দিল্লি দর্পণ -২


দিল্লি দর্পন || পর্ব - ২

কা লী প দ  চ ক্র ব র্ত্তী, নতুন দিল্লি


কেন এত পার্থক্য 

দিল্লিতে প্রথম আসার পর আমারও জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, এখানকার লোকজনদের সাথে আমাদের বাংলার লোকজনদের ব্যবহার, আদব-কায়দা ইত্যাদির এত তফাৎ কেন। কেন এখানকার লোকজনদের মধ্যে নমনীয়তা বা কমনীয়তার অভাব? বহুদিন এখানে থাকার পর যা মনে হয়েছে তা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। যদিও অনেকে এর সাথে একমত নাও হতে পারেন। এটি আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতি মাত্র। একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছি, যে জায়গার মাটি যত নরম সেখানকার মানুষের ব্যবহারও সেখানে খুব নরম তরম। যেখানকার মাটি খুব শক্ত সেখানকার মানুষগুলোর ব্যবহারও তেমন শক্ত পোক্ত। প্রকৃতি হয়ত সেভাবেই মানুষকে গড়ে তুলেছে। অনেকটা ঠিক পুকুরের মাছ এবং সমুদ্রের মাছের মধ্যে পার্থক্যের মতো। পুকুরের মাছগুলোকে সমুদ্রের মাছগুলোর মতো অত প্রতিকূলতার মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়না। সমুদ্রের মাছগুলোকে প্রতিনিয়ত জলের ঢেউ-এর সাথে এবং অন্যান্য প্রাণীদের থেকে বেঁচে থাকার জন্য জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। সেকারণেই হয়তো তারা শক্তিশালী এবং তাদের গায়ের চামড়াগুলো মোটা। পুকুরের মাছগুলোকে সেই অনুপাতে এত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় না। তাই হয়তো এখানকার প্রবাসীরা সরাসরি তাদের মত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে ভালবাসেন, যেটা অনেকের কাছেই অসহনীয় মনে হতে পারে। এখানকার লোকেরা স্পষ্ট কথায় বেশী বিশ্বাসী। তাতে অপরে কি ভাবল সেটা নিয়ে হয়তো খুব বেশী ভাবেন না। অনেকের কাছে অশালীন বলেও মনে হয়।  এখানে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রতিযোগিতায় সবাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যুদ্ধ করে চলেছেন। এটি অনেকের কাছে অস্তিত্বের লড়াই, আবার অনেকের কাছে বেশী অর্থ উপার্জনের চেষ্টা। ইট-কাঠের জঙ্গলে চলছে উন্মত্তের মতো দৌড়ানো বা ছুটে চলা। এখানে চাওয়া পাওয়ার যেন শেষ নেই। গ্রামের শান্ত মধুর পরিবেশ তাই এখানে খুঁজে পাওয়া বাতুলতা মাত্র।  
 
আজকাল অবশ্য বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে মানুষ এসে ভিড় করার জন্য আইন-শৃঙ্খলার বেশ কিছুটা অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমি প্রথম যখন দিল্লিতে আসি, তখন দেখেছি রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। বাসগুলোতে অনায়াসে চড়ে বসতে পাওয়া যেত। এখন সে দৃশ্য আর দেখতে পাবেন না। দিল্লির মোহময়ী আকর্ষণ আমাদের আটকে রাখে তার মায়া জালে। মনে পড়ে যায় দিল্লির সেই পুরাতন দিনের কথাগুলো। নস্টালজিক হয়ে ওঠে মন। পুরানো সে দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়...। 

দিল্লির আয়তন খুব একটা ছোট নয়। এর আয়তন প্রায় ১,৪৮৩ বর্গকিলোমিটার। এই রাজ্যটি হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। শুনলে অবাক লাগতে পারে যে এর ভেতর ১৬৫ টি গ্রাম, ৬২ টি শহর এবং ২৭টি তহশিল আছে। যদিও এই গ্রামগুলো আমাদের বাংলার গ্রামের মত নয়। তবে দিল্লিতে আজও  বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন দিনে হাট বসে। অবশ্য আমরা বাংলার হাট বলতে যা বুঝি এগুলো তা থেকে অনেক আলাদা। এর আয়তন বা বিস্তৃতি এলাকা বুঝে হয়। প্রায় প্রতি এলাকাতেই এবং প্রতি সপ্তাহে এই হাট (সাপ্তাহিক বাজার ও বলতে পারেন) বসে রাস্তার ধারে কোনও ফাঁকা জায়গা দেখে। সেখানে সস্তায় তরিতরকারি থেকে শুরু করে জামা, প্যান্ট পর্যন্ত কিনতে পাওয়া যায়। দৈনন্দিন কাজে লাগার বহু উপকরণ আপনি দোকানে খুঁজে না পেলেও এই হাটে পেয়ে যেতে পারেন (মনে রাখবেন এগুলো কিন্তু দিল্লী হাট থেকে পৃথক। রাজ্য সরকার কিছু জায়গায় স্থায়ী দিল্লী হাট নামে কিছু প্রদর্শণীর ব্যবস্থা করেছেন।সেখানে ঢুকতে গেলে টিকিট লাগে। সেখানে শাক-সব্জী ইত্যাদি কিন্তু পাবেন না)। এলাকা ভিত্তিক এর নামের পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়। কোথাও বলা হয় সস্তা বাজার আবার কোথাও সানডে মার্কেট (রবিবার বসে বলে), আবার কোথাও মঙ্গল বাজার, কোথাও সোম বাজার ইত্যাদি। এখানে  হাটের কথা যখন লিখছি তখন দিল্লির অন্য দুটি সাপ্তাহিক বাজারের কথা না লিখলেও অন্যায় হবে। একটি হল প্রতি রবিবারে দরিয়াগঞ্জে বসা পুরাতন ও নতুন বই-এর সস্তা বাজার। বর্তমানে এই বাজারটি ডেলাইট সিনেমার সামনে মহিলা হাটে বসতে শুরু করেছে। লালকেল্লার পেছন দিকে সপ্তাহে একদিন বসে চোর বাজার। সেখানে পুরানো টায়ার থেকে টি ভি পর্যন্ত অত্যন্ত সস্তায় পেয়ে যাবেন। এই বাজারটিও শুনেছি স্থানান্তরিত হচ্ছে।
এখানে কাশ্মীরী গেট, সরাই কালে খাঁ এবং আনন্দ বিহার বলে তিনটি বড় বাস টার্মিনাল আছে। তবে আজকাল আরও কয়েকটি বাস টার্মিনাল বাড়ানোর কথা চলছে। গত কয়েক বছর আগে স্টুডেন্ট এইড পাব্লিকেশনস-এর দিল্লী স্টুডেন্ট গাইড এ প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখেছিলাম প্রায় ২,৫৩৫ টি প্রাইমারী বিদ্যালয়, ৬৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১৬৮৯ টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়  এবং ৮৮ টি কলেজ আছে দিল্লিতে। তবে সে সংখ্যা এখন পর্যন্ত নিশ্চয়ই অনেকে বেড়ে গেছে। দিল্লি ভারতের রাজধানী হওয়ায় বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রতি বছর বহু ছাত্র-ছাত্রী এসে ভর্তি হয়। এখানে পড়াশোনার পরিবেশ এখনও বিদ্যমান। যদিও পশ্চিমি সভ্যতার আঁচ এখানে একটু বেশিই লেগেছে বলা যেতে পারে। বিভিন্ন প্রদেশের গ্রাম থেকেও ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে পড়তে আসেন এবং যখন ফিরে যান তখন সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ। তাদের আদব-কায়দায় বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

Comments

  1. তথ্য সমৃদ্ধ ঝরঝরে লেখা। পরের লেখাটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  3. পড়ে ভালো লাগল। নতুন অনুভূতির কথা জানলাম (মানুষের নরম-গরম ব্যবহার)।

    ReplyDelete
  4. খুব ভালো লাগল এবং নিজের পুরানো দিনের স্মৃতির মধ্যে একবার যেন হারিয়েই ফেললাম নিজেকে

    ReplyDelete
  5. এই রকম একটা লেখার জন্য অনেক দিন ওয়এট করছিলাম, বেশ তথ্য বহুল

    ReplyDelete
  6. সুব্রত ঘোষJuly 24, 2020 at 8:08 PM

    যথেষ্ট উপভোগ্য ,সহজ সুন্দর লেখা ।

    ReplyDelete
  7. সুব্রত ঘোষJuly 24, 2020 at 8:16 PM

    আগেকার দিল্লি আর এখনকার দিল্লির তুলনামূলক ধারাবাহিকতার স্বচ্ছ ব্যাখ্যান ।

    ReplyDelete
  8. দিল্লী কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছে ।কাজেই প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে হলে এই পাল্টানো দিল্লী র ছবি নিশ্চয়ই তুলে ধরবেন।
    আরেকটা তথ্য হল স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ভারত পর্যটনের সময় দিল্লী এসেছিলেন ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল