জ্বলদর্চি

পুজো আমার কাছে একটা মন খারাপের নিখুঁত সম্পাদ্য /পার্থ বসু

পুজো আমার কাছে একটা মন খারাপের নিখুঁত সম্পাদ্য

পার্থ বসু       


পুজোর আগেই জ্যাঠামশাই আসতেন তারপর বড়কাকু-ছোটকাকুরা। তারপরই আসত পরীক্ষা। আর আমার প্রত্নবাগানে, মুলি বাঁশের ফটক সরিয়ে কণিকা-দি আসতেন, ফুল তুলতে। ঘাসের চেয়েও নরম পা, টুপ করে ফেলতেন ফুলের মতো। সে এক মায়া-পুরাণ। পুজোর ছুটিতে দুই-কামরার বৃন্দাবনে, ফুটে উঠতেন বকুল দিদিমণি। আমি বীজগণিতে বয়সের সূত্র মিশিয়ে, মহাপ্রভুর ভঙ্গিতে এগিয়ে দিতাম তাম্রলিপি খাতা। ভুল ঠিকানার "প্রিয়তমা" পোস্টকার্ড ফেলে আসতাম লাল-ডাকবাক্সে। সে আমার ক্ষণজন্মা সন্ধ্যা মালতী প্রেম। দেবীপক্ষের দু’দিনেই ফুরিয়ে যেত আমার সব ট্রাম্পকার্ড। তারপর ফিরোজা ফকিরি। ট্রাপিজিয়াম গেম, চাঁদ ছুঁই কোজাগরী খেলা।
  পুজো আমার কাছে একটা মন খারাপের নিখুঁত সম্পাদ্য। কাকের বাসায় কোকিল ছানার মতো বেড়ে ওঠা । 
   সেসব মাধবী দিনের চোখে তন্দ্রা নেমে এলে, মা পিলসুজের প্রদীপ আর শঙ্খ-স্তোত্রে আকাশে জ্বালিয়ে দিতেন নক্ষত্র। অষ্টোত্তরশত কৃষ্ণনামে মুলিবাঁশের বেড়া ঘেরা বাগানে ফুটত জোনাকি। কুণ্ডলী পাকানো ধূপধোঁয়া, মন খারাপ সমেত  মিলিয়ে যেত ঠাকুর দালানে।
    রেডিও অ্যান্টেনা সামান্য নৈঋতে ঘুরিয়ে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ-কে আরও ধ্রুপদী করে তুলতেন বাবা, আর এসব ক্লাসিক বেলা বদলের পালা দেখতে দেখতে আমার মায়াচোখ জড়িয়ে আসত ঘুমে। ছেঁড়া ছেঁড়া কানে আসত 'যা দেবী সর্ব.......'। মা খুব আস্তে বাজিয়ে দিতেন ৪৫ আর.পি.এম-এর  "সুন্দরী গো দোহাই দোহাই..." । 
তারপর চেয়ারে আলতো দুলতে দুলতে হারিয়ে যেতেন, হয়তো নিজের শৈশবে। 
   আমার খুব মনে পড়ে যখন আমি মেশিনটি চালাবার অধিকার পেয়েছিলাম, প্রথম-প্রথম কেবলই ৩৩ আর পি এম রেকর্ডকে ৪৫ বা ৭৮ আর পি এম-এ বাজিয়ে দিতাম। ঠিক সেরকমই হুড়মুড়িয়ে বড় হয়ে গেলাম আমি। সপরিবারে উঠে এলাম বৈকুণ্ঠ নিবাসের ছ’তলায়, না-দেখা ইত্যাদির কাছে। আমার আঠারো মোকামের শরীর, ঝলসে উঠল ইমন আগুনে, পুড়ে গেল সমস্ত বীজশস্য।স্মৃতিসম্ভোগ শ্রান্ত, সে এক ঘুম-পাড়ানির দেশ। ছেঁড়া-ছেঁড়া আনন্দ কোলাজের হুতাশ উপাখ্যান। আর মায়াবতী মেঘ মেলায়, জাবরকাটা তিন পুরুষের ধারাবাহিক।
🍂
    আমরা অনেক কিছুই ফেলে এসেছিলাম আমাদের পুরনো ঠিকানায় - ঠাকুরমার মারফি  রেডিও, জ্যাঠামশাই-এর রেমিংটন টাইপ মেশিন, কালো ওজনেদার টেলিফোন, ঠাকুরদার ঠং-ঠং দেওয়াল ঘড়ি এরকম আরও ইত্যাদি ইত্যাদি। ধীরে ধীরে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল আমার যাত্রিক সংঘ, শিউলি নামের শরৎ, পুজো সংখ্যার সাথে হৃদয়ের এক্সচেঞ্জ, পৃথিবীর সমস্ত পারফিউমকে হার মানানো নতুন জামার গন্ধ কিংবা পায়ের ফোসকা সহ উত্তর বালুচরের লাইটিং দুর্গা।আজও জাবর কাটতে বসে আমি রেকর্ড প্লেয়ারটি চালাই, কভারের পেছনে হাত বোলাই, যেখানে সম্পা নিজের হাতে লিখেছিল "ভালো চাই ভালো থেকো" দিনাঙ্ক ২২/০৯/১৯৮১ আমার ১৫তম জন্মদিনের বুক দুরুদুরু করা সেই উপহার।লেখাটি লিখতে বসে ভীষণ ইচ্ছে করছে - সম্পাকে একটা চিঠি লিখে, লাল ডাকবাক্সে ফেলে আসি। বাবার ইয়েজদি  চড়ে ওর টাইপ কলেজের সামনে সাংকেতিক হর্ন বাজাই কিংবা সপ্তমীর দু’টাকা দশের রেয়ারস্টল ম্যাটিনিতে—হাত রাখি বকুল দিদিমণির হাতে, পা রাখি ভূলোকের সেরা গালিচায়।
   এখনকার এরা, কী করে ধরে রাখবে ওদের এই উৎসব? কিংবা ওদের কি একটা 'বকূল দি' থাকবে, যে পুজোর সংখ্যায় লিখতে বলবে এমন অমর রূপকথা......

Post a Comment

1 Comments

  1. নস্টালজিক মনকথা এমনটাই এলোমেলো হয়। সবকিছুকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে,অথচ ফাঁক দিয়ে সময় এসে সব কেড়ে নিয়ে যায়। রূপকল্পের আর তাই রূপকথা হয়ে ওঠা হয় না। পড়ে থাকে এক রাশ দুঃখবোধ শুকনো বকুল গন্ধের মতো।

    ReplyDelete