সন্দীপ কাঞ্জিলাল || পর্ব - ২



অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল বনাম আঁতেল  
পর্ব -২

স ন্দী প  কা ঞ্জি লা ল 

আঁতেল 

আজকাল প্রায়শই  রাস্তাঘাটে চায়ের ঠেকে, রকের আড্ডায় একটি কথা শুনতে পাই " আঁতেল"। ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলেন, "বুদ্ধিজীবী" বা "ইন্টেলেকচুয়াল" শব্দটির অপভ্রংশ  হচ্ছে আঁতেল শব্দটি। তিনি আরও বলেন," চল্লিশ- পঞ্চাশ দশকে একদল বাঙ্গালী পাঞ্জাবী পরে চা বা কফির সাথে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এমন ভাব দেখাতো, তারা যা বলে বা যা ভাবে সেটাই সঠিক এবং ' আমরাই সেরা'। আর এই সব বুদ্ধিজীবীকে দেখে অন্যান্যরা ''আঁতেল' বলে ডাকতো।" এক কথায় যারা নিজেদের জাহির করার জন্য সদা সর্বদা ব্যস্ত, তারাই 'আঁতেল'। যদিও আঁতেল শব্দটি বুদ্ধিজীবী শব্দ থেকে উৎপত্তি, বর্তমানে আমাদের সমাজে আঁতেল শব্দটি শ্লেষ বা বিদ্রূপার্থে প্রয়োগ হয় বেশী। বর্তমানে গজিয়ে উঠা বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, টিভি আর ফেসবুকের কল্যাণে আঁতলামির প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। সবজান্তা হয়ে দিনের পর দিন নিরন্তর মত প্রদান করে চলেছে। এরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করার জন্য ইঁদুর দৌড় দৌড়য়। ইঁদুর দৌড়ের সমস্যা হচ্ছে জিতলেও ইঁদুর থেকে যেতে হয়। ঠাণ্ডা ঘরে কাজু আর মাংস সহযোগে লালপানীয় সেবন করতে করতে গরীব দুঃখী আর সংখ্যালঘু মানুষদের দুঃখে কাঁদেন! এদের প্রধান কাজ হচ্ছে কোনো কিছুর খুঁত ধরা এবং তা নিয়ে আলোচনা করা। এরা ঠিক নাট্যকার মনোজ মিত্রের  'চোখে আঙ্গুল দাদা'। যে অফিস থেকে মেডিকেল ছুটি নিয়ে বেলা করে ঘুম থেকে উঠে বৃদ্ধা মায়ের চা তৈরির খুঁত ধরে, যে আবার রবিবাবু ও শরতবাবুকে গালাগাল করে এত কাগজ নষ্ট করার জন্য। তাই নিন্দুকেরা এদের সবজান্তা বলে। এদের চেনার উপায়,  একমুখ দাঁড়ি আর কাঁধে ঝোলা ব্যাগ থাকে! ফটো তোলার সময় একটা চশমা চোখে লাগিয়ে নেয়, ঘাড় একটু কাত করে, দার্শনিক দৃষ্টি আনে চোখে। নকশা করা পাঞ্জাবী আর নয়তো ফুল ফুল জামা ইন করে পরে। কেউ কেউ আবার অদ্ভুত পোশাক  এবং ব্যতিক্রমী কথাবার্তা বলে নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা এবং লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের পাঁয়তারা কষে। হাসি ঠাট্টা পছন্দ করে না। চলনে বলনে কৃত্রিম গাম্ভীর্যতা ফুটিয়ে তুলে নিজেদের গুরুত্ব বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। এরা চাটুকারিতা ও দালালি পছন্দ করে।বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে  নিজেদের মধ্যে একটা গ্রুপ বানায়,এদের কাজ হলো প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রশংসা করা। 
এই আঁতেল প্রসঙ্গে পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বলেন," মহাভারতেও আঁতেল ছিল। যেমন 'কর্ণ, " কর্ণের " ' আমি সব পারি ' মানসিকতা এবং অহংবোধের প্রকাশ দেখি। যখন দুঃশাসন মারা গেল, তখনও দুর্যোধনকে কর্ণ বলে যাচ্ছে আমরাই জিতব।" জ্ঞান যেখানে পরিপূর্ণ নয়,সেখানেই থাকে ওপরচালাকির প্রবণতা।আসলে মূর্খ না ভেবে কথা বলে, বুদ্ধিমান না চিন্তা করে বলে না। বর্তমানে ঐ 'ম্যায় হুঁ না' আঁতেলর সংখ্যাটা বেশি। ঋষি দেবতারা যা উপদেশ দেন তারা তা মানেন না।মুখে বলে এমনটা তোমরা করোনা, ঋষি দেবতারাও আাঁতেল। যদিও এরা বুদ্ধিমান, জ্ঞানী না চালাক পরবর্তী পর্বে আলোচনা করবো।

আর প্রেমের ক্ষেত্রে মেয়েরা যদি আঁতেল হয়, অনেক বয়ফ্রেন্ড পছন্দ করে। কারণ সে তার বন্ধুদের কাছে গর্ব করে তা নিয়ে। আর মেয়েটি যেহেতু আঁতেল তাকে ছেড়ে দিলেও সে ভবিতব্য বলে মেনে নেয়। যতদিন ভালোবাসা ততদিন প্রেমিক প্রেমিকা! বিচ্ছেদ হলে পরস্পর বন্ধু হয়ে গেল! তাই গার্লফ্রেন্ড একটু খোলা মনের আঁতেল হলে ভালো। আবার আঁতেলরা নিজেদের জাহির করার জন্য তারা কমার্শিয়াল সিনেমা দেখে না। তারা আর্ট ফিল্মের দিকে বেশি ঝোঁকে! যদিও মন ছটফট করে 'বাহুবলী' ছবি  দেখার জন্য।
আজকাল দেখা যায় অনেক কবিতা পাঠের আয়োজন হচ্ছে ফেসবুক লাইভে। সেখানে কেউ কেউ কবিতা বিশেষজ্ঞ হয়ে ভুল তথ্য পরিবেশন করছেন। আবার কেউ কেউ কবিতার ভুল বাখ্যা করে গুরুগম্ভীর মতামত দিয়ে গুরু সাজছেন। আবার তাকে মান্যতা দেয় বা মান্যতা আদায় করার জন্য ভুল ভাল মন্তব্য করে গোষ্ঠীপতি সেজে আঁতলামি করছেন। আবার কথায় কথায় অনেকে ইংরেজি ঝেড়ে আঁতেল সাজতে চাইছে।
এদের মাথায় সবসময় একটা দুর্বুদ্ধি কাজ করে যে, আমি সবকিছু বিষয়ে সবার থেকে এগিয়ে আছি। কেউ মানুক না মানুক তার বোঝা সঠিক বোঝা। এরা তার ভুল বোঝাটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমানে তর্ক চালিয়ে যায়। এরা মনেই রাখে না, সমাজে বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন আছে, কিন্তু অপবাখ্যাকারীর প্রয়োজন নেই! তাই আঁতেল আর বুদ্ধিজীবীদের 'রবীন্দ্রনাথের' কথায় বলতে ইচ্ছা হয়, "ওদের কথায় ধাঁদা লাগে, তোমার কথা আমি বুঝি।"
------

Comments

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন