সুদর্শন নন্দী || পর্ব - ৩


সু দ র্শ ন  ন ন্দী  


হারিয়ে যাওয়া ঝিঁঝি পোকা || পর্ব- ৩

মাঠভরা ধান আর জলভরা দিঘি,
চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি।
আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাড় যেন,
মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন।

ছোট নদী যেমন বড় নদীতে পড়ে আর বড় নদীর নির্বাণ লাভ হয় সমুদ্রে মিশলে, তেমনি সব গ্রামই জুড়ত কাছের কোন আধা শহর হোক বা ব্লক অঞ্চল হোক। আলোচ্য গ্রামের নিকটতম শহর গ্রাম থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার। শুধু আমাদের গ্রাম কেন পাশাপাশি নন্দনপুর, চাঁদাবিলা, মোলবেড়া, পুরোষত্তমপুর, নাকাইজুড়ি সব গ্রামই যুক্ত ছিল শহরের সাথে। গ্রাম থেকে শহরের রাস্তা পুরোই জঙ্গলাকীর্ণ। মাঝে বাঁধ, খাল। জায়গায় জায়গায় বেচ আর ভুড়ুর ফলের ছোট ছোট গাছ, শীতে শিয়াকুল থেকে বড় জাতের কুল । যেখানে সন্ধ্যা হয় সেখানে বাঘের ভয় প্রবাদকে হার মানিয়ে এদিকে বাঘের ভয় ছিল সারাদিনই। সন্ধের পর তো ছিল ওদের মুক্তাঞ্চল।  হায়না নেকড়ে তো ছিলই। মূল রাস্তা লাল মোরামের। রাস্তার পাশে বোর্ডে কোথাও কোথাও সরকারি বিজ্ঞাপন লেখা “নিবিড় ধান চাষ পদ্ধতি” । মাথায় গামছা বাঁধা চাষির কাঁধে ধানের ছবি। তখন বাহন বলতে গরুর গাড়ি, একা একা গেলে দীর্ঘ পথ হেঁটেই যাতায়াত । যাঁরা দুটো পয়সার মুখ দেখেছে তাদের রয়েছে সাইকেল। র‍্যালে আর হারকিউলিস সাইকেল  ছিল বিয়ে বাড়িতে বরকে দেওয়ার মতো কুলীন বাহন। রাস্তার জায়গায় জায়গায় খানাখন্দ। শহর থেকে গ্রামে ঢুকলে মূল রাস্তা থেকে গ্রামে যেতে মেঠো পথ। বৃষ্টি পড়লেই নাকে আসত পাগল করা মিষ্টি সোঁদা গন্ধ। আল-খাল-জমি পেরিয়ে গ্রামে ঢোকা। আগেই বলেছি জায়গায় জায়গায় ছোটবড় পুকুর, কোথাও বাঁধ। বাঁধের পাড়ে তালগাছ আকাশ পানে তাকিয়ে থাকত। ঘরে ঘরে গোয়ালের কথা বলেছি।  ঘরের দাওয়াতে লাঙ্গল, মই, কোদাল, কাস্তে  যাবতীয় চাষের যন্ত্রপাতি রাখা হত। মাটির বাড়ি, খড়ের চালা। দুচারজনের ঘরের চালা  টিনের । মানে করোগেটেড শিট। খামারে খড়ের পালুই। ছেলেবেলায় লুকোচুরি খেলায় লুকনোর জায়গা। সেই খড় থেকে ছানি (কুচনো খড়)কেটে গরুকে খাওয়ানো হত, ঘর ছাওয়া হত। 
গ্রামে ছিল আটচালা। আটচালায় হত অষ্টম প্রহর ও চব্বিশ প্রহরের নাম সঙ্কীর্তন। সে কথায় পরে আসব।  ছোট্ট আটচালায় মোড়লরা বসত রেডিও নিয়ে। সারা গ্রামে একটি রেডিও। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট  সময়ে বসত রেডিও নিয়ে। গ্রামের ইচ্ছুক শ্রোতারা সেই অবাক রেডিও কথাকারকে ঘিরে বসত। না বুঝলেও মনে আছে সেই ষাট বছর আগেকার রেডিওর প্রোগ্রাম। হত তরজা, হত রামায়ণ গান আর মহাভারতের কথা। কীর্তনের অনুষ্ঠানে  উপচে পড়ত ভিড়। থেকে থেকেই কীর্তনের রসে চোখ ভেসে যেত কত্তামা (ঠাকুমা), কাকি-জেঠিদের। এই আটচালাতেই বসত যাত্রাপালা। গ্রামের দল, নেপাল কাকা থেকে গোপাল জেঠা পাট ( অভিনয়) করতেন। নেপাল কাকা মেয়েদের অভিনয় খুব ভালো করতেন বলে স্ত্রী চরিত্র তাঁর বরাদ্দই থাকত। অসুবিধা হত বিড়ি খাবার নেশা জাগলে। রাম হয়তো সীতা সীতা করে ডাকছেন। সীতার চরিত্রে নেপাল কাকা দৌড়ে এসে হেথা নাথ, হেথা নাথ করছেন আর কয়লা ইঞ্জিনের মতো মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে । সেও কম মজার নয় গ্রামের যাত্রা দেখায়।(চলবে)

-----

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি