জ্বলদর্চি

ওয়ান হেলথ দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

ওয়ান হেলথ দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৩রা নভেম্বর, আন্তর্জাতিক ওয়ান হেলথ দিবস। প্রাণী ও প্রকৃতির সুস্থতায় এক পৃথিবী এক স্বাস্থ্যের আহ্বান জানানো হয়েছে এই দিনে আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
স্বাস্থ্যই সম্পদ। সুস্থ জীবনযাপন প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য কি শুধুমাত্র হাসপাতাল, চিকিৎসক কিংবা ওষুধের ওপর নির্ভরশীল? এক কথায় উত্তর না। মানুষের সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রাণিজগৎ, উদ্ভিদজগৎ এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশ। মানুষ, পশুপাখি ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে সমগ্র জীবজগতের ওপর। এই গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিকেই সামনে রেখে গড়ে উঠেছে ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণা। প্রতি বছর ৩রা নভেম্বর আন্তর্জাতিক ওয়ান হেলথ দিবস পালিত হয়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এক পৃথিবীতে সকলের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।'ওয়ান হেলথ’ কথাটির অর্থ এক স্বাস্থ্য। এটি এমন একটি সমন্বিত ধারণা, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীদের স্বাস্থ্য, উদ্ভিদজগৎ এবং পরিবেশের সুস্থতাকে একই সূত্রে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণার মূল কথা হলো, মানুষ একা সুস্থ থাকতে পারে না, যদি তার চারপাশের প্রাণী ও প্রকৃতি অসুস্থ থাকে। ধরা যাক, কোনো অঞ্চলের জলাশয় দূষিত হয়ে পড়ল। সেই জল পান করে মানুষ অসুস্থ হতে পারে, জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে পারে এবং কৃষিকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার বনভূমি ধ্বংস হলে, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান নষ্ট হয়। এর ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্পর্শ বাড়তে পারে এবং কিছু সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যকেও বিপন্ন করে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই ওয়ান হেলথের মূল ভিত্তি।
বিশ্বব্যাপী ওয়ান হেলথ ধারণার গুরুত্ব তুলে ধরতে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ওয়ান হেলথ দিবসের সূচনা হয়। ওয়ান হেলথ কমিশন, ওয়ান হেলথ প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়ান হেলথ ইনিশিয়েটিভ টিমের উদ্যোগে এই কর্মসূচি শুরু হয়। প্রতি বছর ৩রা নভেম্বর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি পালন করা হয়। এই দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যরক্ষায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, পরিবেশবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক, প্রশাসক এবং সাধারণ নাগরিক সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। মানুষ খাদ্য, জল, অক্সিজেন ও নানা প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণী ও উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম।
🍂
প্রাণীরা খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৌমাছি ও প্রজাপতি পরাগসংযোগের মাধ্যমে কৃষি ও উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সাহায্য করে। পাখি ও অন্যান্য প্রাণী বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখে। বনভূমি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে, তাই প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকতে পারে না। বর্তমান বিশ্বে সংক্রামক রোগ একটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। কিছু রোগ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। এ ধরনের রোগকে বলা হয় জুনোটিক রোগ। জলাতঙ্ক, বার্ড ফ্লু এবং কিছু ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিশ্বায়ন, দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংস্পর্শের ধরন বদলাচ্ছে, এর ফলে নতুন রোগের উদ্ভব এবং পুরোনো রোগের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারি গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, কোনো সংক্রামক রোগ শুধু একটি দেশ বা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়। রোগের বিস্তার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, নজরদারি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত জরুরি। ওয়ান হেলথ পদ্ধতি এই সমন্বিত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, এক নীরব বিপদ ওয়ান হেলথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা। যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা পরজীবী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ওষুধের প্রভাবকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়, তখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মানুষের চিকিৎসা, পশুপালন, কৃষি এবং পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই এই সমস্যার প্রভাব রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, নির্ধারিত চিকিৎসা মেনে চলা এবং পশুপালনে ওষুধের দায়িত্বশীল ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মাটিদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। দূষিত বায়ু শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। দূষিত জল থেকে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। আবার প্লাস্টিক বর্জ্য জলজ প্রাণী ও পাখিদের জীবন বিপন্ন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পানীয় জলের প্রাপ্যতা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ফলে পরিবেশ রক্ষা করা মানে শুধু প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়, মানুষের ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করা। ভারতের মতো জনবহুল ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশে ওয়ান হেলথের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষি ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে রয়েছে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, নদী, জলাভূমি এবং নানা ধরনের বন্যপ্রাণী গ্রামাঞ্চলে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণী অনেক সময় কাছাকাছি বসবাস করে। তাই পশুদের নিয়মিত টিকাকরণ, রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। শহরাঞ্চলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পথপ্রাণীদের স্বাস্থ্যরক্ষার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ভারতে মানবস্বাস্থ্য, পশুস্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এই ধারণা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়ান হেলথ শুধু সরকার বা বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব নয়। প্রত্যেক নাগরিক নিজের দৈনন্দিন জীবনে কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তুলে এই উদ্যোগকে সফল করতে পারেন। 
প্রথমত, বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবহার করতে হবে এবং খাদ্যদ্রব্য পরিচ্ছন্নভাবে সংরক্ষণ ও গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, গৃহপালিত প্রাণীদের নিয়মিত টিকাকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থ প্রাণীকে অবহেলা না করে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চতুর্থত, বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত করা বা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
পঞ্চমত, গাছ লাগানো, জলাশয় রক্ষা করা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
ষষ্ঠত, রোগের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।
সপ্তমত, স্কুল, কলেজ, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ওয়ান হেলথ সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। আজকের পৃথিবী নানা ধরনের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তাই শুধু বর্তমানের সমস্যার সমাধান করলেই চলবে না, আগামী দিনের পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যালয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া সমান। ওয়ান হেলথ কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যধারণা নয়, এটি একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ার সামগ্রিক দর্শন। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পরিবেশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃতির কোনো একটি অংশ বিপন্ন হলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়ে। তাই মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষা করতে হলে প্রাণীদের সুরক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান জরুরি। ৩রা নভেম্বর ওয়ান হেলথ দিবস আমাদের সামনে সেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই তুলে ধরে স্বাস্থ্য কোনো একক বিষয় নয়, এটি সমগ্র জীবজগতের সম্মিলিত সম্পদ। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সচেতন হই, প্রকৃতিকে ভালোবাসি, প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তুলি। কারণ পৃথিবী সুস্থ থাকলেই মানুষ সুস্থ থাকবে। আমাদের অঙ্গীকার হোক এক পৃথিবী, এক স্বাস্থ্য, একসঙ্গে সুস্থ ভবিষ্যৎ।

Post a Comment

0 Comments