পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা


পূ র্ণ চ ন্দ্র  ভূ ঞ্যা

বিজ্ঞানে ঈশ্বরের চিহ্ন
পর্ব - ১
 
উদ্ভাবনা, না আবিষ্কার ?

ঈশ্বর কী বা কে, তিনি আছেন কিনা, থাকলেও তাঁর স্ব‍রূপ কেমন - এমনতর হাজারো জিজ্ঞাসা বা কৌতূহল আমাদের মনে। অতীতে একটা সময় ছিল যখন বিজ্ঞানের ধারণা বা অস্তিত্ব কিছু ছিল না, থাকলেও সমাজে সহজে মান্যতা পেত না। প্রকৃতির সব সত্য ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া হত ধর্মের মোড়কে, পরমেশ্বর ভগবানের মাহাত্মের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এখন ? বর্তমানকাল বিজ্ঞান নির্ভর। ঈশ্বরের তত্ত্ব আওড়েও মানুষ বিজ্ঞানের উপরেই বেশি ভরসা রাখেন, সে বিজ্ঞানী হোক বা মন্দিরের পুরোহিত। এতে ভুল নেই। বিজ্ঞান ও ঈশ্বর - হাতে হাত ধরে কুয়াশা ঢাকা সমান্তরাল পথ চলে যেন। বাইরে থেকে কারও উপর সম্পূর্ণ ভরসা করা যেমন চলে না, তেমনি কে বড় বা কার ক্ষমতা বেশি - এ কথা বলাও বাতুলতার সামিল। শেষ অঙ্কে হয়ত বা বিজ্ঞানের দিকে দাঁড়িপাল্লা বেশি ভারী - এ কথা প্রতিপন্ন হয়। 

"বিজ্ঞানে ঈশ্বরের চিহ্ন" আসলে প্রকৃতির আবিষ্কৃত বা উদ্ভাবিত সত্য ঘটনায় 'ঈশ্বর' নামক মহাশক্তির সন্ধান, তাঁর অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তি খোঁজা। উদ্ভাবনা ( Invention) ও আবিষ্কার ( Discovery ) - এ দু'য়ের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে সেই অসীম শক্তির অনুসন্ধান করা আমাদের লক্ষ্য।

গনিতের সাহায্য নিয়ে মানুষ তার লালিত বিদ্যাবলে প্রকৃতির যে স্বরূপ অনুধাবনে অগ্রসর হয়, সে উদ্ভাবনা না আবিষ্কার ? মানুষ চিন্তা ক'রে প্রকৃত সত্যের পর্দা উন্মোচন করে ? নাকি, তা রয়েছে ব্রম্ভান্ড সৃষ্টির সময় থেকে, যুগে যুগে পন্ডিতরা একটু একটু করে তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন ? ব্যাপারটা যেন ভাষ্কর্য শিল্পের মতন। শিল্পী কি মূর্তি তৈরি করেন, না আবিষ্কার করেন ? অর্থাৎ পাথরের উপাদানে মূর্তির দেহাবয়ব তৈরি হয়, নাকি, আগে থেকেই পাথরের মধ্যে সে লুক্কায়িত ছিল - শিল্পী তাঁর বুদ্ধিবলে প্রয়োজনীয় কৌশল অবলম্বন করে সে-মূর্তির নিখুঁত গঠন বের করে আনেন, তার চারপাশের অপ্রয়োজনীয় আবর্জনার স্তুপ সরিয়ে ফেলে ? এক্ষেত্রে প্রথমটা উদ্ভাবনা, আর দ্বিতীয় আবিষ্কার।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পূর্বে থেকে পাথরের ভেতরে মূর্তির কাঠামো তৈরি করে রেখেছিল কে ? তিনিই কি ভগবান-গড-আল্লাহ, মানুষের আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই যিনি এই বিশ্ব-ব্রম্ভান্ডের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ? চিত্তের অস্থিরতায় গনিতের সাহায্যে পন্ডিতগন পরে তা আবিষ্কারে মত্ত হয়েছেন ?

তাহলে বলতে হয়, আবিষ্কারের বেলায় অবশ্যই ঈশ্বরের প্রচ্ছন্ন মদত বা ছায়া বর্তমান। দু-একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারখানা আর একটু পরিষ্কার হবে। নাবিক ক্রিষ্টোফার কলম্বাস ( 1451-1506 ) আমেরিকা আবিষ্কার করেন, আর থমাস আলভা এডিসন ( 1847-1931 ) বৈদ্যুতিক বাতি বা বাল্ব উদ্ভাবন করেছেন। এছাড়াও, কে সর্বাপেক্ষা সেরা বিজ্ঞানী - আইনস্টাইন, টেসলা, না নিউটন ? এর উত্তর আমরা সরাসরি দেব না, বরং বিজ্ঞানীত্রয়ের আবিষ্কৃত বা উদ্ভাবিত প্রাকৃতিক সত্য ঘটনার তুলনামূলক চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে উত্তরের ভিত তৈরি করব। তারপর, সচেতন পাঠক চিন্তা করবেন - কারও মাথার ওপর পরমেশ্বরের হাত ছিল কি না!
বিজ্ঞানী টেসলা ( 1856-1943 ) সম্পূর্ণ নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় যে পরিবর্তী প্রবাহ ঘটনা উদ্ভাবন করেন, তার সামান্যতম আগাম আভাস বা সংকেত তাঁর আগে কোন পন্ডিত দেননি। তাই টেসলার অনুসন্ধান 'উদ্ভাবনা'-র মধ্যে পড়ে। কিন্তু বাকি দু'জনের বেলায় সে তত্ত্ব খাটে না। গনিতজ্ঞ আইজ্যাক নিউটন ( 1643-1727 ) বস্তুর গতি ও মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের গতি সম্বন্ধে যে সব যুগান্তকারী প্রকৃত সত্য ঘটনার সঠিক দিশা দেখালেন, তা পূর্বতন জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি ( 1564-1642 ) ও অন্যান্য পন্ডিতবর্গের চিন্তার সীমাবদ্ধতার পথ ধরে উঠে আসা সমাধান বই অন্য কিছু নয়। আইনস্টাইনের বেলায়ও নিউটনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। নোবেলজয়ী আইনস্টাইন ( 1879-1955 ) - এর কালজয়ী 'সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ' নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের অদূরদর্শীতার ফলে সৃষ্ট। তাঁর দুর্বোধ্য 'বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব' জটিল ও কঠিন উন্নত গনিতের ইঙ্গিতপূর্ণ সমাধানের ফসলমাত্র। অর্থাৎ নিউটন এবং আইনস্টাইনের চিন্তা নিঃসৃত সমাধান 'আবিষ্কার'-ই। 

তাহলে কে বড় ? উদ্ভাবক, না আবিষ্কারক ? বিজ্ঞান, না ঈশ্বর ? বিচারের ভার অভিজ্ঞ পাঠকের।

-------

Comments

  1. purota porlam kintu sir kichu bujhte parini
    ja kothin kothin bhasha.

    ReplyDelete
  2. It's an informative article which is very interesting too. As it's a sequel I personally expect more to get and clarify my Q's in coming episodes. I wish my best to put your max.

    ReplyDelete
  3. It's an informative article which is very interesting too. As it's a sequel I personally expect more to get and clarify my Q's in coming episodes. I wish my best to put your max.

    ReplyDelete
  4. দারুন।
    পরের পর্বের অপেক্ষায় আছি স্যার।

    ReplyDelete
  5. দারুন হয়েছে স্যার ।।
    এককথায় অনবদ্য।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন