ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস || পর্ব- ৭


সৌ ম্য দী প  চ ক্র ব র্ত্তী

ইংরেজি সাহিত্য: পর্ব বিন্যাস ও রূপরেখা
পর্ব- ৭     



 ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ড:

আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় শিল্প বিপ্লবের প্রভাবের মধ্যে দিয়ে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধেই ইংল্যান্ড তথা ইউরোপে দেখা যায় এক অবক্ষয়। ইংল্যান্ডে এই অবক্ষয় মূলত সামাজিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে দেখা যায়। এরই মধ্যে ১৮৩৭ সালে ভিক্টোরিয়ার ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আসীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডের। শাসনকালের প্রথম থেকেই তিনি ইংল্যান্ডকে সামাজিক সংস্কারের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ১৮৩২ সালের রিফর্ম অ্যাক্ট, ১৮৩৩ সালের ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট, ১৮৪২ এর মাইনস এন্ড কোলিয়ারিজ অ্যাক্ট এবং ১৮৭৬ এর এডুকেশন অ্যাক্ট সেই কথাই বলে যায়। সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। তাঁর শাসনকালে সাহিত্যের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির ধারা অক্ষুণ্ণ থাকে। এসময়ে ধর্মীয় ক্ষেত্রে জন হেনরি নিউম্যানের হাত ধরে ক্যাথলিক ভাবধারা ও রীতির শিথিলতা ও সংস্কারের বার্তা নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সংঘঠিত হয় অক্সফোর্ড মুভমেন্ট (সূচনাকাল- ১৮৩৩)। তবে রানী ভিক্টোরিয়ার সম্পূর্ণ রাজত্বকালের (১৮৩৭ - ১৯০১) এইসময়ে ভাবনা-চিন্তার জগতে ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান ও দ্বন্দ্ব এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
গতানুগতিক, যান্ত্রিক শিল্পকর্মের থেকে সরে এসে রয়্যাল অ্যাকাডেমির তিনজন শিল্পী- দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেটটি, উইলিয়াম হোলমান হান্ট এবং জন এভারেট মিলাইস-এর হাত ধরে সাহিত্যের অঙ্গনে এসময়ে সূচনা হয় এক নতুন স্বাদের শিল্পকর্মের। পরে টমাস উলনার, এফ. জি. স্টিফেন্স প্রমুখ কবি, শিল্পীরা এই আঙ্গিকের হাত শক্ত করেন এবং 'প্রি -রাফেলাইটিসম' নামের এক ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠা দেন। আবার শিল্প-সাহিত্য চর্চায় কেবলমাত্র নান্দনিকতার বোধকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে অস্কার ওয়াইল্ড, ওয়াল্টার পেটারের শিল্প-সাহিত্য কর্মের মধ্যে দিয়ে এসময়েই 'আর্ট ফর আর্ট'স সেক'-এর ডাক ওঠে।
ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডের সাহিত্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই উঠে আসে কবিতার কথা। আলফ্রেড লর্ড টেনিসন ও রবার্ট ব্রাউনিং -এর কবিতায় ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্য আলাদা মাত্রা পায়। আর্থার হেনরি হ্যালামের স্মৃতিতে লেখা ১৮৫০ সালে প্রকাশিত ১৩৩ টি কবিতার সংকলন 'ইন মেমোরিয়াম' টেনিসনের সর্বোত্তম সাহিত্য কীর্তি। 'ড্রামাটিক মনোলোগ' আঙ্গিকে লেখা ব্রাউনিংয়ের কাব্য-সংকলন 'ড্রামাটিক লিরিকস', 'ড্রামাটিক রোমান্স' কাব্য-সাহিত্যের ধারাকে পুষ্ট করে। এছাড়াও ভিক্টোরিয়ান যুগের বিশিষ্ট কবিদের তালিকায় রয়েছেন এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং, আর্থার হিউ ক্লাউ-এর মতো নাম। কাব্য-কবিতা ও সমালোচনা এই দুই ক্ষেত্রেই নিজস্ব শৈলী সৃষ্টি করে এযুগের অন্যতম বড় নাম ম্যাথু আর্নল্ড। 'ডোভার বিচ', 'দি স্কলার জিপসি'-র মতো কবিতার পাশাপাশি তাঁর 'কালচার  এন্ড অ্যানারকি' ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের এক সম্যক চালচিত্র তুলে ধরে।

কাব্য-কবিতার পাশাপাশি এই যুগ উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজের কলুষতার, অনৈতিকতার দিকগুলিকে বিশেষভাবে সামনে এনে চার্লস ডিকেন্স লেখেন 'অলিভার টুইস্ট', 'ডেভিড কোপারফিল্ড', 'হার্ড টাইমস', 'গ্রেট এক্সপেক্টেশন্স' -এর মতো উপন্যাস। এর সাথে এসময়ের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের তালিকায় সহজেই স্থান করে নেয় অস্কার ওয়াইল্ডের 'দি পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে', উইলিয়াম ম্যাকপিস্ থাকারের 'ভ্যানিটি ফেয়ার', জর্জ মেরেডিথের 'দি এগোইস্ট', বেঞ্জামিন ডিসরেলির 'ভিভিয়ান গ্রে', স্যামুয়েল বাটলারের 'দি ওয়ে অফ অল ফ্লেশ', আর. এল. স্টিভেনশনের 'ট্রেসার আইল্যান্ড', 'কিডন্যাপড' এবং 'ড: জেকিল এন্ড মি: হাইড'-এর মতো লেখাগুলি।

সমাজ ও সাহিত্য পরিসরে এসময়ের এক বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা মহিলা ঔপন্যাসিকদের উত্থান। ডিকেন্সের সমসাময়িক কালে জর্জ এলিয়ট ছদ্মনামে মেরি অ্যান এভান্স 'অ্যাডাম বেডে',  'মিডলমার্চ'এর মতো উপন্যাস উপহার দিয়েছেন। এসময়ের আরো এক বিশিষ্ট মহিলা ঔপন্যাসিক হলেন এলিজাবেথ গ্যাস্কেল। তাঁর উপন্যাস- 'মেরি বার্টন', 'ক্র্যানফোর্ড' এযুগের উৎকৃষ্ট সাহিত্যের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এছাড়া এসময়ের মহিলা ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম তিন ব্রন্টে বোনেরা। শার্লট ব্রন্টের 'জেন আয়ার', এমিলি ব্রন্টের 'ইউদারিং হাইটস' এবং অ্যান ব্রন্টের 'অ্যাগনেস গ্রে' এসময়ের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

গদ্যের ক্ষেত্রেও এসময়ে কিছু উলেখযোগ্য রচনা আমরা পাই। টমাস কার্লাইলের 'দি ফ্রেঞ্চ রেভোলিউশন', জন স্টুয়ার্ট মিলের 'দি সাবজেক্শন অফ উইমেন্', জন রাস্কিনের 'মডার্ন পেইন্টার্স', ওয়াল্টার পেটারের 'দি রেনেসাঁস'-এর মতো লেখা একালের গদ্য-সাহিত্যের সম্পদ। সমাজ, চিন্তাশীলতা ও নান্দনিকতার বিবিধ দিকের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রনে এই লেখাগুলি একালের অন্যতম বিশিষ্ট গদ্য-সাহিত্য। ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডের বিপুল সাহিত্য ভান্ডারকে দু-চার কথায় তুলে ধরার এক ক্ষুদ্র প্রয়াস রইলো এই পর্বে।
-----

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল