জ্বলদর্চি

বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১লা নভেম্বর, বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবস। আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
জীবনের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা
প্রকৃতি আমাদের প্রতিদিন কত কিছু উপহার দেয়! আলো, বাতাস, জল, গাছপালা, ফল, ফুল, শস্য সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জীবনের এক অপূর্ব সমন্বয়। এই প্রকৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী। অথচ নিজেদের স্বার্থে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার শুধু মানুষের একার নয়। প্রতিটি প্রাণেরই রয়েছে নিজস্ব অস্তিত্ব, অনুভূতি এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। এই উপলব্ধি থেকেই নিরামিষভোজী জীবনযাপনের গুরুত্ব আমাদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতি বছর ১লা নভেম্বর বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবস (World Vegan Day) পালিত হয়। ১৯৯৪ সালে ব্রিটিশ ভেগান সোসাইটির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই দিনটির সূচনা হয়। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাদ্যাভ্যাস কেবল ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জীবজগতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।নিরামিষভোজনের ধারণা আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতিতে বহু প্রাচীন। অহিংসা, করুণা, সংযম ও সহাবস্থানের আদর্শ ভারতীয় দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। প্রাচীন ঋষি-মুনিদের জীবনযাপন থেকে শুরু করে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যে নিরামিষ আহারের বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। আমাদের বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতেও শাক, সবজি, ডাল, ভাত, ফলমূল, দুধ ও নানা উদ্ভিজ্জ খাদ্যের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সামান্য উপকরণ দিয়েও যে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা যায়, বাঙালির রান্নাঘর তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ,
তবে নিরামিষভোজন এবং ভেগান জীবনযাপন এক বিষয় নয়। নিরামিষভোজীরা সাধারণত মাছ-মাংস খান না, কিন্তু অনেকে দুধ, দই, ঘি, মাখন কিংবা ডিম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে ভেগান জীবনযাপনকারীরা প্রাণিজ উৎস থেকে পাওয়া খাদ্য যেমন মাংস, মাছ, ডিম, দুধ, মধু ইত্যাদি পরিহার করেন। তাঁদের মূল ভাবনা হলো, যতটা সম্ভব প্রাণীর ওপর নির্ভরতা ও প্রাণীর ব্যবহার কমিয়ে আনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা নিরামিষভোজী বা উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের কথা ভাবব?
প্রথমত, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা। মানুষ যেমন আনন্দ পেতে চায়, নিরাপদে বাঁচতে চায়, তেমনই অন্যান্য প্রাণীরও রয়েছে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকার। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন যদি প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা কমাতে সাহায্য করে, তবে সেই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
🍂
দ্বিতীয়ত, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৃহৎ পরিসরে পশুপালনের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি, জল ও খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে বনভূমির ওপর চাপ, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে, তাই খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, ফল, বাদাম ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদানের পরিমাণ বাড়ানো পরিবেশের ওপর আমাদের ব্যক্তিগত প্রভাব কমানোর একটি পথ হতে পারে।
তৃতীয়ত, সুপরিকল্পিত উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্য ও বাদামে রয়েছে নানা ধরনের ভিটামিন, খনিজ, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। এগুলি সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু নিরামিষ খেলেই শরীর সুস্থ থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের যথাযথ উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত সম্পূর্ণ ভেগান খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরামিষভোজন কোনো প্রতিযোগিতা নয়, কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আদর্শও নয়। এটি একটি সচেতন জীবনদর্শন। প্রত্যেক মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে তার পারিবারিক পরিবেশ, আর্থিক সামর্থ্য, শারীরিক চাহিদা ও সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকে। তাই কাউকে ছোট না করে, কাউকে আঘাত না দিয়ে, যুক্তি ও সচেতনতার মাধ্যমে এই ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবস আমাদের সামনে একটি সুন্দর বার্তা তুলে ধরে পৃথিবীকে ভালো রাখতে হলে আমাদের জীবনযাপনের ধরন নিয়েও ভাবতে হবে। উৎসবের দিনে শুধু বক্তৃতা বা আলোচনা নয়, দৈনন্দিন জীবনে ছোট, ছোট পরিবর্তন আনাও জরুরি। যেমন, খাদ্যে স্থানীয় ও মরশুমি শাকসবজির ব্যবহার বাড়ানো, খাবারের অপচয় বন্ধ করা, ফলমূল ও ডালকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ করা। আমরা যদি একটু গভীরভাবে ভাবি, তাহলে বুঝতে পারব, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অন্য প্রাণীর ওপর আধিপত্য বিস্তারে নয়, বরং নিজের বুদ্ধি, বিবেক ও সহানুভূতি দিয়ে সমস্ত জীবের কল্যাণের কথা ভাবতে পারার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম, লালনের মানবতাবাদ এবং ভারতীয় দর্শনের অহিংসার আদর্শ আমাদের সেই পথেই আহ্বান জানায়, যেখানে মানুষ প্রকৃতির শাসক নয়, বরং তার সহযাত্রী। নিরামিষভোজন শুধু খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়, এটি হতে পারে এক মানবিক উপলব্ধির সূচনা। যে হাতে আমরা অন্ন গ্রহণ করি, সেই হাতেই যেন প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারি। আমাদের প্রতিটি সচেতন সিদ্ধান্ত যদি একটি প্রাণের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ায়, একটি গাছকে রক্ষা করে কিংবা পরিবেশের ওপর চাপ কমায়, তবে সেই সিদ্ধান্তই হবে সার্থক।
আসুন, বিশ্ব নিরামিষভোজী দিবসে আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করি, নিজে ভালো থাকব, অন্য প্রাণকে ভালো থাকতে দেব, প্রকৃতিকে ভালোবাসব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আরও সুন্দর, সবুজ ও সহানুভূতিশীল পৃথিবী গড়ে তুলতে সচেষ্ট হব।
কারণ, পৃথিবী শুধু মানুষের বাসস্থান নয়, পৃথিবী সমস্ত প্রাণের। আর সেই পৃথিবীকে সুন্দর রাখার দায়িত্বও আমাদের সকলের।

Post a Comment

0 Comments