দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২রা নভেম্বর, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তির অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস। আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
সত্যের পক্ষে লড়াই এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে
প্রতি বছর ২রা নভেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই দিবস। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, হুমকি, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ২রা নভেম্বর দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সমাজের নানা অসংগতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। তাঁদের কলম, ক্যামেরা ও সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নাগরিকেরা সত্য জানার সুযোগ পান, কিন্তু সেই সত্য প্রকাশ করতে গিয়েই বহু সাংবাদিককে প্রতিনিয়ত বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকরা রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক বাধা, অপরাধী চক্রের হুমকি এবং নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের হত্যা করা হলেও অপরাধীরা যথাযথ শাস্তি পায় না। তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, প্রমাণ নষ্ট হয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অপরাধীদের মধ্যে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু একজন সাংবাদিক বা তাঁর পরিবারের ক্ষতি করে না, এর প্রভাব পড়ে গোটা সমাজের ওপর। যখন একজন সাংবাদিককে তাঁর কাজের জন্য আক্রমণ করা হয় এবং অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, তখন আসলে আঘাত করা হয় সাধারণ মানুষের জানার অধিকারকে। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে সাংবাদিকরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন। এর ফলে দুর্নীতি ও অন্যায় আড়ালে থেকে যায় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকদের বিপদের ধরন আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন, ভুয়ো তথ্য ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকরা অনলাইনে লিঙ্গবিদ্বেষমূলক আক্রমণ ও হুমকির শিকার হন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিতভাবে তাঁদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে শুধু কর্মক্ষেত্রের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, তাঁদের ডিজিটাল নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মহানগর, সর্বত্র সাংবাদিকরা নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তুলে ধরেন। স্থানীয় দুর্নীতি, পরিবেশ ধ্বংস, জমি দখল, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার খবর প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি বন্ধ করতে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি।
🍂
প্রথমত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হত্যার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, বিপদের মুখে থাকা সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নাগরিক সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংঘ, ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক স্তরে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে শুধু আন্তর্জাতিক দিবস পালন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এই দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বাস্তবে নিশ্চিত হবে এবং তাঁদের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে শুধু সাংবাদিকের স্বাধীনতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সত্য জানার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। যে সমাজে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন, সেখানেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর যে সমাজে সত্য প্রকাশের মূল্য দিতে হয় ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে, সেখানে গণতন্ত্রের ভিত ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
২রা নভেম্বর তাই কেবল একটি স্মরণদিবস নয়, এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের দিন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। কারণ সত্যের কণ্ঠরোধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা সমাজ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সত্যকে নিরাপদ রাখা, আর সত্যকে নিরাপদ রাখা মানেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
0 Comments