গোলাম রসুল


গো লা ম  র সু ল


ঝড়ের মানচিত্র

অন্ধ চিত্রকরের আঁকা এই দুঃসময়
দেয়ালে টাঙানো ছবি থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে

আর একটি ভয় গোল হয়ে ঘুরছে সূর্যের চারদিকে

রাস্তায় নদীর ছায়া
এখানে  কদিন আগে প্লাবন ছিলো 
বেশ বোঝা যায়
দু ধারের বাড়িগুলো  ভিন্ন গ্রহের পূর্বজন্মের মেঘ এসে ঘুরে বেড়ায়
তারপর তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে চলে গেলো একটি এ্যাম্বুলেন্স
ঝড়ের মানচিত্র
জীবনের অনেক আসবাবপত্রের মধ্যে
ঠাণ্ডা মাথায় সন্তানের গায়ে হাত রাখলো পিতা ঠিক যেমন একটি রোগমুক্ত পৃথিবী
আমাদের ভবিষ্যৎ একটি বালক নক্ষত্র
 

মনীষীদের মূর্তি গুলো চেয়ে রয়েছে

পৃথিবীর বিরলতম সময়
আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসছে সূর্য
পর্বত উড়ছে বিপদ সংকেত
আর সমুদ্র মুড়ে নিচ্ছে তার  ভিজে পালক

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে
এবার মর্মর মূর্তি গুলো বেজে উঠবে
মোলায়েম পাথরের ওপরে ভেসে উঠবে অনেক দূরের সুর
কে গাইছে অমরত্বের গান
ছোট একটি পিয়ানোয় আলো জ্বলছে সন্ধ্যাতারা যা আমাদের সান্ত্বনার মতো
আঙুলের সিঁড়িতে বসে  আমি আকাশ দেখছিলাম
যে আকাশ আমার নয়
গর্ব বোধের মতো মেঘ 
আর  কোথায়ও বৃষ্টি হচ্ছে মনুষ্যজাতির   কান্না 
রাত্রি  চমকে দিচ্ছে
প্রকাণ্ড গাছের মতো
শিশুরা স্বপ্ন দেখছে নরকের
আর মানবতার জন্য যে যুদ্ধ আমরা করেছিলাম তার কিছু  অংশ ঝুলে রয়েছে
রোগা বাড়ির ওপর চাঁদ
অশুভ ঘোড়ার মতো দৌড়চ্ছে
হত্যালীলার সাইরেন
মৃত্যু পুড়ছে মৃত্যুর ভেতরে জনমানবশূন্য
অন্ধকারে কে ছবি আঁকছে আগামীকালের
আর মনীষীদের মূর্তি গুলো চেয়ে রয়েছে
         
আকাশে বিকেলের চাঁদ

সূর্য জ্বলছে
আর হারমোনিয়াম বাজছে
সারা মাঠে ঝরে পড়ছে করুণা

ঠান্ডা হাওয়া 
একটি মেয়ের মতো পাতলা গড়ন
চলে গেল
আর তার গানের শেষ শব্দটি আমি শুনতে পাই নি

তখন মেঘ  দেখছিলাম
আমার দুঃখ যেখানে আশ্রয় নেয় 
আর হারিয়ে যায় বার বার সমুদ্রের দিকে 

স্বচ্ছ জলের মতো দৃষ্টি
আমি চিন্তা করছিলাম টুকরো টুকরো পাথর 

দুপুর গড়িয়ে
আকাশে বিকেলের চাঁদ
       

 বৃষ্টির কিছু আনন্দ এখনো আমি পাই

একটু আগে তোমার কবরে পৌঁছে দিয়ে এলাম একটি চিঠি
কেউ আমাকে দিয়ে গিয়েছিল 
সামান্য মেঘ আর কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি

তোমার মরণের সময় আমার বিশেষ কিছু করার ছিল না
আর আমি জানতামও না কিভাবে মরতে হয়

নির্জন ঘরে আমার অস্তিত্বকে সবচেয়ে বেশি দেখি
সারাক্ষণ তাই রাস্তায় ঘুরে বেড়াই
পৃথিবী যেমন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে
সেই রূপ আমার ঘুরে বেড়ানো ছিল একটি কবরখানাকে ঘিরে

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিলো 
আমিও কখন যে মেঘ হয়ে গিয়েছিলাম মনে নেই

গভীর রাত 
ভারী হচ্ছে আমার অস্তিত্ব 
আর শুনতে পাচ্ছিলাম মানুষের কবরে বৃষ্টি হচ্ছে
তুমি এখনও মেঘের দেহ রেখা
বৃষ্টির কিছু আনন্দ এখনো আমি পাই
             
ঈশ্বরের চেয়েও একটি দয়ালু মানুষ

কে জানতো এত কঠিন হবে জীবন
মেঘের নিচে আমাদের হত্যা  করা প্রাণীগুলো পুনরায় চিৎকার করবে
আর পৃথিবীর সব নদীগুলো  ফিরে যাবে পর্বতের দিকে

ইউরোপ কাঁপছে 
শেষ বসন্তের পাতার মতো
পাখির ঠোঁটে ধরা কফিন
যতটা আধুনিক করে নেওয়া যায়
খুব জোরে ঝড় বইছে
আর আমেরিকা চিন ওদের গর্ব করার মতো মানুষগুলো থেকে চুইয়ে আসছে জল 
ভিজে স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার জন্য সারছে না জ্বর সর্দি কাশি
শরীরের ভেতরে মৃত্যু ঢুকে বেরিয়ে আসছে পালকের মতো
আর অনেক বেশি বেতন দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে কবর খোঁড়ার লোকগুলো
পৃথিবী সংক্রমিত হচ্ছে একটি ডিমের খোলে
একজন স্বেচ্ছাসেবী রাস্তা দিয়ে  গান গাইতে গাইতে চলে গেলো
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ সব দোকান
দোকানের সামনে মৃত সন্তান কোলে বাবা
যেমন ভালো শিল্পীর আঁকা একটি স্থাপত্য কাজ
আকাশ মধ্যযুগের মাঠ
আর গ্রীষ্মকাল পুড়ছে 
মানুষ ভুলে গেছে সব দুঃখ
ধর্ম রোগা ঘোড়ার মতো  বাঁধা রয়েছে  সেই মাঠে
সংরক্ষিত  চাঁদ
একটা শিশু জন্ম গ্রহণ করেই প্রত্যাখ্যান করল
আমাদের ফুসফুস থেকে অক্লান্ত ঝরে পড়ছে  আগুন
মৃত্যুর আতসবাজির খেলা
হিম শীতল রাত্রি
আমরা পান করছি নক্ষত্রের আলো
আমাদের প্রত্যাশা একটি ভোরবেলা
ঈশ্বরের চেয়েও একটি দয়ালু মানুষ

----

Comments

  1. প্রতিটি কবিতা অনবদ্য 💚

    ReplyDelete
  2. এ এক শব্দ নিয়ে অনন্য ছবি আঁকা।সবকটি কবির অসাধারণ সব ছবি।সেই ভেতরের বোধ আর কালো কালো অক্ষরের শব্দ আচঁড়। সুন্দর! শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন রইলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন