রাখহরি পাল


রা খ হ রি পা ল


সমর্পণ

বাঁশিতে সুর তুলে প্রেমিক পুরুষ
জল ছুঁয়ে ছায়া ফেলে কলাপী ময়ূর
নদী তীরে বনবীথি তমাল সারি
বাঁশি শুনে ভুল করে রাধার নূপুর।

ছেঁড়া মেঘ ভেসে যায় যমুনা জলে
যত সুর তত তার হাহাকার ধ্বনি
সেই সুরে কার নাম লিখেছে নাগর   
তৃষ্ণাবুকে পাশ ফেরে আয়ান ঘরনি। 

তার কিছু ব্যথা আঁচে ব্যর্থপুরুষ 
প্রকৃতির কাছে জল করেনি গোপন  
মাঝ রাতে খাঁচা খুলে উড়ায় পাখি 
অভিসারী রাধা রূপ একেঁছে নয়ন।

মিথ্যেসাঁকো  

আমি যে কত অসহায়,--ওরা কেউ বুঝল না
আমি ও যে গাছের ছায়া পেলে শিশুর মতো কাঁদি
পাহাড়ের কোলে খর্বতার দৈন্য রেখে
সাগরের ঢেউয়ে জলজ সাঁতার প্রার্থনা করি
সে কথা কেউ মানল না।

ওদের কাছে 'বড় খোকা' মানে হাঁটুর ব্যথার উপশম,
অনিদ্রার ট্রাঙ্ক্যুইলাইজার,
হাজারো সমস্যার উদয়াস্ত উদযাপন।
স-ব সমস্যার সমাধান করে দেবো বলে
ঘন্টার কাঁটা পাঁচটা পেরিয়ে গেলে
জানালা গলে রাস্তা এসে দাঁড়ায় চৌকাঠে।
সন্ধ্যায় নেমে পড়ে ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ।
থাইরয়েড, প্রেসার, সুগার,এনলার্জ প্রস্টেটগ্ল্যান্ড
প্রেসক্রিপশন হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি যেন ছু-মন্তরে মেরামত করে দিতে পারি
হেলানো পিসার ন্যুব্জতা
পৃথিবীর সবকিছু জ্বালা-যন্ত্রণা উপশমের মহৌষধ যেন
আমার পিছনে পোষ্যের মতো ঘুর-ঘুর করে।
ধুলোমাটি জীবনে বিশ্বাসের এই মিথ্যেসাঁকো
কোনোদিন ভেঙে পড়েনি অন্ধ নদীর স্রোতে।

যেদিন কোনো চেষ্টাই টিকল না
সাঁকোটা পেরিয়ে গেলে অবলীলায়
তোমার ভরসা হাত ছুঁয়ে ছিল মরীচিকা জল
তোমার বর্ণহীন চোখের স্থির বিশ্বাস,সেদিনও----
টলেনি মিথ্যেসাঁকোর ভরকেন্দ্র থেকে।   


গোধূলি বারান্দা

কিছু কি লুকানো ছিল,নদীর গোপনে ?
কিছু কি ইশারা ছিল,স্নিগ্ধ মাশকারায় ?
কিছুতো বলনি তেমন একান্ত নির্জনে ?
তবুও মুগ্ধতা কেন স্বপ্নচারিতায়?

অসংকোচে হেঁটে যাওয়া গলি পথ ঘুরে 
কত হাতে হাত রেখে অনর্গল কথা
কাঁপে না বুকের পাঁজর অনির্দেশ্য জ্বরে
তুমি এলে জমে যেত ঋদ্ধ নীরবতা ।

তুমি এলে এলোমেলো, অকস্মাৎ ঝড়ে
মরুর দৈন্যতা বাড়ে উত্তপ্ত হাওয়ায়
না ফোঁটা কুঁড়ির কথা অনাদরে ঝরে
জেগে থাকে সূর্যমুখী আলোর প্রতীক্ষায় ।

কিছু কি লুকানো আছে এই অবেলায় ?
কিছু কি ইশারা এখনো নিরন্তর ডাকে ?
সূর্য ডোবার আলো গোধূলি বারান্দায়  
অসমাপ্ত কথা ফেলে দীর্ঘ ছায়া আঁকে।


চির গোপন

কি বলবে বলে থমকে দাঁড়িয়েছ বারান্দায়
সূর্য এখন নেমে যাচ্ছে দীর্ঘ ছায়া ফেলে।

এর আগে,বলবে বলবে বলে বহুবার উঁকি দিয়েছ জানালায়
মনে হচ্ছে মুক্ত পুরুষ ছড়িয়ে দেবে রঙিন ফোয়ারা
আমরা মুক্তিস্নান সেরে নেব।

কখনো এমন,যেন অনায়াসে বলা যায়
উচ্ছ্বসিত প্রপাতের মতো। 

মনে হয়েছে এই মাত্র পেয়ে যাবো দিগন্তের ঠিকানা। 
তুমি নীল হাতে ওড়না ওড়াচ্ছ
মেঘে মেঘে তার ই সহাস্য বিজ্ঞাপন
বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে আবহমণ্ডলে
সমুদ্র নতজানু থেকে জারিয়ে নিচ্ছে তোমার গভীরতা
পাহাড় পর্বত ঘাড় উঁচিয়ে উৎকর্ণ,--কি জানি, কি হয়?

তুমি রং বদলালে।জানা হল না--
কি অসম্ভব সত্য আস্তিনে লুকিয়ে
সুর্যকে রেখেছ স্থির 
মোহাচ্ছন্ন পৃথিবীকে ঘুরিয়ে নিচ্ছ বারবার ।


শূন্যতার কাছে

চলে যেতে যেতে কথা ফেলে যায় ঘাটে
স্থানু তরঙ্গের মতো গোপন ব্যাপ্তি তার
কিনারা ছুঁয়ে জেগে থাকে অস্থির আবেগে।

হাট শেষে মগ্নতায় ডুব দেয় অন্তরঙ্গ মাঠ 
আরণ্যক মেঘ জমা রাখে শোকের কাজল 
ছোঁয়া পেলে ভিজে ওঠে  মাটির নরম।

স্পর্শ করি,কোলাহলে খুঁজে যাই মুখ
চন্দন বনের ঢেউ আঁচল উড়িয়ে গেছে 
জ্যোৎস্নায় ডানা মেলে অফুরন্ত সুখ।

প্রতিটি নির্বাণ, মুক্তো রেখে সূর্যের দেশে
চলে গেছে তারাদের ধূসর ঠিকানায়।
মুক্তো খুঁজে মালা গাঁথি মিথ্যে আয়নায়।

শূন্যতার কাছে অনন্ত খুঁজি ক্ষ্যাপার মতো
অসতর্ক মুহূর্তের ছল  উঁকি মেরে চলে গেছো
ফেলে রেখে একরাশ তৃষ্ণা কেবল।
--------

Comments

  1. কবির ভাবগম্ভীরতা মুগ্ধ করেছে আমাকে। আরো কিছুর জন্য আশায় থাকলাম।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯