পর্ব ৯
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
জলাভূমির বারোশৃঙ্গ ও বিলুপ্তির রূপকথা
এখন উপায়! গাইড ভদ্রলোকের বিস্তর অভিজ্ঞতা। ড্রাইভারকে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল। আর সেই সাথে থেমে রইল গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। উপস্থিত প্রত্যেকের হৃৎস্পন্দন শোনা যায়। অনন্ত সে প্রতীক্ষা। ভয়ে, বিস্ময়ে প্রার্থনার কথাও বোধ হয় ভুলতে বসেছি তখন। এমন স্থির সেই সময়, ঘড়ির কাঁটা মনে হয় এক পাও নড়েনি। এমন এক ঘটনার সাক্ষী আগেও হয়েছি একবার রাজস্থানের রণথম্বরে। একপাশে খাদ আর একপাশে টিলা । সামনে বাঘ, পিছনে বাঘ। মাঝে দুটি হুডখোলা জিপসি যার একটিতে আমরা আর একটিতে প্রখ্যাত ক্রিকেটার রাহুল দ্রাবিড় এবং রস টেলর। সে গল্প অন্য কখনও বলব একদিন। ফিরে আসি মধ্যপ্রদেশে কানহার জঙ্গলে। ফিসফিস করে গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রাণে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কতটা? তিনি আত্মসংযম দেখিয়ে আশ্বস্ত করলেন এবং স্থির থাকতে বললেন। সাথে জানালেন, শব্দ না করতে। অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই । কি হবে কেউ বলতে পারেনা। তবে জঙ্গলের কিছু নিয়ম আছে। জিপসি গাড়ির বিরাট আয়তন এবং শব্দকে বন্য প্রাণী সমীহ করে চলে । সহজে আঘাত হানেনা। হুড খোলা গাড়িতে বসে থাকা ব্যক্তিকে বাঘ আলাদা ভাবেনা । তবে যে মুহূর্তে কেউ জিপসি থেকে নেমে দাঁড়াবে, তার সমূহ বিপদ। কতটা সময় পেরোল জানা নেই। একসময় সামনের বাঘটি উঠে দাঁড়াল। সামনের দিকে রাজকীয় চালে এগিয়ে চললো। ইঞ্জিন স্টার্ট করে আমাদের গাড়িও ধীর লয়ে তার পেছনে, কিছুটা দূরত্ব রেখে এগোতে থাকলো। তারপর পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল। পেছনের বাঘটি তখনও সেখানেই রয়েছে নির্ঘাত, তবে দৃষ্টিপথের বাইরে। আমরা প্রাণ ফিরে পেলাম। যে সময়ের কথা বলছি তখন জঙ্গলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া যেত। এখন প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে শুধু ক্যামেরাই অনুমোদন পায়। এখন তাই শুধুই স্থির চিত্র সংগ্রহ করি আমরা।
আতঙ্কের রেশ যখন বাতাসে মিলিয়ে গেল, তখন লম্বা ঘাসের চাদর সরিয়ে উঁকি দিল এই অরণ্যের এমন এক প্রাচীন বাসিন্দা, যাকে দেখতে পাওয়া বাঘ দেখার চেয়ে কোনো অংশে কম ভাগ্যের নয়। উঁচু ঘাসের আড়াল থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো একদল হরিণ। তাদের মাথায় গাছের ডালপালার মতো বিন্যস্ত, আশ্চর্য সুন্দর ১২টি শিং। এরা হলো হার্ড-গ্রাউন্ড বারোশিঙা, কানহার আসল মুকুট, যাদের বৈজ্ঞানিক নাম Rucervus duvaucelii branderi।
🍂
কানহার গল্প শুধু বাঘেদের একচ্ছত্র আধিপত্যের গল্প নয়। বরঞ্চ এক প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে এই বিশেষ প্রজাতির জলাভূমির হরিণগুলো শিকার আর বাসভূমি হারানোর ফলে সম্পূর্ণ বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। গোটা পৃথিবীতে এদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৬৬টিতে! কানহার এই বিস্তীর্ণ সবুজ সাম্রাজ্য থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল এই সুন্দর শিংওয়ালা জীবদের। যদি তারা হারিয়ে যেত, তবে কিপলিং-এর সেই সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার অরণ্য-চিত্র কি আর দেখা যেত! প্রকৃতি এবং মানুষের যৌথ লড়াই কীভাবে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, কানহা তার জীবন্ত প্রমাণ। বন দপ্তর, গবেষক এবং স্থানীয় আদিবাসীদের কয়েক দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ কানহায় বারোশিঙাদের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। কানহা বাঘ-প্রকল্পের অফিশিয়াল ম্যাসকট বা প্রতীকী চরিত্রও কোনো বাঘ নয়, বরং ‘ভুরসিং দ্য বারাশিঙা’। ভারতের সমস্ত টাইগার রিজার্ভের মধ্যে কানহাই প্রথম, যারা নিজেদের বনের পরিচয়ের জন্য বাঘের বদলে এক তৃণভোজী প্রাণীকে বেছে নিয়েছে। কারণ অরণ্যের দর্শন বলে, রাজাকে বাঁচতে হলে আগে তার রাজ্য তথা প্রজাদের বাঁচাতে হয়।
কুয়াশা মোছা আলোয় দেখলাম এক জোড়া পুরুষ বারোশিঙা মাঠের মাঝখানে নিজেদের শিং ঠোকাঠুকি করে শক্তির পরীক্ষা দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন কোনো প্রাচীন রাজপুত যোদ্ধারা তলোয়ার খেলছে। তাদের শিংয়ের সেই ঠক-ঠক শব্দ কানহার সুপ্রাচীন শাল বনের গভীরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। খুরের গঠন এমন, যা এই মধ্যভারতের শক্ত এবং স্যাঁতসেঁতে মাটিতে অনায়াসে দৌড়াতে সাহায্য করে। পিঠের ওপর সোনালী রোদের আলো এসে পড়ায় মনে হচ্ছিল, তারাই যেন এই বাঘ-মহালের জীবন্ত ভাস্কর্য।
বারোশিঙাদের এই রূপকথার মতো বেঁচে ওঠার গল্প দেখতে দেখতে আমাদের জিপসি গাড়ি আবার তার চাকা ঘোরাল। কানহার এই অনন্ত সবুজ সমুদ্রের মায়া কাটানো সহজ নয়, কিন্তু আমাদের এই দীর্ঘ বন্য যাত্রার অন্তিম পর্যায় এবার শুরু হতে চলেছে। আমাদের গাড়ি এবার আরও উত্তরের দিকে মুখ করেছে, যেখানে অপেক্ষা করছে এক প্রাচীন পাথুরে পাহাড়ের রাজত্ব, যেখানে ইতিহাস আর বন্যপ্রাণী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে শতাব্দী ধরে... যার নাম বান্ধবগড়। (ক্রমশ...)
0 Comments