্ষরও লেখা হলো না, বেলা গড়িয়ে চলেছে। এমন সময় পিছনের বাড়ির রমেশ বাবু এসে হাজির—"দাদা, বাড়িতে আছেন?"

"আরে, আসুন, আসুন।"

"বিরক্ত করলাম না তো?"

"কী বলছেন কি? আপনারা এলে কত ভালো লাগে বলুন তো।" (মনে মনে) আসার আর সময় পেলেন না? এখন বসে বসে হাবিজাবি বকবেন, সেগুলো আমার শুনতে হবে।

"বসুন, চা খান।" কাজের লোককে ডেকে দু-কাপ চা করতে বললেন। পাড়া-বেপাড়ার খবর, রাজনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সব নিয়ে খানিক পরচর্চা হলো; রমেশ বাবু উঠলেন বেলা সাড়ে বারোটায়। বেলার মতো জগবন্ধু বাবুর লেখাও মাথায় উঠল। ইরাবতী এসে আল্টিমেটাম দিয়ে গেলেন, বেলা একটার পর তিনি আর হাঁড়ি আগলে বসে থাকতে পারবেন না।

যাক, বিকেলে পার্কে বেড়িয়ে এসে লিখতে বসা যাবে—নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে পরপর স্নান, খাওয়া, ছোট্ট একটা ভাতঘুম দিয়ে উঠে বিকেলে চললেন পার্কে।

জগবন্ধু বাবুর বন্ধুভাগ্য বেশ ভালো, সে তো তাঁর নামেই বোঝা যায়! পাড়া-বেপাড়ার প্রায় সমবয়সী কয়েক জনের সাথে তাঁর আগে থেকেই আলাপ ছিল। রিটায়ারমেন্টের পর বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে, ওঁরাও তো রিটায়ার করেছেন! অনেক সুখ-দুঃখের আদান-প্রদান হয় নিজেদের মধ্যে। পার্কে গিয়ে শোনা গেল একজনের আজ জন্মদিন।

"চলুন আজ বিকেলে আমার বাড়িতে চা খাবেন সবাই।"

"আরে, না, না, এখন কি যাওয়া যায় নাকি?"

"কেন? চলুন তো সবাই, গিন্নিকে বলে এসেছি চা রেডি করতে, তিনি সব সাজিয়ে বসে আছেন, আপনারা না গেলে তিনি দুঃখ পাবেন।"

অগত্যা চার বন্ধু মিলে চললেন জন্মদিনের চা খেতে। (মুখে আপত্তি করলেও সকলেরই মনে মনে ইচ্ছা ছিল যাবার, বুড়ো বয়সে যা হয় আর কি)।

সেখানে কেক কাটা ও খাওয়া, বন্ধুর বউয়ের রান্না ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, পায়েস, মিষ্টি সাবাড় করে বাড়ি ফিরতে রাত আটটা। ইরাবতীকে আগেই ফোন করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তো ছেড়ে দেবার পাত্র নন, কথা শুনিয়ে দিলেন—আগে জানলে তিনি জগবন্ধু বাবুর জন্য রান্না করাতেন না। অনেক কষ্টে তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ছন্দে ফিরিয়ে একটু আয়েশ করে বসতে না বসতেই একে একে ছেলে-মেয়েদের ফোন—অবশ্য রোজই ওরা এই সময়েই ফোন করে। ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি, বউমা, জামাইয়ের সাথে কর্তা-গিন্নি দুজনেই খুব আনন্দ করে কথা বলেন।

তবে মেয়ে আজ একটু অভিযোগ করল, "বাবা, আজ এত তাড়াতাড়ি করছ কেন, কি এমন তোমার জরুরি কাজ আছে?"

"না রে মা, সেরকম কোনো কাজ নেই, তুই তো জানিস, আমি লিখতে ভালোবাসি, তাই একটু বসব লেখা নিয়ে, তবে সে এখনও দেরি আছে।"

ছেলে, মেয়ে, বউমা, জামাই, নাতি, নাতনি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে করতে রাত প্রায় সওয়া নটা।

এতক্ষণে টেবিলে বসে খাতা-পেন খুলে আয়োজন করে বসলেন জগবন্ধু বাবু।

এবার দেখুন, ওনার ভাগ্যে কি ছিল। শুনতে পেলেন ল্যান্ডফোন বাজছে। ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে ইরাবতী প্রবেশ করলেন—"টুকুর বাবা ফোন করে তোমাকে চাইছিলেন, ওনার মা বাথরুমে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন, একটু সাহায্য করো, গিয়ে ওনার পাশে দাঁড়াও।"

কোনোমতে তাড়াতাড়ি গায়ে জামা গলিয়ে দৌড়লেন জগবন্ধু বাবু। টুকুর ঠাকুমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলো, পাড়ার দু-চারজন কমবয়সী ছেলেও ছিল, তারাই সব ব্যবস্থা করল। টুকুর ঠাকুমাকে একটু সুস্থ দেখে জগবন্ধু বাবু যখন বাড়ি ফিরলেন,তখন রাত আড়াইটার কাছাকাছি।

তখন কোন্ লেখক লিখতে বসতে পারেন, আপনারাই বলুন না!

তবে এটাও ঠিক, এইসব ঘটনা রোজ রোজ ঘটে না, কিন্তু অনেক সময় ঘটে, অথবা অন্যরকম কিছু ঘটে, যার জন্য জগবন্ধু বাবুর লেখা আর হয়ে ওঠে না।

পরিবেশ চাই, পরিবেশ! প্রতিভার বিকাশের জন্য পরিবেশ চাই। আপনারা বুঝবেন বলেই ওনার দিনলিপি তুলে দিলাম।

পরদিন আবার জগবন্ধু বাবু জানলার ধারে খাতা খুলে বসেন, আবার পাশের বাড়িতে রন্টু আর ওর মায়ের যুদ্ধ, আবার জগবন্ধু বাবুর জানলা বন্ধ। আবার ইরাবতী আগমন, দরকারি কথা, আবার....।

Post a Comment

1 Comments

  1. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 30, 2026

    খুব ভালো👍

    ReplyDelete