হাজার বছরের বাংলা গান // পর্ব - ৯

হাজার বছরের বাংলা গান ।। পর্ব- ৯

তু ল সী দা স  মা ই তি


বাঙালির শক্তিসাধনা: 
শাক্ত সংগীতের ধারা ও অন্যান্য 

বৈদিক ঋষিগণ "প্রাণদায়িনী,অন্নদায়িনী, স্তন্যদায়িনী মাতা রূপেই পৃথিবীর স্তব" করে শক্তি পুজোকেই সামনে এনেছেন বলে পণ্ডিতরা মনে করেন।
'মাতা পৃথিবী মহীয়ং'-'বিস্তীর্না পৃথিবী আমার মাতা।' এই ভাবনাকেই শক্তিদেবী কল্পনার প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়ে থাকে। শক্তিদেবী দুর্গা,কালী, উমা পার্বতী- সবাই প্রকৃতি মাতারই বিবর্তিত রূপ। দুর্গার নানান রূপ। কালীরও বহুরূপের নানান কাহিনি। এই শক্তি আবহের সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাস নানান স্রোতে আমাদের মননে ও সংস্কৃতিতে  সঞ্চরণশীল। এই সংস্কৃতির গর্ভ থেকেই বাংলা শ্যামাসংগীত তথা শাক্ত সংগীতের উদ্ভব।

ভারতে শাক্তসাধনার ইতিহাস খুব প্রাচীন। বাঙালির শাক্তসাধনা ও শাক্ত সংগীতের কথা বলতে গেলে তাই তার পূর্বসূত্রটিও দেখা প্রয়োজন। তবে এও সত্যি যে, এই সাধনার ক্ষেত্র এতই সুবিশাল তাকে এই অল্প আলোচনায় আনা সম্ভব নয়। এই  বিষয় সম্পর্কে পুরাণ ও ইতিহাস পড়ে জানা যায় যে ভারতের শক্তিদেবীর কল্পনা প্রাকবৈদিক কাল থেকেই। মানুষ যখন থেকে ঈশ্বর কল্পনা করেছে তখন থেকেই  ঈশ্বর নারীদেবতা না পুরুষদেবতা এই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সময়ের স্রোতে নানান বিবর্তনে এই ভাবনাগুলি বহুকৌণিক অবস্থান তৈরি করেছে। শক্তিদেবীর প্রার্থনার মূলকথা মাতৃ পূজা। বিশ্বজুড়েই এই মাতৃপূজার প্রসঙ্গ। ভারতের সিন্ধুসভ্যতা সহ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন সমস্ত সভ্যতায় মাতৃপূজার নিদর্শন আছে। বেদে ঊষা ও রাত্রিদেবীর বর্ণনা আছে। পণ্ডিতরা মনে করেন এই রাত্রিদেবীর প্রবাহেই কালিকা দেবীর কল্পনা। সংস্কৃত শাস্ত্রের নানান পর্বে শক্তিদেবীর আরাধনা। সব ক্ষেত্রেই শিবঘরণী দুর্গা কখনো বা চণ্ডী ইত্যাদি নানানরপে বর্ণিত। বলাবাহুল্য, শাক্ত সাধনার সাথে তন্ত্রসাধনার  নানান একক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। সাংখ্য দর্শনের প্রভাবও তাতে যুক্ত হয়ে এক নতুন তত্ত্ব উদ্ভূত হয়েছে।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে রামপ্রসাদের হাতে শাক্তগানের যে প্রবাহ শুরু হয় তাকেই শাক্তসঙ্গীতের সূচনা বলে বলা হলেও বাঙালির শক্তিসাধনার প্রকৃত সূচনাকালটি অনেক আগে থেকেই। বাঙালির  উমা বা কালী  তো অনেক দিনের। তার ভিত্তি ভূমি যে অনেক গভীরে তা সহজেই  বোঝা যায়। বাঙালির অকালবোধনে দুর্গা কে শক্তি রূপে আবাহন একটি বিশেষ প্রথা। এই পুজোর সূচনা পর্বে নবপত্রিকার পূজা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে কদলী, বিল্ব, কালোকচু, মানকচু, অশোক, ডালিম, জয়ন্তী, ধান্য ও হরিদ্রা এই নয়টি বৃক্ষকে বধুসাজে পুজো আসলে প্রকৃতি পুজো। তবে এই নয়টি বৃক্ষ শাখার বন্দনায় যথাক্রমে ব্রাহ্মণী, শিবা,কালিকা, চামুণ্ডা, শোকরোহিতা, রক্তদন্তিকা, কার্তিকী, লক্ষ্মী ও দুর্গা-এই নয় শক্তি  দেবীর স্তব করা হয়। বাঙালির কালী ও দুর্গা কল্পনা তো মার্কণ্ডেয় ও কলিকাপুরাণের অন্তঃস্রোত থেকে বাহিত।

এক ধর্মকলহের যুগে বাঙালি জাতির উদ্ভব ও বাংলা গানের সূচনা। একদিকে বৌদ্ধ ধর্ম, পালযুগে যার ব্যাপক প্রসার, সেন যুগে তার প্রায় শেষ অবস্থা। ব্রাহ্মণ্য যুগে হিন্দু আবেগের জোয়ার। তার অভ্যন্তরে শৈব শাক্ত ও বৈষ্ণব বোধ। জৈন ধর্মে ছিল তান্ত্রিক দেবদেবীর প্রভাব। কিছুকাল পরে ইসলাম শক্তির আগমন। এই আবহে বৈষ্ণব শক্তি ভীষণ ভাবে  জায়গা করে নিলেও শাক্তধর্ম কিছুটা প্রচ্ছন্ন স্রোতে বইতে থাকে। বাংলা গানের জগতে শাক্তধারার ক্ষেত্রে দুর্গা কালী পার্বতী প্রমুখ শক্তিদেবতার উদ্দেশ্যে গাওয়া গান হলেও অন্যান্য নারী দেবতার প্রার্থনা গানও  ছিলো সূক্ষ্মভাবে। বৌদ্ধ মতে প্রজ্ঞাপারমিতা, তারা ও একজটা দেবী  কল্পনার মতোই হিন্দুধর্মের  দেবদেবীর রূপকল্পনা দেখা যায়। বাংলাগানের মধ্যকালে বৈষ্ণব পদাবলীর মতো সংগীত রচিত না হলেও শাক্তকল্পনা ছিলই। চর্যাপদেও দেখি সহজিয়াদের যোগসাধনায় শক্তির কল্পনা। ডোম্বী, সবরী, চণ্ডালী, যোগিনী, সহজসুন্দরী প্রভৃতির সঙ্গে যোগীর মিলন- শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। চর্যাগানে এই শক্তির সহজ প্রকাশ। বৈষ্ণব শাস্ত্রে  রাধা কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। কোথাও কোথাও বিষ্ণুঘরণী লক্ষ্মীদেবীকে বৃহৎ করে দেখানো হয়েছে। বিদ্যাপতির 'দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে' দুর্গার বন্দনা আসলে শক্তি প্রার্থনা। বাঙালি কবি ও শক্তিগীতিকার  বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে তাদের হৃদয়ের আবেগকে প্রকাশ করেছেন । মনসা, চণ্ডী, অন্নদা, শীতলা, ষষ্ঠী, কমলা, বাশুলী সহ এই সমস্ত নারীদেবীর উপাসনায় কাব্যগুলিতে দেবী দুর্গার বন্দনা গান গাওয়া হয়েছে।
বাঙালির শাক্ত সংগীতের ধারা মূলত চৈতন্যের কাল থেকেই নতুন রূপ পেতে থাকে। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে শাক্তপদাবলীর  প্রকৃত ও স্বতন্ত্র রূপ চিহ্নিত হতে থাকে এই সময় থেকেই।  চৈতন্যের সময় বঙ্গদেশে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কালীসাধনার যে রূপ প্রবর্তন করেন সেই রূপই পরবর্তী কালের কালীর রূপ মনে করা হয়। 
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির কর্মচারী রামপ্রসাদ বৈষ্ণব পদাবলীর মতোই শাক্তপদাবলি রচনা করেন। তাঁর গান বাংলা সংগীতজগতে অভিনব ভক্তির জন্ম দেয়। বাংলা শ্যামাসঙ্গীত জগতের এই ধারাতেই সমকালীন ভক্তরা অবগাহন করে আনন্দ উপভোগ করেছেন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো বৈষ্ণব পদাবলীর সাথে শাক্ত সংগীতের কিছু পার্থক্য আছে। বিষয়ে রসের প্রকার আলাদা। বৈষ্ণব গানে যেমন  শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর এই পাঁচ প্রকার রস ,শাক্ত গানে তেমনি বাৎসল্য,বীর, অদ্ভুত, দিব্য ও শান্ত এই পাঁচ রকমের রস। অর্থাৎ ভিন্নতা আছে। আসলে শক্তিসাধকগণ তাঁদের গানে মাতৃভাবকেই অবলম্বন করেছেন। ভক্তিমূলক এই সংগীতধারার দুটি পর্যায়- তত্ত্বমূলক শ্যামাসংগীত ও  বাৎসল্য রসাশ্রিত উমা সংগীত বা আগমনী বিজয়ার গান। রামপ্রসাদের পথেই কমলাকান্ত  ভট্টাচার্য, রসিকচন্দ্র রায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ঈশ্বর গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, রাজকৃষ্ণ ঘোষ প্রমুখ গীতিকার অজস্র শাক্ত গান রচনা করেন।
রামপ্রসাদ সেন বিদ্যাসুন্দর, কালিকীর্তন  কৃষ্ণকীর্তন রচনা করলেও তাঁর জনপ্রিয়তা শাক্তগীতি রচনায়। তিনি বৈষ্ণব ভাবধারার আদর্শে  বাৎসল্য রসের উমা সংগীত রচনা করেছেন।
"রামপ্রসাদ বৈষ্ণবদের ভাব চুরি করিয়া কঠোর শাক্ত ধর্ম্মকে যে কোমল শ্রী প্রদান করিয়াছেন বাংলার শাক্ত ধর্ম্মের এখন তাহাই বিশেষত্ব হইয়া দাড়াঁইয়াছে। সাক্ষাৎ শক্তিরূপিনী দশভুজা বাংলার ঘরে ঘরে পাশ, অঙ্কুশ, খেটক, ধনু, অসি, চক্র, শূল  প্রভৃতি আয়ুধ-ধারিণী হইয়াও বাৎসল্যের প্রতিমূর্তি হইয়াছেন।" 
রামপ্রসাদের উমা ঘরের মেয়ে। মেনকা বাঙালির মা। তার আগমনী বিজয়া-র গানে বাঙালি মা- বাবা- মেয়ের আনন্দ বেদনার ছবি। 
"গিরি এবার আমার উমা এলে 
আর উমা পাঠাবো না।
বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনবো না।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়, উমা নেবার কথা কয় 
এবার মায়ে ঝিয়ে করবো ঝগড়া 
জামাই বলে মানব না।"

শূন্য থেকে পূর্ণের সাধনায় তিনি গভীর তত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর শ্যামাসঙ্গীতগুলি বাংলা গানের মূল্যবান সম্পদ। প্রসাদী সংগীত আসলে প্রসাদীফুল। প্রসাদী সুর জীবনকে ছাপিয়ে মহিমা দান করেছে। তাঁর বীর রসের গান 'আমি কি দুখেরে ডরাই', 'দূর হয়ে যা যমের ভটা'  বাঙালিকে উজ্জীবিত করে। সমস্ত  রকম রসের গানেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর দিব্য রসের গানটি স্মরণীয়।
"এমন দিন কি হবে তারা 
   যবে তারা তারা তারা বলে, তারা বেয়ে পড়বে ধারা।"

শাক্তসঙ্গীতের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। বর্ধমান রাজার সভাপণ্ডিত গায়ক কমলাকান্ত উচ্চমানের শ্যামাসংগীত রচনা করে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। আধ্যাত্মিক ভাব যুক্ত তাঁর গান সুমধুর ও চিত্তাকর্ষক। আজও প্রচলিত তাঁর গানগুলি মানবিক রসে নিবিড়।
'মজিলা মন ভ্রমরা, কালীপদ নীলকমল।
যত বিষয় মধু তুচ্ছ হৈল ,কামাদি কুসুম সকলে।।
 চরণ কালো ভ্রমর কালো কালোয় কালো মিশে গেল
দেখ, সুখ দুঃখ সমান হলো আনন্দ-সাগর উথলে।'
এই পথেই রসিকচন্দ্র রায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ঈশ্বর গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত রাজকৃষ্ণ ঘোষ প্রমুখ শাক্তসঙ্গীতে নিজেদের অবদান রেখেছেন। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ সহ বহু মানুষ এই শক্তিসাধনা ও সংগীতে মজেছিলেন।

শক্তিসাধনার নানা রূপ পরবর্তী সংগীত ধারাকে প্রভাবিত করে। বঙ্কিমচন্দ্রের  ভারতমাতাকে উদ্দেশ্য করে বন্দে মাতরম সংগীত তো শক্তিসাধনারই রূপ। বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদা মঙ্গলেও শাক্ত প্রভাব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে ও প্রভাব দেখি। তাঁর "বাল্মীকিপ্রতিভা-"য় দেখি--
 
"কালী কালী  বলো রে আজ -
বলো হো, হো হো, বলো হো, হো হো, বলো হো!"

তাঁর অন্যান্য গানেও আছে মাতৃ আহ্বান

"মিলেছি আজ  মায়ের ডাকে।
………………….
ঘরের ছেলে  সবাই মিলে 
দেখা দিয়ে আয়রে মাকে।"

শাক্ত সংগীতের এই প্রবহমান ধারা বাঙালির জীবনধারার মতোই বয়ে চলবে। তার নিজস্ব গতি মেনেই। (চলবে)

Comments

  1. অসাধারণ এই ধারাবাহিক।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল