পর্ব ৬
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
কাঠকয়লা ও বুনো আদিবাসী
“— আমরা যে দেশে বাস করি তার নাম জান?
— আমরা গয়া জেলায় বাস করি।
— ভারতবর্ষের নাম শুনেছ?
ভানুমতী মাথা নাড়িয়া জানাইল সে শোনে নাই। কখনো কোথায় যায় নাই চকমিকিটোলা ছাড়িয়া। ভারতবর্ষ কোন্দিকে?”
-আরণ্যক
ঘনঘন এই জঙ্গলে আসার কারণে ড্রাইভার এবং গাইড ভাইদের সাথে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই আবদার করেছিলাম এখানকার গ্রাম দেখার। মঙ্গলবার জঙ্গল বন্ধ থাকার কারণে হাতে অনেকটা সময়। নগর সভ্যতার থেকে অনেক দূরে, গভীর অরণ্যে থাকা মানুষেরা কীভাবে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে, লড়াই করে বেঁচে থাকে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও তারা কতটা সরল, আনন্দময় জীবনযাপন করে, তা চাক্ষুষ করতেই এই উদ্যোগ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ পড়ে শিহরিত হয়েছি বহুবার। সভ্য সমাজের চোখে অস্তিত্বহীন, ভানুমতীর মত এইসব বন্য মনুষ্যপ্রাণ শহুরে মানুষের চেয়ে অনেক উদার ও পবিত্র এ ধারণা আগেই তৈরি হয়েছিল। এই কথাই ভাবছিলাম, যখন তাডোবার কোর অঞ্চলের নিস্তব্ধতা পেরিয়ে আমাদের গাড়ি চন্দ্রপুরের বাফার জোনের দিকে এগোচ্ছিল।
অরণ্যের আদিম বুনো রূপ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। দূর থেকে ভেসে আসছিল ডাম্পারের ভারী গর্জন। বাতাসে মহুয়ার মিষ্টি গন্ধের জায়গা নিচ্ছিল কয়লাখনির ঝাঁঝালো গন্ধ। চন্দ্রপুরের এই অঞ্চলটিতে এক অদ্ভুত বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ল। এটি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম উন্মুক্ত কয়লাখনি আর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, আর এর ঠিক গা ঘেঁষেই রয়েছে বাঘেদের রাজত্ব। এই দুই ভিন্ন, বিপরীত মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অন্য মানবসমাজ— এই বনের আদি বাসিন্দা, গোণ্ড এবং বৈগা উপজাতির মানুষেরা।
আমাদের চোখে বাঘ মানে এক রোমাঞ্চকর, রহস্যময় শ্বাপদ, যা দেখার জন্য আমরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসি, বহুমূল্য ব্যায় করে জিপসি, সাফারি বুক করি। কিন্তু জঙ্গলের গা ঘেঁষে থাকা আদিবাসী গ্রামগুলোর কাছে বাঘ কোনো বিনোদনের সামগ্রী নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাফার জোনের এক ছোট্ট গোণ্ড গ্রামের প্রান্তে পৌঁছানো গেল। ড্রাইভার আমোল জি আলাপ করিয়ে দিলেন প্রবীণ আদিবাসী বৃদ্ধ লাহু মার্কমের সাথে।আলাপচারিতা শুরু হল কিছুটা সংকোচ নিয়ে। ধীরে ধীরে উষ্ণতা বাড়তে লাগল। তাঁর চোখের পরিপক্ব চামড়ায় ফুটে উঠছিল এক শান্ত অভিজ্ঞতা। জানতে চাইলাম বাঘের সাথে নিত্য জীবনযাপন তাঁর কেমন লাগে। ভয় করে কিনা জানতে চাইলে লাহু মার্কম একটু ইতস্তত করে দূরে জঙ্গলের দিকে ইশারা করে বলেছিলেন, ‘তারু দেও’ অর্থাৎ তাঁদের বাঘ-দেবতা ঘরের লোক, একেবারে আপনজন। তারা বনে যায় কাঠ কুড়োতে, মহুয়া ফুল তুলতে। তিনি চাইলে তবেই দেখা দেন, নচেৎ নয়। বনের কিছু নিয়ম আছে। মেনে চললে তিনি কাউকে আঘাত করেন না।
🍂
"মানুষ যেখানে বাস করে না, সেখানে দেবতারা বাস করেন—এই নির্জনতা, এই নিস্তব্ধতা তাঁহাদেরই উপযুক্ত মন্দির।"
-আরণ্যক
কি সরল, নিষ্পাপ বিশ্বাস! এই বিশ্বাসের শিকড় অনেক গভীরে। গোণ্ডদের লোকগাথায় বাঘ কোনো হিংস্র, ভীতিকর প্রাণী বা শত্রু নয়, সে তাদের অরণ্যের রক্ষক। ধীরে ধীরে জড়তা, সংশয় কেটে যাচ্ছিলো। লাহুর বৃদ্ধা ঘরনি চা নিয়ে এলেন। কথপোকথন যত এগোলো, তত নিজেরাও অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম। বুঝলাম, তাদের বিশ্বাস, যতদিন বনে বাঘ থাকবে, ততদিন জঙ্গল বেঁচে থাকবে, আর জঙ্গল বাঁচলে তবেই বাঁচবে তাদের সংস্কৃতি। এই সরল বিশ্বাসের সমান্তরালেই জড়িয়ে আছে এক কঠিন অন্তর্নিহিত মানসিক লড়াইও। খনি আর কলকারখানার বিস্তারের ফলে বাঘেদের প্রাচীন করিডোরগুলো আজ খণ্ডিত। তাদের চারণভুমি আজ বেদখল। শুধু তাই নয়, এর সাথে আছে মানুষের ভয়ঙ্কর লোভ। “পোচিং” কথাটার সাথে আমরা পরিচিত। জঙ্গলে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকার এবং পাচার করার অপরাধমূলক একটি কর্মকাণ্ড হল পোচিং। জাতীয় উদ্যানগুলো থেকে অবৈধ উপায়ে পশু-পাখি ধরা, হত্যা করা কিংবা বনের মূল্যবান গাছ ও উদ্ভিদ কেটে পাচার করা এ সবই আড়ালে চলতে থাকে। ফলত বন্যপ্রাণী ক্রমশ কমে আসছে। ইকোসিস্টেম নষ্ট হওয়ায়, বাঘেদের খাদ্যে ঘাটতি দেখা দেয়। বন্যপ্রাণ মানুষের কাজকারবারের কিই বা বোঝে! ফলে প্রায়শই বাঘেরা চলে আসে মানুষের চাষের জমিতে বা গোয়ালঘরে। মানুষ আর বন্যপ্রাণের এই সংঘাত এখানে নিত্যদিনের, যেখানে প্রতি বছর যেমন মানুষের প্রাণ যায়, তেমনই হারিয়ে যায় অরণ্যের রাজারাও। জানা গেল অদূরেই আছে বৃদ্ধ লাহুর আত্মীয়ার বাড়ি। গত বছর তার কন্যাটি ভোরবেলা মহুয়াতলায় বাঘের হানায় বেঘোরে প্রাণ হারায়। কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। প্রকৃতির সাথে মানুষের লড়াই এর এই করুণ রূপ বড় বেদনাদায়ক!
সন্ধের মুখে গ্রাম ছেড়ে বেরোনোর সময় দেখি খনির চিমনি থেকে বেরোনো কালো ধোঁয়া আর বনের কুয়াশা মিলেমিশে গোধূলির এক রহস্যময় রূপ তৈরি হয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসছে আদিবাসী মাদলের একটানা, গুরুগুরু আওয়াজ। বাঘ-দেবতার আরাধনা চলছে নিশ্চয়ই। আধুনিক সভ্যতার ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়েও যেভাবে এরা বাঘের সাথে এক অদ্ভুত সহাবস্থানে বেঁচে আছে, তা মেনে নিতেও বুকে দম লাগে।
3 Comments
অপূর্ব লেখনী! প্রকৃতির আদিম রূপ আর বুনো আদিবাসীদের জীবনচিত্র এত সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য অনেক ধন্যবাদ। পরের পর্বের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি!
ReplyDeleteঅভিজ্ঞতার বিবরণী পড়ে রোমাঞ্চিত হলাম। লাহু জীর সাথে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগছে। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থাকা মানুষজনের মধ্যে এক স্বর্গীয় সারল্য থাকে। শহর যাপনের আগ্রাসন সেই জীবন থেকে তাঁদের উৎখাত করছে নিরন্তর। সর্বত্রই এক চিত্র। আমাদের পরিণতির কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। বাঁশপাতির ছবিটি অনবদ্য। কানহায় দেখা হবে।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগছে এই লেখা l অরণ্য এবং আরণ্যক মিশে যাচ্ছে আমাদের চেতনায় l দুটো ভিন্ন অস্তিত্বের টানাপোড়েন আমরাও উপলব্ধি করছি l সঙ্গের ছবিগুলি লেখাটির মাত্রা বৃদ্ধি করছে l
ReplyDelete